সংবিধান ও সিডও: নারী কী পেল?

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২০     আপডেট: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২০   

শাওয়াল খান

শাওয়াল খান

শাওয়াল খান

সংবিধান রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন। যে আইনের বিধিবিধান মেনে রাষ্ট্র পরিচালিত হয়। সংবিধানের কাজ নাগরিকদের অধিকার সংরক্ষণ। আর কনভেনশন অন দ্য এলিমিনেশন অব অল ফর্মস অব ডিস ক্রিমিনেশন অ্যাগেইনস্ট উইমেন-সিডও হচ্ছে নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্তর্জাতিক চুক্তি বা সনদ। ১৯৭৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে নারীর প্রতি সকল ধরনের বৈষম্য দূরীকরণ বিষয়ক সনদ বা কনভেনশন- সিডও গৃহীত হয়।

জাতিসংঘ কর্তৃক ১৯৭৫ সালকে 'বিশ্ব নারী বর্ষ' হিসেবে ঘোষণা করার পর নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য দূর করার জন্য আরও কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রেক্ষাপটে সিডও পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এই সনদ বা কনভেনশন গৃহীত হওয়ার মধ্য দিয়ে নারীর জন্য সমান অধিকারের লক্ষ্য অর্জনের পথে সমগ্র বিশ্বের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক সূচিত হয়। সকল ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমতার ভিত্তিতে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ইত্যাদি সকল বিষয়ে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সেই পথে জাতীয় পর্যায়ে আইন প্রণয়ন করে পর্যায়ক্রমে বৈষম্যমূলক আচরণের অবসানের জন্য এই সনদে আহ্বান জানানো হয়েছে। নারী-পুরুষের সমতা স্থাপনই সিডও দলিলের মূল মর্মবাণী। ১৯৮০ সালের পয়লা মার্চ থেকে এই সনদে স্বাক্ষর শুরু হয়। ১৯৮১ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ২০টি রাষ্ট্রের অনুমোদনের পর এই সনদ কার্যকর বলে ঘোষণা করা হয়। তখন থেকেই জাতিসংঘের উদ্যোগে ৩ সেপ্টেম্বর সিডও দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশ সরকার ১৯৮৪ সালের ৬ নভেম্বর সিডও সনদে স্বাক্ষর ও অনুমোদন করে। সিডও সনদে মোট ৩০টি ধারা রয়েছে। ৩০টি ধারার মধ্যে ১৪টি প্রশাসনিক, বাকি ১৬টি নারী অধিকার বিষয়ক। এই ১৬টি ধারা নারীর সমতা স্থাপনের জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে কী কী করণীয়, তা সংশ্নিষ্ট রাষ্ট্রসমূহকে বাতলে দিয়েছে। বাংলাদেশ এই দলিলের ৩টি ধারা ২, ১৩(ক) এবং ১৬-১(গ) ও (চ) বাদ রেখে অনুমোদন করে স্বাক্ষর করে। ১৯৯৭ থেকে বাংলাদেশ সরকার ২ ও ১৬-১(গ) ধারা ছাড়া অন্য দুটি ধারার ওপর থেকে সংরক্ষণ প্রত্যাহার করে। এ পর্যন্ত ১৮৬টি দেশ এই কনভেনশন অনুমোদন দিয়ে স্বাক্ষর করেছে। অনেক মুসলিম দেশ যেমন- ইয়েমেন, মরক্কো, তিউনিশিয়া সিডও ধারা-২ ও ধারা ১৬-১(গ)সহ সিডও সনদ অনুমোদন করেছে। নারীর মৌলিক অধিকারকে প্রাধান্য দেওয়া সিডও সনদের প্রাণকথা হিসেবে গণ্য ধারা-২ এবং অন্যতম একটি মূলধারা ১৬-১(গ) থেকে বাংলাদেশ সংরক্ষণ প্রত্যাহার করেনি। এই ধারা দুটি সংরক্ষণ বাংলাদেশের জন্য যুক্তিযুক্ত নয়। ধারা ২-এ বলা হয়েছে, যে সকল আইন, রীতি, প্রথা নারীর প্রতি বৈষম্য তৈরি করে তা বাতিলের জন্য সিডও সনদে স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রসমূহ অবশ্যই ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। ধারা ১৬-১(গ)তে বলা হয়েছে, বিয়ে, সন্তানের অভিভাবকত্ব এবং সম্পত্তি লাভের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান অধিকার এবং রাষ্ট্রসমূহ নারী-পুরুষের সমতার ভিত্তিতে এ বিষয়গুলো নিশ্চিত করবে। এ ধারাগুলো বাদ দিয়ে বাংলাদেশে নারীর অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টি, নারীকে অধিকার বঞ্চিত করা বা অধিকার হরণ করা অর্থাৎ গাছের আগায় বসিয়ে গোড়া কেটে দেওয়ার শামিল। বাংলাদেশ মুসলিম শরিয়া আইনের দোহাই দিয়ে উল্লিখিত ধারা দুটি থেকে সংরক্ষণ বা আপত্তি এখনও পর্যন্ত তুলে নেয়নি। এই পর্যন্ত যে ক'টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ গৃহীত হয়েছে তার মধ্যে সিডও সনদ অন্যতম। শিশু অধিকার সনদের পর এই সনদটি সর্বাধিক দেশ কর্তৃক অনুমোদনপ্রাপ্ত সনদ।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের প্রায় সব আইনই প্রণীত হয়েছে, দেশের সকল নাগরিকের অধিকার রক্ষা/চর্চা এবং ন্যায়বিচারের স্বার্থে সংবিধানের আলোকে ইউরোপীয় সিভিল আইনের আদলে। শুধু নারী অধিকার খর্বকারী ব্যক্তিগত বা পারিবারিক আইন হচ্ছে ধর্মীয় আইননির্ভর। একই সংবিধান মেনে পরিচালিত একটি স্বাধীন দেশে এমন দ্বৈত শাসন তো সংবিধান আমলে না নেওয়ার শামিল। বাংলাদেশের সংবিধানের ধারা- ১০, ১৯, ২৭, ২৮ ও ২৯নং ধারাসমূহে জীবনের সবক্ষেত্রে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। তাই শরিয়া আইনের দোহাই দিয়ে সিডও সনদের দুটি ধারা সংরক্ষণ নারী-পুরুষের সমান অধিকারের সাংবিধানিক নীতি লঙ্ঘন করার শামিল। সংবিধানের আলোকে নারী-পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আইন করে বা আইনের সাহায্যে সাংবিধানিক অধিকার বলে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হলে এক্ষেত্রে বিরাজমান প্রতিবন্ধকতা দূর করতে ধারা সংরক্ষণ প্রত্যাহার অপরিহার্য।

সিডও সনদ নারী অধিকারের আন্তর্জাতিক বিল হিসেবে স্বীকৃত। প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক সনদ সিডওতে তুলে ধরা হয় নারীর অধিকার মানবাধিকার। সাধারণত নারী-পুরুষ সমতা সমঅবস্থা বোঝাতে ব্যবহূত হয়। যেমন- সমঅধিকার, মর্যাদা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার নীতিকে নির্দেশ করে। একজন মানুষ হিসেবে, দেশের একজন নাগরিক হিসেবে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বক্ষেত্রে নারীর পূর্ণ অধিকার আছে। লেখাপড়া, চাকরি, সম্পত্তি, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, মত প্রকাশ, সন্তানের অভিভাবকত্ব, আইনি অধিকার, মজুরি, ভোটাধিকার, তালাক প্রদান ইত্যাদিতে পুরুষের মতোই নারী তার প্রাপ্য অধিকার পাবে। নারীকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে মানবাধিকার লঙ্ঘন। সংবিধানে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের কথা বলা হলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে যেমন-পৈতৃক সম্পত্তি বা উত্তরাধিকার, বিয়ে বিচ্ছেদ, সন্তানের অভিভাবকত্ব ইত্যাদি ক্ষেত্রে নারীর অধিকার পুরুষের সমান নয়, প্রচলিত কিছু আইনের দোহাই দেখিয়ে সংবিধানকে অকার্যকর রেখে রাষ্ট্র পরিচালিত হচ্ছে, ফলে নারী সংবিধানের বদৌলতে প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

এ ক্ষেত্রে উল্লেখ করা প্রয়োজন, সংবিধানের ২৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে-

(১) এই ভাগের বিধানাবলীর সহিত অসামঞ্জস্য সকল প্রচলিত আইন যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, এই সংবিধান-প্রবর্তন হইতে সেই সকল আইনের ততখানি বাতিল হইয়া যাইবে।

(২) রাষ্ট্র এই ভাগের কোন বিধানের সহিত অসামঞ্জস্য কোন আইন প্রণয়ন করিবেন না এবং অনুরূপ কোন আইন প্রণীত হইলে তাহা এই ভাগের কোন বিধানের সহিত যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইয়া যাইবে।

সংবিধান রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন। তা হলে সংবিধানের ওপর কি অন্য কোনো আইন থাকতে পারে? প্রত্যেক নাগরিকের সামাজিক এবং রাজনৈতিক অধিকার রয়েছে। সম্পত্তির অধিকার স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে নারীর সামাজিক অধিকার, সম্পত্তির অধিকারে সমতা অর্জিত না হওয়ার অর্থ শুধু অর্থনীতির মানদণ্ডে পিছিয়ে থাকা নয়, সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হওয়ারও শামিল।

১৯৯৩ সালে ভিয়েনা বিশ্ব মানবাধিকার সম্মেলনে নারীর অধিকারকে মানবাধিকার রূপে ঘোষণা করে এবং নারীর মানবাধিকারজনিত সমস্যাকে জাতিসংঘের সার্বিক মানবাধিকার কর্মসূচি ও কর্মকাণ্ডের সঙ্গে একীভূত করা হয়। ১৯৯৪ সালে কায়রোতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক জনসংখ্যা ও উন্নয়ন সম্মেলনে প্রথম নারীর ক্ষমতায়ন উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশরূপে চিহ্নিত হয় এবং ১৯৯৫ সালে সামাজিক উন্নয়ন শীর্ষ সম্মেলনে নারীর সমস্যার পুরো বিষয়টি উত্থাপনের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ কর্তৃক নারী-পুরুষের সমতা নিশ্চিতকরণের প্রতিশ্রুতি ঘোষিত হয়। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের নারীসমাজ সংবিধান প্রদত্ত সমান অধিকার থেকেও বঞ্চিত। স্বাভাবিকভাবেই নারীর সমস্যা নানাবিধ, তা শুধু সমান অধিকার না পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এসব সমস্যার অনেকটাই সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে সৃষ্ট। এছাড়াও সংবিধান যেসব নাগরিক অধিকারের কথা বলে, রাষ্ট্র কি তা মেনে চলে?

পরিতাপের বিষয় হলো, জাতিসংঘের নানা মানবতাবাদী তৎপরতা ও মানবতাবাদীদের অবিরত তাত্ত্বিক ও সামাজিক ব্যাখ্যার পরও সমাজজীবনে নারীসমাজের সমান অধিকার ও ক্ষমতায়নের কাম্য স্বস্তি এখনও বহুদূর। সমাজের অভ্যন্তরে এমন অস্বস্তি, দূরত্ব এবং বৈষম্য বজায় রেখে কি বলা যায়, দেশ সংবিধানের আলোকে পরিচালিত হচ্ছে?

লেখক: শিক্ষক ও গবেষক