করোনা এবং অর্থনীতি

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২০   

ড. কাজী ছাইদুল হালিম

জাতীয় অর্থনীতি অনেকটা ঘূর্ণায়মান বৃত্তের মতো। এই বৃত্তের মধ্যে অবস্থান করে গৃহস্থালি বা ভোক্তা এবং উৎপাদক, যা চক্রের মতো ঘুরতে থাকে। জাতীয় অর্থনৈতিক কার্যক্রম চলে মূলত এই দুই গোত্রের মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে। বাজার ব্যবস্থার মাধ্যমে ভোক্তা ও উৎপাদক মিলিত হয় পণ্য ক্রয়- বিক্রয়ের নিমিত্তে। আর এই ক্রয় এবং বিক্রয় ব্যবস্থায় বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে অর্থ বা সোজা কথায় বাংলাদেশের ক্ষেত্রে টাকা। উৎপাদকের উৎপাদিত পণ্য এবং ভোক্তার ভোগ জাতীয় অর্থনীতির বেঁচে থাকার জন্য অত্যাবশ্যকীয় দুটো নিয়ামক। সরকার সব সময় জাতীয় অর্থনীতির উৎপাদন এবং ভোগকে চাঙ্গা রাখতে বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করে। কারণ শক্তিশালী উৎপাদন এবং ভোগ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অন্যতম পরিমাপক। এই উৎপাদন এবং ভোগব্যবস্থা কিছু কিছু কারণে সংকুচিত হয় আবার কিছু কিছু কারণে পরিবর্ধিতও হয়। উদাহরণস্বরূপ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারি, যুদ্ধ, অর্থ পাচার এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা উৎপাদন এবং ভোগব্যবস্থাকে সাধারণত সংকুচিত করে। অপরদিকে, ইতিবাচক ব্যবসার পরিবেশ, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অনুকূল আবহাওয়া এবং গ্রাহকের আত্মবিশ্বাস উৎপাদন এবং ভোগব্যবস্থাকে সাধারণত পরিবর্ধিত করে।

উৎপাদন এবং ভোগের সঙ্গে জাতীয় অর্থনীতিকে সচল রাখতে আরও কিছু কার্যকলাপ অত্যাবশ্যকীয়, যেমন- সঞ্চয়, কর এবং আমদানি। এ তিনটিকে যথাক্রমে অর্থনীতির লিকেজ বলা হয়। কারণ এই কার্যকলাপগুলো অর্থনীতির বৃত্ত থেকে সম্পদ বাইরে নিয়ে যায়। অন্য তিনটি অত্যাবশ্যকীয় কার্যকলাপ হলো বিনিয়োগ, সরকারি ব্যয় এবং রপ্তানি। এ তিনটিকে যথাক্রমে অর্থনীতির ইনজেকশন বলা হয়। কারণ এই কার্যকলাপগুলো অর্থনীতির বৃত্তে সম্পদের সমাবেশ ঘটায়। বাস্তব ক্ষেত্রে যা অর্থনীতির বৃত্ত থেকে লিকেজের মাধ্যমে বের হয়ে যায় পরবর্তীকালে সেটাই কিন্তু আবার ইনজেকশন হিসেবে প্রবেশ করে অন্ততপক্ষে তত্ত্বীয়ভাবে। একটা অর্থনীতিতে লিকেজ যেমন অত্যাবশ্যকীয়, তেমনি অত্যাবশ্যকীয় হচ্ছে ইনজেকশনও। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য সরকার এই লিকেজ এবং ইনজেকশন উভয়ের মধ্যে ভারসাম্য আনার চেষ্টা করে রাষ্ট্রীয় ফিসকাল ও মুদ্রানীতির মাধ্যমে। এভাবে যে কোনো জাতীয় অর্থনীতির অনেক উদ্দেশ্যের মধ্যে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অন্যতম। আবার এটাও আমাদের বুঝতে হবে যে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা মানে অর্থনৈতিক স্থবিরতা নয়। তাই অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধিও প্রতিটি সরকারের মৌলিক উদ্দেশ্য।

উপরে বর্ণিত লিকেজ এবং ইনজেকশনের উপাদানগুলো জাতীয় অর্থনীতির বৃত্তের নিয়মতান্ত্রিক কার্যক্রম। লিকেজের উল্লেখিত তিনটি নিয়মতান্ত্রিক উপাদান ছাড়াও অনিয়মতান্ত্রিক কার্যক্রম সংঘঠিত হতে পারে জাতীয় অর্থনীতিক বৃত্তে যেমন (১) দুর্নীতি এবং (২) বিদেশে অর্থ পাচার। দুর্নীতি এবং অর্থ পাচার জাতীয় অর্থনীতি বৃত্তে সম্পদের নিয়মতান্ত্রিক প্রবাহকে সঙ্কুচিত করে। দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত এবং পাচারকৃত অর্থে রাষ্ট্রীয় কোন নিয়ন্ত্রণ থাকেনা। অনিয়ন্ত্রিত অর্থ সমাজে সমতার ভারসাম্যকে দুর্বল করে দেয়, ক্ষমতা চলে যায় দুর্নীতির মাধ্যমে সৃষ্ট ধনীক শ্রেণীর হাতে। এভাবে সমাজে রাজনৈতিক দুরবৃত্তায়নের প্রাদুর্ভাব ঘটে। আর বিদেশে অর্থ পাচারের মাধ্যমে দেশজ ভোগ এবং বিনিয়োগে অর্থ ঘাটতি দেখা দেয়। দেশ আস্তে আস্তে নিমজ্জিত হয় অর্থনৈতিক সংকটে। দুর্নীতি এবং বিদেশে অর্থ পাচার আমাদের দেশের অন্যতম দুটো সামাজিক এবং অর্থনৈতিক সমস্যা। তারপর এ বছরের প্রথম দিকে বিশ্বব্যাপী যে মহামারি করোনা আঘাত হেনেছে তার প্রকোপ বাংলাদেশও হাড়ে হাড়ে অনুভব করছে। করোনা যে খুব সহজে বাংলাদেশ বা এই পৃথিবী থেকে যাচ্ছে না তা অনেকটই নিশ্চিত। দুর্নীতি, অর্থ পাচার এবং তার সাথে যোগ হয়েছে এখন করোনা। আমাদের অর্থনীতি এখন ত্রিমুখী সংকটের সন্মুখীন!

করোনার মধ্যেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। অর্থনীতিকে শক্ত ভিতের উপর দাঁড় করাতে হবে। আর এ জন্য আমাদের সবচেয়ে বেশী যেটা দরকার তা হল সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ কার্যকরী ব্যবহার নিশ্চিত করা। অধিকন্তু, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়া। দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতিকে বাক্য থেকে বাস্তবে প্রয়োগ করা। দুর্নীতি এবং বিদেশে অর্থ পাচার একে অপরের সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। এ দূটোকেই বন্ধ করতে হবে। দুর্নীতি বন্ধের জন্য সরকার দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদককে আরো শক্তিশালী এবং কার্যকরী সংস্থা হিসাবে গড়ে তুলতে পারে। দুর্নীতিবাজ এবং অর্থ পাচারকারীদের বিচারের আওতায় আনতে বিভিন্ন সংস্থা থেকে বেশী বেশী করে সৎ, দক্ষ এবং দেশপ্রেমিক কর্মকর্তাদের দুদকে কয়েক বছরের জন্য ডেপুটেশনে নিয়োগ দেয়া যেতে পারে। টাকা পাচারকারীদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের সন্মুখীন করতে সরকার আন্তর্জাতিক সল্ফপ্রদায় এবং উন্নয়ন সহযোগীদের যেমন কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যের সাথে চুক্তি সম্পাদন করতে পারে।

দুর্নীতি এবং বিদেশে অর্থ পাচার বন্ধ করতে সরকারকে আরো যা করা উচিত তা হল এ দুটোর উৎসস্থলকে চিহ্নিতকরণ, এগুলোর মূল নায়কদের শনাক্তকরণ এবং দ্রুত বিচারের মাধ্যমে তাদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিতকরণ। অনেকসময় আমরা এটাও দেখি যে আমাদের বিচার ব্যবস্থার ধীরগতি অনেককে দুর্নীতি এবং বিদেশে অর্থ পাচারের মত অপরাধ করতে উৎসাহিত করে। তাই বলব যে বিচার প্রক্রিয়া যত দ্রুত সময়ের মধ্যে সম্ভব সম্পন্ন করতে হবে। এখানে মনে রাখতে হবে যে justice delayed, justice denied. মোদ্দাকথা অপরাধীকে তার কৃতকর্মের জন্য দ্রুত শাস্তি পেতে হবে। কোন অপরাধের জন্য অপরাধীর শাস্তি, অন্যজনকে একই ধরনের অপরাধ করতে নিরুৎসহিত করে। তাই সমাজ বিজ্ঞানীরা বলে থাকেন যে কোন অপরাধীকে যদি তার কৃত অপরাধের জন্য উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে অন্যরা একই ধরনের অপরাধ করতে উৎসাহ পায়। ফলস্বরূপ্‌, সমাজে অপরাধীর সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে পারে।

করোনা মহামারি উত্তর অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশকে তার সীমিত সম্পদের সদ্বব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। আর এটা তখনই সম্ভব হবে যখন রাষ্ট্র ব্যবস্থা দুষ্টের দমনে এবং শিষ্টের পালনে সক্ষম হবে। প্রতিটা দুর্নীতিবাজ এবং বিদেশে অর্থ পাচারকারীর উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে, দেশের অর্থ দেশে বিনিয়োগ হবে। আমরা সমৃদ্ধশালী দেশে পরিনত হব। এর চেয়ে গর্বের বিষয় আর কি হতে পারে আমাদের একটা স্বাধীন জাতি হিসেবে।

লেখক : শিক্ষক ও গবেষক