পরিবার ও সমাজ বিপরীত যাত্রা!

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২০     আপডেট: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২০   

ড. মোহাম্মদ আলী ওয়াক্কাস সোহেল

মানুষ সামাজিক জীব হিসেবে এ ধরায় প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন,বন্ধু-বান্ধব, সহকর্মী, খেলার সাথী, সামাজিক বন্ধন, আচরণ, রীতিনীতি, সংস্কৃতি ও সভ্যতার ধারা প্রবাহিত হয়ে টিকে থাকার প্রাণান্তকর লড়াইয়ে মত্ত থেকে আগামীর স্বপ্ন বুননে ব্যস্ত সময় পার করছে। ভোগবাদের বিকাশ, ব্যক্তিস্বাতন্ত্রীকরণের প্রভাব এবং তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় ব্যপ্তি স্বাভাবিক জীবনযাত্রার পালে নতুন গতির সঞ্চার করেছে। এসবের কারণেই মানব সমাজে নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা এবং আধুনিকতার উৎকর্ষ সত্ত্বেও কোথায় যেন সার্থকতার শূন্যতা। প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ব্যবধান যেন কমছেই না। এ যাত্রা কি প্রত্যাশিত? সমাজের নাগরিক হিসেবে এ যাত্রা কি আমাদের কাম্য ছিল? 

সমাজকে যদি একটি দেহের সঙ্গে তুলনা করা হয় তাহলে সহজেই বোধগম্য হয় যে শরীরের কোথাও যদি ক্ষত অস্বস্তি এবং অস্থিরতা থাকে তার প্রভাব সমুদয় দেহে যেমন অনুমেয় তেমনি সমাজ কাঠামোর কোথাও যদি অসামঞ্জস্য ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় তা সমুদয় ব্যবস্থাতেই প্রভাব ফেলে থাকে। এ যাত্রা কোথায় গিয়ে থামবে তা আমাদের জানা নেই। তবে এসব যাত্রায় যে বৈকল্যতা, অসংগতি, অস্থিরতা, অসামঞ্জস্য, অনিয়ম, অসততা, অসচেতনতা এবং বিপরীতমুখী প্রবণতাকেই কাছে টানছে তা অনুঘটকগুলোর প্রভাবক বিশ্নেষণেই অনুধাবন করা যেতে পারে।

প্রকৃতি সৃষ্টিকর্তার অপার আশীর্বাদ। প্রকৃতিতেই আমরা নির্মল, পবিত্র, অকৃত্রিম ভালোবাসা ও তৃপ্তি পাই। অথচ আমরাই কিনা পাহাড় কেটে স্থাপনা, বসতবাড়ি তৈরি করছি, নির্বিচারে পাথর উত্তোলন, নদী ভরাট করে মার্কেট তৈরি, পানিতে মানব সৃষ্ট বর্জ্য ফেলে নোংরাকরণ, যত্রতত্র বালি উত্তোলন এবং নালা, ছড়া, খাল দখলের প্রতিযোগিতায় মত্ত থেকে নগরজীবনে জলাবদ্ধতা এবং আগাম বন্যা ডেকে আনছি। যার কারণে মাঝে মাঝে পিচঢালা রাস্তায়ও নৌযান চলতে দেখা যায়। এসব কি আমাদের স্বাভাবিক যাত্রার ইঙ্গিত বহন করে?

প্রতিটি সমাজই পরিচালিত হয় কতগুলো পদ্ধতি, আচার-অনুষ্ঠান, আদর্শ ও মূল্যবোধ, অলিখিত নিয়মনীতি, প্রথা, আচরণ এবং বন্ধন দ্বারা। এ দেশে আবহমানকাল থেকেই বড়রা ছোটদের স্নেহ করত, অনুজরা অগ্রজদের শ্রদ্ধা ও অনুকরণ করত। খেলার সাথী এবং প্রতিবেশীর সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ লাভের মাধ্যমে সামাজিক মানুষ হিসেবে তৈরি হওয়ার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে পারত। বর্তমান সময়ে খেলার মাঠের স্বল্পতা, প্রতিবেশীর সঙ্গে সংস্পর্শে আসার সুযোগ কম এবং কোমলমতি শিশুদের আধুনিক আইসোলেশনে রাখার কারণে তারা জানে না প্রতিবেশীর সঙ্গে কীরূপ আচরণ করতে হয়। অথচ আমরা বিপদে-আপদে, সুখে-আনন্দে সর্বদা প্রতিবেশীর পাশে থাকার তাগিদ অনুভব করতাম। আজ যেন এসব স্বপ্ন।

আত্মীয়তার পবিত্র বন্ধন আমরা ছেলেবেলায় যেভাবে উপভোগ ও অনুভব করতাম এখন এসব কল্পনা। স্কুল ছুটিতে নানা, ফুফু ও খালার বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার স্মৃতি আজও তরতাজা। একান্নবর্তী পরিবারে বড় হওয়ার কারণে অনেক দূরের আত্মীয়কেও আপন করার মানসিকতা ছিল। সমাজের সেই সোনালি সময়ে আর্থিক দৈন্যের মাঝেও প্রাপ্তি কোনো অংশে কম ছিল না। যান্ত্রিক সমাজে আত্মীয়তার পরিধি যেন সংকুচিত হয়ে আসছে। নিকট স্বজনের সঙ্গেও দেখা করার ফুরসত পাওয়া যায় না। জাগতিকতার কারণে অনেক আত্মীয়ের যশ, খ্যাতি এবং পরিচিতিও রয়েছে। তারপরও কোথায় যেন হাহাকার ও শূন্যতা। আবেগ-অনুভূতির সঙ্গে কায়েমি ব্যক্তিত্বের সংঘাত চলছে। অথচ সব সম্পর্কের মাঝেই আনন্দ, কষ্ট, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, সহমর্মিতা-সহযোগিতা উপস্থিত থাকাটা স্বাভাবিক। কারণ যে সম্পর্কে এসব উপাদান একেবারেই অনুপস্থিত থাকে সে সম্পর্ক তো মৃত এবং যে সম্পর্কে রাগ, ভালোবাসা আনন্দের সংমিশ্রণের সঙ্গে মাঝে মাঝে দ্বন্দ্বেরও উপস্থিতি থাকে সে সম্পর্কই তো সুন্দর এবং সর্বজনীন। সমাজে চলতে গিয়ে মত-পথের অমিল হবে, সিদ্ধান্তের বিরোধিতা থাকবে, মাঝে মাঝে ঝগড়া ও হবে- এসবই তো আত্মীয়তার সৌন্দর্য। অথচ আধুনিকতায় অনেকেই ঠুনকো বিষয়কে বড় করে ভেবে আত্মীয়তার সম্পর্কের মাঝে তালা লাগিয়ে দেয়। এমনকি মৃত ব্যক্তির লাশ দর্শনেও অনীহা বোধ করে। এসব অসুস্থতা থামার লক্ষণ কি নিকট ভবিষ্যতে দেখা যাবে?

সমাজে ভালো মানুষেরা আজ একা, বিচ্ছিন্ন এবং সমাজের খারাপ লোকেরা সংঘবদ্ধ। আওয়াজ দিলেই হাজারো শয়তান জড়ো হয়ে যায়। শিক্ষিত ব্যক্তিরা যেখানে বিনয়ী ও পরোপকারী হওয়ার কথা ছিল তারাই কিনা অসততা আর দুর্নীতি-অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থেকে অহংকার ও দম্ভ প্রদর্শন করছে। পেশাজীবী অনেক মানুষই মানব সমাজে স্বার্থপর ও কসাইয়ের আখ্যা পাচ্ছেন। অথচ এসব কেন? আধুনিক সময়ে এসব পিছুটানের তো কথা ছিল না?

প্রযুক্তি আমাদের কর্মযজ্ঞের বেগ বাড়িয়েছে বহু গুণ, যার কারণে চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষা নিয়ত বদলাচ্ছে। কিন্তু বিপরীতে কেড়ে নিয়েছে অনুভূতি, ভালোবাসা, আবেগ এবং সহমর্মিতাবিষয়ক প্রপঞ্চগুলোকে। তাই তো আজ দেখা যায় সামাজিক যোগাযোগের প্রসারে ভার্চুয়াল বন্ধুর তালিকা বেড়েছে কিন্তু বিপরীতে আবেগ-অনুভূতি ক্রমহ্রাসমান হারে কমছে। নতুন প্রজন্ম এখন সামাজিক জীব হিসেবে পরিচয়ের চেয়ে ভার্চুয়াল প্রাণীর বৈশিষ্ট্য ধারণা করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে। এমন কেন হচ্ছে? এসব কি দেখার কথা ছিল?

আগে আমাদের মাঝে অল্পতেই সন্তুষ্টি ছিল। প্রাপ্তি ও প্রত্যাশার পার্থক্য কম ছিল। ঈদের নতুন জামা পাওয়ার আনন্দ ছিল সীমাহীন। ছেলেবেলায় ইন্টারনেট, ডিশ অ্যান্টেনার সংযোগ, স্মার্টফোন এবং ট্যাবের সঙ্গে আমাদের পরিচয় ঘটেনি। অথচ এখনকার প্রজন্মের নতুন কাপড়ের অভাব নেই। নানারকম ডিভাইস নিত্যসঙ্গী। অপ্রাপ্তির উপস্থিতি না থাকলেও একাকিত্বের শূন্যতা এবং সামাজিকীকরণের নানা উপকরণের সঙ্গে পরিচিতি লাভের সুযোগের অভাবে পরিপূর্ণ বাস্তববাদী যুক্তিনির্ভর মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে বিপত্তির সম্মুখীন হচ্ছে। তাহলে আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কোন পথে ধাবিত করছি? একবারও কি ভেবে দেখেছি?

সমাজের এ ক্ষত ও বিপরীত যাত্রা আদৌ থামবে কিনা তা হয়তো মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন। এ প্রবণতার কারণেই সমাজে প্রাপ্তি ও প্রত্যাশার মিল পাওয়া যাচ্ছে না, আর্থিক সংগতি এবং জাগতিক উপকরণের উপস্থিতি সত্ত্বেও সুখ নামক অনুভূতি নাগালে থাকছে না। 'তখন সত্যি মানুষ ছিলাম এখন আছি অল্প'- কবির এমন উপলব্ধিতেও বৈকল্যতার ইঙ্গিত বহমান।

সমাজে মানুষ একা বসবাস করতে পারবে না তার যত কিছুই থাকুক না কেন। সমাজের প্রতিটি মানুষেরই একে অন্যের প্রয়োজন; কারণ সবে মিলেমিশে কাজ করলে যেমন ভালো ফল পাওয়া যায় এবং এর আনন্দ ও অকৃত্রিমতা থাকে পাশাপাশি দশে মিলে কাজ করলে তাতে হারজিতেও লাজ নেই। আমরা কি এমন সমাজের কল্পনা করতে পারি, যেখানে পারিবারিক সম্প্রীতি থাকবে, প্রতিবেশীর সঙ্গে সহযোগিতা ও সহমর্মিতামূলক আচরণের পরিবেশ বিরাজমান এবং ঠুনকো অজুহাতে আত্মীয়তার মাঝে দেয়াল তৈরি হবে না। সৎ ও নিরহংকারী আচরণ দ্বারা নিজেদের প্রভাবিত করে বিপরীত যাত্রার পথ থেকে ইউটার্ন হয়ে সুন্দর, স্বপ্নীল, প্রেমময়, সহযোগিতা ও ভালোবাসাময় সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে সামনের দিকে এগোতে পারি।

লেখক: শিক্ষক ও গবেষক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়