খাদ্যে ভেজাল মনে অসুস্থতা

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২০   

রহমান মৃধা

রহমান মৃধা

রহমান মৃধা

আমি বাংলাদেশের গ্রামের ছেলে। গ্রামের পরিবেশে শিশুকাল কেটেছে, তবে শহরেও থেকেছি। আজ যে মাগুরা জেলা হয়েছে অতীতে তা ছিল মহকুমা। সেখানের সরকারি স্কুলে দুই বছর পড়েছি। এছাড়া ঢাকায় দুই বছর থেকে ইন্টারমিডিয়েট পড়েছি। সব মিলে আমার ছোটবেলার সময়গুলো গ্রাম এবং শহর উভয় জায়গাই কেটেছে।

গ্রামে সব ধরনের খাবার যেমন মাছ, শাকসবজি, ফলমূল, হাঁস-মুরগি, দুধ ইত্যাদি ছিল। কিছু খেতে ইচ্ছে হলে কখনও ভাবিনি যে এটা খাওয়া যাবে না বা এটা খেলে অসুস্থ হবার আশঙ্কা আছে। মনের আনন্দে যখন যেটা খুশি সেটা খেয়েছি কোনো সমস্যা ছাড়াই। আমি যে সময়ের কথা নিয়ে স্মৃতিচারণ করছি তা হবে চল্লিশ বছর আগের কথা। সে সময়ও ভেজাল নিয়ে কথা হয়েছে বটে যেমন মুসুরির মধ্যে বাজারির মিশ্রণ, দুধে পানি মেশানো, পাট কম শুকানো, সরিষার তেলের মধ্যে অন্য তেল মেশানো ইত্যাদি। স্কুলে পরীক্ষার হলে মাঝেমধ্যে কেউ কেউ নকল করেছে। যদি ধরা খেয়েছে এ অপরাধের কারণে, প্রতিবেশী থেকে শুরু করে গ্রামে সেটা রটে গেছে। সে এক লজ্জার কথা! এসব ছিল তখনকার দিনে ঘৃণ্য অপরাধ।

আর এখন দেশে বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি ও ফলমূল উৎপাদনের জন্য কীটনাশক ব্যবহার করার ফলে খাবারগুলোতে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বিষক্রিয়া কার্যকর থাকে। তাছাড়া বিভিন্ন ধরনের মুখরোচক খাবার ও ফলমূল আকর্ষণীয় ও দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করার জন্য ক্ষতিকর কার্বাইড, ইন্ডাস্ট্রিয়াল রঙ, ফরমালিন ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়।

অধিক মুনাফার আশায় একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী বিভিন্ন মসলায় বিষাক্ত রঙ, ধানের তুষ, ইট ও কাঠের গুঁড়া, মটর ডাল ও সুজি ইত্যাদি মেশাচ্ছে। ভেজাল মসলা কিনে ক্রেতারা শুধু প্রতারিতই হচ্ছেন না, এতে তৈরি হচ্ছে ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি।

বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য প্রস্তুতকারী কারখানাগুলোয় পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের ব্যবস্থা নেই। দম বন্ধ হওয়া গরমে খালি গায়ে বেকারি শ্রমিকরা আটা-ময়দা পা দিয়ে দলিত-মথিত করে। সেখানেই তৈরি হয় ব্রেড, বিস্কুট, কেকসহ নানা লোভনীয় খাদ্যদ্রব্য। এসব বেকারিপণ্যে ভেজাল আটা, ময়দা, ডালডা, তেল, পচা ডিমসহ নিম্নমানের বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করা হয়।

পরবর্তী সময়ে সেসব ভেজাল খাওয়ার কারণে আমাদের দেহে ছড়িয়ে পড়ে বিষাক্ত কেমিক্যাল, শুরু হয় নানা অসুখ-বিসুখ। খাবারে ভেজাল আজ কোনো গোপনীয় ব্যাপার নয়। মনে হচ্ছে সবার মধ্যে এটা এক ধরনের অলিখিত বৈধতা পেয়েছে।

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, একটি দেশের মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো তাদের নৈতিকতা। আমরা তাজা রক্ত বিসর্জন দিয়েছি একটি বৃহৎ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে, তৈরি করেছি মহান আত্মত্যাগের অবিস্মরণীয় ইতিহাস। ১৯৭১-এর সেই রক্তাক্ত আত্মবিসর্জন আমাদের দিয়েছে ভৌগোলিকভাবে স্বাধীন সার্বভৌম একটি রাষ্ট্র। এই মহান আত্মত্যাগ, এই ভৌগোলিক স্বাধীনতা যথার্থ পূর্ণতা পাবে যদি আমরা আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতি অর্জনের মাধ্যমে সুস্থ সবল জাতি গঠন করতে সক্ষম হই। কারণ, একটি সুস্থ সবল জাতিই পারে সব শৃঙ্খল, প্রতিকূলতা ছিন্নভিন্ন করে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে।

আমাদের ব্যক্তিত্ব এবং আচরণের ওপরে নানা ধরনের মানসিক শক্তি প্রভাব ফেলে। তার মধ্যে সুপার ইগো হচ্ছে নৈতিক আদর্শ বা সামাজিক উপাদানের একটি বিশেষ দিক। আমাদের মধ্যে সুপার ইগো বেশি করে ক্রিয়াশীল করতে হবে, উচিত হবে নৈতিক আদর্শের ভিত্তিকে মজবুত করার কাজে মনোনিবেশ করা। আমি সুইডেনে এমনটি লক্ষ্য করি। জাতি হিসেবে তাদের মোরাল ভ্যালু অনেক উঁচুতে। তাদের চিন্তা-চেতনায় লক্ষণীয় যে তারা কতটুকু উপার্জন করছে তার থেকে গুরুত্বপূর্ণ সেটা কীভাবে উপার্জন করছে। সচেতন জাতি অজুহাত নয়, খোঁজে সমাধান এবং সামষ্টিক কল্যাণ। তাই খাদ্যে ভেজাল রোধে শুধু ভেজালবিরোধী অভিযানেই সমাধান খুঁজলে হবে না, আমাদের মানসিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আনতে হবে নিজ নিজ জায়গা থেকে।

লেখক : সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন

rahman.mridha@gmail.com