একুশ শতকে মানব সভ্যতা নতুন করে মুখোমুখি হয়েছে মহাদুর্যোগের, যার ভয়াল নাম কভিড-১৯। মানুষের সঙ্গে পালল্গা দিয়ে প্রকৃতি থমকে দিয়েছে আজকের প্রযুক্তিনির্ভর মানব সভ্যতাকে। কভিড-১৯ নতুন মাত্রা যোগ করেছে মানব জীবনের সর্বস্তরে। যেখানে চমকে গেছে আন্তর্জাতিক বিশ্ব, বাংলাদেশ সেখানে মোটেই তার ব্যতিক্রম নয়। সে কারণে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক, বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক সবাইকে খাপ খাওয়াতে হচ্ছে নতুন পরিবর্তিত শিক্ষা প্রক্রিয়ার সঙ্গে। এক্ষেত্রে আমাদের মতো মধ্যম আয়ের উন্নয়নশীল দেশে ধাক্কাটি আরও প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। তবে আশার কথা হলো থেমে নেই বর্তমান রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তা ব্যক্তিরা। 

এক্ষেত্রে কভিড- ১৯ ও তার পরবর্তী সময়ে শতভাগ সাক্ষরতা অর্জনে নতুন করণীয় নির্ধারণ করার দায়িত্ব দেশের শিক্ষাবিদ, নীতিনির্ধারক, বিশেষজ্ঞ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবকের। দেশে সাক্ষরতার হার ৭৪.৭ শতাংশ। এখনও আমাদের দেশে প্রতি ৪ জনে ১ জন নিরক্ষর লোক রয়েছে। এমতাবস্থায়, কভিড-১৯ ও তার পরবর্তী সময়ে শতভাগ সাক্ষরতা অর্জনে শিখন শেখানো প্রক্রিয়ায় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

প্রথমত বোঝা প্রয়োজন যে, সাক্ষরতা শিখনের ধারণা ও ব্যাপ্তি বলতে কী বুঝায়? বাংলাদেশ সংবিধানের ১৭ (ক, খ ও গ) ধারা বিবেচনায় সাধারণভাবে বলা যায়, এদেশের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে বসবাসকারী সব নাগরিকের শিখনের মাধ্যমে নূ্যনতম মৌলিক শিক্ষা নিশ্চিত করার প্রক্রিয়াই সাক্ষরতা শিখন। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষানীতি (২০০৬) স্পষ্টত নির্দেশনা দিয়েছে যে, 'সাক্ষরতার অর্থ হলো ভিন্ন প্রেক্ষাপট বিবেচনায় ব্যক্তির পড়তে পারা, অনুধাবণ করতে পারা, ব্যাখ্যা করতে পারা, মৌখিক এবং লিখিতভাবে যোগাযোগ এবং গণনা করতে পারা। এটা এমন অব্যাহত শিখন যোগ্যতা, যা ব্যক্তির সুপ্ত প্রতিভা ও জ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করে, যাতে সে সামাজিক সম্পর্ক কিংবা অধিকতর সামাজিক ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে সক্ষম হয়।' আর সাক্ষরতা শিখনের ব্যাপ্তি হতে পারে পর্যায়ভিত্তিক যেমন- প্রাক প্রাথমিক পর্যায়ে সাক্ষরতা : ৩-৫ বছর বয়সী শিশুদের শিক্ষা তথা সাক্ষরতা শিখনে আগ্রহী করে গড়ে তোলা; প্রাথমিক পর্যায়ে মৌলিক সাক্ষরতা : উপানুষ্ঠনিক শিক্ষার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া কিংবা বিদ্যালয়ে গমন না করা শিশুদের সাক্ষরতার আওতাভুক্ত করা; কিশোর-কিশোরী সাক্ষরতা শিখন : ১১-১৪ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের সাক্ষরতার আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা; বয়স্ক সাক্ষরতা শিখন : ১৫-৪৫ বা তদূর্ধ্ব বয়স্কদের সাক্ষরতায় অন্তর্ভুক্ত করা; জীবনব্যাপী সাক্ষরতা শিখন : নব্য সাক্ষর কিংবা বহুমুখী শিখন সাক্ষরতায় অন্তর্ভুক্ত করা; একবিংশ শতাব্দীর সাক্ষরতা শিখন : একবিংশ শতাব্দীর দক্ষতা তথা তথ্য সাক্ষরতা, জীবন দক্ষতা, পরিবর্তিত নিও নরমাল সাক্ষরতা, নূ্যনতম বেঁচে থাকার দক্ষতা, প্রযুক্তি সাক্ষরতা, বৈজ্ঞানিক দক্ষতা ইত্যাদি সাক্ষরতার অন্তর্ভুক্ত করা।

ইউনেস্কো ২০০৭ সালে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে শিক্ষা-শিখনের কতিপয় চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করে, যা বাংলাদেশের চলমান সাক্ষরতা পরিস্থিতি বিবেচনায় সামঞ্জস্যপূর্ণ। কভিড-১৯ সংকট এবং এর পরবর্তী অবস্থায় এদেশের প্রেক্ষাপটে সাক্ষরতা শিখনের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো হলো- শিখনে আইসিটি সংযোজন চিহ্নিতকরণ ও সঞ্চালন; শিখনে আইসিটির সফল ব্যবহার নিশ্চিতকরণ; শিক্ষক, শিক্ষা বাস্তবায়নকারী, শিক্ষা নির্বাহী, শিক্ষা প্রশাসক এবং শিক্ষাসমূহ নীতিনির্ধারকদের ক্ষমতায়ন, শিক্ষায় আইসিটি ব্যবহারের দক্ষতা উন্নয়ন; শিক্ষার্থী ও শিক্ষা বাস্তবায়নকারীর আইসিটি উপকরণে ব্যাপক প্রবেশাধিকার উন্মুক্তকরণ প্রভৃতি।

এমতাবস্থায়, সুনির্দিষ্টভাবে বাংলাদেশে সাক্ষরতা শিখনে কভিড-১৯ এবং পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলায় উলেল্গখযোগ্য চ্যালেঞ্জেসমূহ রয়েছে তা হলো- সরকারি ও স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নিশ্চিতকরণ; সাক্ষরতা শিখনে আইসিটি অন্তর্ভুক্তিকরণ বাস্তবায়নযোগ্য নীতি এবং সতর্ক পরিকল্পনা গ্রহণ; স্থানীয় চাহিদা ও দীর্ঘমেয়াদি আইসিটি উপকরণ বিতরণ নিশ্চিতকরণ; সাক্ষরতা সহয়তাকারীদের অব্যাহত পেশাগত উন্নয়ন ব্যবস্থা প্রণয়ন; শিখনকেন্দ্রভিত্তিক সময়োপযোগী ও পর্যাপ্ত কারিগরি সহায়তা প্রদান এবং দক্ষতা উন্নয়ন।

এক্ষেত্রে দৃশ্যমান হলো- অকস্মাৎ নতুন পরিবর্তনে অপ্রস্তুত শিখন প্রক্রিয়া; শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের শিক্ষা-প্রযুক্তিতে তুলনামূলক অনভ্যস্ততা; শিক্ষা-প্রযুক্তি উপকরণ অপ্রতুলতা; শিক্ষা-প্রযুক্তি ও শিখন শেখানো পদ্ধতির ফলপ্রসূ সমন্বয়ের ঘাটতি; নিও-নরমাল পরিস্থিতিতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, শিক্ষা প্রশাসক ও নীতিনির্ধারকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণের সীমাবদ্ধতা; শ্রেণি-পাঠ মূল্যায়নে বিকল্প পদ্ধতি উদ্ভাবনে সময় সাপেক্ষতা।\হতবে আশার কথা হলো, উদ্ভূত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হলে যে প্রাক-প্রস্তুতি প্রয়োজন সে ব্যাপারে ইতোমধ্যে নীতিনির্ধারক, শিক্ষাবিদ, শিক্ষা প্রশাসক মহল পদক্ষেপ গ্রহণ করতে শুরু করেছেন। কভিড-১৯ সংকটময় পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশের সাক্ষরতা শিখনকে এগিয়ে নিতে গৃহীত পদক্ষেপ আরও বেশি ফলপ্রসূ রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে যেসব ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা আমলে নেওয়া জরুরি তা হলো : ইউনিয়নভিত্তিক আইসিটি সেন্টারের ব্যবহার বৃদ্ধি করা; সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোকে সাক্ষরতার হাব হিসেবে ব্যবহার করা; দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের থিঙ্ক ট্যাঙ্ক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের কাজে লাগানো; দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের ও বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়কে (মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা ইত্যাদি) সাক্ষরতা শিখনে ব্যবহার করা; বাংলাদেশে কর্মরত আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় এনজিওদের দীর্ঘমেয়াদি অভিজ্ঞতা বাস্তবায়ন; মোবাইল নেটওয়ার্ক, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের রেজিস্টার্ড সার্ভার, রেডিও, টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম/ অনলাইন প্ল্যাটফর্ম সাক্ষরতা শিখনে কাজে লাগানো; জাতীয় আইসিটি নীতি (২০০৯, পৃষ্ঠা ০৬ ) অনুযায়ী গণসাক্ষরতা ও জীবনব্যাপী শিক্ষায় আইসিটি উপকরণ ব্যবহার নিশ্চিতকরণ; জাতীয় শিক্ষানীতি (২০১০, পৃষ্ঠা ০৯ ) অনুসারে সাক্ষরতা শিখনে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় তথ্যপ্রযুক্তির পরিধি বিস্তৃতিকরণ ইত্যাদি।

নতুন বাস্ততবতায় কেবল সাক্ষরতা নয় বরং জীবন ও সমাজের রূপান্তরিত ক্ষেত্রে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবহারিক সাক্ষরতা অর্জনের দিকে আমাদের মনোযোগ দিতে হবে। সে লক্ষ্যে প্রয়োজন তথ্যপ্রযুক্তির সমন্বয়ে শিখন-শিক্ষণ সম্পাদন; আর সেটি নিশ্চিত করতে হলে যে পদক্ষেপ বিবেচনার দাবি রাখে, তা হলো মোবাইল/ অনলাইন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ইচ ওয়ান টিচ ওয়ান কৌশলের বাস্তবায়ন। সর্বপরি, বর্তমান সংকটকালীন পরিস্থিতিতে বহুল ব্যবহূত সামাজিক গণমাধ্যম এবং প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগ মাধ্যমগুলোকে সাক্ষরতা শিখনের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগাতে পারলে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হতে পারে।

লেখক: অধ্যাপক; চেয়ারম্যান, উপানুষ্ঠানিক ও জীবনব্যাপী শিক্ষা বিভাগ, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

abdussalam@du.ac.bd  

বিষয় : সাক্ষরতা ও করোনা

মন্তব্য করুন