করোনায় আমাদের শিক্ষার্থীবান্ধব পদক্ষেপ

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২০     আপডেট: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২০   

প্রফেসর ভিনসেন্ট চ্যাং

প্রফেসর ভিনসেন্ট চ্যাং

প্রফেসর ভিনসেন্ট চ্যাং

করোনাভাইরাসের সংক্রমণের শুরু থেকেই ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এ বছরের শুরুর দিকে বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের ঝুঁকি তখনও অতটা ছিল না। তবে মহাখালীর মতো ব্যস্ত এলাকায় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ভবনগুলোতে শিক্ষার্থী বিচরণের বিষয়টি মাথায় রেখে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বৈশ্বিক যেসব খবর পাচ্ছিলাম তার পরিপ্রেক্ষিতে বুঝতে পারছিলাম, করোনাভাইরাস নিয়ে অনেকেরই প্রশ্ন আছে। বাংলাদেশে তখন একজনও করোনা রোগী শনাক্ত হয়নি। করোনাবিষয়ক সচেতনতা ও বিশদ তথ্য জানাতে আইইডিসিআরের ডিরেক্টর প্রফেসর ড. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরাকে আমি 'দ্য আউটব্রেক অব করোনাভাইরাস ডিজিজেস ২০১৯' শীর্ষক ১৯ ফেব্রুয়ারির সেমিনারে আমন্ত্রণ জানাই। ১৬ মার্চ সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা শিক্ষক-শিক্ষার্থী-স্টাফদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ক্যাম্পাসের প্রতিটি ভবনে তাপমাত্রা মেপে প্রবেশ, হ্যান্ড স্যানিটাইজার বিতরণ ও মাস্ক পরা নিশ্চিত করেছি। শিক্ষার্থীদের ভালো রাখাই ছিল আমার উদ্দেশ্য।

কভিড-১৯-এর কারণে সেমিস্টার শেষ করতে বেগ পেতে হবে সেটা ফেব্রুয়ারিতেই আমরা অনুমান করছিলাম। ডিপার্টমেন্ট ও স্কুলসমূহ তাদের অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল। যাহোক, লকডাউন ঘোষণার পর আমরা বুঝলাম পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হবে না কারণ এটা নিরাপদ নয়; যারা ঢাকার বাইরে আছে তাদের জন্য কঠিন হবে। দূরবর্তী শিক্ষণ ব্যবস্থার অনলাইন টেস্টিংয়েও সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী ইন্টারনেট সংযোগে সমস্যার মুখোমুখি হওয়ায় দুই সপ্তাহ আগে সেমিস্টার সমাপ্ত করাটাকেই যৌক্তিক মনে হয়েছে আমাদের। কভিড-১৯ সংকট সমাধানে এটাই ছিল আমাদের প্রথম বড় উদ্যোগ।

সামার ২০২০ সেমিস্টারে স্টুডেন্ট অ্যাসিসটেন্স ফান্ড গঠন করার মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় উদ্যোগ গ্রহণ করি আমরা। প্রাথমিকভাবে সেই সেমিস্টারের জন্য ১৫ কোটি (১.৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) টাকার ফান্ড গঠন করা হয়। পরে এটি সমন্বয় সাধন করে ২৩ কোটি টাকা (২.৭ মিলিয়ন ডলার) করা হয়েছে। সব শিক্ষার্থী নন-টিউশন ফিতে ফুল ওয়েভার ও ১০ শতাংশ টিউশন স্কলারশিপ পেয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ১০ থেকে শতভাগ পর্যন্ত টিউশন স্কলারশিপ দেওয়া হয়েছে। যারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের জন্য আমি স্টুডেন্ট অ্যাসিসটেন্স ফান্ড তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিলাম। ফান্ডের বিভিন্ন বিষয় বাস্তবায়ন করতে স্টাফদের অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। তবে যেসব শিক্ষার্থীর জন্য এই ফান্ডের সুবিধা সবচেয়ে বেশি দরকার তাদের কাছে এর সুবিধা পৌঁছাতে এটাই ছিল একমাত্র উপায়।

ফল সেমিস্টার শুরু হতে চললেও করোনা মহামারি মোকাবিলা এখনও চ্যালেঞ্জ হয়েই রয়েছে। জুনে ঘটে যাওয়া আম্পান চলমান সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। যদিও বিশ্ববিদ্যালয় কঠিন আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তবু আমি অ্যাসিসটেন্স ফান্ডকে নিয়মিতকরণ করার সিদ্ধান্ত নিই, যাতে আমরা শিক্ষার্থীদের সহায়তা চালিয়ে যেতে পারি।

আমাদের তৃতীয় প্রধান উদ্যোগ হলো ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির অনলাইন লার্নিং প্ল্যাটফর্ম 'বিইউএক্স'- এর উন্নয়ন। বাজার থেকে একটা তৈরি সফটওয়ার কিনে জুম আর গুগল হ্যাংআউটসে শিক্ষাদান করানোটা সহজই ছিল। এতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ভিন্ন একটা পরিস্থিতির মধ্যে ঠেলে দেওয়া হতো। আমাদের এমন একটা শিক্ষার্থীবান্ধব প্ল্যাটফর্ম দরকার ছিল, যা একেবারে প্রত্যন্ত এলাকাতে কম ব্যান্ডউইথেও কাজ করতে সক্ষম, যা আমাদের শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠদান প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে সক্ষম। শিক্ষার্থীরা যেখানেই থাক এবং ইন্টারনেট সংযোগ যত দুর্বলই হোক না কেন 'বিইউএক্স'-এ দূরবর্তী শিক্ষণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারবে। এটি শিক্ষাদানের দূরবর্তী অভিজ্ঞতাকে আরও মিথস্ট্ক্রিয় এবং জীবন্ত করবে। এতে শিক্ষার্থী তার নিজের মতো করে শিক্ষাদান কার্যক্রমে অংশ নিতে সক্ষম হবে, যা তাকে মহামারির সময়ে অতিরিক্ত চাপ থেকেও মুক্তি দেবে। 'বিইউএক্স' হলো ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ভার্চুয়াল ক্যাম্পাসের এক্স ফ্যাক্টর।

বিশ্ব প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে আমরা খুব সহজে এই পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাওয়াতে পেরেছি। নতুন এই পরিস্থিতি উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত করেছে। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি নতুন কোনো কিছুর সঙ্গে পরিচিত হতে প্রস্তুত এবং গত দেড় বছরে শিক্ষার্থীবান্ধব বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে আন্তর্জাতিক মানের পথে এটি নিজেকে নতুনভাবে আত্মপ্রকাশ করেছে।

লেখক: ভাইস চ্যান্সেলর, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি