পড়তে পারা, পড়াতে পারা এবং শিক্ষার দুরবস্থা

প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০     আপডেট: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০   

মো. সাইফুজ্জামান রানা

 মো. সাইফুজ্জামান রানা

মো. সাইফুজ্জামান রানা

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে শিক্ষাক্ষেত্রে এর সুযোগ এবং অংশগ্রহণ দুটোই উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। কিন্তু নানা দিক দিয়ে প্রশ্ন উঠছে মানসম্মত শিক্ষা নিয়ে। এ প্রশ্ন আছে প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত সবক'টি স্তর নিয়ে। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ৬৫ শতাংশ শিক্ষার্থী বাংলা পড়তে পারে না। গণিত ও ইংরেজির অবস্থা আরও খারাপ। শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিতের লক্ষ্যে সরকারি ও বেসরকারি নানা উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলেও শিক্ষার মান কাঙ্ক্ষিত মাত্রার কাছাকাছিও পৌঁছাতে পারছে না কেন? বলা হচ্ছে শিক্ষায় বিনিয়োগ কম, অভিভাবকদের শিক্ষার প্রতি অনীহা ও আর্থিক দৈন্য, পর্যাপ্ত শিক্ষার সুযোগ-সুবিধার অভাব, বিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাতে অসমতা, শিক্ষা উপকরণের অভাব, দুর্গমতা এবং দক্ষ শিক্ষকের অভাব ইত্যাদি। এ বিষয়গুলো নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির অন্তরায়। তবে সব ক্ষেত্রে এগুলোই প্রধান কারণ নয়।

সাম্প্রতিক বছরগুলোর তথ্য-উপাত্ত বলছে, প্রাথমিকে অবকাঠামোসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বেড়েছে, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত সহনীয় হতে শুরু করেছে, শিক্ষা উপকরণে এসেছে বৈচিত্র্য, যোগ হয়েছে ডিজিটাল যন্ত্রপাতি; কিন্তু সমস্যা কমছে না। এর প্রধান কারণ হচ্ছে প্রশিক্ষণের অভাব। শুধু প্রশিক্ষণ নয়, যথার্থ প্রশিক্ষণের অভাব সর্বত্র। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ হচ্ছে ঠিকই; কিন্তু সেই প্রশিক্ষণের গুণগত মান নিয়ে নানা প্রশ্ন আছে সমাজে। মূলত মানসম্মত ও কার্যকরী প্রশিক্ষণের অভাবে তৈরি হচ্ছে না যোগ্য শিক্ষক। আর যোগ্য শিক্ষকের অভাবে অর্জিত হচ্ছে না শিক্ষার মান। শিক্ষার মান শুধু প্রাথমিক স্তরেই নিম্নমুখী না, মাধ্যমিক স্তর থেকে উচ্চশিক্ষা সকল স্তরেই ধস নেমেছে।

সাধারণ অর্থে সমাজের বেশিরভাগ মানুষের ধারণা যে, আমরা যেহেতু পড়তে পারি, তাই পড়াতেও পারি; কিন্তু বিষয়টা অতটা সহজ নয়। পড়তে পারা আর পড়াতে পারার মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে। আমরা পড়তে শিখি মূলত অন্য কোনো ব্যক্তির সহযোগিতা নিয়ে। যিনি সহযোগিতা করেন তিনি মূলত শিক্ষক। আর শিক্ষকের কাজ হলো শিশুকে পড়তে সহযোগিতা করা। আরও পরিস্কার করে বললে পারি, শিশুকে লিখতে পড়তে উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি শিশুকে পাঠে সাহায্য করা একজন শিক্ষকের অন্যতম দায়িত্ব। শিক্ষক হওয়ার প্রধানতম শর্ত হলো লেখাপড়া জানা হতে হবে; কিন্তু এটাই সব নয়। কেননা এই যে শিশুকে লিখতে পড়তে সহায়তা করার নানা কলাকৌশল আছে, সেগুলো জানতে হবে। আর এই শিখন শিক্ষণ কলাকৌশলকে বলে শিক্ষাবিজ্ঞান। অর্থাৎ পাঠ পরিচালনার পদ্ধতি সম্পর্কে শিক্ষকের যথেষ্ট জ্ঞান ও দক্ষতা থাকতে হবে। অন্যদিকে শুধু কলাকৌশল বিষয়ে জ্ঞান থাকলেই কি ভালো শিক্ষক হওয়া যায়? মোটেই না।

শিক্ষককে শিশুর বিকাশ, মনস্তত্ত্ব, প্রকৃতি ও পরিবেশ সম্পর্কে পরিস্কার ধারণা থাকতে হবে। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, শিখন শিক্ষণ কলাকৌশল, শ্রেণি ব্যবস্থাপনা, শিশু মনস্তত্ত্ব, পরিবেশ, শিক্ষা উপকরণ ও মূল্যায়ন প্রভৃতি বিষয়ের সমন্বিত জ্ঞান ও দক্ষতার ফলস্বরূপ একজন লিখতে পড়তে পারা মানুষ শিক্ষক হয়ে উঠতে পারেন। আর এই বিষয়গুলোতে দক্ষতা অর্জনের জন্য অবশ্যই বিশেষ প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ ছাড়া শিক্ষাবিজ্ঞানে দক্ষতা অর্জন প্রায় অসম্ভব। সাধারণ অর্থে লোকে ধরে নেয় যে, লিখতে পড়তে পারলেই তিনি পড়াতে পারবেন। হ্যাঁ, পড়াতে পারবেন; কিন্তু সেটা কতটা বিজ্ঞানসম্মত হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাবে। কেননা বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে পড়ানোর দক্ষতাকেই মূলত পড়াতে পারার দক্ষতাকে নির্দেশ করে। পাঠ পরিচালনা দক্ষতা অর্জন শেষে শ্রেণিকক্ষে পাঠ পরিচালনা করার পেশাই হলো শিক্ষকতা পেশা। যে কেউ পড়াতে পারেন; কিন্তু পেশা হিসেবে পড়ানোর জন্য অবশ্যই পেশাগত প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হবে। যে কোনো পেশার ক্ষেত্রে পেশাগত জ্ঞান বা প্রশিক্ষণ ছাড়া সেই পেশাজীবী হওয়া কি সম্ভব? আবার হলেও সফলতা কতটুকু ধরা দেয় সেই পেশাজীবীর জীবনে?

কয়েকটি পেশার দিকে দৃষ্টি দেওয়া যাক। একজন আইন বিষয়ে পড়াশোনা সমাপ্ত করলেই আইনজীবী হন না। আইনজীবী হতে হলে আইনশাস্ত্রে পড়াশোনার পাশাপাশি তাকে বার কাউন্সিল থেকে আইন পেশার সনদ অর্জন করতে হয়। আর এই সনদ শুধু পড়াশোনার মাধ্যমে অর্জন করা যায় না। এটা অর্জন করার জন্য হাতে-কলমে একজন আইনজীবীর সঙ্গে কাজ করার পাশাপাশি পড়াশোনা করে নির্ধারিত বার কাউন্সিল থেকে বিশেষ পরীক্ষায় পাস করার মধ্য দিয়ে আইন পেশায় যুক্ত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে হয়। ডাক্তারি পেশার দিকে খেয়াল করলেও একই রকম বিষয় দেখতে পাওয়া যায়। কেননা যে কেউ মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করলেই কিন্তু তিনি ডাক্তার নন। এখানে ডাক্তার নন বলতে রোগী দেখা ও পরামর্শ দেওয়ার ক্ষমতা অর্জন না করাকে বোঝানো হয়েছে। এ ক্ষমতা অর্জন করার জন্য এমবিবিএস পাস করার পর সে ব্যক্তিকে এক থেকে দুই বছর নির্দিষ্ট হাসপাতালে ইন্টার্ন ডাক্তার হিসেবে কাজ করতে হয়। ইন্টার্নশিপ করার পাশাপাশি তাকে একটি বিশেষ পরীক্ষায় পাস করতে হয়। ইন্টার্নশিপ পরীক্ষায় পাস করার পর মেডিকেলের জন্য নির্ধারিত প্রতিষ্ঠান থেকে সনদ অর্জন করার পরই কেবল এমবিবিএস পাস ব্যক্তি রোগী দেখার যোগ্যতা অর্জন করেন এবং পেশা হিসেবে চিকিৎসাকে বেছে নিতে পারেন। এভাবে হিসাব নিরীক্ষক, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টসহ আরও অনেক পেশার ক্ষেত্রে একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি পেশাগত প্রশিক্ষণ বা ডিগ্রি বাধ্যতামূলক। পেশাগত প্রশিক্ষণ ছাড়া কর্মজীবনে উন্নতি বা সফল্য লাভ করা প্রায় অসম্ভব।

কিন্তু বাংলাদেশ বিবেচনায় শিক্ষকতা পেশার ক্ষেত্রে কী ঘটছে? এখানকার বেশিরভাগ মানুষ কোনো প্রকার পেশাগত ডিগ্রি কিংবা প্রশিক্ষণ ছাড়াই শিক্ষকতা পেশার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন এবং এখনও হচ্ছেন। সরকারি স্কুল-কলেজগুলোতে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকলেও এ পেশায় প্রবেশের ক্ষেত্রে পেশাগত প্রশিক্ষণ কিংবা সংশ্নিষ্ট ডিগ্রি বাধ্যতামূলক নয়। অন্যদিকে বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে ওঠা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পেশাগত প্রশিক্ষণ কিংবা ডিগ্রির পরিমাণ নগণ্য। বিশেষ করে কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোর শিক্ষকদের তেমন কোনো প্রশিক্ষণ নেই বললেই চলে। এই যখন পরিস্থিতি, তখন প্রশিক্ষণহীন বা পেশাগত ডিগ্রিধারী দক্ষ জনসম্পদের ঘাটতি রেখে কী করে দেশের শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত অথবা উন্নত করা সম্ভব?

দেশের সকল স্তরের শিক্ষার মান যে দিন দিন পড়তির দিকে, এখন এ কথা অনেকেই বলছেন। কিন্তু এই মান উন্নয়নের জন্য যে পরিমাণ দক্ষ মানবসম্পদ তথা দক্ষ শিক্ষক ও পেশাজীবী গড়ে তোলা দরকার সেখানে নজর খুব একটা আছে বলে মনে হয় না। এর মূল কারণ হয়তো সরকার কিংবা নীতিনির্ধারকরা আস্থা রাখছেন 'যেহেতু পড়তে পারে তাই পড়াতেও পারে' এই নীতির ওপর। ফলে শিক্ষকতা পেশা কিংবা শিক্ষা সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে লোকজন নিয়োগের ক্ষেত্রে পেশাগত ডিগ্রি ও প্রশিক্ষণকে বাধ্যতামূলক না করে উন্মুক্ত রাখা হচ্ছে। শুধু শিক্ষকতা পেশা নয়; শিক্ষা প্রশাসনেও পেশা সংক্রান্ত ডিগ্রিধারী লোকের অভাব। ফলে শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের জন্য অনেক প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সফলতা আসছে না। দেশের শিক্ষার তথা সমাজের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য এ সংক্রান্ত কাজের সঙ্গে যুক্ত সকলের পেশাগত প্রশিক্ষণ নিশ্চিতের পাশাপাশি শিক্ষকতা পেশায় প্রবেশের ক্ষেত্রে শিক্ষাবিজ্ঞানে ডিগ্রি বাধ্যতামূলক করতে হবে; সেটা প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সব স্তরের জন্য করা প্রয়োজন।

লেখক : শিক্ষা উন্নয়নকর্মী
shakdip@gmail.com