বিদেশ সফরের বিলাসিতা

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০     আপডেট: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০   

সুদীপ্ত সাইফুল

 সুদীপ্ত সাইফুল

সুদীপ্ত সাইফুল

করোনায় বিপর্যস্ত দেশের অর্থনীতি। লাখ লাখ মানুষ কর্ম হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। করোনার এই বিপর্যয় থেকে ঘুরে দাঁড়াতে ব্যয় সংকোচনের তাগিদ দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদরা। ব্যয় সংকোচন কতটা জরুরি হয়ে পড়েছে তা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। ব্যয় সংকোচনের অন্যতম একটি ক্ষেত্র হিসেবে উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে সরকারি কর্মচারীদের বিদেশ ভ্রমণকে চিহ্নিত করেছেন অনেকেই। প্রতিবছর এ খাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়। 

গত পাঁচ অর্থবছরে চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়া এক হাজার ৪০৫টি প্রকল্পের মধ্যে ৯৯৩টিতেই অন্তর্ভুক্ত ছিল এমন সফর। অর্থনীতিবিদ ও সাবেক আমলাদের অনেকেই এ ব্যয়কে অপচয় বলে থাকেন।

নদী, খাল-বিল ও পানির দেশের কর্মচারীরা পুকুর খননের প্রশিক্ষণ নিতে যেতে চান বিদেশে। কৃষিনির্ভর দেশের আমলারা আলু চাষ দেখতে, খিচুড়ি ব্যবস্থাপনার প্রশিক্ষণ নিতে দল বেঁধে বিদেশ যেতে চান অভিজ্ঞতার ঝুড়ি ভারী করতে। এ ধরনের ঠুনকো ব্যাপারে বিদেশ ভ্রমণের সংবাদ প্রকাশের পর বিব্রত বোধ করছে সরকার, সমালোচনার ঝড় উঠেছে সর্বমহলে।

গত এক দশকে যে কোনো সরকারি প্রকল্পের অধীনে সরকারি কর্মচারীদের বিদেশ ভ্রমণ রীতিমতো ভ্রমণ বিলাসে পরিণত হয়েছে। প্রকল্প যাই হোক না কেন, তার অধীনে এই ভ্রমণ রাখতেই হবে। তাই সরকারের সবুজ সংকেত পাওয়া প্রায় সব প্রকল্পেই থাকে প্রশিক্ষণের নামে বিদেশ সফর। প্রকল্পে সফরের বিষয়টি এমনভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয় যে, সফরগুলোকে স্পষ্টতই অহেতুক ও অপ্রয়োজনীয় মনে হলেও অবৈধ বলার সুযোগ থাকে না। এসব সফর বাবদ প্রতিবছর ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় কয়েক কোটি টাকায়। সরকারি অর্থে এই ভ্রমণ বিলাস নিঃসন্দেহে আর্থিক শৃঙ্খলা নষ্ট করছে।\হআমরা অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছি; উন্নয়নের স্বার্থে কিছু বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জনে বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন অবশ্যই আছে। তবে সেই সফরের আকার প্রয়োজনের সঙ্গে মানানসই হওয়া চাই। যে বিষয়ে একজন সফর করলেই কাজ হয়ে যাবে, এমন ক্ষেত্রে যদি ১০ জন সফর করেন বা যে কাজটি পর্যবেক্ষণ করতে পাঁচ দিন লাগবে সে কাজটি দেখতে যদি ২০ দিন বিদেশে অবস্থান করতে হয় তাহলে তাতে প্রশ্ন ওঠা অহেতুক কোনো বিষয় নয়। এ ছাড়া উন্নত প্রযুক্তি, পুকুর খনন, গরু পালন কিংবা খিচুড়ি ব্যবস্থাপনা যদি শিখতেই হয় তবে দল বেঁধে দেশের বাইরে না গিয়ে ট্রেইনার এনে দেশেই তা শেখা যায়। এতে সরকারি অর্থের অপচয় কম হবে। অহেতুক বিদেশ ভ্রমণে শুধু দেশের অর্থই অপচয় হয় না, বরং আন্তর্জাতিকভাবে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়।

আমরা দেখেছি, গত বছর শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি দল নাসা আয়োজিত এক প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়। তাদের পুরস্কৃত করতে নাসার পক্ষ থেকে দলটিকে ফ্লোরিডায় আমন্ত্রণ জানানো হয়। বিজয়ী দলের সদস্যদের সঙ্গে সরকারি খরচে ফ্লোরিডায় যাওয়ার কথা তথ্য মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তার। তবে শেষ পর্যন্ত দেখা গেছে, ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে নাসার আমন্ত্রণ পাওয়া বিজয়ী দলের সদস্যরা সেখানে কেউ যাওয়ার অনুমতি পায়নি। প্রতিযোগীরা অনুমতি না পেলেও সরকারি কর্মকর্তাদের যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ বন্ধ থাকেনি। প্রতিযোগীদের রেখে তারা যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ করে আসেন সরকারি খরচে।

করোনাকালে আমলাদের বিদেশ সফরের মতো বিলাসিতা কমে আসবে, সেটা প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু মাঝেমধ্যেই অযৌক্তিক কিছু সফরের খবর উঠে আসছে সংবাদমাধ্যমে। এসব সংবাদের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাপক সমালোচনা হলেও বিদেশ সফরের প্রস্তাবনা থেকে সরে আসছেন না কেউ। করোনার এই দুর্যোগে এ ধরনের সফরের মাধ্যমে সরকারি অর্থ ব্যয় দুর্ভোগে থাকা মানুষদের সঙ্গে তামাশা ছাড়া আর কিছু নয়। বিগত সময়ে এ বিষয়ে সরকারের মধ্যেও সমালোচনা হয়েছে। শুধু সমালোচনা হলেই চলবে না; অহেতুক ও অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফর বন্ধে কঠোর হতে হবে।

লেখক: সাংবাদিক