সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্যে অবিচল

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০     আপডেট: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০   

অধ্যাপক ড. মুনাজ আহমেদ নূর

 অধ্যাপক ড. মুনাজ আহমেদ নূর

অধ্যাপক ড. মুনাজ আহমেদ নূর

আজ ২৮ সেপ্টেম্বর, বঙ্গবন্ধুকন্যা, দেশরত্ন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার ৭৪তম জন্মদিন। ১৯৪৭ সালের এই দিনে জাতির পিতার জন্মস্থান গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। প্রাণপ্রিয় নেত্রীর জন্মদিনে তাকে শুভেচ্ছা ও উষ্ণ অভিনন্দন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে আজ দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ছিল ১০০ ডলার। বর্তমানে বঙ্গবন্ধুকন্যা তা দুই হাজার ডলারের ওপরে নিয়ে গেছেন। দরিদ্র মানুষের অন্নের ব্যবস্থা করতে তিনি 'একটি বাড়ি একটি খামার' প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন। মৎস্য উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান এখন তৃতীয়। খাদ্যশস্য উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ১১তম। তার সুযোগ্য নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে দরিদ্র অসহায় মানুষের বাসস্থানের ব্যবস্থা করেছেন। চিকিৎসাব্যবস্থা ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে যাচ্ছে। এখানে দুটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন যে বিশ্বের অনেক ধনী দেশেও চিকিৎসাসেবা এবং শিক্ষা বিনামূল্যে দেওয়া হয় না। কিন্তু বাংলাদেশে এই দুটি সুযোগ একেবারে বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে দেওয়া হচ্ছে বাড়তি সুবিধা। প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের দেওয়া হচ্ছে বিনামূল্যে টিফিন ও উপবৃত্তি। মাধ্যমিকেও শিক্ষার্থীদের দেওয়া হচ্ছে উপবৃত্তি। উচ্চশিক্ষায় দেওয়া হচ্ছে স্কলারশিপ। তার ওপর হতদরিদ্রদের জন্য সোশ্যাল সেফটি নেট প্রোগ্রাম তো আছেই। 

২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে হারানো হলে দলের নেতাকর্মীদের ওপর জোট সরকারের অত্যাচার ও নির্যাতন শুরু হয়। ২০০৪ সালের গ্রেনেড মেরে শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা চালানো হয়। সে হামলায় দলের নেতাকর্মীদের মানববর্ম শেখ হাসিনাকে প্রাণে বাঁচালেও আওয়ামী লীগ মহিলা সম্পাদক আইভি রহমানসহ ২৪ জনকে প্রাণ দিতে হয়েছে। ২০০৬ সালের পর তাকে গৃহবন্দি করা হয়, জেলে পাঠানো হয় অনৈতিকভাবে, কিন্তু কোনো ঘাত-প্রতিঘাত তাকে দমাতে পারেনি। ষড়যন্ত্র কখনোই পিছু ছাড়েনি তার, এতে অবশ্য তিনি কখনোই বিচলিত নন। দমে যাননি শেখ হাসিনা। বরাবরের মতোই শোককে শক্তিতে পরিণত করে জনগণের কল্যাণে নিজেকে হিমালয়সম অটল রেখেছেন।

২০০৯ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত টানা তিনবারসহ চতুর্থবারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তিনি। ২০০৯ থেকে ২০২০ সাল এই ১১ বছরে শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রবেশ করেছে ইতিহাসের এক স্বর্ণযুগে। এক মনে ও ধ্যানে পিতার অঙ্গীকার পূরণে নির্ভীক চিত্তে সৎ ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন শেখ হাসিনা। তার অনন্য রাজনৈতিক বিচক্ষণতার কারণে তিনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়ে থাকার কারণ। তিনি ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর দেশের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে স্বচ্ছতা, স্থিতিশীলতা ও ধারাবাহিকতা এই তিনটি বিষয়ের ওপর গভীর গুরুত্ব দিয়েছেন। এর মাধ্যমে তিনি দেশকে উন্নয়নের মহাসড়ক উন্নীত করেছেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন দেশকে যদি সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়, তাহলে এই তিনটি বিষয়ের মাধ্যমেই এগিয়ে নিতে হবে। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়ে বাংলাদেশ বারবার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। দুদককে তখন বানিয়ে রাখা হয়েছিল নখদন্তহীন বাঘ। তিনি দুর্নীতি ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণ করছেন। যদি কোনোভাবে দুর্নীতি ধরা পড়ে, সেটা ছোট কিংবা বড় যে পর্যায়েরই হোক, কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। এখন দুর্নীতির সূচকে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। এর কারণ হচ্ছে কোনো দুর্নীতি ধরা পড়লেই সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। যা এর আগে আমরা দেখতে পাইনি। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় আমরা দেখেছি, দেশ বারবার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে কিন্তু দুর্নীতিবাজদের আইনের আওতায় আনা হয়নি। দুদক ছিল নিশ্চুপ। এখন শেখ হাসিনা, সিস্টেমই যেন দুর্নীতিকে ধরে ফেলতে পারে সেদিকে ধাবিত হচ্ছেন। সেজন্য তিনি ডিজিটালাইজেশনের দিকে জোর দিচ্ছেন এবং ধীরে ধীরে সেদিকে যাচ্ছেন। 

বিচার বিভাগ এবং প্রশাসনেও তিনি সমান গুরুত্ব দিয়েছেন। মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল হচ্ছে বিচারব্যবস্থা। আগে বিচার বিভাগে সরকার নগ্নভাবে হস্তক্ষেপ করত। শেখ হাসিনা এর পরিত্রাণ ঘটিয়েছেন। যার কারণে এখন উচ্চ আদালত এবং নিম্ন আদালত স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন। এ দেশে জাতির পিতার হত্যার বিচার হয়েছে, সাধারণ অপরাধীদের বিচার যেভাবে হয় ঠিক সেভাবে। দেশের মানুষের দাবি ছিল জাতির পিতার হত্যাকারীরা যাতে কোনো ধরনের আপিল করতে না পারে এবং রাষ্ট্রপতির নিকট প্রাণভিক্ষা চাইতে না পারে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যে কোনো রাষ্ট্রনায়ক হত্যার বিচার পর্যবেক্ষণ করলে আমরা সেটাই দেখতে পাব। সেখানে রাষ্ট্রনায়কদের হত্যার বিচার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে হয় এবং অপরাধীদের আপিলের কোনো সুযোগ থাকে না। কিন্তু শেখ হাসিনা তা করেননি। তিনি আমাদের নিজস্ব বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা রেখেছেন। অপরাধীদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সর্বোচ্চ সুযোগ দিয়েছেন। একই ঘটনা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রেও তিনি করেছেন। তখনকার গণজাগরণ মঞ্চসহ সাধারণ মানুষের দাবি ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে করার, তাদের আত্মপক্ষ সমর্থন এবং রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার সুযোগ না দেওয়ার। বিশ্বে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য যেসব ট্রায়াল গঠিত হয়েছিল সেখানে অপরাধীদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়নি। আমরা যদি নুরেমবার্গ ট্রায়াল দেখি তাহলে এ বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা পাব। কিন্তু শেখ হাসিনা সবকিছু পেছনে ফেলে বিশ্বে শান্তি ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন; যা এর আগে আমরা বিশ্বের কোথাও দেখতে পাইনি। 

তিনি প্রশাসনকে ধীরে ধীরে মেধাবীদের কাছে নিয়ে যাচ্ছেন এবং তাদেরকে জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা বৃদ্ধি করেছেন। নতুন নতুন নীতি গ্রহণের মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন দুর্বার গতিতে। তার গৃহীত ভিশন ২০২১ বাস্তবায়নের ফলে ২০২১ সালের আগেই বাংলাদেশ ডিজিটাল বাংলাদেশে পরিণত হয়েছে। উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশে পৌঁছানোর লক্ষ্যে তার প্রদত্ত ভিশন ২০৪১ বাস্তবায়নের কাজ চলছে। এই বাংলাদেশকে ১০০ বছর পরে আমরা কেমন দেখতে চাই, এর পরিকল্পনাও করে রেখেছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা। সেই লক্ষ্যে তিনি ভিশন ২১০০ ঘোষণা করেছেন এবং ২১০০ সালের মধ্যে এর বদ্বীপ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছেন। 

যে কোনো বৈশ্বিক দুর্যোগে সবার আগে এগিয়ে যান শেখ হাসিনা। এই করোনার সময় আমরা দেখেছি তার নিরলস পরিশ্রমের কারণে অনেক উন্নত দেশের তুলনায় বাংলাদেশে সংক্রমণ ও মৃত্যুহার অনেক কম। এই মহামারি থেকে দেশের অর্থনীতিকে রক্ষা করে মানুষর জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে একাই লড়ছেন তিনি। সংকট মোকাবিলায় নিয়মিত দাপ্তরিক কাজের পাশাপাশি দুর্গত মানুষকে খাদ্য ও আর্থিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি সরাসরি তদারকি করেছেন। প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের ছোবল থেকে বিশ্ববাসীকে রক্ষায় সুদৃঢ় ভূমিকা রেখেছেন। একাধিক ভিডিও কনফারেন্সিং করেছেন বিশ্ব নেতৃবৃন্দসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে। আহ্বান জানিয়েছেন বৈশ্বিক এই সংকট মোকাবিলায় একসঙ্গে কাজ করার। বিশ্বে শান্তি ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় তার তুলনা তিনি নিজেই। আমরা এখন পর্যন্ত বিশ্বে তার মতো মানবিক নেতা দেখতে পাইনি। এ কথা একবারে উদাহরণ দিয়ে বলা যায়। করোনাকালীন সময়ে অনেক দেশ তাদের দেশে যেসব বিদেশি শ্রমিক কাজ করে তাদের দেশে পাঠিয়ে দিয়েছে। আবার অনেক দেশ পাঠিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। এমন একটি পরিস্থিতিতে তিনি ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে রেখে তাদের খাইয়ে-পরিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছেন। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তাই।

শেখ হাসিনা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে উন্নয়ন, অগ্রগতির মহাসোপানে। এখন তার জীবনের একটাই প্রত্যয় : জাতির পিতার 'স্বপ্নের সোনার বাংলা' গড়ার। সে প্রত্যয় নিয়েই এগিয়ে চলেছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা, আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নিখাদ দেশপ্রেম, দূরদর্শিতা, দৃঢ়চেতা মানসিকতা ও মানবিক গুণাবলি তাকে আসীন করেছে বিশ্ব নেতৃত্বের আসনে। শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্বে জাতির পিতার কাঙ্ক্ষিত মুক্তি সংগ্রাম বাস্তবায়নের শেষ প্রান্তে। এখন তিনি স্বপ্ন দেখছেন ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার। তিনি দেশের নেতৃত্বে থাকলে সফলভাবে ২০৪১ সালের আগেই বাংলাদেশ উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশে পরিণত হবে। শেখ হাসিনা এ দেশের মানুষকে অর্থনৈতিক মুক্তি দিচ্ছেন। নিশ্চিত করছেন এ দেশের মানুষের সমৃদ্ধ জীবনযাপন। প্রাণপ্রিয় নেত্রী আপনার জন্মদিনে জানাই অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। 

লেখক : উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিজিটাল ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ