শেখ হাসিনার যত দুঃখ

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০     আপডেট: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০   

ড. জিয়া রহমান

 ড. জিয়া রহমান

ড. জিয়া রহমান

আজ বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার ৭৪তম জন্মদিন। শেখ হাসিনা এই দিনে গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। জন্মদিনের শুভেচ্ছা বঙ্গবন্ধুকন্যা, প্রধানমন্ত্রী। আজকের এই দিনে সঙ্গত কারণে অনেকেই তাকে নিয়ে লিখবেন। কেউ লিখবেন বঙ্গবন্ধু কন্যার নেতা হয়ে ওঠার গল্প; কেউ কেউ নিশ্চয়ই লিখবেন শেখ হাসিনার কোমল হৃদয়ের গল্প, যেমনটা আমরা প্রায়ই শুনি কোনো এসএসএফ অফিসারের কণ্ঠে কিংবা শেখ হাসিনাকে বিট করা কোনো সংবাদকর্মীর মুখে; কেউ লিখবেন বঙ্গবন্ধুকন্যার রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ওঠার গল্প; কেউবা লিখবেন শেখ হাসিনা এক বাঙালি সংস্কৃতির মুখচ্ছবি, আর কেউ হয়তো লিখবেন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তার স্মৃতিসম্ভার নিয়ে। আমি যখনই বঙ্গবন্ধুকন্যাকে নিয়ে ভাবি আমার মনে সব সময় একটি বিষয়ই ভেসে ওঠে, তা হলো বঙ্গবন্ধুকন্যার কষ্ট। এর কারণ সম্ভবত পৃথিবীতে ঘটে যাওয়া বিয়োগান্তক ঘটনার অন্যতম সাক্ষী হয়ে আছেন বর্তমান বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী ব্যক্তি শেখ হাসিনা এবং তার অনুজ শেখ রেহানা। আমার কাছে তার জীবনী নানা কারণে শোকগাথা এক করুণকাব্য; জীবনের নানা চড়াই-উতরাই পার করে তার অনেক অনেক অর্জন হলেও দিন শেষে মনে হয় দুঃখ আর কষ্টই সম্ভবত তার একমাত্র সঙ্গী।

অন্যরা যা নিয়েই লিখুক, আমার মনে হলো শেখ হাসিনার জন্মদিনে তার দুঃখ-কষ্ট নিয়ে কিছু লিখি। এ বিষয়টা আমি মনে মনে বহুদিন ভেবেছি, বিশেষ করে শুরুটা সেই দিন থেকে যেদিন তিনি প্রবাসে যাপিত জীবন শেষে দেশে ফিরে আসেন। আমার মনে আছে, আমি আমার মা-বাবাকে ফাঁকি দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, মিরপুর থানা কর্তৃক ভাড়া করা একটি বাসের ছাদে উঠে শেখ হাসিনাকে বরণ করার জন্য এয়ারপোর্টে গিয়েছিলাম। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে ভাষণ দেবার সময় তিনি যখন মুহুর্মুহু মূর্ছা যাচ্ছিলেন, দশম শ্রেণির এক কিশোর হিসেবে আমার চোখ থেকে তখন টপ টপ করে পানি পড়েছে অবিরত। অবিশ্বাস্য মানুষের ঢল এবং তুমুল ঝড়বৃষ্টিস্নাত বিকেলে শেখ হাসিনার বার বার মূর্ছা যাবার সময় আমার কোমল কিশোর মনে একটি প্রশ্ন উঁকি দিয়েছে- শেখ হাসিনা নিশ্চয়ই এই বিশাল জনসমুদ্র দেখে মনে মনে এই ভেবেছেন, 'তোমরা এত মানুষ এখন আমাকে বরণ করতে এসেছ, অথচ এ তোমরাই আমার পিতা-মাতা, ভাই-ভাবিসহ সবাইকে হত্যা করেছ ... তোমরা সেই সময় কোথায় ছিলে।' 

আমার বয়স তখন কম, রাজনৈতিক বুদ্ধিও তখন একেবারে কাঁচা, তাই সেই সময়ের উপলদ্ধিও নিশ্চয়ই ছিল আবেগতাড়িত, কিন্তু ভাবনা আমার কাছে এত দৃঢ় ছিল যে, বহুবার ভেবেছি, দেখা হলে আপাকে এই প্রশ্নটি করব। বেশ কয়েকবার আপার সঙ্গে দেখা হলেও সে প্রশ্ন করার সুযোগ হয়নি, যা এখনও আমার কাছে প্রশ্নই থেকে গেছে। সমাজবিজ্ঞানের একজন ছাত্র হিসেবে শেখ হাসিনার কষ্টের বহু বিষয় আমি মনে মনে ভেবেছি, কখনও বিশ্নেষণ করেছি, কখনও সেগুলো অপ্রকাশিত থেকেছে। আজ ইচ্ছা হলো তার জন্মদিনে আমার ভাবনায় শেখ হাসিনার কষ্টগুলো নিয়ে লিখি। 

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর শেখ হাসিনার নিদারুণ সংগ্রাম শুরু হয় প্রবাসজীবন থেকেই। একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে তিনি আশা প্রকাশ করতেই পারতেন, এ হত্যার বিরুদ্ধে বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধ গড়ে উঠবে। বাস্তব অবস্থা ভিন্ন; তার কষ্ট শুরু হলো তৎকালীন প্রবাসে তিনি যে বাসায় ছিলেন সেই অকৃতজ্ঞ রাষ্ট্রদূতের ব্যবহারের মধ্য দিয়ে। এরপর নিশ্চয়ই এ তালিকা আরও দীর্ঘায়িত হয়েছে। আমি আজও জানি না, তিনি কীভাবে ১৫ আগস্টের বেইমানদের সহ্য করেছেন; অবিশ্বাস্য হলেও এটাই সত্যি যে বঙ্গবন্ধুর খুবই সান্নিধ্যে ছিলেন এমন প্রায় সবাই খুনি মোশতা কের মন্ত্রিপরিষদে যোগ দিয়েছিল। একুশ সদস্যের মন্ত্রিপরিষদে কেবল দু'জন ছিলেন আওয়ামী লীগের বাইরের; রাষ্ট্রপতি এবং উপরাষ্ট্রপতি ছিলেন যথাক্রমে খন্দকার মোশতা ক ও মাহমুদ উল্লাহ।

১৯৭৫ সালে আমি খুব ছোট ছিলাম, কিন্তু আমার এখনও মনে আছে এ সব বিশ্বাসঘাতককে মন্ত্রিপরিষদে দেখে আমি কীভাবে শিউরে উঠেছিলাম; এটা সম্ভবত আমার পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ডের কারণে। একদিকে বঙ্গবন্ধুর কৃপায় বড় হয়ে মোশতাকের মন্ত্রিত্ব গ্রহণের বেইমানি যেমন শেখ হাসিনাকে হজম করতে হয়েছে, ঠিক তেমনি তাদের বেশ কিছু সদস্যকে পরে কীভাবে এবং কেন দলে স্থান দিয়ে ফিরিয়ে এনেছেন তা আমার কাছে আজও অজানা। এও কি চিন্তা করা যায়, বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী, আব্দুল মান্নান, মনোরঞ্জন ধর, সোহরাব হোসেন কিংবা আসাদুজ্জামান খান, এ আর মল্লিক, মুজাফফর আহমেদ চৌধুরীর মতো মানুষেরা মোশতাকের মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিলেন! এটা ঠিক তাদের সবাই হয়তো স্বেচ্ছায় খুনি মোশতাকের সঙ্গে যোগ দেননি এবং সেই অর্থে হয়তো সবাই অপরাধীও ছিলেন না, তবুও রক্ত-মাংসের মানুষ হিসেবে এগুলো মনে হলে শেখ হাসিনার কেমন লাগে? বঙ্গবন্ধু পরিবারের সঙ্গে যাদের নূ্যনতম যোগাযোগ আছে, কিংবা বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ সম্পর্কে যাদের নূ্যনতম ধারণা আছে তারা জানেন বঙ্গবন্ধু কেএম ওবায়েদুর রহমান, শাহ মেয়াজ্জেম হোসেন কিংবা তাহের উদ্দিন ঠাকুরকে কেমন স্নেহ করতেন। 

এত গেলো শেখ হাসিনার দলের লোকজনের ব্যাপারে তার কষ্টের কথা। আওয়ামী লীগের বাইরে যে তথাকথিত ভালো মানুষেরা সমাজের কাছে খুবই সমাদৃত তাদের ব্যবহার শেখ হাসিনাকে কতটুকু পীড়িত করেছে, কেউ কি তার মতো করে ভেবেছেন? এ ধারায় আছেন তথাকথিত সিভিল সমাজের এক বিরাট অংশ, যারা প্রতিনিয়ত শেখ হাসিনার সমালোচনা করেন। খুব ভেতর থেকে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে তাদের একটা বিরাট অংশের পারিবারিক ঐতিহ্য কোনো না কোনোভাবে আওয়ামী লীগ বিরোধী ধারার।

আধুনিক যুক্তিবাদী মানুষ তো বটেই, শেখ হাসিনার শুভাকাঙ্ক্ষীদের আকাঙ্ক্ষাও তার কাছে আকাশসম। কারণ, প্রথমত তিনি বঙ্গবন্ধুর কন্যা এবং দ্বিতীয়ত তিনি আওয়ামী লীগের প্রধান। এইধারায় শুদ্ধ মানুষ থেকে শুরু করে, সমাজতান্ত্রিক, লিবারাল, কনজারভেটিভ, আলট্রা লেফট, আলট্রা রাইট সব মানুষই আছেন। তারা যে জিনিসটা ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় বুঝতে চান না, তা হলো এই না করা বা পারার সমাজতত্ত্ব। মূলত ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের নির্মমতাই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রগতিকে ধ্বংস করে ফেলেছে।

একবার ভাবুন, বাংলাদেশ জিন্দাবাদ তো আমার মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল না, তা কীভাবে প্রতিষ্ঠা হলো? উত্তর খুবই সোজা, পঁচাত্তর-পরবর্তী সামরিক সরকাররা ইহলৌকিক আর পরলৌকিক সমন্বয়ের মধ্যদিয়ে একটি কিম্ভূতকিমাকার রাষ্ট্রের জন্ম দান করে, যা আওয়ামী লীগের মতো একটি ঐতিহ্যবাহী লিবারাল রাজনৈতিক দলের কার্যক্রমকে দারুণভাবে ব্যাহত করেছে। সে কারণে শেখ হাসিনাকে নানাভাবে কম্প্রোমাইজ করতে হচ্ছে। আবার তিনি কেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সঙ্গে উন্নত বিশ্বের মতো সদ্ভাব বজায় রেখে রাজনীতি করেন না, সেই দোষও তার আছে। কিন্তু তার শত্রুদের মতো তার অনেক শুভাকাঙ্ক্ষীও বুঝতে চান না তার রক্তক্ষরণের কথা। একদিকে পিতৃহন্তারকদের বিচার চিরতরে রুদ্ধ করে আইন করেছে এবং হত্যাকারীদের লোভনীয় চাকরি দিয়ে পুনর্বাসিত করেছে এই দল এবং তার পরবর্তী শাসকও। এটা করেও তারা শান্তি পায়নি, তাই হত্যাকারী খুনি মোশতাকের মৃত্যুর পরে পার্লামেন্টে তার জন্য শোক প্রস্তাবও নেওয়া হয়েছে অথচ বঙ্গবন্ধু, চার নেতা, বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যদের ব্যাপারে কি উন্নাসিক ব্যবহারই না করেছে বিএনপি।

ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্য ঘটনা হলো ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া বঙ্গবন্ধুর জীবিত কন্যাকেও পৃথিবী থেকে বিদায় করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র; ২০০৪ সালের ২১ এ আগস্ট সেটাই মঞ্চস্থ করতে চেয়েছিল বঙ্গবন্ধুর রক্তের ওপর দিয়ে তৈরি করা বিএনপি নামক দলটি। আমি মাঝেমধ্যে ভেবে বিস্মিত হই এত ট্রমা নিয়েও শেখ হাসিনা বেঁচে আছেন এবং শত প্রতিকূলতার মাঝেও হাসিমুখে সব করে চলেছেন। মনে মনে ভাবি, এই নিদারুণ কষ্ট নিয়েই শেখ হাসিনা বেঁচে আছেন বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় নিয়ে।

আমি একটি কথা প্রায়ই বলি- 'হিস্ট্রি রিপিটস ইটসেলফ'। ইতিহাস বলে বাঙালি জাতি যেমন উজাড় করে একদিন বঙ্গবন্ধুকে দিয়েছিল, ঠিক একেইভাবে শেখ হাসিনাকেও তারা আবার দুহাত উজাড় করে দিয়েছে। শত ষড়যন্ত্র করেও যেমনই বঙ্গবন্ধুকে ইতিহাসের পাতা থকে মুছে ফেলা যায়নি, আপনিও তেমনি আধুনিক বাংলাদেশের নেত্রী হয়ে বেঁচে থাকবেন হাজার বছর ধরে। আপনার ভালো থাকার মধ্যে দিয়েই ভালো থাকুক বাংলাদেশ। কারণ, বাংলাদেশের আবালবৃদ্ধবনিতা জানেন, আপনিই এখন মানুষের শেষ ভরসা, একমাত্র বাতিঘর। 

লেখক : অধ্যাপক, অপরাধবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়