সমৃদ্ধি

স্থানীয় সরকারের উন্নয়নে শেখ হাসিনা

প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০     আপডেট: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

মো. তাজুল ইসলাম

যার যোগ্য নেতৃত্বে অনেক প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে বাংলাদেশ আজ মধ্যম আয়ের দেশ, তিনি বঙ্গবন্ধুকন্যা বাংলার প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা। তার জন্ম ১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর টুঙ্গিপাড়ায়। পিতা বিশ্ব স্বীকৃত মানবতার পথিকৃৎ, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আর মাতা বঙ্গজননী শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। এ রকম পিতামাতার সন্তান সেরা হবেন, এটিই স্বাভাবিক। যদিও ইডেন কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সক্রিয় ছাত্র রাজনীতি করেছেন ও দেখেছেন। কীভাবে পিতা মুজিব ভীষণ ভালোবাসতেন হতভাগা কৃষক, শ্রমিক আর ছাত্র-জনতাকে। কিন্তু কখনও মনে হয় ভাবেননি পিতৃ-মাতৃহীন আপন ভাইদের হারিয়ে এ রকম কঠিন দায়িত্ব তাকে নিতে হবে। আমার মনে পড়ে কবি কাজী নজরুল ইসলামের 'দুর্গম গিরি, কান্তার মরু, দুস্তর পারাবার', মনে পড়ে Robert Frost - Stopping by woods on a snowy evening :

The woods are lovely, dark and deep
But I have promises to keep  
And miles to go before I sleep
And miles to go before I sleep.

স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশকে পৃথিবীতে একটি গর্বিত জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ১৫ আগস্ট কালরাতে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মাধ্যমে সব লন্ডভন্ড  হয়ে যায়।

শিশুপুত্র রাসেলকে হত্যা করে ঘাতকরা প্রমাণ করেছে যে, বঙ্গবন্ধুর রক্তের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়িত হবে। কিন্তু তারা এটা মোটেও ভাবে নাই যে, বিদেশে থাকা তার কন্যাদ্বয় বাংলাদেশে এসে পিতার অসমাপ্ত কাজ এবং স্বপ্নপূরণের জন্য জীবন বাজি রেখে কাজ করবেন। তারা জানত না, বঙ্গবন্ধুর রক্ত যেখানেই থাকুক, তা কথা বলবেই, মানবতার জন্য।

উল্লেখ্য যে, ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর স্বাধীনতাবিরোধীরা উল্লাসে মাঠে নেমেছিল। যারা স্বাধীনতা যুদ্ধে ৩০ লাখ মানুষকে হত্যা ও ২ লাখ মা-বোনকে ধর্ষণ করেছে, তারা চলে আসে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে। তখন ছিল না কোনো বিচার, দেশপ্রেমিক অনেক সেনা কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতাদের ধরে এনে হত্যা করা আরম্ভ করেছিল। বাংলার মানুষ তখন দিশেহারা। জিয়া সরকার তখন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সরকারের সাথে নানা ভাবে লবিং করছিল যেন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে কোনো দেশে থাকতে না দেয়। এমনও শোনা যাচ্ছিল যে, বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীরা ও তখনকার সরকার বিভিন্নভাবে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীদের নিয়োগ দিয়েছিল এই দুইজনকে হত্যা করার জন্য। এই দুঃসময়ে তৎকালীন সরকারের না চাওয়া সত্ত্বেও বহু দেশ বঙ্গবন্ধুর কারণে আশ্রয় দিতে চেয়েছিল বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যাকে। কিন্তু ভারতে থাকলে বাংলাদেশের গন্ধ পাবেন, নাড়ির কাছাকাছি থাকতে পারবেন- এই জন্য ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন।

কী দুর্ভাগ্য, কী নিষ্ঠুরতা, যার সারা জীবনের ত্যাগ ও কষ্টের বিনিময়ে এই স্বাধীন দেশ; সেই দেশে জাতির জনকের কন্যাকে আসার অনুমতি দেওয়া হয়নি।

শত চেষ্টা আর দেশের অভ্যন্তরে থাকা লক্ষকোটি দেশপ্রেমিকের চাপে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে আসার অনুমতি দিতে বাধ্য হয় তখনকার সরকার। সব ভয়, শঙ্কা উপেক্ষা করে বীরদর্পে ১৯৮১ সালের ১৭ মে বাংলাদেশের মাটিতে ফিরে এলে লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতিতে এক হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। সেই থেকে শুরু, আরম্ভ হলো বিপৎসংকুুল ভয়াবহ পথের যাত্রা, পদে পদে বাধা, হামলা, মৃত্যুর ভয়, জেল-জুলুমসহ নানা অত্যাচার; সব উপেক্ষা করে তিনি ছুটে চলেছেন বাংলার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। সাহস দিয়েছেন সব মানুষকে, মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলন করে মানুষের মধ্যে আশার সৃষ্টি করেছেন। মানুষ বিশ্বাস করে, শেখ হাসিনা ক্ষমতায় গেলে তাদের ভাতের জন্য আর্তনাদ করতে হবে না, শিক্ষার উন্নতি হবে, স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে যাবে সবার কাছে। রাস্তা হবে, বিদ্যুৎ হবে, কর্মসংস্থান হবে, বেকারত্ব কমবে, আয় বাড়বে, শিল্পায়ন হবে, রপ্তানি বাড়বে। হতদরিদ্র দেশটি উন্নত দেশ হবে। তা আজ প্রমাণিত- বৃদ্ধ মা, হতদরিদ্র বাবা, কারও কথা তিনি ভুলেননি।

বঙ্গবন্ধুর দর্শন ছিল গ্রামে শহরের সব সুবিধা পৌঁছে দিয়ে গ্রামের মানুষের জীবনযাপন উন্নত করা। সেই দর্শন বুকে ধারণ করে ১৯৯৬ সালে প্রথম ক্ষমতায় এসে একটি পরিকল্পিত ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়। সব খাতে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়। সাধারণ মানুষের জন্য সেবা নিশ্চিতকরণের জন্য কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, মাতৃত্বকালীন ভাতার ব্যবস্থা করেছেন। মানুষের মনে আশার আলো দেখা দিয়েছিল। 'সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে শত্রুতা নয়' বঙ্গবন্ধুর এই দর্শন বুকে ধারণ করে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশকে একটি মর্যাদার স্থানে আসীন করতে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিচুক্তির মাধ্যমে অসন্তোষ বন্ধ করতে সক্ষম হন। ভারতের সঙ্গে ফারাক্কা চুক্তির মাধ্যমে শুকনো মৌসুমে পানির ন্যায্য হিস্যা পেতে সক্ষম হন।

২০০১ সালে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের কারণে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না যাওয়ার ফলে খাদ্যঘাটতি নতুন করে দেখা দেয়। বিদ্যুৎ উৎপাদন নিম্নগামী, বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ, কমিউনিটি ক্লিনিক বন্ধ, গরিবের বাহন রেলের অনেক স্টেশন বন্ধ করে দেয়। এসবের প্রতিবাদ করতে গিয়ে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা, সারাদেশে ৬৪টি জেলায় একসঙ্গে বোমা হামলা, সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া হত্যাসহ সারা বাংলায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হামলা-মামলা, এমনকি হত্যা করে তার স্বজনদেরই মামলার আসামি করা হয়। বিএনপি-জামায়াত সরকারের দুঃশাসন থেকে মুক্তি পেতে বাংলার মানুষ জননেত্রীকে অনেক ত্যাগের বিনিময়ে ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিজয়ী করে ক্ষমতায় আনেন। ক্ষমতায় এসে বঙ্গবন্ধুকন্যা ঘোষণা করেন দেশ হবে ক্ষুধা-দারিদ্যমুক্ত, উন্নত-সমৃদ্ধ বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশ। সে লক্ষ্যে তিনি পথনকশা প্রণয়ন করেন; ২০২১ সালে মধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সালে বাংলাদেশ উন্নত দেশে পরিণত হবে। আর সেজন্য মাথাপিছু আয় হতে হবে ১২ হাজার ৫০০ ডলার। অথচ ২০০৮ সালে মাথাপিছু আয় ছিল ৫০০ ডলারের মতো, যা এখন দুই হাজার ডলার ছাড়িয়েছে। দেশ এরই মধ্যে নিম্নমধ্যম আয়ের ও উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা লাভ করেছে, যা বিশ্বব্যাংক এবং জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃত।


উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে বিদ্যুৎ। সে লক্ষ্যে দেশের প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশ থেকে আমদানি করছে সরকার। অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন মিয়ানমার এবং ভারত থেকে এক লাখ ৩১ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র সীমানা অর্জন করে।

মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভারতের সঙ্গে দেশের সীমান্তে ছিটমহল সমস্যা নিষ্পত্তি করার জন্য বঙ্গবন্ধু ১৯৭৪ সালে ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে কোনো সরকারই ছিটমহল সমস্যা সমাধানে কোনো কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারেনি। ছিটমহলে বসবাসকারী লোকজন মানবেতর জীবন যাপন করত। এ অবস্থা অবসানের জন্য শেখ হাসিনার সফল উদ্যোগের কারণে সীমানা চুক্তি বাস্তবায়ন হয়। যার ফলে বাংলাদেশ ১৭ হাজার একর এবং ভারত সাত হাজার একর জায়গা পায়।

২০১৮ সালে নির্বাচনী ইশতেহারে গ্রামে শহরের সুবিধা সংবলিত 'আমার গ্রাম আমার শহর' অঙ্গীকারভুক্ত করেছেন। সেই জন্য স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। এরই মধ্যে প্রায় সব বাড়িতে বিদ্যুৎ পৌঁছেছে। টেকসই রাস্তা নির্মাণে তার নির্দেশনা অনুযায়ী নতুনভাবে ডিজাইন হচ্ছে। নদী-খালের নাব্য এবং নৌ পরিবহন ব্যবস্থা অক্ষুণ্ণ রেখে সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে।

গ্রাম বা শহরে সব জায়গার গৃহস্থালি ও পয়ঃবর্জ্য আধুনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহ, হাটবাজারের উন্নতি, প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন, কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোকে আধুনিকায়ন করা হবে। বঙ্গবন্ধুর দর্শন অনুযায়ী ফসলি জমির আইল তুলে দিয়ে সম্মিলিতভাবে বা সমবায়ভিত্তিক চাষাবাদের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে লাকসাম এবং বগুড়াতে সফলভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে, এই পদ্ধতিতে চাষাবাদ অত্যন্ত লাভজনক। কারণ এই পদ্ধতিতে উৎপাদন খরচ হয় তিন ভাগের এক ভাগ আর ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি পায় দুই গুণ।

এরই মধ্যে 'আমার গ্রাম, আমার শহর' ধারণাপত্র অনুযায়ী অনেক উপজেলায় মাস্টার প্ল্যানের কাজ আরম্ভ হয়েছে।

এ দেশের মানুষ অনেক দুর্ভাগ্যের মাঝেও বড়ই ভাগ্যবান। কারণ বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পেয়েছে। যার কারণে আমরা আজ বিশ্বে মর্যাদাশীল জাতি। আমাদের কারও দয়াদক্ষিণার ওপর নির্ভর করতে হয় না। বাজেট প্রণয়নের আগে দাতাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয় না। উন্নয়ন প্রকল্প দেশের স্বার্থে, জনকল্যাণে নিতে কোনো বাধা নেই। মানতে হয় না কারও পূর্বশর্ত। এই অর্জন আর প্রাপ্তি যার কারণে, তার দীর্ঘায়ু কামনা করি। তিনি বেঁচে থাকুন বাংলার মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য।

মন্ত্রী- স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়