একজন সৎ-কর্মঠ কর্মকর্তার বিদায়

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২০   

শেখ ইউসুফ হারুন

সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়

আমানুল্লাহ মাসুদ হাসান

আমানুল্লাহ মাসুদ হাসান

দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে জানাচ্ছি যে, আমাদের প্রিয় বন্ধু আমানুল্লাহ মাসুদ হাসান, পরিচালক, বাংলাদেশ বেতার আর নেই। কভিডে আক্রান্ত হয়ে শুক্রবার রাতে সরকারি কর্মচারী হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। নব্বইয়ের দশকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ফলিত রসায়ন বিভাগে মাসুদ আমার সহপাঠী ছিল। সে নেই ভাবতে বুকটা দুঃখে ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে।

রাজশাহীর বিনোদপুরের ছেলে মাসুদ আমাদের সকলের খুব প্রিয় মুখ। সে রাজশাহী বেতার ও স্থানীয় পত্রপত্রিকায় লেখালেখি করত। তার লেখা কবিতা, প্রবন্ধ, কথিকা ইত্যাদি আমাদের সবার খুব প্রিয়। বিশেষ করে শিশুতোষ সাহিত্য লিখে মাসুদ হাত পাকিয়েছিল। পড়ালেখার চেয়ে আড্ডা ছিল তার প্রিয় বিষয়। দেখতাম, বন্ধুদের সঙ্গে সকাল-দুপুর-বিকেলে আড্ডায় মেতে আছে। মাঝেমধ্যে আমিও তাদের আড্ডায় যোগ দিয়েছি। সাংবাদিক হিসেবেও সে বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস ক্লাবের সদস্য ছিল। পড়ালেখায় মধ্যম মানের ছাত্র হলেও পড়ালেখার বাইরের কর্মকাণ্ডে মাসুদের জুড়ি মেলা ভার। সংস্কৃতিচর্চা, লেখালেখি, সাংবাদিকতা, সমাজসেবা ইত্যাদি কাজকর্মে মাসুদ ছিল অদ্বিতীয়।

এরপর বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ করে আমরা বিসিএস পরীক্ষায় অবতীর্ণ হই। নবম ব্যাচে সে বিসিএস (তথ্য) ক্যাডারে আর আমি অষ্টম ব্যাচে বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারে যোগদান করি। চাকরির পোস্টিংয়ের দূরত্বের কারণে তার সঙ্গে আমার সম্পর্কের সাময়িক ছেদ ঘটে। আমার কর্মস্থল দূরবর্তী স্থানে উপজেলায় আর তার পোস্টিং জেলা শহরে। এ জন্য যোগাযোগ একটু শিথিল হয়ে যায়।\হআমি যখন ঢাকার জেলা প্রশাসক হিসেবে বদলি হয়ে ঢাকায় আসি, তখন তার কর্মস্থল ঢাকায় বাংলাদেশ বেতারে। আবার নতুন করে দেখাশোনা। সে আমার অফিসে খুব একটা না এলেও আমি যখন অফিসার্স ক্লাবে টেনিস খেলতাম, তখন মাঝেমধ্যে একা একা দর্শক হিসেবে বেঞ্চে বসে থাকত। বলত, 'টেনিস দেখতে তার খুব ভালো লাগে।' আমি বলতাম, 'দোস্ত, ব্যাট নিয়ে নেমে পড়ো না কেন?' সে বলত, 'জীবনের অনেক দিন পার হয়ে গেছে। নতুন করে শুরু করা সম্ভব নয়।' তা ছাড়া তার ডায়াবেটিস ছিল নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এটি নিয়ে তাকে কখনও বিচলিত হতে দেখিনি। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের কারণে নিজের অজান্তে তার শরীরের কলকবজাগুলো দুর্বল হতে শুরু করেছিল।

মাসুদ অফিসার্স ক্লাবের পূর্ব দিকে বেইলি স্কয়ারে এক রুমের একটি বাসায় অতিকষ্টে তার একমাত্র ছেলেকে নিয়ে বসবাস করত। নিজে রান্না করে খেত। ছেলেটি (সদ্য ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির স্নাতক) করোনাকালে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকার কারণে রাজশাহীতে চলে যায়। স্ত্রী পিটিআই ইনস্ট্রাক্টর, পোস্টিং রাজশাহীতে। সেখানে তিনি নবম শ্রেণিপড়ুয়া মেয়েকে নিয়ে বসবাস করেন।

শুনেছি, তারা রাজশাহীর শিরোইলে একটি ছোট বাড়ি করেছে। সহকর্মীদের মধ্যে মাসুদ একজন সৎ, নির্ভীক ও স্বাধীনতার সপক্ষের কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিল। আমার কাছে মাঝেমধ্যে এসে সে তার বিভাগীয় বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কথা বলত। এই তো দুই সপ্তাহ আগে সে আমার অফিসে এসে বলল, 'দোস্ত, তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে তৃতীয় গ্রেডে পদোন্নতির প্রস্তাব আসবে, আমার বিষয়টি দেখো।' চা খাওয়ার জন্য বললে সে বলল, 'না দোস্ত, অন্য একদিন।'

গত ১১ অক্টোবর আমি অফিস শেষে বাসায় এলে আমার স্ত্রী বলল, 'মাসুদ খুব অসুস্থ, করোনায় আক্রান্ত।' আমি বললাম, 'ওকে হাসপাতালে ভর্তি হতে বলো।' সে বলল, 'পাঁচ দিন ধরে জ্বর, ওঠার ক্ষমতা নেই। রিকশায় হাসপাতালে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু বৃষ্টির কারণে যেতে পারেনি।' আমি মাসুদকে টেলিফোন করি এবং হাসপাতালে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে বলি। তাৎক্ষণিকভাবে সরকারি কর্মচারী হাসপাতালের পরিচালককে টেলিফোন করে অ্যাম্বুলেন্স পাঠাতে বলি। বিকেলের দিকে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরের দিন কডিভ টেস্ট পজিটিভ আসে। হাসপাতালের পরিচালককে বলি, ফুসফুস সিটি স্ক্যান করাতে। সেটি করে দেখা যায়, ৩৫ শতাংশ আক্রান্ত। এর মধ্যে 'অক্সিজেন সেসুরেশন' কমতে থাকে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাড়াতাড়ি আইসিইউতে স্থানান্তর করে। একটি মেডিকেল বোর্ডও গঠন করা হয়।

হাসপাতালে থাকা অবস্থায় আমার আরেক সহপাঠী রবিউল ইসলাম, রনজু তাকে হাসপাতালে দেখতে গিয়েছিল। রনজুকে আন্তরিক ধন্যবাদ। আমরা যা পারিনি, তুমি তা-ই করেছ। আমিও হাসপাতালে থাকাবস্থায় তাকে একবার টেলিফোন করি। কৃতজ্ঞতায় ভরা মাসুদের কণ্ঠে উদ্বেগ আর ভীতির চিহ্ন স্পষ্ট। সে আমাকে বারবার বলতে থাকে, 'হারুন, আমি ভালো হবো তো? ' আমি বলি, 'চিন্তা করো না। আমাদের প্রত্যেকের দোয়া তোমার সঙ্গে আছে।' শুক্রবার রাতে হাসপাতালের পরিচালক আমাকে জানান, তার প্রেসার অস্বাভাবিকভাবে কমে যাচ্ছে। সকালে দুঃসংবাদটি শুনি, মাসুদ আর নেই।

মাসুদের জন্য মনের গভীরে এক ধরনের কষ্ট অনুভব করি। মধ্যবিত্তের ঘরে বেড়ে ওঠা একজন মানুষ, জীবন-সংগ্রামে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। নিজেকে সব প্রলোভনের ঊর্ধ্বে রেখে সরকারি দায়িত্ব পালন করেছেন। কোনোদিন কারও কাছে এতটুকু কৃপা প্রার্থনা করেননি। বেইলি রোডের এক রুমের অপ্রশস্ত বাসায় কী করে জীবন অতিবহিত করত, ভাবলে অবাক হই। নিজে রান্না করে খেত। যেদিন সে হাসপাতালে যায়, সেদিন আমার স্ত্রীকে বলে, 'আমি দুপুরে কিছু খাইনি। রান্না করার ক্ষমতা ছিল না।' এ কথা ভেবে মাসুদের জন্য আমার স্ত্রীর চোখ দিয়ে জল পড়ছে। নির্লোভ, নিরহংকারী মাসুদ নিজের জন্য কিছুই করেনি। সরকারি দায়িত্ব পালন তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্ব পেয়েছে।

করোনা মাসুদের সবকিছু শেষ করে দিল। রাষ্ট্র মাসুদের মতো একজন সৎ-কর্মঠ স্বাধীনতার সপক্ষের কর্মকর্তাকে হারাল। এ যে কত অপূরণীয় ক্ষতি, তা বুঝতে কারও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। রাষ্ট্র হয়তো আরেকজন কর্মকর্তাকে মাসুদের জায়গায় পদায়ন করবে। কিন্তু যে ক্ষতি হলো মাসুদের পরিবারের, সেটি কি কখনও পূরণ হবে? মাসুদের নবম শ্রেণিপড়ুয়া মেয়েটি তার পিতার ফেরার প্রতীক্ষায় থাকবে অনন্তকাল। হয়তো আকাশের লক্ষ তারার মধ্যে খুঁজবে তার প্রিয় বাবাকে। বন্ধুদের মধ্যে মাসুদ বেঁচে থাকবে অনন্তকাল।