আফগানিস্তানে তালেবানই কি শেষ কথা?

প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২০     আপডেট: ১৯ অক্টোবর ২০২০   

রাজর্ষি চক্রবর্তী ও অয়নাংশ মৈত্র

রাজর্ষি চক্রবর্তী দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে আফগানিস্তান গবেষক। অয়নাংশ মৈত্র ভারতীয় ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক, বাংলাদেশের থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের জুনিয়র ফেলো

দু'দশক ধরে চলা যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে আফগানিস্তানে শান্তি ফেরাতে, কাতারের রাজধানী দোহায় বহু প্রতীক্ষিত ইন্ট্রা-আফগান ডায়ালগ অনুষ্ঠিত হয় মাসে। তালেবানদের সঙ্গে সরাসরি এই প্রথম কোনো গুরুত্বপূর্ণ সংলাপে আফগান সরকার উপস্থিত ছিল। এই শান্তি আলোচনার অভিমুখ ও গতিপ্রকৃতি জানতে আগ্রহী ছিল বিশ্বের অনেকেই। প্রায় ১৯ বছর ধরে আফগানিস্তানে অব্যাহত এই যুদ্ধে মার্কিন সেনা ও তালেবানসহ নিহত হয় দেড় লক্ষাধিক মানুষ। তালেবান আফগানিস্তানের নির্বাচিত সরকারকে কখনোই বৈধ বলে স্বীকার করেনি। ঠিক এ কারণেই পূর্ববর্তী শান্তি প্রক্রিয়ায় আফগানিস্তান সরকারের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। শান্তি প্রক্রিয়া স্থাপন করার জন্য গত ২৯ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তালেবানের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় এক ঐতিহাসিক চুক্তি। সেই অনুসারেই আফগানিস্তান সরকার ও তালেবান একে অন্যের সঙ্গে শান্তি প্রক্রিয়া স্থাপনে রাজি হয়। কিন্তু এই শান্তি চুক্তি আফগানিস্তানে শান্তি স্থাপন করতে পারবে কি?

এই শান্তি প্রক্রিয়া চলাকালে কয়েকশ' নিরীহ আফগান এবং আফগান সামরিক বাহিনী তালেবানদের দ্বারা নিহত ও আক্রান্ত হয়েছে। গত মাসে আফগান উপ-রাষ্ট্রপতি আমরল্লা সালের কনভয়ে মর্মান্তিক একটি বিস্টেম্ফারণ ঘটানো হয়। সরকার ও তালেবানদের মধ্যে বন্দি প্রত্যর্পণের পরও আফগানিস্তানের নানা প্রদেশে হত্যালীলা এবং তাণ্ডব অব্যাহত। আফগান জনগণ এবং সামরিক বাহিনীর ওপর তালেবানের এই আক্রমণ আমেরিকার তাদের সঙ্গে চুক্তিপত্রের লঙ্ঘন। এই পরিস্থিতি থেকে এটা অনুমেয় যে, অনবরত আক্রমণের মাধ্যমে তালেবানরা আফগানিস্তানের সরকারের ওপর চাপ দেওয়ার চেষ্টা করছে।

এই পরিস্থিতির মধ্যেও আফগানিস্তান সরকার তালেবানি শক্তির সঙ্গে শান্তি প্রক্রিয়ায় রাজি হয়েছে মূলত দুটি কারণে। প্রথমত. আন্তর্জাতিক সৈন্য অধিকাংশই আফগানিস্তান ত্যাগ করে নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন করেছে। আফগানিস্তানের সামরিক বাহিনী দেশের সুরক্ষা প্রদানে অক্ষম। দ্বিতীয়ত. আফগানিস্তানের সুবৃহৎ অংশ তালেবানদের অধীনে। ঊন প্রশাসনকে বুদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে, এক সমান্তরাল শাসনব্যবস্থা চালায় তালেবান। নিজের বৈধতা প্রতিষ্ঠা করার জন্য তালেবান সেসব এলাকায় জনগণের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে। তালেবানদের শক্তি খর্ব করা আশরাফ ঘানি সরকারের সাধ্যের অতীত।

আফগানিস্তান সরকার এবং তালেবানের মধ্যে ফারাক হলো তাদের মার্গের ও মতাদর্শের। আফগানিস্তান বর্তমানে একটি সাংবিধানিক প্রজাতন্ত্র। অন্যদিকে তালেবানদের স্বপ্নরাজ্য ইসলামিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা গণতন্ত্রের বা জনমতের কোনো মর্যাদা নেই। শরিয়াহ আইন তালেবানদের এই রাষ্ট্র-কল্পনার অপরিহার্য ও অদ্বিতীয় অংশ। তাই উভয়ের মধ্যে শান্তি প্রক্রিয়া ফলপ্রসূ হলেও গণতান্ত্রিক মতাদর্শ আফগানিস্তানে অক্ষুণ্ণ থাকবে কিনা তা ভবিষ্যৎই বলতে পারে। আর আফগানিস্তানে যদি শরিয়াহ আইন মেনে দেশ চালানো হয়, তবে আশির দশকের আফগানিস্তানের পুনর্জন্ম দেখা দিতে পারে। আফগানিস্তানে এ লড়াই শুধু যুযুধান দুই প্রতিপক্ষ নির্বাচিত সরকার ও উগ্র তালেবানের মধ্যে নয়। এ লড়াই এখন গণতন্ত্র ও দিব্যতন্ত্রের।

আফগানিস্তানে বিভিন্ন শহর ও গ্রামে বিদেশি সামরিক বাহিনী ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর উপস্থিতির পরও তালেবানরা আক্রমণ করছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে যেখানে মাত্র কয়েক হাজার সৈন্য উপস্থিত আছে, সেখানে তালিবান আক্রমণ যে আরও বেড়ে উঠবে তা বলাই বাহুল্য। এ দেশে শান্তি না এলে লাখ লাখ আফগান শরণার্থী যারা ইরান-পাকিস্তান এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিয়েছেন, তাদের পক্ষে দেশে ফেরা অনিশ্চিত হয়ে যাবে। যদিও ইউরোপের দেশগুলো আফগানিস্তানের এই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও সেই দেশে বসবাসকারী আফগান অভিবাসীদের নিজের দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা শুরু করে দিয়েছে।

তালেবানদের সঙ্গে শান্তি প্রক্রিয়া সার্থকতা লাভ করলেও আফগানিস্তানের সব স্তরের মানুষের জন্য শান্তি আসা সম্ভবপর হবে কিনা, তা এখনই বলা সম্ভব নয়। নব্বইয়ের দশকে আফগানিস্তানে যখন তালেবান শক্তি ক্ষমতায় ছিল, সমাজে নারীদের অবস্থা ছিল শোচনীয়। ভবিষ্যতে তালেবানরা আবার ফিরে এলে আফগান নারীর সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার বজায় থাকবে কিনা সেটিও অনিশ্চিত। আফগানিস্তান ভিন্ন জাতি, জন এবং ভাষাগোষ্ঠীর দেশ। হাজারা, তাজিকসহ সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর সঙ্গে তালেবানদের মতভেদ এবং বিবাদ লেগেই থাকে। তালেবানরা সরকারে এলে এসব জাতিগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ সুরক্ষা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যাবে। অভ্যন্তরীণ এই শান্তি প্রচেষ্টা স্থাপন হলে দুই পক্ষের আক্রমণ একে অন্যের প্রতি পুরোপুরি বন্ধ করা যাবে।

তবে এই শান্তি প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে সফলতা কত দিন স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করবে উভয় পক্ষের একে অন্যের প্রতি আচরণের এবং পাশের দেশগুলোর সঙ্গে আফগানিস্তানের কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর। অতীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন এবং পাকিস্তান, আফগানিস্তানে তালেবান সরকারকে সমর্থন করলেও ভারত সরকার কোনোদিনই সমর্থন করেনি। আফগানিস্তানে দু'দশকে দুই ট্রিলিয়ন ডলার অর্থ ব্যয় করেছে ওয়াশিংটন। ট্রাম্প সরকার 'আমেরিকা ফার্স্ট' সংকল্প নেওয়ায়, আফগানিস্তান এখন তুলনামূলকভাবে কম প্রাধান্য পাচ্ছে। আফগানিস্তানে নিরাপত্তা ও কৌশলগত কারণে সুবিপুল এবং স্থূল ব্যয় কমানোই হোয়াইট হাউসের মূল লক্ষ্য। ডিসেম্বরের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে তাদের সেনা ফিরিয়ে আনবে মার্কিন সামরিক সদর পেন্টাগন।

তালেবান সরকারের ক্ষমতা বৃদ্ধি পেলে আফগান-রাজনীতিতে পাকিস্তানের বিশেষ ভূমিকা থাকবে। ভারতবিরোধী কার্যকলাপ চালাতে পাকিস্তান তালেবান, অন্যান্য উগ্র জঙ্গি সংগঠন এবং আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করে চলেছে। আফগানিস্তানে শান্তি ফেরাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করে অদম্য প্রচেষ্টা চালায় ভারত। ভারতের প্রায় ৪০০-এরও অধিক উন্নয়নমূলক কর্মসূচি রয়েছে আফগানিস্তানের ৩৪টি প্রদেশ জুড়েই। পাকিস্তানের তেহরিক-ই-তালেবানের সঙ্গে ভ্রাতৃত্ব ব্যতীত পাকিস্তানের উগ্র জঙ্গি সংগঠন এবং পাক সরকারের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক আছে তালেবানদের। আফগানিস্তানের তালেবান ক্ষমতাসীন হলে, ভারত-আফগানিস্তানের কূটনৈতিক সম্পর্কে তা অবশ্যম্ভাবিকভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। প্রতিবেশী, আঞ্চলিক দেশগুলো এবং পাশ্চাত্যের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কে ভাটা পড়বে। হ্রাস পাবে বিদেশি আর্থিক ও অন্যান্য সহায়তার পরিমাণ ও পরিসর।

দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি স্থাপনের জন্য একটি স্থায়ী ও গণতান্ত্রিক আফগান সরকারের উপস্থিতি একান্ত কাম্য। তালেবানদের পেশিশক্তি বৃদ্ধি পেলে দক্ষিণ এশিয়ার জঙ্গি এবং বিচ্ছিন্নতাবাদীরা বিকশিত হবে তা বলাই বাহুল্য। এসব সংগঠনের সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ ইসলামের বিকৃতি করে ইসলামফবিয়া বা ইসলাম-ভীতি সঞ্চার করবে। আফগানিস্তানে শান্তি সুনিশ্চিত করতে পশ্চিমের ক্ষমতাশালী দেশের সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোর এগিয়ে আসা বিশেষ প্রয়োজন।