মানুষ পালিয়ে বেড়ায় বলে অমানুষের দাপট বেশি

প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২০   

তৌহিদুল হক

অপরাধ বিশেষজ্ঞ; শিক্ষক, সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Email: awohid@gmail.com

মানুষের ওপর মানুষের নির্যাতন নানারূপে পরিচয় পেলেও নির্যাতনের যাতনা নির্যাতিত ব্যক্তি বুঝতে পারে। কত ঘৃণা নিয়ে অপেক্ষা করতে হয় জীবনের চূড়ান্ত পরিণতির সীমানায়। বাংলাদেশ নয়, সমগ্র বিশ্বে শব্দের বহুবিধ কারুকার্যে একটি শব্দ উচ্চারিত হয় বহু কণ্ঠে, বেদনার নীল জোছনায় অপরূপ বিষাদ নিয়ে মানুষ কেন এত নিষ্ঠুর হচ্ছে? জীবনের প্রতি জীবনের মায়া কেন লুপ্ত হচ্ছে? এমন মানবজীবন কি কেউ চেয়েছিল কোনো কালে?

রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের উৎপত্তি কঠিন সংগ্রাম, ত্যাগ, চোখের জলে সিক্ত। যে দেশ এত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে পেয়েছে একটি দেশ, একটি পতাকা এবং নিজস্ব সংস্কৃতি, সেখানে সিলেটের এমসি কলেজ, নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ, সাভারসহ দেশের ভেতরে এ কোন দেশ? এ আমার মানচিত্র নয়! আমি বলতে চাই, এখানে যে সূর্য উদিত হয় তা আমার নয়, যে হাত কিংবা শরীরী অঙ্গ জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেয় নারীর সল্ফ্ভ্রম, সম্মান আর অবস্থান সে হাত মানুষের নয়, পশুর!

মানুষ দিনে দিনে সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে 'মানুষ' নামক সামাজিক পরিবেশে যুক্ত হয়। এ কাজটি মোটেও সহজ নয়। মানুষের সামাজিকীকরণের প্রক্রিয়ায় পরিবার মোটাদাগে মূল ভূমিকা রাখে। পরিবার একজন সন্তানের সামাজিক শিক্ষার সূচনা সৃষ্টি করে। পরিবারে বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে পরস্পরের প্রতি পরস্পরের মায়া, ভূমিকা পালনের তাগিদ জাগ্রত হয়। সন্তানরা সব সময় দেখে পরিবারের অভিভাবক কত পরিশ্রম করে, মায়া দিয়ে সবাইকে আগলে রাখে।

বিষয় হলো, পারিবারিক অনুশাসনের সঙ্গে ধর্ষণের সম্পর্ক কোথায়? একজন সন্তান যখন পারিবারিক শিক্ষার ঘাটতি নিয়ে সমাজজীবনে বিভিন্ন ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় পদার্পণ করে, তখন সঠিক সামাজিক ভূমিকা পালন করতে পারে না। লিঙ্গগত সহনশীলতা কিংবা সংবেদনশীলতার ঘাটতি অন্য লিঙ্গের প্রতি সম্মানের পরিবর্তে ভোগের কামনা জাগ্রত করে। সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক গবেষণায় লক্ষণীয় যে, ত্রুটিপূর্ণ কিংবা ঘাটতিজনিত সামাজিকীকরণ একজন অসুস্থ বোধ সম্পন্ন মানুষ উপহার দেয়। যার আচরণ প্রশ্নবিদ্ধ, যার ভূমিকা সমালোচনায় আবদ্ধ, যার দৃষ্টি একপেশে মূল্যায়নে আবৃত। বারবার আলোচনায় এসেছে সমাজের জন্য উপযুক্ত ব্যক্তি কে- এ প্রশ্নের উত্তরে যেসব উপাদান সংযোজন হয়েছে, তার মধ্যে পারিবারিক অনুশাসনে প্রতিপালিত ব্যক্তি সমাজের শিষ্টাচারের প্রতি বেশি মনোযোগী হয়।

পারিবারিক শিক্ষার ঘাটতি শুধু পরিবারে আবিষ্ট থাকে না। ছড়িয়ে পড়ে সমাজে, রাষ্ট্রের গভীরে। যেখানে নিত্যনতুন জটিলতা তৈরি ও সামাজিক বিপর্যয় সৃষ্টি ত্রুটিপূর্ণ ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্য দ্বারা আবৃত ব্যক্তির মূল প্রেরণা হয়ে দাঁড়ায়। এভাবে সমাজ এগিয়ে যেতে পারে না। মানুষের জীবন থমকে যায়, ঠিকানা হারিয়ে যায়। সমাজ দখল হয়ে যায় অসামাজিক উপকরণে অভ্যস্ত ব্যক্তিদের লোলুপ আকর্ষণে। আজকের ধর্ষণের ঘটনায় যারা জড়িত, তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এরূপ উপাদানে সংযুক্ত।

মানুষের প্রতি মানুষের মায়া, মানবিক পদচারণা কিংবা সামাজিক দায়বদ্ধতা এক দিনে তৈরি হয় না। এটি আদর্শিক ও নীতির সংগ্রাম। বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থার আদর্শিক কাঠামো কী রূপ এ নিয়ে দীর্ঘদিনের আলোচনায় অস্পষ্ট উত্তরনামা সৃষ্টি হয়েছে। একটি সমাজে সংস্কৃতির অনুশীলন কিংবা সংস্কৃতিবোধে অনুপ্রাণিত ব্যক্তির খুবই প্রয়োজন। লক্ষ্যহীন সমাজে আদর্শিক সংগ্রামের চেয়ে আর্থিক সংগ্রাম বেশি গুরুত্ব পায়, সেটি যে উপায়েই হোক। সুস্থ মস্কিস্ক বা আচরণ ধারায় লালিত না হলে অর্থ বা ক্ষমতা সমাজে বিপর্যয় তৈরি করে। চলতি সময়ে সংঘটিত ধর্ষণের ঘটনা এই বিষয়টি জানান দেয়। সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী ব্যক্তির মধ্যে মানবিক গুণাবলি জাগ্রত হয়। মানুষের দুঃখ মানুষের মধ্যে প্রশ্নবোধের সূচনা করে, মানুষকে ভাবায় নিজ কর্মের প্রভাব কিংবা পরিণতি নিয়ে।

বাংলাদেশের সমাজে সংস্কৃতির চর্চা কিংবা বাঙালি সংস্কৃতির অপরিহার্যতা প্রযুক্তিময় সংস্কৃতির প্রভাবে দিশেহারা। মানুষের সামনে কত কিছু রয়েছে সচল। নিজস্বতার প্রতি মানুষের মমত্ব সৃষ্টি না হলে পরকে আপন মনে হয়। উগ্র সংস্কৃতির দাপটে মানুষের মায়াবি আচরণে এক বিচ্ছিন্নতাবোধ মানুষকে দাঁড় করায় মানুষের বিরুদ্ধে। মানুষের সম্মান, সামাজিক অবস্থান, সল্ফ্ভ্রম সবকিছু লুট হয়ে যায়। ধর্ষণ এর নামান্তর। মানুষের প্রতি মানুষের মমত্ব, পরস্পর অনুভব আর অনুভূতি, সহজ একত্রীকরণের কমতি হলে সমাজে দুর্বল হিসেবে বিবেচ্য মানুষের ওপর নির্যাতন, নিপীড়ন বেড়ে যায়। বাংলাদেশে এখন এটি ঘটছে এবং ক্ষেত্র বিশেষে বিস্তৃত হচ্ছে। চোখের জলের দাম নেই, নারীর পোশাক আজ অসহায় নারীর সল্ফ্ভ্রম ঢাকতে। মানুষের সম্মান, লজ্জার প্রতি সহনশীল আচরণ, শ্রদ্ধায় মর্যাদাপূর্ণ না হলে সমাজের সামগ্রিক অধঃপতন অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশের নারীদের কখনও মানুষ হিসেবে গণ্য করা হয়নি। হয়েছে পুরুষের অধস্তন হিসেবে, পুরুষের হুকুম তামিল করার যন্ত্রে। নারীকে 'নারী' করে ঘরের অন্ধকারে নিক্ষেপ করে পুরুষতন্ত্র। আর নারীরা মেনে নিয়ে ভুল করেছে!

বাংলাদেশে সামাজিক সংগ্রাম ব্যতীত নারীর অবস্থার পরিবর্তন হবে না। নারীর প্রগতি এবং সামাজিক অবস্থান পুরুষতন্ত্রের কাছে 'বিষ' মনে হয়। মেনে নিতে পারে না। নারীকে ঘুরে দাঁড়াতে হবে সংগ্রামী মনোভাবে, কঠোর পদচারণে, দাবি আদায়ের মিছিলে। নারীকে কণ্ঠ সোচ্চার করে বলীয়ান হতে হবে নিজের জন্য। কেউ জায়গা করে দেবে না, জায়গা তৈরি করে নিতে হবে। সামাজিক সংগ্রামের প্রতি আগ্রহবোধ নারী মুক্তির অন্যতম চালিকাশক্তি হতে পারে।

কী এক নিষ্ঠুরতা বিদ্যমান! সমাজে নারীর অবস্থান, পরিচয়, ক্ষমতা বা প্রভাব দেখে নারীর বিরুদ্ধে সংঘটিত সহিংসতারোধে ব্যবস্থা গৃহীত হয়। রাষ্ট্র ও সমাজের এরূপ আচরণ ও মনোভাব ধ্বংসাত্মক দিনের পূর্বাভাস মনে করিয়ে দিচ্ছে। সংগ্রাম বিনে মুক্তির মিনার নিশ্চিত হবে না। সব নারী এক হও, জ্বালাও অন্তরের আগুন, জেগে উঠুক সমাজের ঘুমিয়ে পড়া ছন্দ।

বাংলাদেশে নারীর ওপর নির্যাতন, নিপীড়ন, ধর্ষণ, সহিংসতার দ্রুত বিচার নিয়ে আলোচনা আছে। যত ঘটনা ঘটছে বিচার হচ্ছে খুব অল্পসংখ্যক ঘটনার। দ্রুত বিচার না হলে অপরাধপ্রবণ ব্যক্তিদের অপরাধ করার প্রবণতা বেড়ে যায়। বিচারের মাধ্যমে সমাজে দৃষ্টান্ত তৈরি হয়, যা মানুষকে অপরাধমুক্ত রাখতে সহায়তা করে। মানুষ শাস্তির ভয়ে আইন মানে। সেই শাস্তি নিরূপণ ও প্রয়োগে বিলম্ব ঘটলে আইনের প্রতি মানুষের আস্থার জায়গাটি স্তিমিত হয়ে পড়ে। এই সুযোগে সুযোগসন্ধানী মানুষগুলো অপরাধ ঘ্রাণ দিয়ে খুঁজে বেড়ায় তার হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার ব্যক্তিক উৎস। সমাজজীবনে ধর্ষণ এমন একটি সামাজিক ব্যাধি যা একক কারণের পরিবর্তে বহুবিধ কারণের সংযোগে সংঘটিত হয়। একাধিক কারণ বা সুযোগের উত্তর যখন ধর্ষকের নিকট আশাব্যঞ্জন জাগানিয়া তৈরি করে, তখন সমাজে নারীর প্রতি সহিংসতা হিসেবে 'ধর্ষণ সংস্কৃতি'র যাত্রা দীর্ঘ হয় এবং এ যাত্রায় সংখ্যা ও অপরাধ সংঘটনের প্রক্রিয়া নিষ্ঠুর হয়।

আইনের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মতৎপরতা, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা এবং সামাজিক জবাবদিহিতা ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত। এই সম্পর্কের বাম্পার ফলনে রাজনৈতিক পরিচয় উর্বর সার হিসেবে কাজ করে। বাংলাদেশে অধিকাংশ ধর্ষকের রাজনৈতিক পরিচয় রয়েছে। সেটি যেভাবেই থাকুক। আবার রাজনৈতিক পরিচয় অস্বীকার করার প্রবণতা বাংলাদেশে একটি পরিপুষ্ট রাজনৈতিক অসুখ হিসেবে খ্যাতি পেয়েছে। পরস্পর দোষারোপের সংস্কৃতি চলতে থাকলে অপরাধপ্রবণ ব্যক্তির দুঃসাহস বেড়ে যায়। যে কোনো ধরনের অপরাধ করার মানসিকতা তৈরি হয়। কারণ অপরাধী মনে করে তাকে আশ্রয়-প্রশ্রয় ও সহযোগিতা করার জন্য 'ক্ষমতাশালী কুতুব' রয়েছে।

বাংলাদেশে অধিকাংশ ধর্ষণের ঘটনার বিচার না হওয়ার পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব সচল ও দাপুটে ভূমিকা রাখে। এরূপ অবস্থায় রাজনীতি, রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক আদর্শের প্রতি আস্থা অবিচল থাকে না। সৃষ্টি হয় দুর্বলের প্রতি নির্যাতন ও নিপীড়ন। অপরাধীর পরিবর্তে ভিকটিম আত্মগোপনে চলে যায় বা পালিয়ে বেড়ায় পুনরায় ধর্ষণ বা নিপীড়ন থেকে মুক্তির আশায়। সমাজে ভয়ের সংস্কৃতি সচল থাকলে মানুষের স্বাভাবিক মানবিক বিকাশ থমকে যায়। মানুষের প্রতি মানুষের আস্থা ও সংকট নিরসনে মানুষের সংঘবদ্ধ পদক্ষেপ একাকিত্বের তাড়নায় ঠিকানা হারিয়ে ফেলছে। সমাজে মানুষের মধ্যে সুখপ্রাপ্তির বদলে বেদনাবোধের জন্ম হয় এবং মানুষকে প্রভাবিত করে অমানুষিক আচরণে।

মানুষকে সঠিকভাবে তৈরি করতে মানুষের সম্মিলিত জয়যাত্রা অপরিহার্য। মানুষ পালিয়ে বেড়ায় বলে অমানুষের দাপট বেশি। মানুষ একত্রিত হলে অন্যায়-অবিচার জাদুঘরে যাবে, পালকিতে চড়ে। দুর্ভাগ্য মানুষ একত্রিত হতে পারছে না, মানুষের সম্মিলিত প্রতিরোধ আন্দোলন অসাম্প্রদায়িক পরিবেশ বা বৈশিষ্ট্য পাচ্ছে না। প্রায় সবকিছু মুখ চিনে হয়। এভাবে চিনতে চিনতে মানুষের পরাজয়লিপি লিখতে হয় মানুষকেই। নিষ্ঠুরতার প্রতিবাদ না হলে নিষ্ঠুরতা এক সময় সহনীয় হয়ে পড়ে। তবে সেই সহনীয়তা মানুষের কাছ থেকে কেড়ে নেয় তৃপ্তির স্বাদ, দিয়ে যায় সার্বক্ষণিক বিষাদ। মানুষের সঙ্গে মানুষের দূরত্ব এক বড় অমানবিক অসুখ। এই অসুখ যত বাড়বে, তত অন্যায়-অবিচার, নিপীড়ন, জুলুম, জীবন সংস্কৃতির অংশ হয়ে মানুষকে নিপীড়িত করবে। মানুষকে ঠেলে দেবে অশ্রুমাখা অন্ধকার পরিবেশে যেখানে সবার দৃষ্টিশক্তি থাকা সত্ত্বেও অন্ধ।

ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি যাই হোক না কেন, দ্রুত বিচার সম্পন্ন ভিকটিমের অধিকার ও সমাজে পুনঃসংযোগ ঘটাতে না পারলে আইন ও শাস্তির মানবিক আদর্শ পরাজিত হয়। ধর্ষণের দ্রুত বিচার সম্পন্ন করতে সরকারকে নতুন পদক্ষেপের কথা ভাবতে হবে। একজন দুঃখপ্রাপ্ত মানুষের চিৎকারে পৃথিবীতে স্থায়ী বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।