দীর্ঘ বঞ্চনা ও শোষণের বিরুদ্ধে এবং একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের জন্য পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন দিদার ভাই, দিদার আতওয়ার হুসেন। যুদ্ধ করেছেন একজন কমান্ডার হিসেবে কে-ফোর্সের অধীনে। একজন মুক্তিযোদ্ধার আবশ্যিকভাবেই ধর্মনিরপেক্ষ হওয়ার কথা; কারণ তারা যুদ্ধই করেছেন একটা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের জন্য। যদিও বাস্তব চিত্র অতটা সুখকর নয়। দিদার ভাই এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। বাংলাদেশকে একটা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ার প্রশ্নে তিনি আপসহীন। সংবিধানের ইসলামীকরণ তার জন্য একটি গভীর মনোপীড়ার কারণ। তার ভাষায়, 'এ জন্য তো আমরা মুক্তিযুদ্ধ করিনি।'

দিদার ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় মন্ট্রিয়ল শহরে। তার সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎকারের ঘটনাটা ছিল খুবই চমকপ্রদ। প্রথম সাক্ষাতেই তিনি নেতাজী সুভাষ বসুর প্রসঙ্গ তুললেন। প্রথম সাক্ষাতেই আমি বুঝতে পারলাম, মানুষ হিসেবেই তিনি ব্যতিক্রমধর্মী। কারণ দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, বাংলাদেশে আজকাল আর সুভাষ বসুকে কেউ খুব একটা স্মরণ করেন না। যাই হোক, তিনি যখন আবিস্কার করলেন সুভাষ বসু সম্পর্কে আমারও ভালো পড়াশোনা আছে, তখন তিনি আরও বেশি উৎসাহ নিয়ে আমার সঙ্গে কথা বললেন। বললেন, সুভাষ বসুর মতো একজন অসাম্প্রদায়িক নেতা আমাদের দরকার। সুভাষ বসু যখন কলকাতার মেয়র ছিলেন, বিরাট সংখ্যক কাউন্সিলর মুসলমান সম্প্রদায় থেকে হয়েছিলেন। তার উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সহযোগীও ছিলেন মুসলমান সম্প্রদায়ের, যারা জীবন দিয়ে নেতাজীকে রক্ষা করেছেন। বঙ্গবন্ধুও সুভাষ বসুর একজন ভক্ত ছিলেন- আলোচনার সময় দিদার ভাই এ কথাও জানালেন।

মেজর হিসেবে অবসরের পর তিনি ব্যবসায় মনোনিবেশ করেন। পারিবারিক জীবনে একমাত্র কন্যাসন্তানের জনক ছিলেন তিনি। নাম, শাসীন দিদার হুসেইন। দুর্ভাগ্য, মেয়েটা জন্ম থেকেই অসুস্থ ছিল। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা ছিল, নিউরোনে সমস্যা ছিল, হুইলচেয়ারে চলাফেরা করতে হতো। মেয়েটাকে যাতে সার্বক্ষণিক উন্নত চিকিৎসা ও সেবা দেওয়া যায়- এ কারণেই দিদার ভাইয়ের কানাডাতে আসা। একজন পিতা যে সন্তানের জন্য এরকম ত্যাগ স্বীকার করতে পারেন, তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস হবে না। মেয়েটাকে নিয়ে কোথাও যাওয়া কঠিন ছিল। যে কারণে দিদার ভাই ও ভাবির একসঙ্গে কোথাও যাওয়া হয়ে উঠত না। বাড়িতে অন্তত একজনকে থাকতে হতো মেয়েটাকে দেখার জন্য। দেখেছি, দিদার ভাই কোথাও এলে বাসায় যাওয়ার খুব তাড়া থাকত। তার কারণ মেয়েটাকে দেখাশোনা করতে হবে, ওষুধ সেবন করাতে হবে, খাওয়াতে হবে। আসলে মেয়েকে ঘিরেই আবর্তিত ছিল দিদার ভাইয়ের জীবন। মেয়েটার হাসিমুখ দেখতে পারাটাই যেন একমাত্র সুখ ছিল তার জীবনের।

প্রতিদিনের মতো ১৬ তারিখ রাতেও মেয়েটা ঘুমাতে গিয়েছিল একা একা। একা ঘুমানোই পছন্দ ছিল তার। ১৭ তারিখ। ভোর হলো, কিন্তু অর্চির ঘুম ভাঙল না, ওঠার কোনো লক্ষণও দেখা গেল না। দেরি দেখে মা অস্থির। ঘরে ঢুকলেন, ডাকলেন কিন্তু কোনো সাড়া নেই। অবশেষে নাড়া দিলেন। না, তাতেও সাড়া নেই। মা বুঝতে পারলেন, মেয়ে অবচেতন। ৯১১ কল করলেন। হাসপাতালে নেওয়া হলো। ডাক্তার জানালেন, ঘুমের মধ্যেই হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। যথাসাধ্য চেষ্টা করলেন ডাক্তার-নার্স সবাই মিলে। কিন্তু মেয়েটাকে বাঁচানো গেল না কিছুতেই। মাত্র ২০ বছর বয়সেই থেমে গেল জীবনের রথ। পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে অনন্তের পথে পাড়ি জমাল আমাদের সবার স্নেহের, দিদার ভাইয়ের একমাত্র সন্তান অর্চি। আমার নিজেরই লেখা একটা কবিতা মনে পড়ছে আজ এই বিষাদের গল্প লিখতে বসে : 'সবচেয়ে যে শেষে এলো ঘরে/কথা ছিল তাঁর দিন হবে আলোর মতো ঝিলমিল/জীবন হবে বিকেলের ছায়ার মতো দীর্ঘ/... ভুল হলো হিসাব-নিকাশ/লজ্জা পেল গাছ নদী পাহাড় সাগর/আমাদের ছোট নদী চললো না বাঁকে/কাঁশফুল হাসলো না তীরে...।' পিতার কাঁধে সন্তানের লাশ যে কতটা ভারী, তা একমাত্র সন্তান-হারার পক্ষেই বোঝা সম্ভব। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল মৃত্যুর খবর। শোক নেমে এলো মন্ট্রিয়ল শহরে যেভাবে রাত নামে আকাশ জুড়ে দিনের শেষে।

দিদার ভাই এমন একজন মানুষ যিনি বাংলাদেশকে ধারণ করেন। বাঙালিকে ধারণ করেন, বাংলা ভাষাকে ধারণ করেন, মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করেন। তিনি যেন বাংলাদেশ ও বাঙালির প্রতিনিধি। তার মতো একজন বড় ভাইসুলভ মানুষ আমি এই জীবনে আর দেখিনি। বাংলাদেশ থেকে নতুন কেউ এলে তিনি ব্যস্ত হয়ে যান। সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন কী করা যায় তার জন্য। আজ তার এই গভীর বিষাদের দিনে আমরা কী সান্ত্বনা দেবো তাকে। কোনো সান্ত্বনা কি হয় এমন মৃত্যুর?

দিদার ভাইয়ের সঙ্গে গতকাল কথা হলো দূরালাপনীতে। মনে হলো, তিনি এই শোক অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছেন। এখানেও তিনি বড় ভাই। তিনি আমাকে উল্টো সান্ত্বনা দিলেন। বললেন, তরুণ, তুমিই তো একদিন এক প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথকে উদ্ধৃত করে বলেছিলে, 'জীবনেরে কে রাখিতে পারে?/আকাশের প্রতি তারা ডাকিছে তাহারে/তার নিমন্ত্রণ লোকে লোকে/নব নব পূর্বাচলে/আলোকে আলোকে', তোমার মনে নেই? একজন জ্ঞানী মানুষ সব সময়ই পৃথিবীর সব ঘটনা মহাকালের সাপেক্ষে চিন্তা করেন। আমাদের সবারই তা-ই করা উচিত বোধ করি। তবুও কবি নজরুলের মতো জ্ঞানী মানুষও সন্তানের মৃত্যুতে হাহাকার করে ওঠেন। বলেন, 'শূন্য এ বুকে পাখি মোর ফিরে আয় ফিরে আয়...'। কিন্তু পাখি কি কোনো দিন ফিরে আসবে? আসবে না!

(মন্ট্রিয়লবাসী মুক্তিযোদ্ধা, মেজর (অব.) দিদার আতওয়ার হুসেন কন্যা অর্চি ১৭ অক্টোবর মারা গেলে মন্ট্রিয়ল শহরে শোকের ছায়া নেমে আসে।)