সম্প্রতি বিভিন্ন পত্রিকায় একটি বিবৃতি দেখলাম যেখানে দেশের ৬২ জন বিশিষ্ট নাগরিক পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান জেলার চিম্বুক-থানচি সড়কে ম্রো জনগোষ্ঠী আধ্যুষিত এলাকায় বিনোদন পার্ক স্থাপন বন্ধের দাবি জানিয়েছেন। 

পার্বত্য চট্টগ্রামের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে নিবন্ধটি পড়ার পর মনের মধ্যে উঁকি দেওয়া কিছু প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছি। বিবৃতিতে বিশিষ্ট নাগরিকরা যে বক্তব্য পেশ করেছেন, তার সঙ্গে বাস্তবতার মিল কতটুকু, বোঝার চেষ্টা করছি। বিবৃতিটি পড়ে মনে হতে পারে- অন্য বিষয়ে অগাধ জ্ঞান থাকতে পারে; কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তবতা সম্বন্ধে তাদের কোনো ধারণা নেই। হতে পারে কেউ একজন বিবৃতিটি লিখেছেন, বাকিরা স্বাক্ষর করেছেন মাত্র। চাকমা সার্কেল চিফ এবং সুপরিচিত একজন ব্যারিস্টারের বিভিন্ন প্রবন্ধ বা নিবন্ধের সঙ্গে যারা পরিচিত, তারা খুব সহজেই বুঝতে পারবেন তার লেখার সঙ্গে বিবৃতির ভাষা, গাঁথুনি ও যুক্তির মিল রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে আলোচ্য বিশিষ্ট নাগরিকদের কয়েকটি প্রশ্ন করতে চাই। প্রথমত, যে এলাকায় এই পাঁচ তারকা হোটেলটি নির্মাণ নিয়ে বিক্ষোভ হচ্ছে, সেই এলাকাটি সম্বন্ধে তাদের কোনো ধারণা আছে কিনা? আদৌ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে তাদের বসতভিটা থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে? প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে আসলে চাষাবাদের কী পরিমাণ জমি ধ্বংস হয়েছে, সে বিষয়ে বস্তুনিষ্ঠ তদন্ত করে দেখেছেন কিনা? আমি জানি এসবের উত্তর হবে- 'না'।

প্রকৃতপক্ষে যে এলাকা নিয়ে এই বিতর্ক, তা হলো পার্বত্য চট্টগ্রামে অবস্থিত ১৫টি পর্বতমালার অন্যতম চিম্বুক পাহাড়ের চন্দ্রপাহাড় এলাকা। তৃতীয় শ্রেণিভুক্ত জঙ্গলাকীর্ণ এই এলাকা সরকারের খাস খতিয়ানভুক্ত, অর্থাৎ ব্যক্তি মালিকানাধীন ভূমি নয়।

চিম্বুক পাহাড় আনুমানিক ১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ, যা বান্দরবান সদরের তেঁতুলপাড়া থেকে শুরু হয়ে সীমান্ত পিলার-৬৪ অতিক্রম করে মিয়ানমারে প্রবেশ করেছে। এর মধ্যে মাত্র ২০ একর জমি পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত প্রথা ও রীতি মেনে সেখানকার জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি অর্থাৎ হেডম্যানের অনুমতি সাপেক্ষে বান্দরবান জেলা পরিষদের মাধ্যমে সরকারের কাছ থেকে ৩৫ বছরের জন্য লিজ নেওয়া হয়েছে। এ থেকে সহজেই অনুমেয়, বিবৃতিতে উল্লিখিত ম্রো উপজাতির শ্মশান, পবিত্র পাথর, পবিত্র পর্বত ইত্যাদি নষ্ট করে হোটেল ও বিনোদন পার্ক নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে বলে যে অভিযোগ করা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। বস্তুত সেখানে কোনো জনবসতিই নেই। কাজেই সেখান থেকে ম্রো সম্প্রদায়ের ১০ হাজার মানুষকে তাদের ভিটামাটি থেকে উচ্ছেদের যে গল্প তৈরি করা হয়েছে, তা অসত্য। আর এমন একটি ভিত্তিহীন অভিযোগ যাচাই-বাছাই না করে শুধু অন্যের কথা আমলে নিয়ে আমাদের বিশিষ্ট নাগরিকরা কীভাবে বিবৃতিতে স্বাক্ষর করলেন?

প্রসঙ্গত, পৃথিবীর সর্বোচ্চ ও দীর্ঘ পর্বতমালা হিমালয়ের মালিক কে? সেখানে বসবাসকারী তামাং, লিম্বু, গুর্খা বা শেরপা জাতিগোষ্ঠীর মানুষ না নেপালের সরকার? নিশ্চয়ই সরকার। তাহলে কীভাবে ১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই চিম্বুক পাহাড়ের মালিকানা সেখানে বসবাসরত একটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর হয়? প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার পর্যটক শুধু হিমালয় পর্বত দেখতে নেপালে গমন করে। আর এই পর্যটন শিল্পকে কেন্দ্র করে সেখানে গড়ে উঠেছে শত শত হোটেল ও রিসোর্ট, যা নেপালের অর্থনীতির প্রধান স্তম্ভ। এখন যদি সেখানকার জনগণ এই হিমালয়ে হোটেল বা রিসোর্ট তৈরিতে বাধা দিত, তাহলে নেপালের অর্থনৈতিক অবস্থা কী হতো? হিমালয় যদি ব্যক্তি মালিকানাধীন সম্পত্তি না হয়ে থাকে, তাহলে চিম্বুক পাহাড় কীভাবে কিছু সংখ্যক মানুষের পৈতৃক সম্পত্তি হয়?

এই চিম্বুক পাহাড়েই ইতোমধ্যে 'সাইরু' নামে পাঁচ তারকা বিশিষ্ট ব্যক্তিমালিকানাধীন একটি রিসোর্ট তৈরি হয়েছে, যা এলাকার মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রেখেছে। সেটি নিয়ে তো কোনো কথা কেউ বলছেন না! জেনে রাখা ভালো, চন্দ্রপাহাড়ে হোটেল নির্মাণ প্রকল্প শুরু হয়েছিল ২০১৫ সালে। তখন কিন্তু কেউ এর বিরোধিতা করেনি। তাহলে এখন কোন উদ্দেশ্যে এসব আন্দোলন, মিটিং-মিছিল বা বিবৃতি? বর্তমানে সরকার যখন পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে ও দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করছে, ঠিক তখনই পর্যটনবান্ধব একটি প্রকল্পকে বাধাগ্রস্ত করতে স্বার্থান্বেষী মহলের ষড়যন্ত্রে বিশিষ্ট নাগরিকরা কীভাবে শামিল হলেন? বিরাট একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন রেখে যাচ্ছি এখানে।

হোটেল নির্মাণের বিরোধিতা করতে গিয়ে জনস্বার্থ ও জাতীয় স্বার্থের কথা বলেছেন বিবৃতিদাতারা। বান্দরবানের মতো জায়গার সংবেদনশীল পরিবেশ ও প্রতিবেশের বিষয়ে বলেছেন তা খুব ভালো কথা; কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটলে কার স্বার্থের ব্যাঘাত ঘটবে? আসলে স্বার্থন্বেষী মহল চায় না এই অঞ্চলের মানুষ পর্যটন শিল্পের মাধ্যমে অর্থনৈতিক মুক্তি লাভ করুক, দারিদ্র্যের কশাঘাত থেকে বেরিয়ে আসুক। কেননা তারা জানে যে, অর্থনৈতিক মুক্তি লাভ করলে এসব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনগণকে আর দাসত্বের শৃঙ্খলে বেঁধে রাখা যাবে না।

বিশিষ্ট নাগরিকরা জাতির বিবেক। তাদের কাছে আমরা সবসময় পক্ষপাতহীন বক্তব্য ও ন্যায়বিচারের আশা করি। কিন্তু তারা কি কখনও পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী দরিদ্র ও নিপীড়িত বাঙালি জনগোষ্ঠীর পক্ষে কথা বলেছেন? অথচ তারা সেখানে বসবাসকারী মোট জনসংখ্যার অর্ধেক। সেখানে বসবাসকারী বাঙালি জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক অবস্থা সম্বন্ধে তাদের কোনো ধারণা আছে?

পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে যখন দেশি-বিদেশি নানা ষড়যন্ত্র চলছে, তখন দেশের বিশিষ্ট নাগরিকদের কাছে আমরা আরও সতর্কতা ও সচেতনতা প্রত্যাশা করি। কারও ভিত্তিহীন অভিযোগের ফাঁদে পা না দিয়ে নিজের বিবেক জাগ্রত করাই এখনকার কর্তব্য। তাহলেই আপনার আমার সর্বোপরি আমাদের দেশ ও জাতির মঙ্গল। তা না হলেই বিপদ।

বিষয় : বিনোদন পার্ক

মন্তব্য করুন