মোটরযান চালনা কি একটি পেশা? অনেকেই হয়তো বলবেন, এটা তো পেশা। এভাবেই তো লেখা হয়, লিখতে হয়- এটা তো সর্বজনস্বীকৃত একটি বিষয়। এর সঙ্গে দক্ষতার বিষয় জড়িত, প্রাতিষ্ঠানিক বিষয়ও রয়েছে, এছাড়া এই পেশার কিছু আইন ও নীতিমালাও রয়েছে ইত্যাদি। কথাগুলো সত্যি, যদিও কাগজে-কলমে কী আছে আর বাস্তবে তা কতটুকু চর্চা হয় সেটি নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক ও সমালোচনা রয়েছে। কিন্তু তার পরও এই প্রশ্নটিই বর্তমান সময়ে আমাদের সবাইকে আরও জোরালোভাবে করা উচিত হবে।

উপরোক্ত প্রশ্নটির উত্তরের মাঝেই নিহিত রয়েছে অনেক কিছুর সমাধান। ফলে সুষ্ঠু ও যৌক্তিকভাবে এই প্রশ্নটির উত্তর সবার সামনে আনা সম্ভব হলে তা দেশের পুরো যাতায়াত ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে সহায়ক হবে। একই সঙ্গে তা এসডিজি অভীষ্ট অনুসারে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বিশেষত দুর্ঘটনায় মৃত ও আহত ব্যক্তির সংখ্যা নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে আনতে এবং বেকারত্ব দূরীকরণসহ আরও বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ও সমস্যার সমাধানেও বিশেষভাবে অবদান রাখবে বলে বিশ্বাস করি।

জীবিকা নির্বাহ করার উপায় হিসেবে সাধারণভাবে পেশা শব্দটা আমাদের সবার কাছেই খুব চেনা। কিন্তু প্রকৃত অর্থে জীবিকা নির্বাহের উপায়কে আসলে বলা হয় বৃত্তি, ইংরেজিতে 'অকুপ্যাশন'। আর সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, বৃত্তি তখনই পেশার পর্যায়ে যেতে পারে কিংবা মর্যাদা লাভ করতে পারে, যদি তার বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য ও মানদণ্ড থাকে। সেগুলো হলো- সুশৃঙ্খল জ্ঞান ও তাত্ত্বিক ভিত্তি, বিশেষ দক্ষতা ও নৈপুণ্যতা, পেশাগত দায়িত্ব ও জবাবদিহি, পেশাগত সংগঠন ও নিয়ন্ত্রণ, পেশাগত নীতিমালা ও মূল্যবোধ, জনকল্যাণমুখিতা ও উপার্জনশীলতা, ঐতিহাসিক পটভূমি এবং সর্বোপরি সামাজিক স্বীকৃতি। এসব দিক ও মাপকাঠির বিবেচনায় মোটরযান চালনা বাংলাদেশে কতটুকু পেশার মর্যাদা লাভ করতে পেরেছে তা সত্যি সত্যিই প্রশ্নসাপেক্ষ একটি বিষয়।

বৃত্তিজীবীরা ইচ্ছে করলেই তার বৃত্তি পরিবর্তন করে অন্য কোনো বৃত্তিতে সমাপৃক্ত হতে পারেন। অন্যদিকে পেশা হলো কোনো বিষয়ে নির্দিষ্ট জ্ঞান, দক্ষতা, নৈপুণ্যতা, মূল্যবোধ, বিশেষ নীতি ও বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন বৃত্তি। যা সাধারণত জনকল্যাণমুখী এবং পেশাগত সংগঠনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত হয়। যে কোনো পেশাকে পরিপূর্ণ পেশার মর্যাদা অর্জন করতে হলে সমাজ ও রাষ্ট্রের স্বীকৃতিও অর্জন করতে হয়। তাই মনে এ প্রশ্নের উদ্রেক হওয়াটা স্বাভাবিক যে, মোটরযান চালনাকে কি আমরা সত্যিকারভাবেই পেশাগত স্বীকৃতি দিয়েছি?

প্রসঙ্গত, সব পেশাকে বৃত্তি বলা যেতে পারে, কিন্তু সব বৃত্তিকে কিন্তু পেশা হিসেবে অভিহিত করা যায় না। ফলে মোটরযান চালকের ক্ষেত্রেই শুধু নয়, বাংলাদেশে আরও অনেক পেশার ক্ষেত্রেই এ প্রশ্নটি যৌক্তিকভাবে উত্থাপন করার অবকাশ থেকে যায়। যাহোক, ড্রাইভিং বা মোটরযান চালককে পেশার স্বীকৃতি প্রদান করাটা এ মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ বলাবাহুল্য, সড়ক দুর্ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।

গত ২৩ আগস্ট একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত খবর অনুসারে, এ বছরের মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত সড়কে এক হাজার ২০৫টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে (২০২০) এই সংখ্যা ছিল সাতশর বেশি। মোট সাত মাসে দুই হাজার ৪৮২ জন নিহতের মধ্যে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে এক হাজারের কম। অর্থাৎ করোনার সেই সময়কালেও (প্রসঙ্গত উলেল্গখ্য যে, সে সময় লকডাউন ছিল) মাসে সড়কে মৃত্যু হয়েছে গড়ে তিনশরও বেশি মানুষের। সেই সাত মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় আহতের সংখ্যাও কম নয়, প্রায় চার হাজার। হতাহতদের মধ্যে উলেল্গখযোগ্য সংখ্যক মানুষ যে তাদের পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী, এ বিষয়ে সন্দেহ নেই বললেই চলে।

বছরে এমন একটা দিন পাওয়া যায় না যেদিন দুর্ঘটনার সংবাদ চোখে পড়ে না। গত ১৩ নভেম্বর আরেকটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত তথ্য অনুসারে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসে দেশে এক হাজার ১১টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে এক হাজার ২৬ জন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ৭২৪ জন অর্থাৎ প্রায় ৭১ শতাংশেরই বয়স ১৫ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। ফলে এটা সুস্পষ্ট যে, দুর্ঘটনা ঘটছে এবং দুর্ঘটনা বাড়ছে, যা নিয়ন্ত্রণে আনা একান্ত জরুরি।

গণপরিবহন খাত নিয়ে অনেক আলোচনা, অনেক লেখালেখি, পরিকল্পনা, আইন অনেক কিছুই হয়েছে, এখনও হচ্ছে। এই খাতের সমস্যা ও করণীয় বিষয়গুলোও প্রায় সবই চিহ্নিত। কিন্তু তার পরও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি আমরা লক্ষ্য করছি না, বরং তা ক্রমশ আরও খারাপের দিকেই যাচ্ছে। কারণগুলোর মধ্যে অদক্ষ চালকের সংখ্যা এবং ফিটনেসবিহীন গাড়ির সংখ্যা দুটিই ক্রমাগতভাবে বাড়ছে। এই দুটি কারণই সড়ক দুর্ঘটনা অব্যাহত থাকার জন্য যথেষ্ট। তবে অবশ্য সবচেয়ে বড় কারণটি হলো মোটরযান চালক এবং পেশা হিসেবে তাদের স্বীকৃতি।

বিষয়টি ভেঙে বললে খুব সহজেই সুস্পষ্ট হবে, বিআরটিএ থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ৪৫ লাখ ৬৪ হাজারের বেশি। আর সেই সময় পর্যন্ত বৈধ চালকের সংখ্যা ২৭ লাখ ৬৭ হাজার। অর্থাৎ রেজিস্ট্রেশনপ্রাপ্ত যানবাহনের তুলনায় চালকের সংখ্যা কম ১৮ লাখের বেশি। অথচ দেড় বছরের বেশি সময় দরপত্র জটিলতায় চালকদের জন্য লাইসেন্স প্রিন্টের কার্ড ছাপানো সম্ভব হচ্ছে না। যদিও এ অজুহাতের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সমালোচনা ও প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ বলছে, কার্ড ছাপা হলে আরও নয় লাখের বেশি ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রিন্ট দেওয়া হবে। সব মিলিয়ে তখন ৯ লাখের মতো চালক সংকট থাকবে।

সারাদেশে যেখানে বৈধ চালকের সংখ্যাই সাড়ে ২৭ লাখের বেশি। তার মধ্যে রেজিস্ট্রেশনভুক্ত মোটরসাইকেলের সংখ্যাই ৩০ লাখ ৬২ হাজার ছাড়িয়েছে। অর্থাৎ নিবন্ধিত মোটরসাইকেল থেকেও বৈধ চালকের সংখ্যা কম! আর প্রাসঙ্গিকভাবে এই প্রশ্ন ওঠাও স্বাভাবিক যে, মোটরসাইকেল চালায় কতজন আর অন্যান্য যানবাহন চালায় কতজন? শ্রম আইন অনুযায়ী একটানা পাঁচ ঘণ্টা একজন চালক গাড়ি চালাতে পারবেন। আর সারাদিনে পারবেন সাত ঘণ্টা। এই হিসাব অনুযায়ী মোট যানবাহনের অন্তত দ্বিগুণ বৈধ চালক থাকা আবশ্যক। কিন্তু তা দেখা যাচ্ছে না। বরং অনেক কম। এটা সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা। বিআরটিএর আরেকটি তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় প্রতিদিন গড়ে ৪৩৪টি যানবাহন নিবন্ধিত হয়। যার মধ্যে মোটরসাইকেল ২৭২টি এবং ব্যক্তিগত গাড়ি ৪১টি।

ওপরের তথ্য থেকে দুটি বিষয় খুব সুস্পষ্ট। এক. উপযুক্ত সংখ্যায় বৈধ চালক প্রয়োজন। কিন্তু আসলেই কতভাগ মানুষ চালকের আসনে বসতে আগ্রহী- এ প্রশ্নটি কি আদৌ আমরা করে দেখেছি? এ সংক্রান্ত নির্ভরযোগ্য কি কোনো গবেষণা আছে? আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সাল্ফপ্রতিক তথ্য অনুযায়ী, করোনাভাইরাস সংকটে বিশ্বে প্রতি ছয়জনে একজন বেকার হয়েছেন, আর বাংলাদেশের প্রতি চারজন যুবকের মধ্যে একজন কর্মহীন বা বেকার রয়েছেন (২৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ)। ফেব্রুয়ারি (২০২০) মাস থেকেই এই বেকারত্ব বাড়ছে। এই যুবকদের মধ্যে মোটরযান চালনার আগ্রহীর সংখ্যা নিরূপণের জন্য যদি একটা জরিপ পরিচালনা করা যেত, তাহলেই হয়তো চিত্রটা আরও স্পষ্ট হতো।

যাহোক, কভিড-১৯ নিয়ে দেশব্যাপী প্রতিটি জেলায় কাজ করার সুবাদে এর মাঝে বিভিন্ন যুব সংগঠন ও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে এমনকি কিছু নবীন ড্রাইভারের সঙ্গেও ব্যক্তিগতভাবে কথা বলার সুযোগ হয়েছে আমার। তাতে উল্লেখযোগ্য যে প্রশ্ন ও বিষয়গুলো বেরিয়ে এসেছে, সেগুলো হলো- এত দুর্ঘটনা, বঞ্চনা ও অবহেলা, বিয়ের ক্ষেত্রে আপত্তি, বিশ্রামহীন কাজ ইত্যাদির মধ্যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কেন তারা চালকের আসনে বসবেন? আনন্দ নেই, মর্যাদা নেই, কোনো ঘটনা বা দুর্ঘটনা ঘটলে উপযুক্ত বিচার-বিশ্নেষণের ভিত্তিতে দোষী সাব্যস্ত করার ব্যবস্থা ও ব্যবস্থাপনা যেখানে অনুপস্থিত, সেখানে কেন সেই কাজটা তারা করবেন? একজন চালকের আসনে বসা কিংবা পেশা হিসেবে ড্রাইভিং বেছে নেওয়াটা কি স্বপ্ন দেখার মতো কোনো বাসনা হতে পারে?

আসলে সব পেশারই পেশাগত মূল্যবোধ ও নীতিমালা রয়েছে, যা তাকে স্বতন্ত্র মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করে। কিন্তু বাংলাদেশে এক্ষেত্রে আমরা কতটুকু করতে পেরেছি? পেশাগত মূল্যবোধ ও নীতিমালার ক্ষেত্রে অবশ্য রাইড শেয়ারিং কোম্পানিগুলো ইতিবাচক ও প্রাণান্ত কিছু প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সেগুলো ভালো কিছু উদাহরণ তৈরি করলেও দেশব্যাপী সেসব কার্যক্রম সম্প্রসারণে এবং নানামুখী যানবাহনের ক্ষেত্রে এখনও খুব বেশি আশাব্যঞ্জক ফল অর্জিত হয়নি বলেই অনুমান করি।

তবে সার্বিক বিবেচনায় সড়ক পরিবহন ক্ষেত্রে ভালো কিছু উদাহরণ খুঁজে পাওয়ার জন্য খুব বেশি দূরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। এশিয়ার অনেক দেশ থেকেও (যেমন- ভুটান, শ্রীলংকা ইত্যাদি) আমরা তাদের আচার-আচরণ ও সার্বিকভাবে মূল্যবোধ কেমন এ সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ অনেক শিক্ষাই পেতে পারি।

এ কথা বলা অনস্বীকার্য যে, প্রত্যেকটি পেশাতেই কম-বেশি চ্যালেঞ্জ রয়েছে, ড্রাইভিং বা মোটরযান চালনাতেও স্বাভাবিকভাবেই থাকবে। কিন্তু চালককে পেশার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে হলে, বেকার জনগোষ্ঠীর বড় অংশকে এই পেশায় উৎসাহী করে তুলতে হলে এবং বর্তমান মোটরযান চালকদের একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মানগত দিকে আরও উৎকর্ষ ও দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হলে আসলে যানবাহনের মালিকদের পক্ষ থেকে নিয়োগপত্র, মানসম্মত বেতন স্কেল, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, নৈমিত্তিক ছুটি, জীবনবীমা, অবসরকালীন সুবিধা, উৎসব বোনাসসহ আর্থিক বিষয়ে বিভিন্ন প্রণোদনা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। আইন অনুসারে যানবাহন মালিকদের দায়বদ্ধ রাখা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে উপযুক্ত ব্যবস্থা ও ব্যবস্থাপনাও থাকা প্রয়োজন।

এ ছাড়া এই পেশায় আসার জন্য নূ্যনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকাটাও আবশ্যক। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে মানসম্মত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থাকতে হবে। সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড অনুসারে সেইসব প্রতিষ্ঠানের মানগত দিক নিশ্চিত করারও প্রয়োজন হবে। কারিগরি দিকের বাইরে গিয়ে সামাজিক, পেশাগত, আচরণগত প্রভৃতি দৃষ্টিকোণ বিবেচনায় মোটরযান চালকদের জন্য বর্তমান প্রশিক্ষণ মডিউলগুলোয় যেসব গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি রয়েছে, সেগুলো দূর করাটাও একান্তভাবে জরুরি হবে। আরও জরুরি হবে প্রশিক্ষণগুলোর ফলপ্রসূ বাস্তবায়নের জন্য প্রশিক্ষকদের মান আরও উন্নত করে তোলা। কোনো দুর্ঘটনা হলে উপযুক্ত তদন্তের মাধ্যমে আইন অনুসারে ব্যবস্থা নিতে হবে। একতরফাভাবে মোটরযান চালক অর্থাৎ ড্রাইভারের ওপর দোষারোপ করা যাবে না। নতুন সড়ক পরিবহন আইনে এসব অনেক বিষয়েরই উল্লেখ আছে। কিন্তু তা নিশ্চিত হতে আমরা দেখছি না। পুরোপুরিভাবে আইন কার্যকর করাও সম্ভব হচ্ছে না। ফলে সংখ্যার দিক থেকে মানসম্মত চালক বাড়ছে না। দুর্ঘটনাও নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে না।

বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে ( যেমন- বাণিজ্যিক, বিনোদনমূলক, সমাজ উন্নয়নমূলক, বিভিন্ন দেশে কাজের সুযোগ সৃষ্টি ইত্যাদি) সত্যিকার অর্থে চালক পেশার গুরুত্ব তুলে ধরা ও সবাইকে এ জন্য স্বপ্ন দেখানো জরুরি। তবে সেই স্বপ্ন যেন অকালে মৃত্যুর কবলে না পড়ে সেজন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বপ্ন দেখানোর জন্য প্রাসঙ্গিক সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি ও সেই অনুসারে তার সুষ্ঠু বাস্তবায়নের দায়িত্ব থাকাটাও সমানভাবে প্রয়োজন। তাহলেই কেবল প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে চালক তৈরির বদলে একটি সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়াও তৈরি করা সম্ভব। যার মধ্য দিয়ে চালক তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় উৎসাহ, অনুপ্রেরণা ও জনপ্রিয়তা সৃষ্টি হবে এবং প্রতিবছর চাহিদা অনুপাতে মানসম্মত ও দক্ষ চালক বেরিয়ে আসবে।

প্রসঙ্গত, সরকারি উদ্যোগে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও অভিজ্ঞ চালকদের বিদেশে চাকরির উদ্যোগ গ্রহণ করার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখার মধ্যে ইতিবাচক অনেক দিক ও সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে। প্রচারমাধ্যমে মোটরযান চালনাকে সম্মানজনক পেশা হিসেবে উপস্থাপন করাটাও জরুরি হবে। আর এক্ষেত্রে মোটরযান মালিকদের মনমানসিকতার পরিবর্তন আনাও খুব দরকার, তা না হলে এই পেশায় শিক্ষিত ও উপযুক্তদের আসার পথ সুগম হবে না।

সার্বিক এসব বিষয় চিন্তা করে এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় গবেষণারও প্রয়োজন আছে। এই গবেষণার মধ্য দিয়ে প্রকৃত চাহিদা নিরূপণ করাও জরুরি হবে। গবেষণায় দেখা যেতে পারে, বর্তমান চালকদের বয়স কত, কতভাগের দৃষ্টিজনিত সমস্যা রয়েছে, এই পেশায় অন্যদের পাশাপাশি শিক্ষিত তরুণ ও বিশেষ করে নারীদের আগ্রহ ঠিক কতটুকু, দেশের বিভিন্ন সড়ক ও স্থান এবং যানবাহনভেদে প্রয়োজনীয় কী কী ক্ষেত্রে চালকদের জন্য সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করাটা জরুরি, নারীরা এই পেশায় কেমন করছে, দেশের বাইরে কোন দেশে চালকের চাহিদা কতটুকু ইত্যাদি।

২০১৮ সালে বিমানবন্দর সড়কে দুই শিক্ষার্থীর অকাল মৃত্যুর পর শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়কের দাবিতে বড় ধরনের আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। তাদের দাবির মুখে সরকার সড়ক পরিবহন আইন সংশোধনও করেছিল। সেই আইনের (অক্টোবর, ২০১৮ পাসকৃত) পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। উপযুক্ত বিধিমালার মাধ্যমে আইন পালন, অন্যান্য ধারার পাশাপাশি গুরুত্ব দিয়ে জনবান্ধব ধারাগুলো বাস্তবায়ন, প্রয়োজনীয় নীতিমালা ও মূল্যবোধ যদি অনুসরণ করা হয়, তাহলে ড্রাইভিংকে সত্যিকার অর্থে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে ও পেশার মর্যাদা দিতে আমাদের খুব বেশি পথ পাড়ি দিতে হবে না।

কারণ এই লেখার শুরুতে আমি যেসব বিষয় উল্লেখ করেছি- সুশৃঙ্খল জ্ঞান ও তাত্ত্বিক ভিত্তি, বিশেষ দক্ষতা ও নৈপুণ্য, পেশাগত দায়িত্ব ও জবাবদিহি, পেশাগত সংগঠন ও নিয়ন্ত্রণ, পেশাগত নীতিমালা ও মূল্যবোধ, জনকল্যাণমুখিতা ও উপার্জনশীলতা, ঐতিহাসিক পটভূমি এবং সর্বোপরি সামাজিক স্বীকৃতি সেগুলোর অনেক কিছুই ড্রাইভিং বা মোটরযান চালনা পেশার ক্ষেত্রে বর্তমান। কিন্তু কতটুকু আসলে বাস্তবে আছে, আর কতটুকু নেই এবং ঠিক কতটুকু লিখিত আছে কিন্তু পরিপূর্ণ প্রয়োগ নেই- সেসব দিক চিহ্নিত করে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করাই এখন সবচেয়ে জরুরি হবে। আর তা নিশ্চিত করা গেলেই হয়তো ড্রাইভিং বা মোটরযান চালনাকে আমরা সত্যিকার অর্থেই পেশা হিসেবে স্বীকৃতি ও মর্যাদা দিতে পারব। যার মধ্য দিয়ে নিঃসন্দেহে সংস্কৃতিগত ইতিবাচক একটি পরিবর্তন সাধিত হবার প্রক্রিয়ারও সূচনা হবে। একই সঙ্গে অন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ অর্জনের পাশাপাশি নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা গড়ে তোলার পথটাও আমরা সুগম করে তুলতে পারব।

বিষয় : চতুরঙ্গ বিধান চন্দ্র পাল

মন্তব্য করুন