সারাবিশ্ব যখন করোনা নামক এক ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট অতিমারির ঝড় সামলাতে ব্যস্ত, এর অভিঘাত যখন সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের দুর্দশাকে বাড়িয়ে দিয়েছে আরও বহুগুণ, অনেক পরাশক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর বেহাল দশা যখন উন্মোচিত হয়ে পড়েছে, মানুষ উপলব্ধি করতে পারছে যে, প্রচলিত পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদ এখন বর্বরতা ছাড়া আর কিছুই উপহার দিতে পারে না, এই অন্ধকারের মাঝে যখন চীন, কিউবা, ভিয়েতনামের মতো কিছু রাষ্ট্র মহামারি নিয়ন্ত্রণের উজ্জ্বল সাফল্য প্রদর্শন করতে পারছে, ঠিক তখনই খুবই নীরবে বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের বাতিঘর হিসেবে পরিচিত কিছু ব্যক্তি এবং ঘটনার বিশেষ উদ্‌যাপন করার বার্ষিকী অতিক্রান্ত হয়ে যাচ্ছে। এই বছরেই উদ্‌যাপিত হচ্ছে মার্কসীয় মতাদর্শ বিনির্মাণের অন্যতম দিকপাল ফ্রেডরিক অ্যাঙ্গেলসের জন্মদ্বিশতবার্ষিকী, মার্কসবাদকে প্রথম সার্থকভাবে প্রয়োগের মাধ্যমে সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করার প্রধান নায়ক এবং বিশ্ব সর্বহারা শ্রেণির মহান নেতা ভদ্মাদিমির উইলিয়ানভ ইলিচ লেনিনের সার্ধশতবর্ষ এবং চীন বিপ্লবে নেতৃত্বদানকারী আন্তর্জাতিক শ্রমিক শ্রেণির নেতা মাও সেতুংয়ের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী। এ বছরটি আবার ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠারও শতবর্ষ। আবার আজ থেকে ৫০ বছর আগে লাতিন আমেরিকার দেশ চিলিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়লাভ করে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হন দেশটির বামপন্থি নেতা সালভাদর আলেন্দে। এখানে একটি গুরত্বপূর্ণ বিষয় হলো যে, চিলিতে আলেন্দেকে হত্যা করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মদদে ক্ষমতা দখল করেছিলেন সামরিক স্বৈরশাসক অগাস্তো পিনোশে, তারই প্রণীত সংবিধানকে গণভোটের মাধ্যমে এ বছরই বাতিল করেছে সেখানকার জনগণ। পৃথিবীর ইতিহাসকে পাল্টে দেওয়ার মতো এসব ঘটনা এবং তার নেপথ্যে মূল ভূমিকা পালনকারী ব্যক্তিদের এই মাহেন্দ্রক্ষণগুলো করোনার কারণে অনাড়ম্বরের সঙ্গে উদ্‌যাপিত হলেও এই নিরাশাময় পরিস্থিতিতে এগুলোর তাৎপর্য আলোর দিশা দেখাচ্ছে।

আজ থেকে দুইশ' বছর আগে ঠিক আজকের দিনে জার্মানির রাইন প্রদেশের বার্মেন শহরে জন্মগ্রহণকারী ফ্রেডরিক অ্যাঙ্গেলস ছিলেন বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রবাদের অন্যতম স্থপতি। কার্ল মার্কসের জীবনী সংক্রান্ত এক রচনায় লেনিন লিখেছিলেন, 'মার্কসের মতাদর্শ সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে গেলে তার ঘনিষ্ঠতম সতীর্থ চিন্তাবিদ ও সহযোগী ফ্রেডরিক অ্যাঙ্গেলসের সঙ্গে পরিচিত হতে হবে। 'বামপন্থি কমিউনিজম- এক শিশুসুলভ বিশৃঙ্খলা' গ্রন্থে লেনিন দেখিয়েছিলেন, 'মার্কসের মতো অ্যাঙ্গেলস এমন একজন দুর্লভ চিন্তাশীল গ্রন্থকার যার প্রত্যেকটি মৌলিক রচনার প্রতিটি বাক্য এক অসাধারণ গভীর ভাবসমৃদ্ধ।' বস্তুতপক্ষে শ্রমিক শ্রেণির বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে মার্কসের সঙ্গে অ্যাঙ্গেলসের নাম অবিচ্ছেদ্যভাবে সম্পৃক্ত। লেনিন লিখেছিলেন, 'ইউরোপীয় প্রলেতারিয়েত বলতে পারে যে, তাদের সৃষ্টি করেছিলেন দু'জন মনীষী ও যোদ্ধা যাদের পারস্পরিক সম্পর্ক, মানবিক বন্ধুত্ব প্রাচীনকালের সকল মর্মস্পর্শী কাহিনিকে ছাপিয়ে গেছে।' অবশ্যই সেই দুই মনীষী হলেন কার্ল মার্কস ও ফ্রেডরিক অ্যাঙ্গেলস। এই দুই মনীষীর অসাধারণ সখ্য কিন্তু অ্যাঙ্গেলসের স্বকীয় চিন্তার সৃজনশীলতাকে কখনো ঝাপসা করে দেয়নি। বরং তাকে আরও উদ্দীপ্ত করেছে।

অ্যাঙ্গেলসের ব্যবসায়ী বাবা চেয়েছিলেন, ছেলে তার মতোই পাঁড় ব্যবসায়ীতে পরিণত হন। এজন্য পুত্রের প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার অকস্মাৎ ছেদ ঘটিয়ে তাকে ইংল্যান্ডের ম্যাঞ্চেস্টারে নিজের বিস্তৃত ব্যবসার কাজে যুক্ত হওয়ার জন্য পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু মানব ইতিহাসকে পাল্টানোর জন্য জ্ঞান অনুসন্ধানের জন্য ব্রতই অ্যাঙ্গেলসকে বেশিদিন বাবার ব্যবসায়িক অফিস কিংবা কারখানার চার দেয়ালের মাঝে সীমাবদ্ধ রাখতে পারেনি। যৌবনের প্রারম্ভে 'তরুণ জার্মানি' নামক রাডিক্যাল সাহিত্য আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়া অ্যাঙ্গেলস পরবর্তী সময়ে 'ইয়ং হেগেলিয়ান'দের একটি গোষ্ঠী 'দি ফ্রি'র সঙ্গে যুক্ত হন। কিন্তু এসব বামপন্থি হেগেলিয়ানদের সঙ্গে চলতে গিয়ে তিনি তাদের চিন্তা ও দর্শনের মধ্যে অসংগতি দেখতে পান এবং নতুন পথের সন্ধান করতে থাকেন। ইতোমধ্যে বাবার নির্দেশে ব্যবসায়িক কাজে যুক্ত হয়ে ইংল্যান্ডের কারখানাগুলোতে সেই সময়কার নব্য শিল্প শ্রমিকদের দুর্দশাময় জীবন স্বচক্ষে অবলোকন করতে থাকেন। তার এই পর্যবেক্ষণের ওপর ভিত্তি করে রচনা করেন তার প্রথম শক্তিশালী কাজ- 'ইংল্যান্ডে শ্রমিক শ্রেণির অবস্থা'। মার্কসের কাছে এই বইটি ছিল উচ্চ সমাদৃত, লেনিনের ভাষায় 'a terrible indictment of capitalism and bourgeois'। অ্যাঙ্গেলস তার অভিজ্ঞতা, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ও জ্ঞানের সাহায্যে শ্রমিক শ্রেণির যে ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা এখানে প্রকাশ করেছিলেন, তা মার্কসের দর্শনের সঙ্গে অভিন্ন। পরে মার্কস যখন তার অর্থনৈতিক ভাবনা সম্প্রসারিত করেন, তখন এই বইটির তথ্য ও সিদ্ধান্তের ওপর খুবই নির্ভর করেছিলেন। অথচ তখনও মার্কসের সঙ্গে অ্যাঙ্গেলসের সরাসরি সাক্ষাৎ ঘটেনি।

মার্কসের সঙ্গে অ্যাঙ্গেলসের প্রথম সাক্ষাৎ ঘটেছিল ১৮৪২ সালের নভেম্বর মাসে কোলোন শহরে 'রাইনিশে জাইতুং'-এর সম্পাদকীয় অফিসে। যদিও তাদের প্রথম আলাপ খুব বেশি একটা জমেনি। কেননা মার্কস তখন ইয়ং হেগেলিয়ানদের একটি অংশ 'দি ফ্রি' গোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের 'বিমূর্ত সমালোচনা' তত্ত্বের বিরুদ্ধে বিতর্করত এবং তিনি অ্যাঙ্গেলসকে চিনতেন তাদের একজন ঘনিষ্ঠ হিসাবে। অবশ্য অ্যাঙ্গেলস মার্কসকে তখনই ইউরোপের সব বিপ্লবী চিন্তাবিদ ও লেখকের মধ্যে অগ্রগণ্য মনে করতেন। এর দুই বছর পরে যখন দু'জনের সাক্ষাৎ ঘটে সেটি হলো মার্কসবাদের ইতিহাসে ঐতিহাসিক ঘটনার সূচনা। এখান থেকেই শুরু হয় এমন এক অকৃত্রিম বন্ধুত্বের যার ওপর ভিত্তি করে মানব ইতিহাসকে পাল্টে দেওয়ার যুগান্তকারী দর্শনের আবির্ভাব ঘটে।

এই দুই মনীষীর মধ্যকার সম্পর্ক কেবলমাত্র নিছক বন্ধুত্বই ছিল না, তাদের দার্শনিক মেলবন্ধনই এখানে সবচাইতে উল্লেখযোগ্য। পৃথিবীর ইতিহাসে অনেক বন্ধুত্বের কথা শোনা যায়, বন্ধুত্বের জন্য আত্মত্যাগের মহান দৃষ্টান্তও রয়েছে বেশ কয়েকটা, কিন্তু এ রকম দর্শনগত বন্ধুত্ব যা আবার প্রবল পারস্পরিক আত্মত্যাগের মাধ্যমেও মহীয়ান খুব একটা আছে কিনা সন্দেহ। মার্ক-অ্যাঙ্গেলস যৌথভাবে যেমন একদিকে রচনা করেছেন প্রচলিত পৃথিবী পাল্টানোর পথনির্দেশক অনেক গুরুত্বপূর্ণ রচনা, আবার একে অন্যের মহান সৃষ্টিতেও অবদান রেখেছেন। যেমন কার্ল মার্কস যখন তার পুঁজিবাদী অর্থনীতির অন্তঃসারশূন্যতা প্রমাণ করার লক্ষ্যে মহান সৃষ্টি 'দাস ক্যাপিটাল' রচনার কাজে ব্যস্ত, তখন অ্যাঙ্গেলস মার্কসের পরিবারের অনেক অর্থনৈতিক দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে তো নিয়েছেনই, এমনকি মার্কস যাতে শুধু এই মহান গবেষণার কাজে নিযুক্ত হতে পারেন, সেজন্য তার হয়ে নিজে 'নিউইয়র্ক ট্রিবিউন'-এর জন্য লেখা লিখে দিয়েছেন। তাদের চিঠিপত্র প্রকাশিত না হলে জানাই যেত না যে, ট্রিবিউনে প্রকাশিত লেখার এক-তৃতীয়াংশই অ্যাঙ্গেলসের লেখা। আবার মার্কসের মৃত্যুর পরে অ্যাঙ্গেলস 'দাস ক্যাপিটাল'-এর দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ডের সম্পাদনার কঠিন দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছেন, প্রকাশ করার কাজে আত্মনিয়োগ করেছেন এবং প্রথম খণ্ড ইংরেজিতে অনুবাদও করেছেন। তার পরেও মার্কসীয় মতাদর্শ বিনির্মাণে নিজের অবদান সম্পর্কে অ্যাঙ্গেলস অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বলেছেন, 'মার্কস যা পেরেছিলেন আমি তা কখনোই পারতাম না। আমাদের তুলনায় মার্কস ছিলেন অনেক উঁচুতে দাঁড়িয়ে অনেকদূর পর্যন্ত দৃষ্টি চালিয়ে অনেক ব্যাপক ও দ্রুত অবস্থান নিতে পেরেছিলেন। মার্কস ছিলেন প্রতিভাধর, আর আমরা ছিলাম বড়জোর সহজাত দক্ষতাসম্পন্ন।'

মার্কস যখন 'দাস ক্যাপিটাল' লেখায় ব্যস্ত হলেন, তখন অ্যাঙ্গেলস গভীর মনোযোগের সঙ্গে নোট নিচ্ছেন, পাঠ করছেন সমকালীন পৃথিবীতে রসায়ন, ভূবিদ্যা, প্রযুক্তির ইতিহাস সংক্রান্ত বইপত্র। মার্কস ও অ্যাঙ্গেলস উভয়েই পুঁজিবাদের স্বরূপকে বোঝার জন্য গভীরভাবে আগ্রহী ছিলেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ইতিহাসে। কিন্তু 'দাস ক্যাপিটাল' লেখার সময় মার্কসকে যেহেতু অর্থনীতি এবং দর্শনের পড়াশোনার সঙ্গে বেশি ব্যস্ত থাকতে হয়েছে, তাই অ্যাঙ্গেলসকে এ সংক্রান্ত পাঠে মনোনিবেশ করতে হয়েছে। সমাজতন্ত্র বলতে যে আসলে বোঝায় শ্রমজীবী মানুষের স্বশাসন, সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদ যে রাষ্ট্রের অবিলুপ্তির ধারণাকেই মান্যতা দেয়, এই ভাবনাগুলোর খোঁজ করতে গিয়ে আমরা সাধারণত দৃষ্টিপাত করি 'কমিউনিস্ট ইশতেহার' কিংবা মার্কস রচিত 'ক্রিটিক অব দ্য গোথা প্রোগ্রাম'-এর দিকে। কিন্তু এটাও খেয়াল রাখা উচিত যে, সাম্যবাদ ভাবনার মূল কথা ও মূল নীতিগুলো প্রথম পেশ করেছিলেন অ্যাঙ্গেলস তার 'দ্য ড্রাফট অব আ কমিউনিস্ট কনফেশন অব ফেথ', 'প্রিন্সিপালস অব কমিউনিজম', এবং তার পরে 'অ্যান্টি ডুরিং'-এর তৃতীয় অংশে। আবার পিতৃতন্ত্রের সমালোচনা, লিঙ্গবৈষম্য বিষয়টি জৈবিক নয়, সামাজিক-নারীবাদী তত্ত্বের এই মূল ভাবনাগুলোকে নিয়ে কলম ধরেছিলেন অ্যাঙ্গেলস তার 'দি অরিজিন অব দ্য ফ্যামিলি, প্রাইভেট প্রপার্টি অ্যান্ড স্টেট' গ্রন্থে। কেট মিলেট, শুলামিথ ফায়ারস্টোন প্রমুখ বিশিষ্ট রাডিক্যাল নারীবাদীরা স্বীকার করেন, সমাজতান্ত্রিক নারীবাদী ভাবনার অ্যাঙ্গেলসই ছিলেন আদি প্রবক্তা। মার্কসের মতো অ্যাঙ্গেলসও বিশ্বাস করতেন যে, শুধু তত্ত্বেই আবদ্ধ থাকলে চলবে না, সরাসরি বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকতে হবে এবং সংগঠন গড়তে হবে। ১৮৪৮ সালে ইউরোপজুড়ে যে বুর্জোয়া বিপ্লবের ঢেউ উঠেছিল, সেখানে মার্কসের সঙ্গে তিনিও সরাসরি লড়াইয়ের ময়দানে ছিলেন। আবার মার্কসের সঙ্গে মিলে তৈরি করেছিলেন প্রথম আন্তর্জাতিক এবং মার্কসের মৃত্যুর পর গড়ে তুলেছিলেন দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক।

বর্তমান সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং পূর্ব ইউরোপের বিপর্যয়ের পর বিশ্বের সাম্যবাদী আন্দোলন কিছুটা পিছু হটলেও পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের মহাসংকট এবং এখনকার করোনা মহামারি প্রমাণ করছে যে, মানবিক সমাজ বিনির্মাণ তথা সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদের অভিমুখে যাত্রা ছাড়া বিকল্প নেই। সেই সমাজ বিনির্মাণের লড়াইয়ে ফ্রেডরিক অ্যাঙ্গেলস সবসময়েই একজন অন্যতম পথ প্রদর্শক হয়ে আছেন এবং থাকবেন।