যুদ্ধ চলছে; তুমুল যুদ্ধ। পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে আমাদের গুলিবিনিময় হচ্ছে। পুকুরপাড়ের পাশে একটি খেজুরগাছের আড়ালে অবস্থান নিয়ে গুলি করছি। ঘুটঘুটে আন্ধকার। হঠাৎ পাকিস্তানিদের ছোড়া গুলি এসে লাগে আমার বাম হাঁটুতে ও কপালে। কপালের গুলিটা মাংস ভেদ করে বেরিয়ে যায়। বাম হাঁটু আর কপাল থেকে স্রোতের মতো রক্ত ঝরতে থাকে। তবু জ্ঞান হারাইনি। ডান হাত দিয়ে ক্ষত হাঁটু আর বাম হাতে কপাল চেপে ধরে বসে আছি। অস্ত্রটা (এসএলআর) ঝুলিয়েছি কাঁধে। 'ভাই, আমারে বাঁচাও, আমি মইরা যাইতাছি' বলে সহযোদ্ধাদের ডাকতে থাকি। কিছুক্ষণ পর সহযোদ্ধারা এসে কাঁধে তুলে অন্ধকারে সাঁতরে নিয়ে যান আহ্‌সান উল্লাহ্‌র বাড়িতে। খবর পেয়ে আসেন সন্তোষ চন্দ্র দাস নামে এক চিকিৎসক। তিনি হাঁটু ও কপালে ব্যান্ডেজ করে দেন। ভাগ্যক্রমে সেদিন বেঁচে যাই। অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে আছি গত ৫০ বছর ধরে।

১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বরের ঘটনা। সেদিন ছিল মঙ্গলবার। চূড়ান্ত বিজয়ের ঠিক দু'দিন আগে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার মাওনা এলাকার লবণদাহ খালপাড়ে পাকিস্তানিদের সঙ্গে আমাদের এ সম্মুখযুদ্ধ হয়। এলাকাটা মাওনার 'পাথার' নামে পরিচিত। পাথারের পূর্ব দিকে আমরা ও পশ্চিম দিকে পাকিস্তানিরা। বীর যোদ্ধাদের গুলিতে সেদিন কয়েক পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়। খালপাড়েই পড়ে থাকে তাদের লাশ। পরদিন আহত শরীর নিয়ে আবার চলে যাই রণাঙ্গণে।

আমি তখন শ্রীপুরের শৈলাট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষার্থী। শৈলাট গ্রামেই আমার জন্ম। পিতৃহারা চার সন্তানকে মা পরম আদরে মানুষ করেছেন। আমি দ্বিতীয়। বড় এক বোন আছে। ২৫ মার্চের পরপরই খবর আসছে- শহরের বুকে পাকিস্তানি সেনাদের ট্যাঙ্ক দানবের মতো ছুটছে। পুড়ে যাচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম। নারী-পুরুষ-শিশুদের ঘর থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করে পাকিস্তানিরা পাখির মতো গুলি করছে। এমন সব খবরে আর স্থির থাকতে পারলাম না। অবতীর্ণ হলাম রণাঙ্গনে। ১১ নম্বর সেক্টরে আফসার ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক মেজর আফসার উদ্দিনের অধীনে যুদ্ধ করি। অন্য আরও অর্ধশত যুবকের সঙ্গে পবিত্র কোরআন হাতে শপথ নিয়েছিলাম- দেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত ঘরে ফিরে যাব না। তাই হলো। চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হওয়ার আগ পর্যন্ত অসীম সাহসিকতায় কালিয়াকৈর ব্রিজ গুঁড়িয়ে দেওয়া, ফুলবাড়িয়া লোহার ব্রিজ ধ্বংস, ভালুকার চানপুরের অপারেশন, মাওনার পাথারের সম্মুখযুদ্ধসহ বেশ কয়েকটি যুদ্ধে অংশ নিয়েছি। গুলিবিদ্ধ হয়ে কত সহযোদ্ধাকে যে ছটফট করতে করতে মরে যেতে দেখেছি!

মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি গাজীপুর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। ছাত্রলীগের অন্যান্য নেতাকর্মীর সঙ্গে আমিও বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শোনার জন্য ঢাকার উদ্দেশে বের হই বাড়ি থেকে। হেঁটে ৬ মার্চ শ্রীপুর গিয়ে রাত যাপন করি। ৭ মার্চ ভোরের ট্রেনে ঢাকা পৌঁছি। সোজা চলে যাই রেসকোর্স ময়দানে। জাতির পিতার ভাষণ শুনে সেদিনই রক্ত গর্জে উঠেছিল।

বাড়ি ফিরে মায়ের কাছ থেকে ৪০ টাকা নিয়ে বের হয়ে যাই যুদ্ধের ময়দানে। ভালুকার মল্লিকবাড়ি গজারি বনে ছিল আমাদের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প। এখানে আমাদের রাইফেল, গ্রেনেড থ্রো শিখানো হয়। তার পর হাতে দেওয়া হয় থ্রি নট থ্রি রাইফেল আর দুটি গ্রেনেড। সামান্য প্রশিক্ষণ নিয়েই অপারেশন চালাই ভালুকার চানপুর ও ধামশুর এলাকায়। এবার প্রশিÿণ নিতে সহযোদ্ধাদের সঙ্গে চলে গেলাম ভারতে। তখন জুলাই মাস। মেজর আফসারের সঙ্গে আমরা ৮০ জন চলে যাই মেমঘালয়ের তুরা ক্যাম্পে। ২০ দিনের হায়ার ট্রেনিং শেষে আবার যুদ্ধের ময়দানে। তখন সর্বত্রই যুদ্ধ আর যুদ্ধ। নির্দিষ্ট রণাঙ্গন বলতে কিছু নেই।

১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর। তখন আমাদের ক্যাম্প মল্লিকবাড়ি ধামশুরে পাকিস্তানিরা আসছিল ময়মনসিংহের দিক থেকে। ওদের সঙ্গে আমাদের তুমুল গুলি বিনিময় চলে পারাগাঁও এলাকায়। ওখানে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন মেজর আফসারের ছেলে মুক্তিযোদ্ধা নাজিম উদ্দিন আহমেদ। আমাদের গুলিতে মারা যায় পাকিস্তানি ৮ জন। জীবিত ধরা পড়ে আরও ৪ জন পাকিস্তানি সেনা। বাকিরা গুলি করতে করতে গাজীপুরের দিকে এগোতে থাকে। আমরাও তাদের পিছু নিই। অবশেষে মাওনার পাথারের খালপাড়ে ওদের মুখোমুখি হই। এদিন বিকেল ৪টায় শুরু হয় যুদ্ধ। আমরাও অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত। মুক্তিযোদ্ধা শেখ আতাহার আলীর বাড়ির পশ্চিমদিকে পুকুরপাড়ে একটি খেজুরগাছের আড়ালে আমার অবস্থান। রাত ৮টা। প্রচণ্ড গোলাগুলি চলছে। খবর পাই, মেজর আফসার মর্টারের আঘাতে আহত হয়েছেন।

ঠিক থাকতে পারলাম না খবরটা শুনে। তখনই পাকিস্তানিদের ছোড়া গুলি এসে লাগে আমার বাম হাঁটুতে। প্রথমে ছিটকে পড়ে যাই। একটা গুলি বাম হাঁটুতে বিদ্ধ হয়ে বেরিয়ে যায়। হাঁটুতে ভর দিয়ে উঠতে গিয়েও পড়ে যাই। কপালেও গুলি লাগে একটা। তবে সেটা মাংস ভেদ করে বেরিয়ে যায়। আমার দেহ থেকে ঝরে পড়া রক্ত দূর্বাঘাস ভেদ করে বাংলার মাটিতে জমাট বেঁধে যায়। তারপর আমার আর্তনাদ শুনে সহযোদ্ধারা এগিয়ে আসেন। কাঁধে তুলে নিয়ে যান নিরাপদ আশ্রয়ে। সেখানে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরদিন আবার ঝাঁপিয়ে পড়ি ইজ্জতপুরের যুদ্ধে।

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা
অনুলিখন :: ইজাজ আহ্‌মেদ মিলন
গাজীপুর প্রতিনিধি