দেশ এক দিন স্বাধীন হবে- মুক্তিযোদ্ধা আয়শা খানমের স্বপ্ন ছিল, 'এ দেশের সবুজ প্রান্তরে, নীল আকাশে- মানবিক পরিবেশ গড়ে উঠবে। বৈষম্য থাকবে না- যে বৈষম্য দূর করার জন্য এক দিন তারা অনিশ্চিত সময়ের যাত্রী হয়েছিলেন।'

প্রগতিশীল বামপন্থি আন্দোলনের সংগঠক, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি, মুক্তিযোদ্ধা আয়শা খানম ১৯৬৫ সাল থেকে ছাত্ররাজনীতিতে সম্পৃক্ত ছিলেন। স্কুল পড়ার সময়ে শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। অংশগ্রহণ করতেন একুশে ফেব্রুয়ারির প্রভাতফেরিতে। এভাবেই এসব কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকায় নিজের ভেতরের আত্মজিজ্ঞাসা তৈরি হয়। অনুভব করেন, সমাজ ও দেশের জন্য কিছু করার। সে প্রত্যয়ের ধারাবাহিকতায় '৬২-র ছাত্র আন্দোলন, '৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, '৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭২ সালে স্বাধীন দেশের সূচনালগ্নে সাম্য ও প্রগতির জন্য নারীর অধিকার অর্জনের সংগ্রামে নেতৃত্ব দেন। অবহেলিত, সামাজিকভাবে অধিকারহীন নিগৃহীত-বঞ্চিত নারীদের মানবাধিকার রক্ষার কাজে নিজেকে নিবেদন করেন। অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, নারী-পুরুষের সমতাপূর্ণ মানবিক বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন নিয়ে দেশ স্বাধীন হয়েছিল, সেই বাংলাদেশ গড়ার সংগ্রামে আমৃত্যু সারথি ছিলেন।

২৮ অক্টোবর ১৯৪৮-এ তৎকালীন বৃহত্তম ময়মনসিংহ জেলার নেত্রকোনা মহকুমার গাবরাগাতি গ্রামে আয়শা খানমের জন্ম। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি পরিবার থেকেই পেয়েছেন। বাবা গোলাম আলী খান ছিলেন তৎকালীন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং মা মিসেস জমাতুননেসা খানম একজন সাধারণ গৃহিণী। নিজ গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্তের পর নেত্রকোনা বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করেন। ১৯৬৫ সালে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন ছাত্র আন্দোলন ও বামপন্থি রাজনীতির সঙ্গে। ১৯৭০ সালে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।

১৯৬৬ থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত রাজবন্দিদের মুক্তির জন্য বিভিন্ন পর্যায়ের আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। রাজবন্দিদের মুক্তির লক্ষ্যে বিশিষ্ট নারীদের স্বাক্ষর সংগ্রহ করেন। বেগম সুফিয়া কামাল, বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, জোবেদা খাতুন চৌধুরী, মনোরমা বসু, জোহরা তাজউদ্দীন, রেবেকা মহিউদ্দিন, অণিমা সিংহ প্রমুখ ছিলেন সে তালিকায়। ১৯৬৯-এ আয়শা খানম তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। ওই বছরের শুরুতেই ছাত্র-মিছিলে গুলিবর্ষণে ছাত্রনেতা আসাদ নিহত হন। তিনি সেই উত্তাল মিছিলে উপস্থিত ছিলেন। ১৯৭১-এর অসহযোগ আন্দোলনে ছাত্র সংগ্রাম কমিটির সংগঠক হিসেবে উদ্বুদ্ধকরণের জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক জনসভায় যোগ দেন।

ছাত্র আন্দোলন ছাড়াও তিনি মহিলা সংগ্রাম কমিটিতে যোগ দেন। বেগম সুফিয়া কামাল, মালেকা বেগমসহ বিভিন্ন নেতবৃন্দের সঙ্গে তিনি বিভিন্ন মহল্লায় সভা করতেন। ওই সময়েই তিনি নির্ধারণ করেছিলেন তার ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা। নির্ধারণ করেছিলেন ছাত্ররাজনীতি এবং নারীদের জীবনমান উন্নয়নে আজীবন কাজ করবেন। সচেতনভাবে চিহ্নিত কর্মপন্থায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন আজীবন। অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, নারী-পুরুষের সমতাপূর্ণ মানবিক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নে, আন্দোলনকারী ও সংগঠক হিসেবে তিনি আমৃত্যু লড়াই করে গেছেন।

ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের পর মনে হয়েছিল, দেশের রাজনৈতিক সংকট আরও স্থায়ী হতে পারে। স্বাধীনতা ঘোষণার পর দেশের রাজনীতির প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হয়। পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক রোকেয়া হলের অনেক ছাত্রীই হল ত্যাগ করেন। আয়শা খানমও হল ছেড়ে জিগাতলায় এক সহপাঠীর বাসায় অবস্থান করেন। সে সময়ে তিনি ছিলেন রোকেয়া হল সংসদের সভানেত্রী।

২৭ মার্চ কারফিউ তুুল নিলে বান্ধবী মুনিরা আক্তারকে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে রোকেয়া হলে গিয়ে জানতে পেলেন, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী হলের দারোয়ান 'নমীদা'কে খুন করে। জানতে পারেন, হলের প্রভোস্ট হল সুপার, অবস্থানরত ছাত্রী ও অন্য কর্মচারীদের অত্যাচার আর নিগৃহীত হওয়ার কথা। ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ঢাকায় অবস্থান করে রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেন আয়শা খানম।

মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন আত্মানুভূতি থেকে। ৩০ এপ্রিল দলীয় রাজনৈতিক সহযোদ্ধাদের সঙ্গে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর হয়ে ভারতের আগরতলায় পৌঁছান। সেখানে ক্র্যাপটস হোস্টেলে অবস্থান করেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন প্রায় সাত মাস মা-বাবা ও পরিবারের সঙ্গে কোনো প্রকার যোগাযোগ ছিল না। ছাত্ররাজনীতি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের সদস্য থাকার কারণে মা-বাবা, পরিজন সব সময় তাকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতেন। পরিচিত জনদের মধ্যে রাজাকার এবং মুক্তিযোদ্ধা- দুই-ই ছিল। নেত্রকোনার অজপাড়াগাঁয়ের একটি মেয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য ক্যাম্পে চলে গেছে- সে বিষয়টি সে সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে অনেক বড় একটি বিষয় ছিল। একাত্তরের জুলাই মাসের শেষে মা হঠাৎই খবর পেয়েছিলেন; শুনতে পেয়েছিলেন সাদা শাড়ি লাল পাড়ের একটা মেয়ের লাশ পড়ে থাকতে দেখা গেছে। এ সংবাদে মা-বাবা খুব দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। সে সময়ে দিনরাত মা জায়নামাজে বসে চোখের পানি ফেলতেন। পরবর্তীতে গ্রামের পরিচিত এক দূরসম্পর্কের আত্মীয় আজিজুল ইসলাম খানের কাছে মা জানতে পারেন- আয়শা খানম আগরতলা আছেন, বেঁচে আছেন।

১৯৭২ সাল থেকে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সম্পাদক হিসেবে কাজ শুরু করেন আয়শা খানম। আমৃত্যুই বাংলাদেশ মহিলা পরিষদেই ছিলেন। ২ জানুয়ারিতে সভাপতি আয়শা খানম পাড়ি জমান অনন্তযাত্রায়। স্বামী প্রকৌশলী গোলাম মর্তুজা খানের মৃত্যু হয় অনেক আগেই। একমাত্র মেয়ে ঊর্মি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময়কাল তার জীবনের সবচেয়ে গৌরবময় স্মৃতি। সরাসরি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ না করলেও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন বলে তিনি নিজেকে ধন্য মনে করতেন। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সার্টিফিকেট সংগ্রহের প্রয়োজন মনে করেননি। যদিও মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নাম রয়েছে তার। 

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণ এবং বাঙালি জাতির বিজয়ের কথা যখন শুনছিলেন, তখন তার চোখ থেকে গড়িয়ে পড়েছিল আনন্দাশ্রু। আয়শা খানম মনে করতেন, দেশের সবচেয়ে গৌরবময় ইতিহাসের সঙ্গে তিনিও মিশে আছেন।

বিষয় : মুক্তিযোদ্ধা আয়শা খানম

মন্তব্য করুন