আমাদের পরিবেশ প্রতিবেশ ও জীবনাচারে জলাভূমির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জলাভূমির গুরুত্ব তুলে ধরতে রামসার কনভেনশনে স্বাক্ষরের দিনটিকে বিশ্ব জলাভূমি দিবস হিসেবে পালন করা হয়। ১৯৭১ সালে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হলেও ১৯৯৭ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী ২ ফেব্রুয়ারিকে বিশ্ব জলাভূমি দিবস হিসেবে পালন করা হচ্ছে। বাংলাদেশের মোট জলাভূমির বড় অংশ জুড়ে রয়েছে হাওর। সুন্দরবনের পর টাংগুয়ার হাওর দেশের দ্বিতীয় 'রামসার সাইট'। এটি রামসার কনভেনশনস কর্তৃক আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত জলাভূমি। বাকি হাওরগুলো ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকলেও টাংগুয়ার হাওর পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অধীনে। এটি প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকাও।

রামসার কনভেনশনে দস্তখতকারী দেশ হিসেবে এই হাওরের পরিবেশ ও প্রতিবেশ রক্ষা করতে সরকার অঙ্গীকারাবদ্ধ। এ লক্ষ্যে হাওরটিতে বেশ কিছু কার্যক্রমও পরিচালিত হয়েছে। তবে ২০১৬ সালে আইইউসিএনের প্রকল্প শেষ হওয়ার পর একপ্রকার দায়সারা ভাবে এই হাওরের ব্যবস্থাপনা চলছে। এতে হাওরটির পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন। অবশ্য ওই প্রকল্পও পরিবেশ সুরক্ষায় খুব একটা ভূমিকা রাখতে পারেনি। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা পরিবেশের ক্ষতিই করেছে বলে অনেকেরই ধারণা।


সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর ও ধর্মপাশা উপজেলার প্রায় ১০ হাজার বর্গ কিলোমিটার জায়গাজুড়ে অবস্থিত রামসার সাইট খ্যাত টাংগুয়ার হাওর। এটি জীববৈচিত্র্যের আধার। টাংগুয়ার হাওরের বৈশিষ্ট্য দেশের অন্য ক'টি হাওরের চেয়ে একটু ভিন্ন। এই হাওরের পানি খুবই স্বচ্ছ হওয়ায় সূর্যের আলো সহজেই নিচ পর্যন্ত পৌঁছে যায়, যা জলজ উদ্ভিদ বেড়ে উঠতে সাহায্য করে। তাই এখানে জলজ উদ্ভিদ বেশি। এই জলাবন মাছ ও পাখির খাদ্য হিসেবে ব্যবহূত হয়। তাই এই হাওরে মাছের উৎপাদন বেশি হয় এবং পরিযায়ী পাখি আকৃষ্ট হয়। টাংগুয়ার হাওরে ৫২টি বিল রয়েছে। অধ্যাপক আলী রেজা খানের বর্ণনানুযায়ী এই হাওরে প্রায় ২৫০ প্রজাতির পাখি, ১৪০ প্রজাতির মাছ, ১২ প্রজাতির ব্যাঙ, ১৫০ এর বেশি প্রজাতির সরীসৃপ এবং এক হাজারের বেশি অমেরুদণ্ডী প্রাণীর আবাস রয়েছে (প্রেক্ষিত জানুয়ারি : ২০১২)।

সুন্দরবনের পর এটি দেশের দ্বিতীয় রামসার সাইট। ১৯৯৯ সালে সরকার হাওরটিকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করে। ২০০০ সালের ২০ জানুয়ারি এটিকে রামসার সাইট ঘোষণা করা হয়। হাওর এলাকার মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন, সম্পদ সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০০১ সালে বাংলাদেশ ও সুইজারল্যান্ড সরকারের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। ২০০৩ সালের ৯ নভেম্বর হাওরটির নিয়ন্ত্রণ নেয় জেলা প্রশাসন। টাংগুয়ার হাওরের পরিবেশ ও প্রকৃতির মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। আগের তুলনায় মাছ ও পাখির সংখ্যা বহুলাংশে কমেছে। এর কারণ হিসেবে প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এই ফাঁকে প্রকল্পের ব্যর্থতার ধুয়া তুলে একটি পক্ষ আবারও হাওরটিকে লিজ প্রথায় ফিরিয়ে নিয়ে ফায়দা হাসিলের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে।

টাংগুয়ার হাওরের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য আজ হুমকির সম্মুখীন।পাখি পর্যবেক্ষকরা বলছেন, গত কয়েক বছরে টাংগুয়ার হাওরের পাখি কমেছে ৮০ শতাংশ। ২০১৫ সালে প্রায় দুই লাখ অতিথি পাখি এসেছিল। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের জরিপে দেখা যায়, মাত্র ৫০ হাজার অতিথি পাখি আসে। অথচ এর আগে ২০০২ সালে এ হাওরে পাঁচ লাখের বেশি শুধু জলচর পরিযায়ী পাখি গুনেছেন বলে জানান ক্লাবটির প্রতিষ্ঠাতা ও পাখি বিশেষজ্ঞ ইনাম আল হক। হাওরটির সম্পদ রক্ষায় জেলা প্রশাসন ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে আনসাররা হাওর পাহারা দিয়ে থাকেন। স্থানীয়রা বলছেন, হাওর রক্ষার দায়িত্ব যাদের তারাই ভক্ষকের ভূমিকা পালন করছে। তারা বলেন, নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসাররা নিজেদের পকেট ভারী করতে যেমন মাছ ধরা ও গাছ কাটার সুযোগ দিচ্ছেন। অতিথি পাখি শিকারের সঙ্গেও জড়িত তারা। এ ছাড়া এক সময় গোলাবাড়ি এলাকায় ম্যাজিস্ট্রেট থাকলেও এখন তিনি থাকেন টেকেরঘাট এলাকায়। ফলে ১৫ কিলোমিটার দূর হওয়ায় টাংগুয়ায় হাওরে আসা তার জন্য সময়সাপেক্ষ।

এই মুহূর্তে টাংগুয়ার হাওরের ব্যবস্থাপনা কী হবে তা নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতা রয়েছে। দ্রুত এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বলা যায় এটি টাংগুয়ার হাওরের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থা টাংগুয়ার হাওর পারে এবং সুনামগঞ্জ শহরে দুটি মতবিনিময় সভা করে। এক ভিডিও বার্তায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টাংগুয়ার হাওরের কথা বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন।

টাংগুয়ার হাওরের মায়াবী সৌন্দর্য প্রকৃতিপ্রেমী মানুষকে দারুণভাবে আকৃষ্ট করছে। তাই সাম্প্রতিক সময়ে টাংগুয়ার হাওরে বেড়েছে পর্যটকের ভিড়। তবে পরিবেশবান্ধব সুষ্ঠু পরিকল্পনা না থাকায় পর্যটন টাংগুয়ার হাওরের পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ইঞ্জিনচালিত নৌকায় হাওরটির যত্রতত্র উচ্চ স্বরে মাইক বাজিয়ে ঘোরাফেরা ও হাওরের পানিতে অপচনশীল বর্জ্য ফেলার কারণে পর্যটন এখানে গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তাই একটি নির্দিষ্ট জায়গার পরে ইঞ্জিন নৌকা নিষিদ্ধ করে হাতে চালিত নৌকায় পর্যটকদের ঘোরার ব্যবস্থা করলে পরিবেশ রক্ষা হবে। একই সঙ্গে হাতে চালিত নৌকায় অনেক মানুষের বাড়তি আয়েরও ব্যবস্থা হবে। নতুন করে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হলে হাওরের সম্পদের ওপর চাপও কমবে। পর্যটনের সঙ্গে জড়িত সব নৌকার মাঝি এবং গাইডদের পরিবেশবান্ধব পর্যটনের ওপর পর্যটন করপোরেশন কর্তৃক প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন। হাওরে পর্যটনের একটা নির্দিষ্ট রুট করে দিতে হবে। এর বাইরে পর্যটকদের বিচরণ নিষিদ্ধ করতে হবে। শব্দ দূষণ বন্ধে টাংগুয়ার হাওরে পর্যটকদের মাইক ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে হবে।

টাংগুয়ার হাওরের পরিবেশ সুরক্ষা করতে হলে হাওর তীরবর্তী পরিবারগুলোকে বিকল্প আয়ের সুযোগ করে দিতে হবে। বিকল্প আয়ের সুযোগ না থাকলে তারা জীবন ও জীবিকার তাগিদে হাওরের সম্পদের ওপর হামলে পড়বেই। এজন্য সরকারিভাবে বা বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে আয় বর্ধনমূলক কর্মসূচি চালিয়ে যেতে হবে। হাওরের বাফার জোনগুলো হাওর পারের মানুষের সমন্বয়ে গঠিত কমিটিগুলোকে প্রতি বছর স্বল্প সময়ের জন্য ব্যবহার করতে দেওয়া হয়। এই বাফার জোন আগে ভাগেই সমিতির লোকদের বুঝিয়ে দেওয়া হলে এ থেকে তাদের আয় বাড়বে। একই সঙ্গে হাওরে গাছ ও নলখাগড়া কাটা বন্ধ করতে হলে হাওরের পরিবারগুলোকে বিকল্প জ্বালানির ব্যবস্থা করে দিতে হবে। প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা সরকারিভাবে ইজারা দেওয়া আইনত নিষিদ্ধ থাকলেও টাঙ্গুয়ায় হাওরে হানিয়া, কলমা বিল দুটি ইজারা প্রদান করা হয়েছে। অতিসত্বর বিল দুটির ইজারা বাতিল করা প্রয়োজন। টাংগুয়ার হাওরে বেশ কিছু হাঁসের খামার রয়েছে। এসব হাঁস খাদ্য হিসেবে মাছের ডিম ও অন্যান্য জলজ প্রাণী খেয়ে থাকে। তাই হাওরের সর্বত্র হাঁসের খামার নিষিদ্ধ করার দাবি তুলেছেন স্থানীয় আদিবাসীরা।

টাংগুয়ার হাওরের ভেতর দিয়ে কয়লা ও চুনাপাথরবাহী নৌকা চলাচল করে। এসব নৌকা থেকে ক্ষতিকর রাসায়নিক ও নৌকার ইঞ্জিনে ব্যবহূত তেলে হাওরের পানি দূষিত হয়। তাই হাওরটির মাঝ দিয়ে নৌকা না চালিয়ে বিকল্প নৌরুটের সন্ধান করা জরুরি।

টাংগুয়ায় হাওরের পরিবেশ রক্ষায় স্থানীয় জনসাধারণের অংশগ্রহণ সবচেয়ে জরুরি। তাই টাংগুয়ার হাওরের পরিবেশ রক্ষায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সচেতন করে তুলতে হবে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ ক্ষমতা কাঠামোর সঙ্গে জড়িত সকলকে পরিবেশ রক্ষায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে। পরিবেশ বিপর্যয় রোধে আইনের প্রয়োগ সহজতর করতে হাওরে আধুনিক প্রযুক্তির সহযোগিতা গ্রহণ করা যেতে পারে।

বর্তমানে হাওরটি ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসনের নানা ব্যস্ততার তাদের কাছে হাওরটি যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না। একজন ম্যাজিস্ট্রেট ও কয়েকজন আনসার দিয়ে এখন যেভাবে ব্যবস্থাপনা চলছে তা পর্যাপ্ত নয়। প্রয়োজন নিবিড় পরিচর্যা ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি একটি আলাদা কর্তৃপক্ষ গঠন করে নজরদারি বাড়ানো সম্ভব।

টাংগুয়ায় হাওর সারাদেশের সম্পদ। এই সম্পদ সুরক্ষার দায়িত্ব আমাদের সকলের। সরকারসহ সকল অংশীজনের সমন্বিত প্রয়াসের মাধ্যমে এই হাওরকে রক্ষা করা সম্ভব। টাঙ্গুয়ায় হাওর ফিরে পাক তার সুদিন।