করোনা মহামারিকালে আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর কংগ্রেস ভবনে হামলা করে নিন্দনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ট্রাম্প সমর্থকরা। অধিবেশন চলাকালীন কংগ্রেস ভবনে প্রবেশ করে হামলা চালায় তারা। আইনপ্রণেতারা জীবন বাঁচাতে ভয়ে নিরাপত্তার জন্য নিরাপদে লুকিয়ে ছিলেন। এই ভবনটি আমেরিকান সার্বভৌমত্বের শক্তি এবং শালিনতার একটি স্বীকৃত প্রতীক। এ হামলা প্রমাণ করে দেয় যে, স্পর্শকাতর এ জায়গায়টি আমেরিকায় কতটা অরক্ষিত। পুলিশসহ ছয়টি প্রাণ ঝরে পড়ল। বিশ্ববাসী দেখল কীভাবে হামলাকারীরা অতিসহজে নিরাপত্তা বাহিনীকে পরাভূত করে ভবন দখলে নেয়। ঊর্ধ্বকক্ষ, নিম্নকক্ষ, স্পিকার অফিসসহ সব কক্ষে প্রবেশ করে তছনছ করে দেয় এবং দীর্ঘ পাঁচ ঘণ্টা ব্যাঘাত ও অবরুদ্ধ থাকে। ১৮১৪ সালে ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনী ওয়াশিংটন ডিসির প্রতিরক্ষা ভেদ করে মশাল ও গান পাউডার দিয়ে ওই ভবন, প্রেসিডেন্টের বাসস্থান এবং অন্যান্য সরকারি দপ্তর পুড়িয়ে দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের একজন বিদায়ী প্রেসিডেন্ট তার সমর্থকদের উস্কে দিয়ে ওই হামলার ঘটনা ঘটিয়েছেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের ২০০ বছরের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে নজিরবিহীন।

ডোনাল্ড ট্রাম্প যিনি এর আগে তার সমর্থকদের রাজধানীতে যাত্রা করার আহ্বান জানিয়েছিলেন এবং ভোট জালিয়াতির কারণে নির্বাচনে হারার দাবি পুনরাবৃত্তি করছেন। নির্বাচনে পরাজিত হয়েও কারচুপি করে তাকে হারানোর অভিযোগ তুলে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য সবকিছুই করেছেন ট্রাম্প। আদালতে ৬০টি মামলা করে সব ক'টিতেই হেরে যান।

এসবের মূল কারণ ছিল, জো বাইডেনকে মার্কিন রাষ্ট্রপতির ঘোষণায় বাধা দেওয়া এবং আইনপ্রণেতারা যেন ট্রাম্পকেই জয়যুক্ত করেন। সশস্ত্র হামলার মুখেও নিজেদের সিদ্ধান্তে অটল থেকে আইনপ্রণেতারা জো বাইডেনের বিজয় অনুমোদন করেছেন। এটিই ছিল ডোনাল্ড ট্রাম্পের সর্বশেষ ট্রাম্প কার্ড। ট্রাম্পের ধারণা ছিল, ভাইস প্রেসিডেন্ট যেহেতু উচ্চকক্ষের সভাপতি এবং তিনিই প্রতিনিধি পরিষদের ফলাফল ঘোষণা করবেন তার ইচ্ছানুযায়ী। কিন্তু ভাইস প্রেসিডেন্ট বিবেক আর সংবিধানের কাছে হার মেনে শেষ পর্যন্ত বাঁচিয়ে দিলেন যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র ও নির্বাচন ব্যবস্থা। আর পরাজিত হয়েছে স্বেচ্ছাচারিতা, উগ্র বর্ণবাদী ও অগণতান্ত্রিক মানসিকতার।

শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র এখনও মারাত্মক বিপদে হয়তো পড়েনি, বিশেষত তাদের বিচার বিভাগের কারণে। যদি এ হামলা অন্য কোনো দেশে ঘটত, তা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ত এবং সরকারের হয়তো পতন হতো। আপাতত আমেরিকা হয়তো নিরাপদে, তবে তা কত দিন? অনেকে মনে করেন, আমেরিকার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে ফাটল না ধরলেও দাগ পড়েছে। সবকিছু মিলে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আমেরিকানরা অশান্তিতে এবং জাতিগত বৈষম্য ও বিভাজনের কারণে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমেরিকান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ক্ষতিকর প্রভাবের জন্য সোশ্যাল মিডিয়াকে দায়ী করা হয়। কারণ এসব মিডিয়ার কারণে আগের চেয়ে অনেক বেশি দৃশ্যমান। যুক্তরাষ্ট্রে এখন জাতিগত বর্ণ-বৈষম্য চরম প্রকট। মহামারিকালে অব্যবস্থাপনা ও বিশ্ব নেতৃত্বে ব্যর্থতার কারণে আমেরিকার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা দুর্বল হয়েছে।

গণতন্ত্র মানে শুধু নির্বাচনকে বুঝায় না বরং অনেক বিষয়ের সমষ্টি যা সুষ্ঠু গণতন্ত্রের জন্য কাজ এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রভাবিত করে। বিশ্বাস ক্ষয় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে। স্বৈরাচারী মনোভাব তৈরি হয়। আমেরিকান গণতন্ত্র হয়তোবা বিপর্যস্ত হচ্ছে না, তবে এর কার্যকারিতা দুর্বল হচ্ছে। বিশ্ব নেতাদের ভাবিয়ে তুলছে। আইনের শাসনে চলমান আক্রমণ, সত্যভিত্তিক সাংবাদিকতা এবং গণতন্ত্রের অন্যান্য নীতি ও নিয়ম আরও ম্লানের সম্ভাবনা থাকে। ৬ জানুয়ারি ঘটনাগুলো অবশ্যই আমেরিকার গণতন্ত্রের জন্য একটি টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে চিহ্নিত হবে।

ইতিহাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে সফল সাংবিধানিক প্রজাতন্ত্র হিসেবে পরিচিত। এই দেশের রাষ্ট্রপতি পৃথিবীর অনেক দেশের জন্য একটি গণতন্ত্রের প্রতীক। ৬ জানুয়ারি কোনো গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ ছিল না, এটি ছিল জনগণের ভোটের প্রতিফলনের বিরুদ্ধে তৎকালীন শাসকদলের 'অভ্যুত্থান'। হামলাকারীদের মধ্যে সাবেক-বর্তমান সামরিক কর্মকর্তা, পুলিশসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বড় কর্তাব্যক্তিরাও ছিলেন। এতে বুঝা যায়, এটি ছিল একটি পরিকল্পিত হামলা। ক্যাপিটল হিল ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হওয়ায় সহিংসতা ও রক্তপাতের মধ্য দিয়ে শেষ হলো ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতার মেয়াদ। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে, অস্ত্র ও পেশিশক্তি দিয়ে গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা রোধ করা যায় না।

আমেরিকান সংবিধানের ভাষায়, ন্যায়বিচার সবার জন্য এবং কেউই এর ঊর্ধ্বে নন। আর এ কারণেই আমেরিকার ইতিহাসে তৃতীয় প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রতিনিধি পরিষদে দ্বিতীয়বার অভিশংসিত হলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ পর্যন্ত ২৭৬ জন হামলাকারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। যেসব আইনপ্রণেতা ওই বিদ্রোহকে প্ররোচিত করেছিলেন, তাদেরও খোঁজা হচ্ছে। প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামোর কারণেই ক্ষমতায় থেকেও সবচেয়ে ক্ষমতাবান ব্যক্তি ডোনাল্ড ট্রাম্প ছিলেন ক্ষমতাবান। নীতি-নৈতিকতা অধঃপতন হয়নি এখনও। ৬ জানুয়ারির ঘটনার ছায়া আমেরিকাজুড়ে দীর্ঘ সময় ধরে থাকবে। আমেরিকার ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করতে বেশ কিছু সময় লেগে যাবে। কিন্তু যেভাবে জাতিগত এবং বর্ণ-বৈষম্য চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে তা কি ঠেকানো যাবে? গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কি নতুন করে সংজ্ঞায়িত হবে?