নাগরিক জীবনে বৈশ্বিক মহামারি করোনার পরে নিত্যপণ্যের পাশাপাশি এখন সর্বাধিক আলোচিত সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত ভর্তিবাণিজ্য এবং নামে-বেনামে বিভিন্ন ফি আদায়ের যন্ত্রণা। ২০১৬ সালে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চট্টগ্রামে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তিতে সরকারি নীতিমালা উপেক্ষা করে ভর্তিবাণিজ্যে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসন ও জেলা শিক্ষা অফিসকে নিয়ে অভিযান পরিচালনা করে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, অতিরিক্ত অর্থ ফেরতদানে সফল হলেও বছর যেতে না যেতেই পরের বছর আবার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নতুন বছরে ভর্তিতে ঘুরেফিরে আবারও সেই ভর্তিবাণিজ্য শুরু হয়েছে। অতিরিক্ত ফি আদায়ের মহড়া, কেজি ও নার্সারি শ্রেণিতে ভর্তিতে লটারির নামে গোপনে লটারি দেখিয়ে পছন্দসই শিক্ষার্থী ভর্তি করানো, এসএসসি ও এইসএসসিতে শ্রেণিশিক্ষকের কাছে প্রাইভেট না পড়লে টেস্ট (নির্বাচনী) পরীক্ষায় অকৃতকার্য করাসহ নানাভাবে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের মহোৎসব আবার শুরু হয়েছে।

বৈশ্বিক করোনা মহামারির এ সময়েও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) নির্দেশনা অমান্য করে বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বছরের শুরুতেই ছাত্রছাত্রীদের নতুন করে ভর্তি ও পুনঃভর্তি করছে। সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গত বছরের জানুয়ারির সমান ফি নিচ্ছে। এমনকি কেউ কেউ ফি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নিচ্ছে। করোনার কারণে গত মার্চের মাঝামাঝি থেকে বন্ধ হওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনও খোলেনি। গত শিক্ষাবর্ষের অধিকাংশ সময় শিক্ষার্থীরা অনলাইন কিংবা দূরবর্তী শিখন কার্যক্রমে অংশ নিয়েছে। তার চেয়ে বড় কথা, করোনার প্রভাবে অনেক মানুষ কর্মহীন হয়েছে; অনেক পরিবারের আয় কমে গেছে; নতুন করে অন্তত ২০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। এ রকম সংকটকালেও বেতন-ফি আদায়ে অভিভাবকদের ওপর চাপ প্রয়োগ করার বিষয়টি অমানবিক। প্রশাসনিক বিধিনিষেধ থাকার পরও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বছরের শুরুতে যেভাবে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছে, তা করোনা দুর্যোগের এ সময়ে যেন 'মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা' হিসেবে নতুন উপসর্গ দেখা দিয়েছে।

মাউশি অ্যাসাইনমেন্ট, টিফিন, পুনঃভর্তি, গ্রন্থাগার, বিজ্ঞানাগার, ম্যাগাজিন ও উন্নয়ন খাতে কোনো ফি না নেওয়ার নির্দেশনা প্রদান করেছে। আশা করা হয়েছিল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ সাতটি খাতে করোনাকালে অর্থ আদায় না করার কথা বলেছে; সেহেতু কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাদের এ নির্দেশনা মানছে কিনা তা তদারকি করা এবং না মানলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্বও মাউশির। অস্বীকার করা যাবে না, করোনার প্রভাব শিক্ষা খাত বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর তুলনামূলক বেশি পড়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানকেই শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন দিতে হিমশিম খেতে হয়েছে। করোনা দুর্যোগসৃষ্ট সংকটটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোরও অনুধাবনের কথা। তার চেয়ে বড় কথা- এটি এমন এক ভাইরাস, তা যেমন কোনো দেশের সীমানা মানেনি; তেমনি ধনী-দরিদ্র কাউকে বিচার করেনি। বৈশ্বিক এ সংকট আমরা সবাই মিলে মোকাবিলা করছি বলেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোরও সেভাবে দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রত্যাশিত। আমরা দেখছি, প্রায় সব খাতই করোনার প্রভাব কাটিয়ে উঠছে। বিশেষ করে অর্থনৈতিক সব কর্মকাণ্ড এখন সচল। অথচ সরকার এখনও পরিস্থিতির আলোকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না; যদিও শিক্ষার একেবারে জরুরি সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রম বন্ধ নেই। যেমন অটোপাস-অ্যাসাইনমেন্টের সিদ্ধান্ত, ভর্তি প্রক্রিয়ায় লটারি, কলেজে ভর্তি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি কার্যক্রম ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা।

তবে গত শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থীদের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, এখন তা কীভাবে কাটিয়ে ওঠা যায়, সে চিন্তা করা দরকার। এর বিপরীতে একেবারে স্বাভাবিক অবস্থার মতো ভর্তির অর্থ নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের যেভাবে চাপে ফেলা হচ্ছে তা কাম্য হতে পারে না। আমাদের প্রত্যাশা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো মাউশি নির্দেশিত সাতটি খাত তথা অ্যাসাইনমেন্ট, টিফিন, পুনঃভর্তি, গ্রন্থাগার, বিজ্ঞানাগার, ম্যাগাজিন ও উন্নয়ন বাবদ কোনো ফি তো নেবেই না; এর বাইরেও যেসব ফি নেওয়া হবে তা আগের চেয়ে কমিয়ে ধরা হলে অভিভাবকরা যেমন স্বস্তিতে থাকবেন, তেমনি শিক্ষার্থীর শিক্ষাও নিশ্চিত হবে। গত বছর যেহেতু সরাসরি ক্লাস হয়নি, তাই যেসব ফি অত্যাবশ্যকীয় নয় বা যা কোনো কাজে আসেনি, সেগুলো টিউশন ফির সঙ্গে সমন্বয় করতে বলেছিল মাউশি অধিদপ্তর। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তা করেছে বলে শোনা যায়নি। উল্টো বছর শেষে গত বছরের বেতন বকেয়া থাকলে তা পরিশোধ করতে হয়েছে অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। আমরা জানি, শিক্ষা বাণিজ্য নয়, বরং সেবা হিসেবেই দেখা হয়। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সেবার মানসিকতা নিয়েই ফি নির্ধারণ করা উচিত। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে শুধু শিক্ষার্থী ফির ওপর নির্ভরশীল না থেকে নিজস্ব আয়ের খাতও বের করা দরকার।

গত শিক্ষাবর্ষে ক্যাবসহ অনেক অভিভাবক সংগঠন অর্ধেক বছরের টিউশন ফি মওকুফের দাবি উত্থাপন করেছিল। কিন্তু সরকার বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তা আমলে নেয়নি। আবার চলতি শিক্ষাবর্ষে নানা ধরনের ফির সঙ্গে অগ্রিম বেতনও নেওয়া হচ্ছে। অভিভাবকরাও স্কুল যা চাচ্ছে, তা দিতে বাধ্য হচ্ছেন। সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা তাদের বেতন-ভাতা যেমন নিয়মিত পাচ্ছেন, তেমনি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা তাদের বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। তাহলে এ ধরনের চাপ দেওয়ার কারণ কী? অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামে এ ধরনের অভিযোগ আছে- তারা শুধু তাদের নামের ওপর ভর করে শিক্ষার নামে এক ধরনের ব্যবসা করে থাকে।

যেহেতু সরকারের একটি সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে; সরকারের প্রতিষ্ঠানও রয়েছে বিষয়টি দেখভাল করার জন্য, সেহেতু বিষয়টি তাদের দেখা দরকার। যেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অবশ্যই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিলে আরও অনেক প্রতিষ্ঠান এ ধরনের অপরাধে যুক্ত হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো মাউশির নির্দেশনা মেনে চলুক- এটাই প্রত্যাশা। যেসব প্রতিষ্ঠান নির্দেশনা মানবে না, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাই সরকার, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন ও শিক্ষা প্রশাসন করোনাকালীন সাধারণ মানুষের কঠিন বাস্তবতায় অভিভাবকদের ভর্তি-টিউশন ফির চাপমুক্ত করতে এ সংক্রান্ত নীতিমালা ও নির্দেশাবলির যথাযথ বাস্তবায়নে মাঠ পর্যায়ে খোঁজখবর নেওয়া ও তদারকি জোরদার করা জরুরি।