করোনা ভ্যাকসিন বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব সাফল্য। সাধারণত ভ্যাকসিন তৈরি হতে ১০ থেকে ১২ বছর পর্যন্ত সময় লাগে। ভ্যাকসিন তৈরির বিভিন্ন ধাপ বা ফেজ আছে। গবেষকরা প্রথমে স্টাডি করেন কীভাবে ভ্যাকসিনটি কাজ করবে। এরপর তা অ্যানিমেলে প্রয়োগ করা হয়। অ্যানিমেলে প্রয়োগ করার পর মানবদেহে প্রয়োগের আবেদন করা হয়। এরপর ফেজ ওয়ান, ফেজ টু এবং ফেজ থ্রি ট্রায়াল পার করে লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে হয়। রিভিউসহ এসব প্রসেস করতে প্রায় ১২ থেকে ১৪ চৌদ্দ বছর সময় লাগে। আবার কোনো কোনো ভ্যাকসিন, যেমন ডেঙ্গু ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে প্রায় ৫০ বছর ধরে কাজ করেও শেষ পর্যন্ত সফলতা আসেনি।

একটি উদাহরণ দিয়ে এ বিষয়টি আরও স্পষ্ট করা যেতে পারে। ফিলিপাইনে এ ভ্যাকসিনটি ছোট ছোট বাচ্চাদের শরীরে প্রয়োগ করা হয়। তখন এক দিনে অনেকগুলো বাচ্চা মারা যায়। এরপর ভ্যাকসিনটির প্রয়োগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ৫০ বছরের গবেষণার ফলাফলের এভাবেই শেষ হয়। সেদিক থেকে চিন্তা করলে ১০ মাসের মধ্যে ভ্যাকসিনটি মানুষের হাতে পৌঁছে দেওয়া বিরাট সাফল্য।

করোনাভাইরাসের ফলে বিশ্বব্যাপী অনেক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। বিশ্ব অর্থনীতির অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। মানুষের যাপিত জীবনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। করোনার বিস্তার কমানো বা নিয়ন্ত্রণে অনেক দেশ নাকাল। বিশ্বব্যাপী এখন এই ভ্যাকসিন পাওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। সব দেশই ভ্যাকসিন চাচ্ছে। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে এক দেশ অপর দেশের সঙ্গে ভ্যাকসিন পাওয়ার চুক্তি করছে। মডার্না আর ফাইজারের ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা নিয়ে একটা দুশ্চিন্তা ছিল। কিন্তু ফেজ ওয়ান, ফেজ টু ও ফেজ থ্রি ট্রায়ালের যে ডাটা আমাদের সামনে আছে, তাতে আশার আলো দেখা যাচ্ছে। তবে ফেজ ওয়ান, ফেজ টু ট্রায়ালের পাঁচ থেকে ছয় মাসের যে ডাটা আছে, তাতে পাঁচ বছরে কী হবে, সেটা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

পৃথিবীর সব মানুষের জন্য ভ্যাকসিন প্রয়োজন। কিন্তু একসঙ্গে সব মানুষের জন্য ভ্যাকসিন পাওয়া সহজ নয়। এটি সবার জন্য সহজলভ্য করা সময়সাপেক্ষ এবং কিছুটা জটিলও বটে। অনেকেই জানেন, কানাডা ভ্যাকসিনের জন্য এরই মধ্যে সাতটি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করেছে। এই কোম্পানিগুলোর উৎপাদন এবং আনুষঙ্গিক বিষয় ঠিকঠাক থাকলে তারা স্বাভাবিকভাবেই আগে পাবে। অপফোর্ড এবং অ্যাস্ট্রাজেনেকা করোনা ভ্যাকসিন তৈরি করছে। এশিয়ার দেশগুলো এই ভ্যাকসিন পাওয়ার জন্য ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। অনেকের আশঙ্কা ছিল, বাংলাদেশ সরকারের দেশের সবার জন্য ভ্যাকসিন কেনার সামর্থ্য নেই।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার ভ্যাকসিন কূটনীতির ক্ষেত্রে অসামান্য সাফল্য অর্জন করেছে। সরকার অতি দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিপুল ভ্যাকসিন ক্রয়ের একটি চুক্তি স্বাক্ষর করতে সক্ষম হয় সেরাম ইনস্টিটিউটটের সঙ্গে। সেরাম ইনস্টিটিউট বিশ্বের প্রথম সারির ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণ্য। এটি ভারতের পুনেতে অবস্থিত। এই প্রতিষ্ঠান প্রতি বছর প্রায় দেড় বিলিয়ন ভ্যাকসিন উৎপাদন করে। বিভিন্ন ধরনের ভ্যাকসিন এবং তাদের সরবরাহ ও নিরাপত্তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। চুক্তির সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিধান ছিল, সেরাম ইনস্টিটিউট ছয়টি চালানের মাধ্যমে ভ্যাকসিন সরবরাহ করবে। প্রশ্নটা অন্য জায়গায়।

কানাডাতে এ বিষয়ে সরকার সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে। কারণ এটা একটা জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়। বাংলাদেশকেও এ ব্যাপারে ভাবতে হবে। এখানে অন্য কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। এক্ষেত্রে সরকারকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে, ভ্যাকসিন সংগ্রহ ও সরবরাহের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি যেন না হয়। এখন করোনার টিকা প্রক্রিয়া সফলভাবে শেষ করার সময় এসেছে। একটি ইতিবাচক দিক হলো, আমাদের স্বাস্থ্যকর্মীদের বিভিন্ন ধরনের ভ্যাকসিন প্রদানের পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে। সুতরাং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকা অনুসরণ করে জনগণকে ভ্যাকসিন সরবরাহ করা কঠিন কাজ হবে না। সরকারকে অবশ্যই এটি নিশ্চিত করতে হবে, ভ্যাকসিন প্রক্রিয়ায় যেন কোনো ধরনের অনিয়ম না হয়। যদি অনিয়মের ঘটনা ঘটে তবে সরকারের সাফল্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। আমাদের অবশ্যই স্বীকার করতে হবে, ভ্যাকসিন কূটনীতি এবং কভিড-১৯ মহামারির স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় সরকার দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। আমরা আশা করি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভ্যাকসিন আনার কূটনীতির সফলতার মতো দেশে ভ্যাকসিন প্রয়োগেও সফল হবেন।

স্বাস্থ্য খাত নিয়ে ভাবনার ক্ষেত্রে উন্নত এবং উন্নয়নশীল বা অনুন্নত দেশগুলোর মধ্যে পার্থক্য আছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় উন্নত দেশগুলো সবদিক যাচাই-বাছাই করে। অপরাপর দেশগুলো সে তুলনায় কিছুটা উদার বা শিথিল। কানাডায় স্বাস্থ্য খাত পুরোপুরি সরকারের দায়িত্বে। এফডিএর অনুমোদনের পরপরই ভ্যাকসিন কানাডা গ্রহণ করবে বিষয়টি এমন নয়। এফডিএর রিভিউ হওয়ার পরও কানাডা তাদের নিজস্ব রিভিউয়ার দিয়ে এগুলোকে রিভিউ করাবে।

কানাডার স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, তারা ইতোমধ্যে রিভিউ করছেন। যে ডাটাগুলো পাওয়া গেছে, এফডিএর রিভিউয়ের পাশাপাশি কানাডা নিজেও তা রিভিউ তত্ত্বাবধান করছে এবং এটা মনে করার কিছু নেই, কানাডা সরাসরি অনুমোদন দেবে। তারা নিজেরা রিভিউ করবে তারপর সিদ্ধান্ত আসবে। ফেজ ওয়ানের যে ডাটাগুলো এসেছে, সেখানে ভ্যাকসিনের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া খুবই কম। সেক্ষেত্রে ভ্যাকসিন না নেওয়ার কোনো যুক্তি নেই এবং তাতে ভয় পাওয়ারও কোনো কারণ নেই। ভ্যাকসিন নিলে আমার কী হবে আর না নিলে কী ক্ষতি হবে, কোনটার পাল্লা ভারী, ভ্যাকসিন না নিলে যদি আমি মারা যাই ইত্যাদি ভাবনাগুলো আমাদের ভেতর কাজ করছে। আবার ভ্যাকসিন নিলে সামান্য মাথাব্যথা ও জ্বর হতে পারে- তা সত্ত্বেও বিশেষজ্ঞরা ভ্যাকসিন নেওয়াই ভালো মনে করছেন। ভ্যাকসিনের পর্যন্ত যে ডাটা আছে, তার সবগুলোই ট্রান্সপারেন্ট এবং ইন্ডিপেনডেন্ট রিভিউ বোর্ড রিভিউ করেছে এবং বিজ্ঞানীরাও রিভিউ করেছেন। কোনো দিক থেকেই দেখা যাচ্ছে না, ভ্যাকসিন বাধার মধ্যে পড়বে। যারা সুস্থ তাদেরও ভ্যাকসিন নেওয়া উচিত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশে করোনা ভ্যাকসিন গ্রহণ নিয়ে অনেকের মধ্যে একটা আতঙ্কভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এ আতঙ্কের মূল কারণ হলো মানবদেহে ভ্যাকসিনের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া সম্পর্কিত পর্যাপ্ত গবেষণার অভাব। বলার অপেক্ষা রাখে না, এই ভ্যাকসিন নিয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা হয়নি। ভ্যাকসিনগুলো অতি স্বল্পতম সময়ের মধ্যে বাজারে এসেছে। সুতরাং টিকা গ্রহণের বিষয়ে অনেকের মধ্যে দ্বিধা থাকা অস্বাভাবিক নয়। এ আতঙ্ক কাটিয়ে ওঠার লক্ষ্যে সরকারের উচিত ভ্যাকসিনের সম্ভাব্য পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে ব্যাপক সচেতনতামূলক বার্তা প্রচার করা। ভ্যাকসিন কোন বয়সীদের গ্রহণ করা উচিত আর কোন বয়সীদের প্রয়োজন নেই- এ বিষয়গুলো জনগণকে সঠিকভাবে জানানো উচিত।

ভ্যাকসিনই কি শেষ কথা বা ভ্যাকসিন নিলেই কি সব বিপদ মুক্ত? এ প্রশ্ন অনেকের মনেই ঘুরপাক খাচ্ছে। আমরা যদি ভ্যাকসিনেশনটা সফলতার সঙ্গে করে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি করতে পারি, তাহলে এই মহামারি ঠেকিয়ে দিতে পারব। হার্ড ইমিউনিটির নিরাপদতম প্রধান এবং একমাত্র শর্ত হচ্ছে ভ্যাকসিন। দুটি করে ডোজ দেওয়া হলে বাংলাদেশে ২৮ কোটি ডোজ প্রয়োজন। এমনকি যারা ভ্যাকসিন নেবেন, তাদেরও কার্যকরী এন্টিবডি না হওয়া পর্যন্ত শেষ কথা বলা যায় না। তাই যথাযথভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতেই হবে। এ ভাইরাসটি আমাদের কাছে নতুন। তবে এ তথ্য জানা গেছে, এদের মিউটেশন হার ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের চেয়ে তুলামূলক অনেক কম। এক বছরে মাত্র ৩০-৩২টি মিউটেশন হয়। তাই হয়তো ইনফ্লুয়েঞ্জা ভ্যাকসিনের মতো এই ভ্যাকসিন প্রতিবছর নেওয়ার দরকার হবে না।