সপ্তাহ দুই ধরে দুটি সংবাদ দেশজুড়ে খুব বেশি আলোচিত হচ্ছে। একটি- থানায় বোমা মেরে নাশকতা মামলা সাজাতে পুলিশকে এক সংসদ সদস্যের নির্দেশনা; অপরটি- পৌরসভা নির্বাচনে অংশ নেওয়া এক মেয়র প্রার্থীকে তার এলাকা থেকে ঢাকায় তুলে এনে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর 'অনুরোধ'। কাকতালীয়ভাবে সার্বিক দিক থেকে দুটি ঘটনার মধ্যে বেশ মিল লক্ষ্য করা যায়।

যশোর-৬ আসনের সংসদ সদস্য শাহীন চাকলাদার কর্তৃক কেশবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জসিম উদ্দিনকে প্রদত্ত কিছু নির্দেশনা। ঘটনাচক্রে সংসদ সদস্য ও ওসির টেলিফোনে সেই কথোপকথনের অডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়। সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত সেই কথোপকথনের একটি অংশে ওসিকে উদ্দেশ করে সংসদ সদস্য শাহীন চাকলাদারকে বলতে শোনা যায়, 'আপনি এখন রাত্তিরে থানায় বোমা মারেন একটা। মারায়ে ওর নামে মামলা করতে হইবে। পারবেন? যদি পারেন ওই এলাকা ঠান্ডা রাখতি, আমি বন ও পরিবেশবিষয়ক স্থায়ী কমিটির সদস্য। ওখানে কারও বাপের ক্ষমতা নেই।'

অন্যদিকে, ৬ ফেব্রুয়ারি হঠাৎ নিখোঁজ হন মাদারীপুরের কালকিনি পৌরসভার স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী মসিউর রহমান। নিখোঁজের ১১ ঘণ্টা পর নিজ এলাকায় ফিরে এসে মসিউর রহমান সংবাদমাধ্যমের কাছে জানিয়েছেন, 'আমাকে বিকেলে হঠাৎ এসপি ফোন করে দেখা করতে বলেন। তিনি থানার ওসিকে আমার কাছে পাঠান। তখন আমি ওসির কাছে জিজ্ঞেস করলে তিনি জানান, আইনশৃঙ্খলার বিষয় নিয়ে এসপি আমার সঙ্গে কথা বলবেন। পরে আমি সরল মনে তার গাড়িতে উঠে এসপির অফিসে যাই। সেখানে যাওয়ার পর এসপি আমাকে তার গাড়িতে উঠিয়ে ঢাকায় নিয়ে যান।' উপরোক্ত দুটি ঘটনার সঙ্গেই ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতা ও পুলিশের যোগসূত্র রয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। আবার দুই ঘটনার দুই ভুক্তভোগীই তুলনামূলক কম ক্ষমতাবান; তবে সমাজ সচেতন। উভয় ঘটনাতেই রাজনীতিকরা পুলিশকে ব্যক্তি ও রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করার প্রয়াস দেখিয়েছেন।

সংসদ সদস্য শাহীন চাকলাদার পুলিশকে থানায় বোমা হামলা করে নাশকতার দায় চাপাতে চেয়েছিলেন ওই উপজেলার শেখ সাইফুল্লাহ নামের একজন পরিবেশকর্মীর ওপর। কারণ ওই পরিবেশকর্মী অবৈধভাবে গড়ে ওঠা একটি ইটভাটার বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট করেছিলেন, যার পরিপ্রেক্ষিতে আদালত ইটভাটাটি বন্ধের নির্দেশনা দেন। পরিবেশকর্মী সাইফুল্লাহর সৌভাগ্য যে, কথোপকথনের অডিও ফাঁস হয়েছিল। অন্যথায় যদি সাংসদের কথামতো কথিত সেই বোমা হামলা ঘটত এবং তাকে অভিযুক্ত করা হতো, তখন কী ঘটতে পারত ভাবা যায়! এর চেয়েও বড় সৌভাগ্যের বিষয় হলো, সংসদ সদস্য কিন্তু তাকে নাশকতার মামলায় জড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন, তার প্রাণদণ্ডের নির্দেশ দেননি! এ ধরনের নির্দেশনা অপরাধ কিনা, অপরাধ হলেও তা বড় না ছোট, তা পরিমাপের মানদণ্ড কি রাষ্ট্রের আছে?

কেউ দায়িত্বশীল জায়গা থেকে কোনো অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়লে বলা হয়ে থাকে সংশ্নিষ্ট ব্যক্তি তার পদে থাকার যোগ্যতা হারিয়েছেন। তা হলে প্রশ্ন উঠতে পারে- এই দুটি ঘটনায় অভিযুক্ত একজন সংসদ সদস্য, দু'জন ওসি ও একজন এসপিসহ অন্যরা কি স্বপদে বহাল থাকতে পারেন? তাদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের যে অভিযোগ উঠেছে, তার তদন্ত হওয়া কি আবশ্যক নয়? কিন্তু থানায় বোমা হামলার নির্দেশদাতা সেই সংসদ সদস্য, প্রার্থীকে তুলে নেওয়ার ঘটনায় অভিযুক্ত এসপি ও ওসি কিন্তু এখনও স্বপদে বহাল রয়েছেন! এ ধরনের ঘটনায় তদন্ত ও বিচার না হওয়ার অর্থ অপরাধকর্মে তাদের আরও উৎসাহিত করা। কোনো সভ্য সমাজে এমন শৈথিল্য কাম্য নয়।

সমাজে রাজনীতিক ও পুলিশের ব্যাপারে নেতিবাচক ধারণা নিয়ে বেড়ে উঠছে নতুন প্রজন্ম। যে রাজনীতিকদের নেতৃত্ব আমাদের স্বাধীন দেশ উপহার দিয়েছিল, যে পুলিশ বাহিনী রাজারবাগে সর্বপ্রথম হানাদারদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল, তাদের এমন অধঃপতন বিবেকবানদের তাড়িত না করে পারে না। 'আগে রাজনীতিকরা অপরাধ করত, এখন অপরাধীরা রাজনীতি করে'- এটি বহুল প্রচলিত একটি প্রবচন। এই প্রবচনের পক্ষে-বিপক্ষে বিতর্ক চলমান। তবে পাপুল, সাহেদ, সম্রাট, জি কে শামীম, পাপিয়া কিংবা শাহীন চাকলাদাররা এই প্রবচনকে বেশ অর্থবহ করে তুলেছে। রাজনীতিকদের একটি বড় অংশই যে ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের অপরাধকাণ্ড ঘটাচ্ছে, তা 'ওপেন সিক্রেট'। তাদের মূল সহযোগী পুলিশের কতিপয় অসাধু সদস্য। এই দু'পক্ষের অশুভ আঁতাতের ফলে গঠিত চক্রের হাতে নির্যাতিত হচ্ছে মানুষ। ক্ষমতা আর পুলিশের এই অনৈতিক রসায়ন কিন্তু নতুন কোনো ঘটনা নয়। বিগত সময়েও এই অসাধু চক্রের মাধ্যমে অপ্রত্যাশিত অনেক অঘটন প্রত্যক্ষ করা গেছে।

অপরাধমুক্ত সমাজ সবারই কাম্য। সেই সঙ্গে কাম্য জনরাজনীতি ও জনপুলিশিং ব্যবস্থা; যেখানে রাজনীতিকরা প্রকৃত অর্থেই জনগণের জন্য কাজ করবেন, পুলিশও জনগণের নিরাপত্তায় নিয়োজিত থাকবে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এর ব্যত্যয় ঘটে চলেছে। রাজনীতিকদের অনেকেই তাদের পূর্বসূরিদের ত্যাগ-তিতিক্ষার কথা ভুলে অপকর্ম আর ভোগে নিমজ্জিত। পুলিশও ঔপনিবেশিক আচরণ থেকে বের না হয়ে ক্ষমতার লাঠি হিসেবে ব্যবহূত হওয়ার সেই উত্তরাধিকার বহন করে চলেছে। এর থেকে পরিত্রাণে দরকার বড় ধরনের সংস্কার। রাজনৈতিক ক্ষেত্র থেকেই সেই সংস্কারের সূচনা হওয়া জরুরি।