শিক্ষা মানব-উন্নয়নের অব্যর্থ হাতিয়ার। দক্ষ ও যুগচাহিদার উপযোগী মানবসম্পদ সৃষ্টির মাধ্যমে ব্যক্তিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের ক্ষেত্রে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। বিশেষ করে একবিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিশাসিত বিশ্বে শিক্ষা ব্যতীত আর্থসামাজিক ও জাতীয় উন্নতি অকল্পনীয়। শিক্ষার অপরিহার্যতাকে অনুধাবন করে বাংলাদেশ সরকার সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদে নাগরিকদের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিংসার সঙ্গে শিক্ষাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে একটি নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। 

সরকার শিক্ষা বিস্তারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। সরকারের নৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থানের ভিত্তিতে গৃহীত পদক্ষেপের কারণে বাংলাদেশ শিক্ষা বিস্তারে দৃশ্যমান অগগ্রতি অর্জন করেছে। বাংলাদেশে প্রাথমিক স্তরে শিশুদের ভর্তি হার ৯৭.৭৪ (সূত্র :প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট)। উল্লেখ্য, মেয়েশিশুদের এনরোলমেন্ট ছেলেশিশুদের চেয়ে বেশি। বিশ্বব্যাংকের বৈশ্বিক এনরোলমেন্ট র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮তম। ২০২০ সালে দেশে স্বাক্ষরতার হার ৭৪.৭ (সূত্র :প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়)। পাকিস্তান আমলে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে সাক্ষরতার হার ছিল মাত্র ২৪ দশমিক ৭ শতাংশ। প্রসঙ্গত, যে পাকিস্তান রাষ্ট্র থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছিল, সেই দেশটি স্বাক্ষরতার দিক থেকে বাংলাদেশের থেকে অনেকখানি পিছিয়ে আছে। সে দেশে স্বাক্ষরতার হার বর্তমানে ৫৯ শতাংশ। স্বাধীনতার পর গত ৪৯ বছরে বাংলাদেশ তার নাগরিকদের সাক্ষর করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য প্রদর্শন করেছে। তবে এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে আরও অনেকটা পথ যেতে হবে।

শিক্ষার কথা এলেই শিক্ষার গুণগতমানের প্রসঙ্গটি অনিবার্যভাবে সামনে এসে যায়। মানসম্পন্ন শিক্ষা মানে সুসমন্বিত শিক্ষা। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অ্যাসোসিয়েশন ফর সুপারভিশন অ্যান্ড কারিকুলাম ডেভেলপমেন্টের ভাষ্য অনুযায়ী মানসম্পন্ন শিক্ষা বলতে বোঝায়, যে শিক্ষা শিশুর পূর্ণাঙ্গ বিকাশকে গুরুত্ব দেয়। যে শিক্ষা লিঙ্গ, বর্ণ, গোষ্ঠী, আর্থসামাজিক অবস্থান অথবা ভৌগোলিক অবস্থানের ঊর্ধ্বে উঠে সব শিশুর সামাজিক, আবেগিক, মানসিক ও শারীরিকভাবে সুসমন্বিত বিকাশ নিশ্চিত করে। এ শিক্ষা শিশুকে জীবনের জন্য তৈরি করে, কেবল পরীক্ষার জন্য নয়। বস্তুত মানসম্পন্ন শিক্ষা হলো একীভূত শিক্ষা, যা তার লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম। শিক্ষা যদি মানুষের নৈতিক ও মানসিক বিকাশে সহায়ক না হয়, যদি মানুষকে পেশা ও বৃত্তি গ্রহণের সামর্থ্য বা কম্পিট্যান্স প্রদান না করেও, তাহলে তাকে মানসম্পন্ন শিক্ষা বলা যাবে না। মানুষকে জীবন ও জগতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম করে তোলার মধ্যে শিক্ষা তার লক্ষ্যের যত বেশি সন্নিকটে পৌঁছাবে তাকে ততটা মানসম্পন্ন শিক্ষা বলা যাবে। মানসম্পন্ন শিক্ষা পরীক্ষায় পাস ও সনদনির্ভরতার মূলে কুঠারাঘাত করে। আহরিত সনদ দিয়ে যদি একজন মানুষ নিজের জীবনকে উন্নতির সোপানে পৌঁছাতে না পারে, দেশের যোগ্য নাগরিকরূপে নিজেকে প্রমাণ করতে না পারে এবং মানবসম্পদরূপে নিজের গ্রহণযোগ্যতাকে নিশ্চিত করতে না পাওে, তাহলে সে শিক্ষা মূল্যহীন। প্রকৃত সত্যটি হলো এই যে, এখন শিক্ষার মান নির্ধারণের অন্যতম সূচক হয়ে দাঁড়িয়েছে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের সক্ষমতা। একবিংশ শতাব্দীতে মুক্তবাজার অর্থনীতি ও বিশ্বায়নের ধারায় চাকরির বাজার বা জব মার্কেটও এখন উন্মুক্ত ও বৈশ্বিকীকরণকৃত। একজন মানুষ এখন গ্লোবাল ভিলেজের বাসিন্দা হিসেবে যেমন বিশ্বনাগরিক, তেমনি বিশ্বকর্মীও বটে। সে নিজের যোগ্যতার ভিত্তিতে পৃথিবীর যে কোনো দেশে বা যে কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সুযোগ নিতে পারে। আবার তাকে নিজের দেশের ভেতরেও বহির্বিশ্বের চাকরিপ্রার্থীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হয়। এ প্রতিযোগিতায় জয়ী হতে হলে তার প্রয়োজন কেবল শিক্ষা নয়, গুণগত মানে উত্তীর্ণ শিক্ষা। তাই বলা যায়, জ্ঞানের সঙ্গে দক্ষতার, দক্ষতার সঙ্গে জীবিকার এবং স্থানিকতার সঙ্গে আন্তর্জাতিকতার সংযোগ সাধন শিক্ষাকে মানোত্তীর্ণ করে।

শিক্ষার ক্ষেত্রে গুণগত মান অর্জন একটি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ। শিক্ষা বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার মান নিশ্চিত করা সত্যি একটি দুরূহ কাজ। কিন্তু বিশ্বের সামগ্রিক উন্নয়নের স্বার্থে শিক্ষার গুণগতমান নিশ্চিত করাটা জরুরি। সে জন্যই জাতিসংঘ পর্যন্ত শিক্ষার মানোন্নয়নকে গুরুত্বের সঙ্গে সামনে তুলে এনেছে। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যতে (এমডিজি) উন্নয়নের জন্য সর্বজনীন শিক্ষার অপরিহার্যতাকে স্বীকার হয়েছিল। এরপর টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যতে (এসডিজি) মানসম্পন্ন শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এসডিজিতে গৃহীত ১৭টি লক্ষ্যমাত্রার ৪ নম্বর লক্ষ্য বা এসডিজি-৪-তে সবার জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। এসডিজির প্রাণভোমরা বলা যায় এসডিজি-৪-কে। কারণ অন্য ১৬টি লক্ষ্য অর্জন ৪ নম্বর লক্ষ্যটির সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে নির্ভরশীল। বলা যায়, অন্য সব লক্ষ্য অর্জনের পূর্বশর্ত হলো ৪ নম্বর লক্ষ্য। বাংলাদেশ এসডিজি অর্জনের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাই সরকার শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে।

বাংলাদেশের শিক্ষার গুণগত মান যে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নেই, তা বলাই বাহুল্য। শিক্ষার মানগত ঘাটতির বিষয়টি প্রতিপাদ্য বিষয় বা শিরোনামের মধ্যেই নিহিত। বাংলাদেশের শিক্ষার মান নিরতিশয় হতাশাজনক বললেও অত্যুক্তি করা হবে না। ইউএনডিপি এসডিজি অর্জনের অগ্রগতি পর্যালোচনায় বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ১৭টির মধ্যে ১২টিতে দুর্বল অবস্থান চিহ্নিত করেছে। এ ১২টির অন্যতম হলো এসডিজি-৪। বাংলাদেশ সরকারও এসডিজির অগ্রগতি পর্যালোচনা করতে গিয়ে শিক্ষার মান নিয়ে হতাশাজনক চিত্র পেয়েছে। বাস্তব চিত্রটি এতটাই অস্বস্তিকর যে, শিখনফল মূল্যায়নে ক্ষেত্রবিশেষে শিক্ষার পশ্চাৎমুখী যাত্রা ফুটে উঠেছে। কারণ লক্ষ্য করা গেছে, একজন ছাত্র তার পূর্বশ্রেণির পঠিত বিষয়ের সম্পর্কে ধারণা রাখে না। এমনকি ষষ্ঠ শ্রেণির একজন শিক্ষার্থী দ্বিতীয় শ্রেণির পাঠ্যবইয়ের অঙ্ক কষতে পারে না। জিপিএ ৫ পাওয়া একজন শিক্ষার্থী যখন বলে আই এম জিপিএ ফাইভ- তখন সেটাকে পশ্চাৎযাত্রা না বলে শিক্ষার অগস্তযাত্রা বললেও অত্যুক্তি করা হবে না।

মানসম্পন্ন শিক্ষার প্রধান নিয়ামকগুলো হলো- জ্ঞান, দক্ষতা, কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের যোগ্যতা, নৈতিকতা, মানবিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গি। যদি শিক্ষা গ্রহণ সাপেক্ষে এগুলোর সমন্বিত উৎকর্ষ সাধন ও প্রয়োগে জীবন এবং জীবিকার ক্ষেত্রে একজন মানুষ নিজেকে অপরিহার্য করে তুলতে পারে, তাহলে সেটাই প্রকৃত মানোত্তীর্ণ শিক্ষা। কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষা এগুলোর কোনোটিতেই কার্যকর অবদান রাখতে পারছে না। ফলে সমাজে নামকাওয়াস্তে শিক্ষিত তথা সনদধারী মানুষের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ২২ লাখ নতুন কর্মশক্তি জনসংখ্যায় যোগ হয়; কিন্তু তার অধিকাংশই কাজ খুঁজে পায় না। সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা উচ্চশিক্ষিতদের। ব্রিটিশ সাময়িকী 'দ্য ইকোনমিস্ট'-এর ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইইইউ) এক প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে স্নাতক বা তদূর্ধ্ব পাস করাদের মধ্যে শতকরা ৪৭ ভাগই কর্মহীন থাকছে। ভারতে এ বেকারত্বের হার ৩৩, পাকিস্তানে ২৮, নেপালে ২০ ও শ্রীলঙ্কায় ৭.৮ ভাগ।

জব মার্কেটে বাংলাদেশে একটি বিপরীতমুখী প্রবণতা লক্ষ্যযোগ্য। সেটি হলো এই- একদিকে শিক্ষিত বেকারের ভারে দেশ নাস্তানাবুদ, অন্যদিকে প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা ও মার্কেন্ডাইজিং খাতে দক্ষ লোকবলের তীব্র অভাব। এর ফলে বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা বিদেশিদের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হন। বাংলাদেশ ইভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটির (বিডা) আগস্ট, ২০১৯-এর পরিসংখ্যানমতে বাংলাদেশে অনুমোদিত বিদেশি কর্মীর সংখ্যা এক লাখ। তবে দেশে অন্তত পাঁচ লাখের মতো বিদেশি কাজ করছেন বলে বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়। তারা দেশ থেকে কমপক্ষে ১০ বিলিয়ন মার্কন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে শিক্ষার জ্ঞান বিতরণ উপযোগের ক্ষেত্রেও চিত্রটিও নিতান্তই নিরাশাজনক। বৈশ্বিক জ্ঞানসূচকে ১৩৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১১২ এবং দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন (সূত্র : ইউএনডিপি ও নলেজ ফাউন্ডেশনের যৌথ নলেজ ইনডেপ, ২০২০)। বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় যখন বৈশ্বিক মানের স্বীকৃতি পায় না তখন নিম্ন থেকে উচ্চস্তর পর্যন্ত শিক্ষার মানগত সংকট নিয়ে আর কোনো প্রশ্ন থাকে না। আমাদের দেশে উচ্চশিক্ষার সনদধারী মানুষও যখন দুর্নীতিতে ডোবে, অমানবিক আচরণ করে, কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িক হয়, তখন বোঝা যায় আমাদের দেশের শিক্ষা তার মানবিক উপযোগ ও লক্ষ্য অর্জনেও ব্যর্থ হয়েছে।

শিক্ষার গুণগত মানহীনতা বাংলাদেশের শিক্ষার একটি গুরুতর সমস্যা এবং এসডিজি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায়। তাই জাতীয় স্বার্থে শিক্ষার মানোন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে এবং করণীয় নির্ধারণ করতে হবে। সমস্যার এর পেছনের সক্রিয় কারণ অনুসন্ধান ও সমাধানে করণীয় নির্ধারণ করতে হবে দ্রুত। শিক্ষার পরিমাণ বা সংখ্যাতাত্ত্বিক অর্জনের ঘোর থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। শিক্ষা বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে তার মানকে কাম্য পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। তবে এ নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব সরকারের একার নয়। সরকার ও সব অংশীজনের সমন্বিত প্রয়াসে কোন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শিক্ষাকে যুগোপযোগী করে তোলা যায়, সেটা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে এখনই।

বিষয় : শিক্ষার মানসংকট

মন্তব্য করুন