কাতারের বিপক্ষে গত ৫ ডিসেম্বর বিশ্বকাপ বাছাই ম্যাচে বাংলাদেশ দল ৫-০ গোলে পরাজিত হয়েছে। এতে আমাদের অবাক হওয়ার কোনো অবকাশ নেই। আবার এই হারের জন্য বাংলাদেশ দলকে দোষ দেওয়ারও কোনো যুক্তি নেই। ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের চেয়ে কাতার ঢের এগিয়ে। দেশটি আয়তনে খুব ছোট, একটা সিটি স্টেট বললেও ভুল হবে না। দেশটি বেশ সম্পদশালী। প্রথম বিশ্বের মতো ফুটবল খেলার সব অবকাঠামো দেশটির আছে। অপর পক্ষে দেশটির ফুটবলে বিদেশি বংশোদ্ভূত প্রতিভাবান খেলোয়াড়ের সংখ্যাই বেশি। আগামী বিশ্বকাপ ফুটবল খেলাও কাতারে অনুষ্ঠিত হবে।

বর্তমান অবস্থায় উভয় দেশের জাতীয় দলের শক্তি, দুর্বলতা এবং সুযোগ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কাতার বাংলাদেশের বিপক্ষে যে কোনো ম্যাচে জিতবে এটাই স্বাভাবিক। অধিকন্তু, আমরা সবাই জানি কাতার এশিয়ার সেরা দল। তবে, ওই ম্যাচে বাংলাদেশের আর একটু ভালো খেলা উচিদ ছিল। প্রায় গোটা দলই তাদের ফুটবল নৈপুণ্য দেখাতে ব্যর্থ হলেও কিন্তু গোলরক্ষক আনিসুর রহমান জিকো গোলপোস্টে যে বিশ্বমানের দক্ষতা দেখিয়েছে, তা অনেককেই অভিভূত করেছে। কাতারের সঙ্গে পরাজয় থেকে শিক্ষা নিয়ে এখন আমাদের এগিয়ে যাওয়ার পালা। আগামীতে কাউকেই এত সহজে, এত বেশি গোলের ব্যবধানে জিততে দেওয়া হবে না। বাংলার দামাল ছেলেরা পারবে। শুধু তাদের সুযোগ করে দিতে হবে।

আমরা কীভাবে এগোব? ফুটবল এমন এক ধরনের খেলা যেখানে প্রথমেই চারটি বিষয় ভীষণভাবে দরকার আর তা হলো একজন খেলোয়াড়ের দ্রুততা, নব্বই মিনিট মাঠে টিকে থাকার ক্ষমতা, কৌশল এবং যথাসময়ে মাঠের যথাস্থানে অবস্থান নেওয়া। এই চারটি বিষয়ে উন্নয়নের মাধ্যমে একজন ফুটবল খেলোয়াড় দক্ষ খেলোয়াড়ের পরিণত হয়। ছিনিয়ে আনে দলের পক্ষে বিজয় প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার মাধ্যমে। একজন খেলোয়াড়ের এই চারটি ক্ষেত্রে উন্নয়ন ঘটে সাধারণত ধারাবাহিক এবং নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে।

তাই বলব, ধারাবাহিক এবং নিয়মিত অনুশীলনই হচ্ছে দক্ষ ফুটবলার তৈরির প্রাণ। ধারাবাহিক এবং নিয়মিত অনুশীলনের জন্য প্রথমেই যা দরকার তা হলো অবকাঠামোগত সুবিধা যেমন অনুশীলনের জন্য উপযুক্ত মাঠ ও বিশ্বমানের ব্যায়ামাগার এবং দক্ষ জনবল যেমন কোচ, ফিজিওথেরাপিস্ট, সমন্বয়কারী, দক্ষ ব্যবস্থাপক ও উপযুক্ত ব্যবস্থাপনা। তাই একজন দক্ষ খেলোয়াড় এবং যৌথভাবে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার মতো জাতীয় ফুটবল দল গঠনে অবকাঠামোগত সুবিধা এবং দক্ষ জনবল অতি জরুরি। ভবিষ্যতে ফুটবলকে একটা সম্মানজনক অবস্থানে নিয়ে যেতে হলে আমাদের এই দুই ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করতে হবে- এটা যত তাড়াতাড়ি হয়, ততই ভালো। আবার এও দেখতে হবে, বিনিয়োগের অর্থ সঠিক স্থানে, সঠিকভাবে খরচ হচ্ছে কী হচ্ছে না। উন্নয়নশীল একটা জাতি হিসেবে আমাদের সম্পদের সীমাবদ্ধতা আছে। তাই সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

মনে রাখতে হবে, একজন খেলোয়াড়ের ধারাবাহিক এবং নিয়মিত অনুশীলন যত কম বয়সে শুরু হবে, তা ততই কার্যকরী হবে। এ ক্ষেত্রে পাঁচ থেকে নয় বছর বয়সটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ১০ বছর বয়সে একজন শিশুর মস্তিস্কের নমনীয়তা পূর্ণ পরিণতি লাভ করে। শুধু ধারাবাহিক এবং নিয়মিত অনুশীলনই যে একজন খেলোয়াড়কে জাতীয় পর্যায়ে খেলার মতো দক্ষ করে তুলবে তাও কিন্তু ঠিক না, তার থাকতে হবে জাতীয় পর্যায়ে খেলার মতো প্রতিভাও। তাই বলা যায়, একজন দক্ষ খেলোয়াড় দুটো জিনিসের সমন্বয়; ধারাবাহিক ও নিয়মিত অনুশীলন এবং প্রতিভা।

বাংলাদেশে এখনও কোনো উপযুক্ত পদ্ধতিগত ব্যবস্থা নেই যার মাধ্যমে দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের বের করে জাতীয় দলের জন্য খুব কম বয়স থেকেই প্রস্তুত করা যায়। আশা করি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন এ ব্যাপারটা নিয়ে খুব গুরুত্ব সহকারে ভাববে। ধারাবাহিক ও নিয়মিত অনুশীলন এবং প্রতিভার পরেই যে বিষয়টি একজন দক্ষ জাতীয় পর্যায়ে খেলার মতো ফুটবলার তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে প্রেরণা বা মোটিভেশন- জাতীয় পর্যায়ে খেলার আকাঙ্ক্ষা। সুতরাং জাতীয় পর্যায়ে খেলার মতো একজন দক্ষ খেলোয়াড় তৈরির পদ্ধতিটা হচ্ছে- ফুটবল খেলায় প্রতিভা+ধারাবাহিক ও নিয়মিত অনুশীলন+জাতীয় পর্যায়ে খেলার প্রেরণা = একজন দক্ষ জাতীয় দলের খেলোয়াড়। এমন প্রণালিবদ্ধভাবে এগোলে বাংলাদেশ জাতীয় দল আগামীতে এশিয়ান ফুটবলে, এমনকি আন্তর্জাতিক ফুটবলেও একটা সম্মানজনক স্থানে উন্নীত হতে পারবে বলে আমি মনে করি। ফুটবল কিন্তু একটা দেশের ব্র্যান্ডিংয়ে গুরুত্বপূর্ণই ভূমিকা পালন করে যা আমরা ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা এবং জার্মানির দিকে তাকালে খুব সহজে দেখতে পাই। তাই বলব, ফুটবল খেলায় বিনিয়োগ বাংলাদেশকে এক দিন বিশ্বের দরবারে সম্মানজনক অবস্থানে উন্নীত করতে পারে।

আমাদের শরীর কিন্তু একটা জটিল মেশিন। একটা মোটরসাইকেল যেমন তেল ছাড়া চলতে পারে না, ঠিক তেমনি একটা মানুষও কিন্তু খাদ্য ছাড়া চলতে বা বাঁচতে পারে না। ফুটবল এমন একটা খেলা যেখানে শারীরিক ওজন এবং পেশি দুটোই খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একজন ফুটবলারকে মাঠে দ্রুত গতিতে দৌড়াতে হয়, আর এজন্য প্রথমেই যা দরকার তা হল হালকা-পাতলা শারীরিক গড়ন। দৌড়াতে যে শক্তি দরকার, শরীরের পেশিগুলো হচ্ছে সেই শক্তির ভাণ্ডার। পেশিবহুল হালকা-পাতলা শরীরিক গঠনে যেটা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণই তা হলো আহার বা খাবারের অভ্যাস।

একজন খেলোয়াড় কী খাচ্ছেন যাতে তিনি পেশিবহুল হালকা-পাতলা থাকেন তার ওপরে নজর দিতে হবে। জাতীয় দলের প্রতিটা খেলোয়াড়ের একটা সাপ্তাহিক প্রোটিনসমৃদ্ধ খাদ্য পরিকল্পনা বা ডায়েট প্ল্যান থাকা দরকার। মনে রাখতে হবে, আমি তাহা, যাহা আমি খাই। আর প্রতিটা খেলোয়াড়কেও নিজ থেকে খাবারের কিছু কিছু নিয়ম মেনে চলতে হবে যেমন যতটা সম্ভব কম কার্বোহাইড্রেট গ্রহণ করা। প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় যেন ২-৩টি সেদ্ধ ডিম, মাংস, মাছ, ৩-৪টা কলা, এক গল্গাস গরম দুধ, কিছু সি ভিটামিনযুক্ত ফল এবং সালাদ থাকে। আবারও বলছি, এ খাবারগুলো অন্ততপক্ষে প্রয়োজন। বাকি সমন্বয়টা করবেন দলের পুষ্টিবিদ।

শুধু সরকারের দিকে তাকিয়ে আমরা ফুটবলের উন্নয়ন সাধন করতে পারব না। এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হবে সমাজের সবাইকে। প্রতিটা অভিভাবককে বলব, আপনি আপনার সন্তানের শখের প্রতি নজর দিন, তার শখ যদি হয় ফুটবল খেলার, তাকে ফুটবল খেলতে দিন। ফুটবল খেলা দেখতে দিন, তার পছন্দের ফুটবল দলের ফ্যান হতে দিন। ফুটবলবিষয়ক জিনিসপত্র তাকে কিনতে দিন। জনপ্রতিনিধিদের বলব, নিজ নিজ এলাকায় অন্ততপক্ষে দুটো করে ফুটবল দলের পৃষ্ঠপোষকতা করুন, আপনি মাঝেমধ্যে নিজেও খেলার অনুশীলন এবং খেলা দেখতে যান। এতে অন্যরাও অনুপ্রাণিত হবে।

একটা মানুষ যখন খেলাধুলার প্রতি অনুরাগী হয় এবং খেলাধুলায় অংশগ্রহণ করে তখন সে সুস্থ এবং সৃজনশীল থাকে। এর অন্যতম কারণ হলো খেলাধুলা প্রচুর পরিমাণে অতি প্রয়োজনীয় অ্যান্ডরফিন, ডোপামাইন এবং সেরোটনিন হরমোন নিঃসরণে কার্যকরী ভূমিকা পালন করে যা আপনাকে সুস্থ এবং সৃজনশীল রাখতে সাহায্য করে। তাই বলব, খেলাধুলায় সময় নষ্ট হয় না বরং সময়ের সদ্ব্যবহার হয়। আপনি খেলুন, অন্যকে খেলায় অনুপ্রাণিত করুন, সবাই মিলে ভালো থাকুন।

বলার অপেক্ষা রাখে না, পৃথিবীর জনপ্রিয় খেলাগুলোর মধ্যে ফুটবল একটা অন্যতম খেলা। ফুটবল এমন একটা খেলা, যা একজন মানুষকে সুশৃঙ্খল, নেতৃত্ব দানে যোগ্য, কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে চৌকস এবং সাহসী করে তোলে। মনে রাখবেন, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েফ এরদোয়ান এবং আমেরিকার নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন উভয়েই কিন্তু পেশাদার ফুটবলার ছিলেন। ফুটবল খেলা একটা জাতিকে কর্মঠ এবং সৃজনশীল করে তোলে। জার্মানি তার একটা জ্বলন্ত উদাহরণ। পৃথিবীর অন্যতম একটা কর্মঠ এবং সৃজনশীল জাতি হিসেবে পরিচিত জার্মানি, যেখানে ৫০ লাখ লাইসেন্সধারী ফুটবল খেলোয়াড় আছে। আপনি নিজে ফুটবল খেলুন, আপনার সন্তানকে ফুটবল খেলায় অনুপ্রাণিত করুন, আপনার বন্ধুকে ফুটবল খেলায় আমন্ত্রণ জানান, জাতীয় দলে দক্ষ খেলোয়াড় সরবরাহের উৎসে পরিণত হোন। শক্তিশালী জাতীয় দল গঠনে অংশীদার হোন। এভাবে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল, ছিনিয়ে আনবে বিজয় এবং বিশ্বদরবারে গৌরবান্বিত হবে গোটা জাতি।