স্বাধীনতার পর থেকে আইন-আদালতে বাংলা ব্যবহারের যে জোয়ার এসেছিল, যার ফলে সংবিধানও বাংলায় রচিত ও প্রণীত হয়েছিল এবং সংবিধানের ৩ অনুচ্ছেদে "প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা" ঘোষিত হয়। ইংরেজি পাঠের সঙ্গে বাংলা পাঠের বিরোধের ক্ষেত্রে বাংলা পাঠের প্রাধান্য সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫৩ (৩)তে ঘোষিত হয়েছিল। ১৯৭৫ সালের পট পরিবর্তনের পর ইংরেজি ব্যবহার আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এ অপচেষ্টা রোধ এবং সংবিধানের ৩ অনুচ্ছেদ কার্যকর করার উদ্দেশ্যে ১৯৮৭ সালে বাংলা ভাষা প্রচলন আইন প্রণীত হয়েছিল। এ আইনের ৩ ধারায় বলা হয়েছে : "৩। প্রবর্তন ও কার্যকরি ব্যবস্থা। (১) এই আইন প্রবর্তনের পর বাংলাদেশের সর্বত্র তথা সরকারী অফিস, আদালত, আধা-সরকারী, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিদেশের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যতীত অন্য সকল ক্ষেত্রে নথি ও চিঠিপত্র আইন-আদালতের সওয়াল-জবাব এবং অন্যান্য আইনগত কার্যাবলী অবশ্যই বাংলায় লিখিতে হইবে। (২) উপধারায় উল্লিখিত কোন কর্মস্থলে যদি কোন ব্যক্তি বাংলা ভাষা ব্যতীত অন্য কোন ভাষায় আবেদন বা আপিল করেন, তাহা হইলে উহা বে-আইনী ও অকার্যকর বলিয়া গণ্য হইবে। (৩) যদি কোন কর্মকর্তা কর্মচারী এই আইন অমান্য করেন, তাহা হইলে উক্ত কার্যের জন্য তিনি সরকারী কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপিল বিধির অধীনে অসদাচরণ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবেন এবং তাহার বিরুদ্ধে সরকারী কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপিল বিধি অনুসারে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে।"

এ আইন প্রচলনের পর থেকে সব আইন, অধ্যাদেশ, বিধিবিধান, প্রজ্ঞাপন প্রভৃতিতে বাংলা ভাষার ব্যবহার শুরু হয়ে এখনও অব্যাহত থাকলেও আদালতের কিছু আইনজীবী ও বিচারক ইংরেজি ব্যবহারের অহমিকা ত্যাগ করতে পারেননি। তাই এ আইন প্রচলনের পরও কোনো কোনো অধস্তন আদালতে আর্জি, জবাব, দরখাস্তে ইংরেজি ব্যবহার অব্যাহত থাকে। এ অবস্থায় নূতন আইনের সুযোগ গ্রহণ করে চট্টগ্রামের দেওয়ানি আদালতে বিচারাধীন ব্যাংকের অর্থ আদায়-সংক্রান্ত মামলায় বাদী বাংলার পরিবর্তে ইংরেজিতে আর্জি দাখিল করায় বিবাদী ওই আর্জি খারিজের দরখাস্ত দিয়ে বিফল হয়ে দেওয়ানি কার্যবিধির ১১৫ ধারা অনুসারে হাইকোর্টে রিভিশনের দরখাস্ত পেশ করলে তা শুনানির জন্য গৃহীত হলে অধস্তন দেওয়ানি আদালতে তদ্রূপ আর্জি খারিজের বহু দরখাস্ত পেশ হয়ে প্রত্যাখ্যাত হলে তদবিরুদ্ধে হাইকোর্টে একই অজুহাতে রিভিশন মামলা দায়ের হয়। এরূপ ছত্রিশটি মামলা একত্রে শুনানি হয়ে হাসমত উল্লা বনাম আজমিরি বেগম নামক ৪৪ ডিএলআর-এর ৩৩২ পৃষ্ঠায় প্রকাশিত রায়ের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়েছিল। ওই রায়ে দেওয়ানি কার্যবিধির ১৩৭ ধারা বাতিল না হওয়ায় ইংরেজিতে আর্জি দাখিলকে বৈধ ঘোষণা করা হয়। ওইসব মামলায় যেসব আইনজীবী অংশগ্রহণ করেছিলেন, স্বাধীনতা সংগ্রামে তাদের কোনো অবদানের কথা আমাদের জানা নেই এবং তাদের বক্তব্য যে সংবিধান পরিপন্থি ছিল, তা মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে। যে যুক্তিতে বিচারপতিদ্বয় ইংরেজি ব্যবহারকে বৈধ বলেছেন, তা হচ্ছে বাংলা ভাষা প্রচলন আইন একটি সাধারণ আইন এবং দেওয়ানি কার্যবিধি একটি বিশেষ আইন এবং সে সাধারণ আইনে বিশেষ আইনের ১৩৭ ধারা ব্যক্ত বা নিহিতভাবে বাতিল না করায় এবং সংবিধানে ১৫৩ অনুচ্ছেদে ইংরেজির ব্যবহার নিষিদ্ধ না করে অনুমোদন করায় অধস্তন আদালতে ইংরেজি ব্যবহার করা যাবে। প্রথমত বিজ্ঞ বিচারপতিদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেও বলা যায় যে দে: কা: ১১৫ ধারায় ন্যায়বিচার বিঘ্নিত না হলে রিভিশনে অধস্তন আদালতের কোনো আদেশ বাতিল করা যায় না। সেখানে রিভিশন মোকদ্দমা খারিজ করার জন্য উপরোক্ত ব্যাখ্যা প্রদানকে প্রাসঙ্গিক মন্তব্য, যা বাধ্যকর নজির নয় এবং মশা মারতে কামান দাগানোর শামিল বলা যায়। তা ছাড়া দেওয়ানি কার্যবিধি একটি বিশেষ আইন নয়, বরং বাংলা ভাষা প্রচলন আইনের মতো একটি সাধারণ আইন। তাই পরবর্তী আইনের কোনো বিধান পূর্ববর্তী কোনো আইনের কোনো বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলে পূর্ববর্তী আইনের বিধান বাতিল গণ্য হয় মর্মে আইন ব্যাখ্যার যে নীতি চালু আছে, বিচারপতিদের নজরে তা তুলে ধরলে অন্যরকম রায় হতো বলে আশা করা যায়। তা ছাড়া দেওয়ানি কার্যবিধির ১৩৭ ধারার বিধান যতটুকু সংবিধানের ৩ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, ততটুকু সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদের বিধানানুসারে বাতিল ছিল। তাই উক্ত রায়ে দেওয়ানি আদালতে বাংলার সঙ্গে ইংরেজি ব্যবহারকে বৈধ ঘোষণা করা সংবিধানসম্মত ছিল না। মনে হয়, ওই মামলাগুলো শুনানিতে বাংলা ভাষাবান্ধব কোনো আইনজীবী বক্তব্য প্রদানে উৎসাহ বোধ করেননি। যা হোক, উক্ত রায়ের ফলে উৎসাহিত হয়ে ইংরেজি প্রেমিক বাংলাভাষীরা পূর্ণ উদ্যমে অধস্তন আদালতের ইংরেজি ব্যবহার বাড়াতে চাইলেও বাধাগ্রস্ত হচ্ছেন ইংরেজি জানা আইনজীবী ও বিচারকের অভাবের ফলে। উল্লেখ্য, বাংলা ভাষা প্রচলন আইনের বিরুদ্ধে প্রায় পাঁচশ আইনজীবী সরকারের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করলে তার বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবীসহ সহস্রাধিক আইনজীবী সুপ্রিম কোর্টসহ সব আদালত ও সরকারি কার্যালয়ে বাংলা ব্যবহারের দাবি করে পাল্টা স্মারকলিপি প্রদান করেন।

কেউ কেউ বলেছেন, সংবিধানে ইংরেজি ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়নি। তারা নিজেদের স্বার্থে সংবিধানের অপব্যাখ্যা করেছেন। সংবিধানের ৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, "প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা।" তার অর্থ রাষ্ট্রীয় সব ক্ষেত্রে বাংলা ব্যবহূত হবে, অন্য কোনো ভাষা নয়। এর সরল অর্থ হচ্ছে- সুপ্রিম কোর্টসহ রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানে বাংলা ব্যবহূত হবে, অন্য কোনো ভাষা নয়। ১৯৮৭ সালের বাংলা ভাষা প্রচলন আইনের ৩ (১) ধারায় বলা হয়েছে :"বিদেশের সাথে যোগাযোগ ব্যতীত অন্য সকল ক্ষেত্রে নথি ও চিঠিপত্র, আইন-আদালতের সওয়াল জবাব এবং অন্যান্য আইনানুগ কার্যাবলী অবশ্যই বাংলা ভাষায় লিখিতে হইবে।" উপরোক্ত আইনটি প্রণীত হয়েছে "সংবিধানের ৩ অনুচ্ছেদের বিধানাবলী পূর্ণরূপে কার্যকর করিবার উদ্দেশ্যে এবং বাংলাদেশের সর্বত্র তথা সরকারি অফিস, আদালত, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে" বাংলা ভাষার ব্যবহার অব্যাহত রাখার জন্য। উপরোক্ত আইনের ৩ ধারার (২) উপধারায় বলা হয়েছে, "যদি কোন ব্যক্তি বাংলা ভাষা ব্যতীত অন্য কোন ভাষায় আবেদন বা আপীল করেন তাহা হইলে উহা বে-আইনি বা অকার্যকর বলিয়া গণ্য হইবে।" উপরোক্ত অবস্থায় আদালতে ইংরেজি ব্যবহার নিষিদ্ধ করেনি বলার সুযোগ কোথায়।

অধস্তন আদালতে বাংলা ভাষার ব্যবহার সম্পর্কে আলোচনা হতে দেখা যায় যে, উচ্চ আদালতে ইংরেজি ব্যবহার অব্যাহত আছে। শুধু ব্যতিক্রম হচ্ছে স্বাধীনতার পর থেকে হাইকোর্ট বিভাগের দৈনিক শুনানির তালিকা বাংলায় প্রকাশ করা। ১৯৫৮ সালে প্রণীত হাইকোর্ট বিধিতে আদালতের ভাষা "ইংরেজি" বলা হয়েছে এবং ১৯৭৩ সালের বিধিতে "ইংরেজি/বাংলা" বলা হয়েছে এবং সংবিধানের ৩ অনুচ্ছেদের বিধানানুসারে তা ইংরেজি বলা বৈধ নয়। এই বিধির অনুবলে এখনও হাইকোর্ট বিভাগে ইংরেজির ব্যবহার অব্যাহত আছে। যেহেতু হাইকোর্ট বিভাগের প্রায় সব কাজকর্মে ইংরেজি ব্যবহূত হয়, তাই সংগত কারণে আপিল বিভাগের সব কাজকর্মে ইংরেজি ব্যবহূত হয়। তৎকালীন ঢাকা হাইকোর্টে বাংলা ব্যবহারের জন্য যে আইনজীবী প্রথম সংগ্রাম শুরু করেন তিনি বাংলা সামছুদ্দীন নামে সমধিক পরিচিত। ১৯৫৬ ও ১৯৬২ সালের সংবিধানে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়ার পর তিনি ১৯৬৬ সালের ৫ ডিসেম্বর ঢাকা হাইকোর্টে বাংলা ভাষায় একটি ফৌজদারি রিভিশন দাখিলের চেষ্টার মাধ্যমে উচ্চ আদালতে বাংলা ব্যবহারের জন্য অগ্রগামী ভূমিকা রেখেছিলেন, সে কথা বিস্তারিতভাবে ভাষাসংগ্রামী গাজীউল হক তার প্রণীত ও ২০০৪ সালে জোনাকী প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত 'উচ্চতর আদালতে বাংলা প্রচলন' গ্রন্থে আলোচনা করেছেন। অ্যাডভোকেট সামছুদ্দীন আহমদ পাকিস্তান আমলে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়ে সফল হতে না পারলেও ভাষাসংগ্রামী গাজীউল হক কীভাবে ভাষাশহীদ রফিকের মায়ের ভর্ৎসনাবিদ্ধ হয়ে বিচারপতিদের ভ্রূকুটি উপেক্ষা করে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে বাংলা ভাষায় দরখাস্ত ইত্যাদি দাখিল করতে সমর্থ হয়ে ওই আদালতের বাংলা ভাষার চর্চা আরম্ভ করেছিলেন, তার কথাও তিনি তাঁর ওই গ্রন্থে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছেন। গাজীউল হক ও তাঁর কতিপয় অনুসারী আইনজীবী উচ্চ আদালতে বাংলা ব্যবহার আরম্ভ করলেও ইংরেজি প্রেমিক অধিকাংশ আইনজীবীর বিরোধিতার ফলে এখনও সেখানে অব্যাহতভাবে ইংরেজি চর্চা হচ্ছে।

উচ্চ আদালতে গাজীউল হকসহ কয়েক ব্যক্তি বাংলা ভাষা ব্যবহার আরম্ভ করলেও মাননীয় বিচারপতিদের বাংলায় রায় প্রদানে অনীহার কারণে উচ্চ আদালতে বাংলার ব্যবহার ত্বরান্বিত হতে পারছে না। এর ব্যতিক্রম ছিলেন বিচারপতি আমীরুল ইসলাম চৌধুরী ও তাঁর সহবিচারপতি। তাঁরা বাংলায় আদেশ দান ও রায় লেখা আরম্ভ করে পথিকৃৎ হয়েছেন। নানা প্রকার বাধার ফলে তাঁরা বেশিদূর এগোতে পারেননি এবং তাঁদের সংক্ষিপ্ত রায় নজির সৃষ্টিকারী না হওয়ায় আইন সাময়িকীতেও প্রকাশিত হয়নি। কিন্তু সেগুলো গাজীউল হকের উক্ত বইতে প্রকাশিত হয়েছে। অপর এক ভাষাসংগ্রামী বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান ১৯৯৫ সালে কয়েক মাসের জন্য বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির পদ অলংকৃত করেন। তিনি নেপালের উচ্চ আদালতে নেপালি ভাষার ব্যবহার দেখে উৎসাহিত হয়ে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের বাংলায় রায় প্রদান করতে অনুরোধ করলেও সফল হতে পারেননি। বিচারকবৃন্দের বক্তব্য ছিল; "বাংলায় রায় লেখা কঠিন, তিনি নিজে কোন রায় বাংলায় না দিয়ে কিভাবে অন্যদের তা করতে বলেন।" তাদের কথা হলো, "আপনি আচরি ধর্ম পরেরে শেখায়।" কিন্তু এর আগে থেকে বিচারপতি আমীরুল ইসলাম চৌধুরী হুকুমদখলকৃত জমির ক্ষতিপূরণ ধার্য করে নিম্ন আদালতের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে আনীত আপিলে বাংলায় সংক্ষিপ্ত রায় দেওয়া ছাড়া অন্য কোনো বিচারক নজির সৃষ্টিকারী কোনো রায় বাংলায় প্রদান করেননি। ১৯৯৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শহীদ দিবসের পূর্বে এবং পরে গ্রন্থকার বিচারপতি কাজী এবাদুল হক, তার সহবিচারপতি হামিদুল হক, আবদুল কুদ্দুস ও মো. আওলাদ আলী মামলায় নজির সৃষ্টিকারী রায় বাংলায় প্রদান করলে তা ঢাকা ল' রিপোর্টস, বাংলাদেশ লিগ্যাল ডিসিশানসসহ সব আইন সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে এবং গাজীউল হক প্রণীত উক্ত পুস্তকে ছাপা হয়েছে। পরে বিচারপতি খায়রুল হকসহ কয়েকজন মাত্র বাংলায় রায় প্রদান করেছেন। কিন্তু যারা বাংলায় রায় প্রদান করেছেন বা করছেন, তাদের সংখ্যা যারা ইংরেজিতে রায় প্রদান করছেন তাদের তুলনায় নগণ্য। উল্লেখ্য, ঢাকা ল' রিপোর্টস-এর কয়েকটি সংখ্যা বাংলায় অনুবাদ করে এ দেশের আইনজীবীদের নিকট পাঠানো হলে প্রতিটি সংখ্যা দ্রুত বিক্রি হয়ে যায়। এতে বোঝা যায় যে আইনজীবীরা ইংরেজি ল' রিপোর্টস-এর চেয়ে বাংলায় ল' রিপোর্টস পছন্দ করেন বেশি।

সংবিধানের ১০৭(১) অনুচ্ছেদ অনুসারে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন নিয়ে আদালতের রীতি-পদ্ধতি নিয়ন্ত্রণের জন্য বিধি প্রণয়নের ক্ষমতাবলে সুপ্রিম কোর্ট সংবিধানের ৩ অনুচ্ছেদের পরিপন্থি ইংরেজি ব্যবহার করার জন্য কোনো বিধি প্রণয়ন করলে তা সংবিধানের ৭(২) অনুচ্ছেদ অনুসারে বাতিল হবে। তা ছাড়া পাকিস্তান আমলে প্রণীত ও প্রকাশিত হাইকোর্ট বিধিসমূহের ২য় খণ্ডের ৪র্থ পরিচ্ছেদের ১নং বিধিতে ইংরেজি ব্যবহারের যে বিধান করা হয়েছে, তা উপরোক্ত কারণে সংবিধান পরিপন্থি ও বাতিল। তাই হাইকোর্ট রুল হাইকোর্ট বিভাগে ইংরেজি ব্যবহারের কোনো অজুহাত হতে পারে না। আসল কথা, উচ্চ আদালতে বাংলা ব্যবহারের প্রকৃত বাধা হচ্ছে কিছু ইংরেজি জানা লোকের বাংলা ভাষা ব্যবহারে অনীহা ও ইংরেজি ভাষা ব্যবহারের অহমিকা ও হীনম্মন্যতা। ইংরেজি ব্যবহার করা তাদের নিকট গৌরবজনক মনে হলেও তা যে তাদের ভিনদেশি ভাষা ব্যবহারের দাস্যভাবপ্রসূত- তা তারা বুঝতে অক্ষম। প্রকৃতপক্ষে সুপ্রিম কোর্টের প্রায় চার হাজার আইনজীবীর মধ্যে বৃহদাংশ ইংরেজিতে সিদ্ধহস্ত নন। তবুও অহমিকা ও হীনম্মন্যতাবশত এবং ইংরেজিতে আপিল আবেদন প্রভৃতির নমুনা কাঠামো ব্যবহারের সুযোগের সদ্ব্যবহারের আশায় অনেকে ভুল ইংরেজি ব্যবহার করেও ইংরেজি চর্চা অব্যাহত রাখছেন। উল্লেখ্য, ভাষাসংগ্রামী গাজীউল হকের উপরোক্ত গ্রন্থে দেওয়ানি, ফৌজদারি, রিট ও এডমিরালটি মামলার নানারূপ দরখাস্ত আপিলের স্মারক, এডমিরালটির আর্জি ইত্যাদির নমুনা, যা হাইকোর্ট বিভাগ ও আপিল বিভাগে দাখিলযোগ্য, তা দেওয়া সত্ত্বেও ইংরেজি ব্যবহারের কোনো যুক্তিসংগত হেতু নেই। অনেক বিচারপতিরও ধারণা, বাংলায় রায় লিখলে তাদের পাণ্ডিত্যপূর্ণ রায় ব্যবহার করা থেকে কমন ল' প্রচলিত দেশগুলোর আইনজীবী ও বিচারকগণ বঞ্চিত হবেন। সে প্রত্যাশায় তারা এখনও ইংরেজিতে রায় লেখা অব্যাহত রেখেছেন। এ প্রসঙ্গে বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য উল্লেখযোগ্য। তিনি তাঁর ভাষণে বলেছিলেন, "আমাদের পবিত্র সংবিধানে আছে, প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ আর প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। সুপ্রীম কোর্টসহ দেশের সকল আদালতই প্রজাতন্ত্রের আদালত। সম্মানিত বিচারকগণ বাঙ্গালী, বিজ্ঞ আইনজীবীগণ বাঙ্গালী এবং বিচারপ্রার্থীগণও ব্যতিক্রম ব্যতিরেকে সবাই বাঙ্গালী। সকল আদালত কর্তৃক ঘোষিত রায় বাংলা ভাষায় হবে, এটাই তো স্বাভাবিক।" কিন্তু কে শোনে কার কথা! প্রধানমন্ত্রীর উদাত্ত আহ্বানও অরণ্যে রোদন হয়ে যায়। আইনের শাসনের কথা বলে যে আইনজীবীগণ মাঠ গরম করেন, যে বিচারকগণ আইন অনুযায়ী বিশ্বস্ততার সহিত তাদের পদের কর্তব্য পালন এবং বাংলাদেশের সংবিধান ও আইনের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধানের শপথ গ্রহণ করেছেন, তারা আইন পরিপন্থিভাবে বাংলার পরিবর্তে ইংরেজি ব্যবহার করবেন, দেশের মানুষ তা প্রত্যাশা করে না।
লেখক
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের
আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি