বাংলা ভাষা আমাদের কাছে যতটা প্রাণের, ততটাই আবেগেরও। ফরাসি, তুর্কি, পর্তুগিজ, ইংরেজ এবং সবশেষ পাকিস্তানিদের হাত থেকে আমরা এই প্রাণের ভাষাকে উদ্ধার করেছি রক্ত-ত্যাগের বিনিময়ে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৩০ কোটি মানুষ বাংলা ভাষাকে প্রথম ভাষা হিসেবে ব্যবহার করছে, সেদিক থেকে আমাদের এই ভাষা পৃথিবীতে সপ্তম। বাংলা ভাষা অর্জনের ইতিহাসকে কেন্দ্র করে ইউনেস্কো একটি দিবস ঘোষণা করেছে। দিবসটি 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' হিসেবে পালিত হয়।

বিশ্বব্যাপী চলছে প্রযুক্তির বৈপ্লবিক সব সৃষ্টির অন্বেষণ, আমাদের দেশেও তার কম ছোঁয়া লাগেনি। দেশের প্রতিটি ক্ষেত্র এগিয়ে যাচ্ছে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে, চলছে আধুনিকীকরণের সরল প্রতিযোগিতা। কিন্তু ভাষার ক্ষেত্রে তো কেন নয়? ভাষাকে টিকিয়ে রাখা বলতে কি শুধুই ভাষার অস্তিত্ব রক্ষা নাকি সম্মানের সঙ্গে টিকে থাকাটাও জরুরি?

আধুনিক চিন্তাবিদদের মতে, ভাষাকে সম্মানের সঙ্গে টিকিয়ে রাখতে তা যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে সর্বজনীন করার কোনো বিকল্প নেই। ১৯৫২-তে যারা আত্মত্যাগের বিনিময়ে ভাষার যে স্বাধীনতা আমাদের উপহার দিয়ে গেছেন, ২০২১ সালে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রক্ষা করাটা আমাদের প্রযুক্তিবিদদের এক প্রকার দায়িত্ব। একাবিংশ শতাব্দীতে একটি ভাষাকে সম্ভ্রমের সঙ্গে টিকিয়ে রাখতে ইন্টারনেটে ওই ভাষায় বিষয়বস্তুর সহজলভ্যতা, প্রয়োজনীয় ভাষা প্রক্রিয়াজাতকরণের সরঞ্জাম এবং কৌশল প্রস্তুত এবং সেই সম্পর্কিত বিস্তর গবেষণা নিশ্চিতকরণ যথাকর্তব্য।

বিশ্বের প্রায় ৭০০০ ভাষা রয়েছে। কিন্তু সবেমাত্র কয়েকটি ভাষা রয়েছে যেগুলো সর্ব দিক বিবেচনা করে উন্নত ভাষা হিসেবে ধরা হয়। সেগুলো হলো- ইংরেজি, চায়নিজ, জার্মান, ফার্সি, আরবি, ফ্রেঞ্চ এবং স্প্যানিশ। এমনকি সর্বোচ্চ প্রযুক্তিগত উন্নয়নও ইংরেজির সঙ্গে এই ভাষাগুলোরই সমন্বয় ঘটেছে। এজন্য এসব ভাষার প্রতি অন্যরাও আকৃষ্ট হয় সহজেই। তাদের সভ্যতা, ঐতিহ্য, কৃষ্টি-কালচার এবং অস্তিত্ব সম্পর্কে বিস্তর মানুষ অবহিত।

অন্যদিকে, বাংলা ভাষা এদিক দিয়ে যথেষ্ট পিছিয়ে রয়েছে। আধুনিক সময়ের অতি প্রয়োজনীয় কিছু টুলস, যেমন- স্বয়ংক্রিয় চ্যাটবট, ভার্চুয়াল সহকারী (গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট), ওসিআর (স্বয়ংক্রিয় পাঠক), স্বয়ংক্রিয় অনুবাদক, কথা থেকে লেখা (স্পিচ টু টেপট), লেখা থেকে কথা (টেপট টু স্পিচ), এগুলো এখন পর্যন্ত বাংলা ভাষার জন্য ভালো মানের পাওয়া যায় না। ফলে আমাদের নিজেদের কাছেই এই ভাষার ব্যবহার এবং গুরুত্ব দিন দিন কমে যাচ্ছে এবং সঙ্গে ৩০ কোটি মানুষের এই ভাষা সর্বজনীন হচ্ছে না। আমরা নিজেরাই বিভিন্ন কাজে ইংরেজির মতো প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত ভাষাগুলোর প্রতি আগ্রহী হচ্ছি।

বর্তমানে কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির অনেক শাখাকেই নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছে, অনেক অসম্ভবকে সম্ভব করে চিন্তার পরিধিকে কয়েক গুণিতকে বড় করে দিয়েছে। তারই একটা ছোট্ট শাখা হলো 'ন্যাচালার ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং' বা ভাষা প্রক্রিয়াজাতকরণ। যেখানে মেশিনকে একটা ভাষা শেখানোর যাবতীয় পদক্ষেপ নিয়ে কাজ করা হয়। আর মেশিন একটা ভাষাকে যতটা ভালো বুঝতে পারে, সেই ভাষাকে ততটাই আধুনিক বলা যায়। ফলশ্রুতিতে ওই ভাষা ব্যবহার করে মেশিনকে দিয়ে আমাদের অনেক কঠিন কাজগুলো খুব সহজেই করিয়ে নিতে পারি। যেমন : হাতে টাইপ না করেই দূর থেকে কথা বলে একটা যন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণ করা, রাস্তাঘাটের ব্যানার-সাইনবোর্ডের লেখা না পড়েই ডিজিটালে রূপান্তর করা, অন্য ভাষা না বুঝেও সেগুলো বাংলায় রূপান্তর করে বুঝতে পারা, অন্যের কথা বা লেখার আবেগ যন্ত্র দ্বারা পরিমাপ করা, ভিনদেশি মানুষের সঙ্গে বাংলা ভাষায় যোগাযোগ করা এবং এমন আরও অনেক কিছু।

উন্নত ভাষাগুলোর মতো বাংলাকে বিশ্বব্যাপী সর্বজনীন করে সম্ভ্রমের সঙ্গে টিকিয়ে রাখতে হলে কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার মতো আধুনিক প্রযুক্তিবিদ্যাগুলোর প্রয়োগ প্রতিনিয়ত বাড়াতে হবে। এই প্রযুক্তির মূল চালিকাশক্তি হলো ডাটা (ট্রেইনিং এক্সামপল)। ধারণা করা হয়, পরবর্তী বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে এই ডাটাকে কেন্দ্র করে। তাই বাংলা ভাষার জন্যও প্রয়োজনীয় ডাটাসেট সংগ্রহ এবং সেগুলোর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন যথাযথ রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা।

আধুনিক সমাজের মানুষজনের মন পেতে হলে তাদের মতো করে উপাত্ত উপস্থাপন করতে হবে। পর্যাপ্ত প্রযুক্তিগত উন্নয়ন না হওয়ার কারণে আমাদের অর্জিত এই ভাষা আমাদের কাছে আজ ক্রমেই সেকেলে হয়ে যাচ্ছে। আমাদের আধুনিক সমাজ ইদানীং বিদেশি ভাষার সংস্কৃতি, বিনোদন এবং সেসব ভাষা ব্যবহারের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। এই স্রোত থেকে বের হয়ে আসতে হলে আমাদের ভাষাকে সমৃদ্ধ করে আধুনিক সমাজের উপযোগী করতে হবে। আর এজন্য প্রযুক্তির আশ্রয় নিয়ে ভাষার 'কম্পিউটেশনাল রিপ্রেজেন্টেশন' বর্ধিতকরণ বা যন্ত্র বোঝার উপযোগী করার বিকল্প নেই।

যদিও এই কাজের অগ্রগতিতে বর্তমান সরকার এবং তাদের আমলাদের নেওয়া পদক্ষেপগুলো অত্যধিক প্রশংসনীয়। তারা বিভিন্ন প্রকার প্রকল্প গ্রহণ এবং বিভিন্ন শাখায় অনুদান প্রদানের মাধ্যমে বেশকিছু বাংলা ভাষার টুলস এবং ডাটাসেট ইতোমধ্যে তৈরি করেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিজ উদ্যোগে অনেক কাজ করেছে, যেগুলো আমরা আন্তর্জাতিক গবেষণাপত্র এবং জার্নাল ঘাঁটলে জানতে পারি। কিন্তু প্রয়োজন এসব কাজের যথাযথ একত্রীকরণ এবং পদক্ষেপ গ্রহণ। আরও প্রয়োজন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা দলগুলোর সঙ্গে ইন্ডাস্ট্রি এবং রাষ্ট্রের ছন্দসমতা। এগিয়ে আসতে হবে সব প্রযুক্তিবিদকে। তাহলেই আমাদের অর্জিত এই ভাষাকে সম্ভ্রমের সঙ্গে বর্তমান সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রক্ষা করতে পারব।




বিষয় : চতুরঙ্গ সানজিদ কাওসার

মন্তব্য করুন