ভাষা গতিশীল। বিশ্ব মানচিত্রে ভাষার স্থানিক বিস্তৃতির স্বরূপ সে কারণে বেশ জটিল ও পরিবর্তনশীল। পৃথিবীর ৯৫ শতাংশের বেশি জনসংখ্যা ১০০টি জনপ্রিয় ভাষার মধ্যে অন্তত একটিতে কথা বলে। আবার অন্যদিকে জনসংখ্যার ৫০ শতাংশ প্রধানত জনপ্রিয় ভাষার মধ্যে অন্তত একটি ভাষা ব্যবহার করে থাকে। সে কারণে প্রধান প্রধান ভাষা পৃথিবীর মানচিত্রের উল্লেখযোগ্য অংশজুড়ে রয়েছে। ভাষার স্থানিক বণ্টনের ক্ষেত্রে দুটি প্রধান বৈশিষ্ট্য অনুসরণ করা হয়, প্রথমত, কোনো অঞ্চলের ভৌগোলিক বিস্তৃতির সঙ্গে জনসংখ্যার আনুপাতিক উপস্থাপন সব সময় সঠিক হয় না। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়, চীনে স্থানীয় জনসংখ্যায় মাতৃভাষার আধিপত্য রয়েছে যদিও সে দেশে ইংরেজি ভাষাও প্রচলিত। দ্বিতীয়ত, ভৌগোলিক সীমানার বাইরেও কিছু কিছু ভাষা একাধিক দেশে উচ্চারিত হয় যেমন- ইংরেজি, স্প্যানিশ, আরবি বা জার্মান ভাষা, যা অনেক দেশের মাতৃভাষার বাইরেও প্রভাবশালী ব্যবহারিক ভাষা।

ভাষাবিদদের মতে, জাতীয় ভাষার অভাবিত বিকাশ ঘটেছে গত ২০০ বছরে। দশম শতাব্দীর মাঝামাঝি ইউরোপ ও তার আশপাশে ছয়টি ভাষার প্রাধান্য ছিল- লাতিন, গ্রিক, হিব্রু, অ্যাঙ্গলো-স্যাপন ও গির্জা-স্লাভোনিক। ইউরোপে ত্রয়োদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি ভাষার সংখ্যা উন্নীত হয় সতেরোতে, ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষে ত্রিশে এবং এ শতাব্দীর ত্রিশের দশকে তিপ্পান্নতে। বিশ্বের ২৩ হাজার ভাষার মধ্যে বর্তমানে ছয় হাজার ভাষা প্রচলিত আছে এবং আগামী ২০ বছরে ভাষাবিদদের মতে এ সংখ্যা ২০০-তে নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে।এ আশঙ্কার পরিসংখ্যান প্রধানত নৃ-তাত্ত্বিক গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে বেশি প্রযোজ্য। সংস্কৃতির সমৃদ্ধির জন্য ক্ষুদ্র জাতিসত্তার ভাষা সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি।

জাতীয় আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে প্রত্যেক জনজাতির মধ্যে ভাষার প্রতি মমত্ব বৃদ্ধি পায়। প্রতিটি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা থাকে যা তার প্রাণকে সজীব রাখে, উজ্জীবিত করে। প্রকৃতপক্ষে যে ভাষায় যারা কথা বলে, সে ভাষাকে সমৃদ্ধ করার চেষ্টা থাকে তাদের প্রতিনিয়ত। বাংলা ভাষাকে যখন ভৌগোলিক প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করা হয়, তখন প্রত্যক্ষ হয় ভাষার বহুরূপতা। প্রকৃতপক্ষে বাংলা ভাষা বহু উপভাষা সমৃদ্ধ। মূলত ভারতীয় উপমহাদেশের পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত ইন্দো ইউরোপীয় ভাষা পরিবারের আর্য উপভাষার অন্তর্ভুক্ত বাংলা ভাষা।

মাগধী প্রাকৃত ও পালি সংমিশ্রণে বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন চর্যাপদ। এই চর্যাপদ পাণ্ডুলিপিটি নেপালের রাজদরবার থেকে আবিস্কার করেন অধ্যাপক হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, যা বর্তমানে প্রচলিত বাংলা ভাষার সঙ্গে অনেক তফাত। চর্যাপদের সময়ে যে বাংলা ভাষা প্রচলিত ছিল, তা অন্ত্যজ শ্রেণির ভাষা। রূপান্তরিত হতে হতে আজকের বাংলায় পরিণত হয়েছে। বাংলা ভাষার বর্ণমালার বয়স হাজার বছর, বাংলা বর্ণমালার বয়স ৫০০ বছর। উনিশ শতকে বাংলা ভাষার কর্তৃত্বশীল প্রমিত রীতি ছিল সাধু রীতি, বিশ শতকের শেষের দিকে চলিত রীতিতে ব্যবহারিক পরিধির সম্প্রসারণ ঘটে। শুধু চলিত রীতি মুখের ভাষাই নয়, জাতীয় অগ্রগতির ঐতিহাসিক প্রয়োজনেই বিকশিত। তাই ভাষার চাহিদা আজ ক্রমেই পরিসর অতিক্রম করে বিস্তৃত হয়ে উঠেছে, অতিক্রম করছে সীমানা।

ভাষাভাষীর সংখ্যা অনুযায়ী পৃথিবীতে বাংলা ভাষার স্থান ষষ্ঠ এবং বাংলা ভাষাভাষীর সংখ্যা ২৩০ মিলিয়ন (২০০৮ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী)। এর ফলে এ ভাষা পৃথিবীর বহুল ব্যবহূত ভাষার মধ্যে অন্যতম বিবেচিত হয়। এ ভাষাভাষীর জনসংখ্যা, দক্ষিণ এশিয়ায় ঐতিহাসিক অঞ্চলের স্থানীয় একটি জনগোষ্ঠী যার অধিকাংশই বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা রাজ্যে কেন্দ্রীভূত। বাংলাদেশের জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় ভাষা বাংলা। ভারতের ২৩টি রাষ্ট্রীয় ভাষার মধ্যে বাংলা ভাষা অন্যতম রাষ্ট্রভাষা। বাংলা ভাষা, পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরার রাষ্ট্রীয় ভাষা। দক্ষিণ এশিয়া উপমহাদেশ, মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চল, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা মহাদেশে অভিবাসীদের কারণে বাংলা ভাষা বিস্তৃতি হয়েছে প্রতিনিয়ত।

বিশ্ব মানচিত্রে বাংলা ভাষার অবস্থান ও সংখ্যাগত উপাত্ত :

দক্ষিণ এশিয়া উপমহাদেশ :বাংলাদেশে-১৫৬ মিলিয়ন, ভারতে-৭০ মিলিয়ন, পশ্চিমবঙ্গ (সরকারি ভাষা), ত্রিপুরা (সরকারি ভাষা), আসাম রাজ্যের কাছাড়, করিমগঞ্জ, গোয়ালপাড়ায় (সহ-সরকারি ভাষা), ধুপরি জেলা, বিহার, ঝাড়খন্ড রাজ্যেও ধানবাদ (দ্বিতীয় সরকারি ভাষা), সিংভুম, সাঁওতাল পরগনা, উড়িষ্যা রাজ্যের বালাসোর জেলা, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ ইউনিয়ন এলাকা। পাকিস্তানের করাচি-২০ (পাকিস্তানে স্বীকৃত দ্বিতীয় ভাষা), নেপাল-২.৩ মিলিয়ন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া-সিঙ্গাপুর।

মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চল (সংযুক্ত আরব আমিরাত) :সৌদি আরব ১০ মিলিয়ন, কুয়েত ১.৫ মিলিয়ন, বাহরাইন ১.২ মিলিয়ন, ওমান ১.১৫ মিলিয়ন, ইউরোপের গ্রেট ব্রিটেন ৫ মিলিয়ন। উত্তর আমেরিকা-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১.৪৩ মিলিয়ন। দক্ষিণ কোরিয়া ১.৩ মিলিয়ন, জাপান ০.১ মিলিয়ন। কানাডা ০.২৫ মিলিয়ন। ইতালি ০.৩৫ মিলিয়ন। অস্ট্রেলিয়া ০.২ মিলিয়ন।

আফ্রিকা মহাদেশের সিয়েরা লিয়নে বাংলা ভাষাভাষীর সংখ্যা ৫০০০। শান্তিরক্ষা বাহিনী জাতিসংঘের মিশনে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলা ভাষাকে সিয়েরা লিয়নে সরকারি ভাষা ঘোষণা করা হয়। ভাষার রূপান্তর অথবা বিলুপ্তির পেছনে অনেক কারণ কাজ করে। সংস্কৃতির বিলুপ্তির কারণেও ভাষার বিলুপ্তি হয়ে থাকে। পৃথিবীর অর্ধেক ভাষার কোনো লিখিত রূপ নেই, যা ভাষার রূপান্তরের অন্যতম কারণ। রাষ্ট্রভাষা উর্দু করার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছিল এ জাতি। বাংলা ভাষার জন্য প্রাণ দিতেও দ্বিধাবোধ করেনি। যদিও দুঃখজনক বাস্তবতা, অভিবাসীদের পরবর্তী প্রজন্ম অনেকেই বাংলা পড়তে, লিখতে কিংবা বাংলায় স্বপ্ন দেখে না। এমনকি আমাদের দেশেও অপেক্ষাকৃত অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল ব্যক্তির সন্তান ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করে। কারণ ক্রমেই ছোট হয়ে আসা বিশ্বের জন্য ইংরেজি বেশি প্রয়োজন। ভাষাবিদের মতে, বিশ্বের ভাষার জীবন এখন নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে কত দ্রুত তা তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তিতে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে। বিশ্বায়নের ফলে মানুষ তার ভাষা হারিয়ে ফেলছে। যোগাযোগ করার জন্য মানুষ এখন সবচেয়ে বেশি যে ভাষার ব্যবহার হয় তা-ই ব্যবহার করে। বর্তমানের বিশ্বের প্রচুর মানুষ বাংলায় কথা বললেও ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ব্যবহূত ভাষার মধ্যে বাংলা নেই। ৮২ দশমিক ২ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ইংরেজি, চায়নিজ, স্প্যানিশ, পর্তুগিজ, আরবি, ফরাসি, রুশ ও কোরীয় ভাষা- এই আটটি ভাষা মধ্যে একটি ব্যবহার করে। উপমহাদেশীয় কোনো ভাষা এই আটটির মধ্যে নেই। বাংলা ইন্টারনেট ভাষা হিসেবে গড়ে না ওঠার বড় কারণ হচ্ছে এর উচ্চারণ এবং কাঠামো। এতে রয়েছে অপেক্ষাকৃত বড় বর্ণমালা এবং জটিল সংযুক্ত বর্ণ, রয়েছে একই শব্দের নানা রকম বানান আর আঞ্চলিক উচ্চারণ। আর একটি বড় বাধা হচ্ছে বাংলা ভাষার প্রক্রিয়াকরণ যথেষ্ট স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। বাংলা ভাষাকে বিশ্বায়ন এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে বহুমাত্রিক ব্যবহারের জন্য বাংলা ফ্রন্ট ও ইউনিকোড প্রমিতকরণ করতে হবে। ভাষার প্রসার ও তাকে রক্ষা করার মূল বাধাগুলো দ্রুত ও যথাযথভাবে শনাক্ত না করা যায় তা হলে সে ভাষা বদলে যাবে, বিলুপ্তি ঘটবে, পরিবর্তিত হবে ভাষা মানচিত্র।

মানচিত্রে সাধারণভাবে কোনো দেশের শুধু প্রভাবশালী ভাষাই উপস্থাপিত হয় কিন্তু অন্য ভাষার অধিক্রমণ প্রদর্শন হয় না। তাই ভাষার স্থানিক বিশ্নেষণের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ভাষা বহমান, তাই সময়ের সঙ্গে পরিধির পরিবর্তন ঘটছে, পরিবর্তন হচ্ছে মানচিত্রে বাংলা ভাষার স্থানিক উপস্থাপন।



তথ্যসূত্র :চড়ঢ়ঁষধঃরড়হ : ইধহমষধফবংয : ঞযব ডড়ৎষফ ঋধপঃ নড়ড়শ ঈবহঃৎধষ ওহঃবষষরমবহপব অমবহপরবং.





বিষয় : চতুরঙ্গ মার্জিয়া লিপি

মন্তব্য করুন