স্কাউটিং আন্দোলনের প্রবক্তা লর্ড ব্যাডেন পাওয়েল ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দের ২২ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন এবং তারই হাত ধরে ১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দে স্কাউটিং আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। তাই ২২ ফেব্রুয়ারি বিশ্বব্যাপী স্কাউট দিবস হিসেবে পালিত হয়। স্কাউটিং বর্তমান বিশ্বে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি শিক্ষামূলক একটি স্বেচ্ছাসেবী, চরিত্র গঠনমূলক, অরাজনৈতিক আন্দোলন; যার মাধমে শিশু, কিশোর এবং যুবকদের শারীরিক, আধ্যাত্মিক সামাজিক, নৈতিক, বুদ্ধিভিত্তিক, সাংস্কৃতিক, সৃষ্টিশীল, আত্মনির্ভরশীল, নৈতিক দায়িত্ববোধ, মানসিক দৃঢ়তা, মেধা-মননশীলতা সংযম, শৃঙ্খলা তথা মানবিক গুণাবলি বিকাশে সহায়ক বিশেষ ভূমিকা পালন করে চলছে।

বর্তমান বিশ্বের ১৭০টি দেশের প্রায় চার কোটিরও বেশি শিশু, কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী, যুব বয়সী স্কাউটিংয়ের আদর্শ অনুপ্রাণিত হয়ে নিজেদের আলোকিত করছে। আলোর পথের অভিযাত্রীর অংশ হিসেবে বাংলাদেশেও প্রায় ১৭ লাখের ওপর কাব স্কাউট, স্কাউট স্কাউটদের সংখ্যা অবিশ্বাস্যভাবে বেড়েই চলছে। রোভার স্কাউট প্রতিজ্ঞা, আইন, মূলমন্ত্র অনুসরণে ব্যক্তি নিজে আত্মমর্যাদায় নির্ভরশীল হয়ে সৃষ্টিকর্তা নিজ নিজ দেশের প্রতি কর্তব্য, অপরের জন্য নিজেকে আত্মনিয়োগ করে থাকে। প্রত্যেকে মোরা পরের তরে, কথা কাজে স্বচ্ছ নির্মল চিন্তার বিকাশ সাধন করার মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করার সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিত, দীক্ষায় দীক্ষিত হয়ে জীবনকে সার্থক সৌন্দর্যমণ্ডিত করার অবারিত সুযোগ তৈরি হয়।

বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে রোভার অঞ্চল বাংলাদেশ স্কাউটসের ১৩টি অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে বড় অঞ্চল। এর যাত্রা শুরু হয় ১৯৭২ সালের ৩ ও ৪ এপ্রিল তৎকালীন নিবেদিত প্রাণ স্কাউটার ও রোভারদের আন্তরিক ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় গঠিত আজকের বাংলাদেশ স্কাউটস রোভার অঞ্চল। লেখাপড়ার পাশাপাশি অবসর সময়কে কাজে লাগিয়ে যুবকদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে ৬৪টি জেলাতেই রোভার স্কাউটস রয়েছে। সব কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় সমপর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মাদ্রাসা, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মুক্তদলের স্কাউটস কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা জেলা রোভার স্কাউটসের দায়িত্ব।

১৯৭৮ সালে গাজীপুর জেলায় বাহাদুরপুর রোভার পল্লিতে বাংলাদেশ স্কাউটস রোভার অঞ্চলের নিজস্ব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপিত হয়। বর্তমানে এ প্রতিষ্ঠানটির জমির পরিমাণ ৭০ বিঘা। চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর পাহাড়ি অঞ্চলে প্রায় ৭.২০ একর জমির ওপর বাংলাদেশ স্কাউটস রোভার অঞ্চলের অ্যাডভেঞ্চার ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। ১৮৮.১১ একর খাসজমির ওপর রোভার অঞ্চলের অনুকূলে ব্যবহারের অনুমতি পেয়েছে ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে। বাংলাদেশ রোভার স্কাউটস শিল্প সাহিত্যে সংস্কৃতি তথা সৃজনশীল কাজেও নিয়োজিত। এরই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ স্কাউটস রোভার অঞ্চল রোভার স্কাউটিং সংক্রান্ত বই নিয়মিত প্রকাশ করে থাকে। এ ছাড়া স্কাউটিং কার্যক্রম সংক্রান্ত মাসিক পত্রিকা 'রোভার' নিয়মিত প্রকাশিত হয়। সেবা প্রদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ স্কাউট কর্তৃক মেডেল অব মেরিট, সি এন সিস অ্যাওয়ার্ড, রৌপ্য ইলিশ, রৌপ্য ব্যাঘ্র ও আঞ্চলিক পর্যায়ে বিভিন্ন অ্যাওয়ার্ড প্রদান করে থাকে।

মানবজীবনের একমাত্র ব্রত হলো সেবা। সেবাই ধর্ম, মানবকূলের হৃদয়ের সব তৃপ্তি, সুখ-সমৃদ্ধি পরিবার, সমাজ, দেশ তথা বিশ্বমানবতার চেতনাশীল দায়িত্ব মনস্কতাসম্পন্ন মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার ক্ষেত্রে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তথা আত্মোন্নয়নের গুণে গুণান্বিত হয়ে সমাজ হিতৈষী কাজে স্কাউটিং আলোর পথের আলোকিত জীবন সন্ধানের বাতিঘর হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। মানবিক সমাজ বিনির্মাণে অনস্বীকার্য ভূমিকায় সুদীর্ঘ কাল ধরে। সমাজ, রাষ্ট্র তথা দেশ ছাড়িয়ে বিশ্বভ্রাতৃবোধ জাগরণ, সেবার মানসিকতা তৈরি, বৈশ্বিক সংগঠন যার মাধ্যমে বিভিন্ন সমাজসেবামূলক, সমাজ উন্নয়নমূলক বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হয়। যেমন শিশু স্বাস্থ্য প্রকল্প, ইপি আই প্রকল্প, ফ্রি ফাইডে ক্লিনিক, শিক্ষা প্রকল্প, বিভিন্ন স্বনির্ভর প্রকল্প, পল্লি উন্নয়ন, মৌমাছি প্রকল্প, বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম, রক্তদান, পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা ইত্যাদি জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি।

স্কাউটিংয়ের মধ্য দিয়ে মানবিক সমাজ নিরূপণের বিভিন্ন ভূমিকায় বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, আপৎকালীন উদ্ধার তৎপরতা, আর্তমানবতার সেবায় নিরলসভাবে স্কাউটরা ত্যাগের মহিমায় সমোজ্জ্বল। শিশু স্বাস্থ্য, পুষ্টি সচেতনতা, শিশুদের ভিটামিন-এ ক্যাপসুল খাওয়ানো, টিকাদান কর্মসূচিসহ নিয়মানুবর্তিতা, সহমর্মিতা, চরিত্র গঠন, সৎ ও সত্যবাদিতা, শারীরিক ও মানসিক সুস্থ-সবলতার চর্চা, কারিগরি দক্ষতা, আত্মনির্ভশীলতা, বিনয়ী ধৈর্যধারণের মৌলিক শিক্ষা, কর্মঠ ও শ্রমের প্রতি মর্যাদা, পরোপকারী গঠনমূলক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে সামাজিক নানা অনাচার রোধ করা সম্ভব। যেমন যৌতুকবিরোধী, বাল্যবিয়ে, অ্যাসিড নিক্ষেপ, যৌন হয়রানি, মাদকের মতো সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে কাজ করে।

স্কাউটরা প্রকৃতির প্রতি দায়বদ্ধতার জায়গা, পরিবার, সমাজ, দেশ জাতি তথা বিশ্বজনীন কল্যাণমুখিতার শুভ বার্তা ছড়িয়ে দিতে নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে থাকে। বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দক্ষতা ও মানবিক গুণাবলি অর্জনের মধ্য দিয়ে আগামীর সমাজ উন্নয়ন ও সেবার লক্ষ্যে আজীবন স্বেচ্ছায় আত্ম নিয়োগের মাধ্যমে অকাতরে বিলিয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে সমাজ সেবা ও সমাজ উন্নয়নের অংশ হিসেবে দারিদ্র্য, জনবহুল ও দুর্যোগ প্রবণ এলাকাগুলোতে রোভার মানবতার জয়ধ্বনি গেয়ে থাকে। তাতে সমাজ গতিশীলতার দিকে সম্মুখপানে এগিয়ে যায়। বিশ্ব স্কাউট আন্দোলনের ৫টি শীর্ষ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বিশ্ব ভ্রাতৃত্ববোধ সমাজকল্যাণ ও মানবিক গুণাবলি বিকাশ স্কাউটিং অতীব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেই চলছে। তাই এই মহৎ আন্দোলনের নেতৃত্বকে এগিয়ে নিয়ে যেতে তথা সুযোগ্য নেতা তৈরিকরণে স্কাউট আন্দোলনকে বেগবান করতে হবে। এর ফলে দেশে ও সমাজে ফিরে আসবে শান্তি ও সম্প্রীতি।


বিষয় : মোশারফ হোসেন চতুরঙ্গ

মন্তব্য করুন