'নিশা লাগিল রে, বাঁকা দুই নয়নে নিশা লাগিল রে/হাছন রাজা পিয়ারির প্রেমে মজিল রে,' এই নেশামাখা গানের সুর কার হৃদয় না ছুঁয়েছে? কে বা না জানে তার এই যৌবনের স্বপ্নভঙ্গের গানের কথা- 'ও যৌবন ঘুমেরই স্বপন, সাধন বিনে নারীর সনে হারাইলাম মূলধন।' অমর গান- 'লোকে বলে, বলেরে, ঘরবাড়ি ভালা নয় আমার/কি ঘর বানাইমু আমি শূন্যের মাঝার...।' মরমি গীতিকবি দেওয়ান হাছন রাজার এই গানটি শুনেননি- এমন কারও খোঁজ মেলা ভার। সুরমা নদীর তীরে বিশাল জমিদার পরিবারে জন্ম আর বেড়ে ওঠা হাছনের। বলা হয়, বাঙালি দর্শনচেতনা বিবেচনায় লালনের পরই হাছন রাজার স্থান। ঘুরে এলাম তারই পদধূলিতে ধন্য ওই সুনামগঞ্জ।

২০১৯ সালের ১৯ অক্টোবর। দেশের শীর্ষ ইলেকট্রনিক্স পণ্যের ব্র্যান্ড ওয়ালটনের সুনামগঞ্জ প্লাজার সামনে চিত্রনায়ক মামনুন হাসান ইমনের সম্মানে একটি বিরাট প্যান্ডেল সাজানো হয়েছে। উদ্দেশ্য, এই চিত্রনায়কের কাছ থেকে ওয়ালটন ফ্রিজ কিনে পাওয়া ২০০ শতাংশ ক্যাশ ভাউচার গ্রহণ করবেন উত্তরাঞ্চলীয় এই জেলার দুই সৌভাগ্যবান ফ্রিজ ক্রেতা। এই প্রোগ্রাম উপলক্ষে সুনামগঞ্জ শহরে সাজসাজ রব। ওয়ালটনের প্রতিনিধি হয়ে সেই প্রোগ্রাম কাভার করতেই সুনামগঞ্জে যাওয়া। সুনামুদ্দির (জানা যায়, মোগল সিপাহি সুনামুদ্দির নামে সুনামগঞ্জের নামকরণ করা হয়) সুনামগঞ্জের সুরমা নদীও দর্শনের সুযোগ এই প্রথম।

প্রোগ্রাম দুপুর ২টার দিকে। ঢাকা থেকে বিমানে আসবেন ইমন ভাই। কিন্তু আমাদের মিডিয়া টিমে লোকজন বেশি থাকায় আমরা গাড়িতে সুনামগঞ্জে পৌঁছে যাই আগের রাতেই (১৮ অক্টোবর, ২০২০)। দুপুর ২টার দিকে ঢাকার মিডিয়া অফিস থেকে গাড়িতে উঠলাম। সঙ্গে ফটোগ্রাফার লিটন ভাই, তার সহকারী ও ড্রাইভারসহ আমরা চারজন। পথেই রাত গভীর। কিন্তু কাত হতে হয়েছে গন্তব্যে পৌঁছেই।

রাতের সুনামগঞ্জের হাওর-বাঁওড় আর ভয়-ভীতি পেরিয়ে ২টার দিকে পৌঁছে গেলাম আগে থেকেই নির্ধারিত হোটেলে। হোটেলটাও সুরমা নদীর ধার ঘেঁষেই। হোটেলে যাওয়ার আগেই রেস্টুরেন্ট খুঁজছিলাম। নদীর কাছেই রেস্টুরেন্টে রাতের খাওয়া-দাওয়া। রাতের নিভু আলোতে তখন নদীর পানি স্পষ্ট দেখা না গেলেও জল-কলতানে বুঝেছি, এই জলস্রোতে যৌবনের তেজ আছে। প্রোগ্রাম দুপুরে হওয়ায় চিন্তামুক্ত। ঘুমাতে যেতে দেরি হওয়ায় ঘুম ভেঙেছে ঘুমের ইচ্ছাতেই।

লেখক, সাংবাদিক ও উপস্থাপক উদয় হাকিম স্যার আমার ভ্রমণপিয়াসী মনে পাল তুলে দিয়েছেন। নতুনভাবে প্রাণশক্তি যোগ করেছেন। যেখানেই যাই তার কথা কানে বাজে- 'যেখানেই যাবেন সেখানকার দর্শনীয় জায়গাগুলো ঘুরে আসবেন। জীবনটা খুবই সংক্ষিপ্ত। দেখার আছে, জানার আছে অনেক।' অফিসের কাজে বা বক্তিগতভাবে যেখানেই যাই না কেন, গুরুত্বপূর্ণ কাজ শেষে সবকিছুর আগে খোঁজ নিই কোথায়, কী দর্শনীয় আছে। এতে অবশ্য কো-ট্রাভেলাররা অনেকে বিরক্ত হন। কিন্তু আপনাকে দমানো যে দায়। দমানোর প্রয়াসও নেই অবশ্য।

ফটোগ্রাফার লিটন ভাইকে নিয়ে ১১টার দিকে প্রোগ্রাম ভেন্যুতে গেলাম। সবকিছু ঠিকঠাক আছে কিনা দেখে নিলাম। কাছেই সংশ্নিষ্ট ওয়ালটন আউটলেটে গিয়ে বিজয়ী ক্রেতাদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় কাজ সমাপ্ত করলাম। ম্যানেজারের কাছে জানতে চাইলাম দেখার মতো কী আছে সুনামগঞ্জে! সানোয়ার ভাই বললেন, পাশেই সুরমা নদী। এ ছাড়া দুই মিনিটের দূরত্বে হাছন রাজা মিউজিয়াম! অল্প সময়ের মধ্যেই ঘুরে আসতে পারবেন। হাছন রাজা নামটি শোনার সঙ্গে সঙ্গে মাথায় বিদ্যুৎ খেলে গেল। তাই তো! এখানেই তো হাছন রাজার বাড়ি! দাপুটে এই রাজা শুয়ে আছেন এই মাটিতেই। তার কতগুলো গানের কথা মনে পড়ে যায়। কে আর ঠ্যাকায় আমায়!

১টার দিকে ছুটলাম মিউজিয়ামের দিকে। রাস্তার বিভিন্ন বাঁকের কারণে ৫ মিনিটের মতো সময় লেগেছে। স্থানীয় ট্রাফিক পয়েন্ট থেকে গাড়িতে একই সময়ে পৌঁছানো যায়। প্রধান ফটকে গিয়ে দেখা গেল, পকেট গেট খোলাই রয়েছে। ভেতরে যেতে বেগ পেতে হলো না। গেট থেকে কয়েক কদম সামনে হাঁটলেই মিউজিয়াম। সদলবলে মিউজিয়াম কমপ্লেপে গিয়ে হাজির।

মিউজিয়ামের ভেতরে প্রবেশের আগেই বাইরে থেকে কিছু ছবি তুলে নিলাম। জাদুঘরের ঠিক সামনে সবুজ ঘাসে আচ্ছাদিত ছোট্ট আকারের একটি খালি জায়গা দেখা যাবে। পেছনে এবং ডানে-বামে রয়েছে কয়েকটি আবাসিক ভবন। চোখে পড়বে আধা পাকা বাড়িও। জানা গেল এসব বাড়ি-ঘরে রাজার প্রপৌত্রদের বসবাস। বাঁ-দিকটায় বেশকিছু খালি জমি পড়ে আছে। সেগুলোর তেমন কোনো কদর আছে বলে মনে হয় না। বড় বড় ঘাসে ভরা। ঘাসগুলোরও কোনো যত্ন-আত্মি করা হয় বলে মনে হলো না। বৃষ্টিতে কর্দমাক্ত জায়গাটা। বর্ষায় তাই সাবধানে পা ফেলতে হয়। বাঁ-দিকেই বড় আকারের একটা পুকুর। স্বচ্ছ পানি। একটু ছুঁয়েই আসা যাক না নীলাভ পানি!

জাদুঘরের সামনেই রাজার কিছু আলোকচিত্র প্রদর্শিত হচ্ছে। নামের সঙ্গে অবয়বের দারুণ মিল রাজার। হাছন রাজা যে সুদর্শন ছিলেন তা আলোকচিত্রগুলো দেখে সহজেই অনুমান করা যায়। সহজেই বোঝা যায় হাছনের যৌবনকালে নারীরা কেন তার প্রতি এত দুর্বল ছিলেন! যৌবনের শুরুতে তিনি ছিলেন ভোগবিলাসে মত্ত এবং শৌখিন জীবন-যাপনে অভ্যস্ত। নারীসঙ্গে নাকি ছিলেন অক্লান্ত! হ্যাঁ, তাই তো হওয়ার কথা। কী নেই তার? এক সময় অত্যাচারী আর নিষ্ঠুর রাজা হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠলেন। 'সর্বলোকে বলে হাছন রাজা লম্পটিয়া'...! নিজের লেখা এসব গানের মধ্যমে অনুমান করা যায় তার আত্মোপলব্ধি।

ইংরেজ আমলে হাছন রাজার বাবা ছিলেন সিলেটের বিখ্যাত জমিদার। বিশাল রামপাশা এস্টেট ছাড়াও সুনামগঞ্জের লক্ষ্মণশ্রী, চামতলা, মহারাম, পাগলা, লাউড় ও বর্তমান ভারতের করিমগঞ্জের অনেক সম্পত্তির মালিক ছিল এই পরিবার। সে সময় তাদের সম্পত্তির পরিমাণ ৫ লাখ বিঘার বেশি। কিশোর বয়সে বাবা দেওয়ান আলী রাজার মৃত্যু হলে জমিদারি দেখার ভার আসে তার ওপর। অল্প বয়সে এত সম্পত্তির মালিক হওয়ায় বিলাসী জীবনযাপন করেন ভাওয়ালী নৌকা এবং ঘোড়ায় চড়তে পছন্দ করা এই রাজা। ইংরেজবিদ্বেষী ছিলেন হাছন। পরাধীনতা মেনে নেননি কখনও। তাই তার এস্টেটের জন্য লিটন নামে একজন ইংরেজ ম্যানেজার রাখেন। রাখেন একজন ইংরেজ দেহরক্ষীও।

ঐশীপ্রেমী এ সাধকের ব্যবহূত কুর্তা, খড়ম, তরবারি, পাগড়ি, ঢাল, থালা, বই, নিজের হাতে লেখা কবিতা ও গানের পাণ্ডুলিপি দর্শকদের পুলকিত করে। যেসব টেবিল-চেয়ার আর তৈজসপত্র তিনি ব্যবহার করতেন, তার অনেক কিছুরই দেখা মেলে মিউজিয়ামে। শোকেসে হাছন রাজার ব্যবহূত পোশাক রাখা আছে। মখমলের আলখাল্লা। সাদা গেঞ্জি। দেখা মিলল তার ব্যবহূত দুধের পাত্র আর পানদানিরও।

মিউজিয়ামের ভেতরে আলোকচিত্রগুলো দেখছিলাম। ভাবছিলাম, যার কথা জানি এই তো সেই হাছন, যিনি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করেননি। অথচ বাংলা দর্শন ও বাউল সাহিত্যে অনন্য অবদান তার। ছিলেন স্বশিক্ষিত। কত সহজ-সরল সুরে আঞ্চলিক ভাষায় হাজারো গান রচনা করে গেছেন। বাংলা ভাষাকে করেছেন সমৃদ্ধ। কবিগুরুও নাকি হাছন রাজাকে পত্রযোগে প্রশংসা জানিয়েছিলেন।

কী এক আধ্যাত্মিক স্বপ্ন-দর্শন এই দাপুটে রাজার জীবন-দর্শন আমূলে পাল্টে দিল? মনোজগতের এই বিরাট পরিবর্তনের মাধ্যমে চরিত্রে এলো সৌম্য ভাব। ত্যাগ করলেন বিলাসী জীবন। নির্লোভ হতে শুরু করলেন ধন-সম্পত্তি, নারী আর বৈষয়িক সবকিছুর প্রতি। এ পর্যায়ে শোধরাতে লাগলেন নিজেকে। রাজকীয় পোশাকটাও ছাড়লেন অবশেষে! বিষয়-সম্পত্তি বিলিবণ্টন করে দরবেশ জীবন-যাপন শুরু করলেন। চলে গেলেন এ কোন চূড়ান্ত জীবন-লক্ষ্যে? ওহ! কীসের সেই সাধন! 'একদিন তোর হইব রে মরণ রে হাছন রাজা'- এজন্যই কি হাছন রাজা গেয়েছিলেন এমন গান? ফটোগ্রাফারের ডাকে চমকে উঠলাম! বেরিয়ে গেলাম মিউজিয়াম থেকে। ভাবনার রেশ যায় না।

পৌর এলাকার গাজীর দরগা। মায়ের পাশেই এই পারিবারিক কবরস্থানে শুয়ে আছেন রাজা। মিউজিয়াম থেকে বেরিয়ে এবার যাব সেখানে। এই দরগায় বছরজুড়েই দর্শনার্থীরা আসেন। গাড়িতে থেকেই দেখছিলাম স্থানটি। হঠাৎ যানজটের কবলে পড়ায় আর নামা হয়নি গাড়ি থেকে। গাজীর দরগায় একটা গেট আছে বটে। তবে রক্ষণাবেক্ষণ তেমন হয় বলে মনে হলো না।

কবরস্থানটি দেখে মনে পড়ে যায় ওই গানটা- 'হাছন রাজায় কয় আমি কিছু নয় রে আমি কিছু নয়, অন্তরে-বাহিরে দেখি কেবল দয়াময়...।' হাছন রাজা এভাবেই তার আত্মার পরিচয় পেয়েছিলেন। 'আমি আমার পরিচয় পাইয়াছি, আমি বুঝিয়াছি তুমি ভিন্ন আমি কিছু নহি, তুমি (আমি) বলিয়া একটি ভবের খেলা খেলাইতেছে। তুমি ঘরে তুমি বাইরে, তুমি সকলের অন্তরে বিরাজমান।' হয়তো এই কবরে শুয়ে সেই আত্মার সঙ্গেই খেলছেন হাছন!

কালোত্তীর্ণ এ সাধকের জন্ম-মৃত্যুবার্ষিকী নীরবেই আসে যায়। কারও তেমন কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। হাছন রাজা-লালনকে কতটুকু জানি আমরা? লালন নিয়ে কিছু মাতামাতি দেখলেও হাছন রাজাকে নিয়ে উল্লেখযোগ্য তেমন কিছু চোখে পড়ে না। ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদ হাছন রাজার গানগুলোকে মধ্যবিত্ত শ্রেণির কাছে পৌঁছে দিতে পেরেছিলেন তার কর্মে। সে জন্যই হয়তো এখনও তার গানগুলো হারিয়ে যায়নি।

মেঘে মেঘে বেলা বহুদূর। আমাদের সাংস্কৃতিক দৈন্যতা আর যায় না। নিজস্ব গৌরবান্বিত সংস্কৃতির দিকে নজর না দিয়ে এক 'হুজুগে পাগলা' আর 'জগাখিচুড়ি' সংস্কৃতির দিকেই ধাবিত হচ্ছি আমরা। যেন বিপথে পথ হারিয়েছে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি। আকাশ সংস্কৃতির কবলে চোরাবালিতে হারাতে বসেছে সংস্কৃতির নিজস্বতা।

সংস্কৃতির অনেক ধ্বজাধারী আছেন। তাই সে চিন্তা আপাত ক্ষ্যান্ত দিয়ে চললাম সুরমা নদীর দিকে। গভীর রাতে যখন নদীর পাড়ে এসেছিলাম, তখনই মনে হয়েছিল এই জায়গাটায় নদীটা খুব প্রশস্ত নয়। দিনের বেলাতে তাই দেখছি ভালোভাবে। নদীর দু'ধারে গোসলে ব্যস্ত কোলঘেষা মানুষরা। দুপুরের প্রখর রোদে দাঁড়িয়েই ছবি তুলে নিলাম। মনে হলো নদীটা এক সময় প্রশস্ত ছিল। সে সময় নিশ্চয়ই তার যৌবন বেগ ছিল আরও গতিময়। স্রোতস্বিনী সুরমা তার নাব্য হারাচ্ছে। নদীর বেশিরভাগ স্থানে স্পষ্টতই চর জেগেছে। সুরমার চেহারায় এসেছে বিশাল পরিবর্তন। এই সেই সুরমা, যে নদী হাছন রাজার চরণ ধুয়েছে। সুরমার পাড়েই রাজা হয়তো সুরের প্রেরণা খুঁজে পেয়েছিলেন। হয়তো তাকে বাউলা কিংবা কবি বানিয়েছিল ওই সুরমাই। এই নদীই শিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাসকে শঙ্খচিল হতে তাড়া দিয়ে থাকতে পারে। বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের কণ্ঠেও হয়তো সুর দিয়ে থাকতে পারে এই সুরমা।

বিষয় : হাছন রাজা

মন্তব্য করুন