দেশে ২০২০ সালে এক বছরে ইন্টারনেট সংযোগ বেড়েছে এক কোটি ২৪ লাখ ৪৭ হাজার। এর মধ্যে মোবাইলে ৮৬ লাখ ৭২ হাজার এবং ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ বেড়েছে ৩৭ লাখ ৮০ হাজার। আর এক মাসের ব্যবধানে ডিসেম্বরে ব্রডব্যান্ড সংযোগ হয়েছে ৮ লাখ ৬৬ হাজার। বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি) প্রকাশিত সর্বশেষ ইন্টারনেট সংযোগের হিসাব থেকে এমন তথ্য পাওয়া যায়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিদায়ী বছরের শেষ মাসে দেশে মোট ইন্টারনেট গ্রাহক ১১ কোটি ১৮ লাখ ৭৫ হাজার। এর মধ্যে মোবাইলে ইন্টারনেট ব্যবহার করেন ১০ কোটি ২৩ লাখ ৫৩ হাজার। আর ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ সংখ্যা পৌঁছেছে ৯৫ লাখ ২২ হাজারে।

বৈষম্য আমাদের কাছে স্বাভাবিকভাবেই পরিচিত একটি শব্দ। আর্থিক বৈষম্য, সামাজিক বৈষম্য ইত্যাদি আমরা প্রতিনিয়ত শুনে থাকি। প্রযুক্তির উৎকর্ষের এই যুগে আমরা নতুন এক বৈষম্য দেখতে পাচ্ছি আর তা হলো ডিজিটাল বৈষম্য। প্রযুক্তি অগণিত মানুষের জীবনকে বদলে দিয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই; তবে বহু মানুষ প্রযুক্তি ব্যবহারের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সেটিও মেনে নিতে হবে। করোনাকালে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেই স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়েছে। ব্যক্তিগত ও আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বহু দেশ তাদের দৈনন্দিন কার্যক্রম অনলাইনভিত্তিক করেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা অফিস-আদালত সব ক্ষেত্রেই বিকল্প হিসেবে প্রযুক্তির সাহায্য নিতে হয়েছে। ডিজিটাল বৈষম্যের আলোচনা এখন তাই ব্যাপকভাবে হচ্ছে। বিশ্বে বহু মানুষ আছে, যারা প্রযুক্তির নানা সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তাদের জন্য অনলাইন ক্লাস, অফিস প্রভৃতি একটি বিভীষিকার নাম। ডিজিটাল বৈষম্য একটি বৈশ্বিক সমস্যা। উন্নত বিশ্বের বহু দেশ এ সমস্যায় ভুগছে। আমেরিকা ও ইউরোপেও দেখা যায়, বহু মানুষ প্রযুক্তি সুবিধার ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে। আবার এর সঙ্গে নানা সামাজিক শ্রেণিবিভাজনও যুক্ত হয়ে যায়। অঞ্চল, লিঙ্গ, আর্থসামাজিক অবস্থাও ডিজিটাল বৈষম্যের সঙ্গে জড়িত থাকে। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর অবস্থা যে আরও খারাপ, তা সহজেই বোঝা যায়।

আমরা অনেকেই নানাভাবে শুনেছি, বহু ছাত্রছাত্রীকে বাড়ি থেকে বহু দূরে গিয়ে অনলাইন ক্লাসে অংশ নিতে হয়েছে। ডিজিটাল বৈষম্যের আরও অনাকাঙ্ক্ষিত চিত্র হয়তো সামনে আমরা আরও দেখতে পাব। আমরা যদি এখনকার বড় বড় ব্যবসার মাধ্যমগুলো দেখি, তাহলে দেখা যাবে সেগুলোর উল্লেখযোগ্য একটি অংশ অনলাইননির্ভর হয়ে গেছে। গুগল, আমাজন, আলিবাবা, ফেসবুক প্রভৃতির কথা আমরা সবাই জানি। এসব কোম্পানি বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা করছে অনলাইনের ওপর নির্ভর করেই। আমাদের দেশের অনলাইননির্ভর কেনাকাটা শুরু হয়েছে। প্রযুক্তি ব্যবহার করে বহু মানুষই এই শতকে এগিয়ে যাবে। তবে বহু মানুষ আছে, যারা প্রযুক্তি সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকবে- এও সত্য। এতে নানা অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য আরও বৃদ্ধি পাবে, এতেও সন্দেহ নেই।

ডিজিটাল বৈষম্য দূর করার পদক্ষেপ অবশ্যই নিতে হবে। একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে হবে। ইন্টারনেট সহজলভ্য করা, প্রযুক্তি সম্পর্কিত অবকাঠামোর উন্নয়ন করা, মানুষকে প্রযুক্তি-সাক্ষর হিসেবে গড়ে তোলার মতো পদক্ষেপগুলো ডিজিটাল বৈষম্য রোধে ভালো ভূমিকা রাখবে। ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে ডিজিটাল বাংলাদেশের ধারণা অনেকেই অনুধাবন করতে পারেনি। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ 'ভিশন ২০২১'-এর মাধ্যমে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে এবং এতে সব ক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির অধিকতর ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার যেমন দারিদ্র্য বিমোচনের সহায়ক একই সঙ্গে তা সুশাসন, গুণগত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষা নিশ্চিতের মাধ্যমে সামাজিক ন্যায্যতা তৈরিতে ভূমিকা রাখে। ২০২১ সালের মধ্যে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, সব ইউনিয়নে কমিউনিটি ই-সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা, ই-গভর্ন্যান্স প্রতিষ্ঠা করা, ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ব্যবহারের হার ৪০ শতাংশে নিয়ে যাওয়া ইত্যাদি। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি নীতিমালায় তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নে অন্যতম কৌশল হিসেবে তথ্যপ্রযুক্তিতে সামাজিক সমতা ও সর্বজনীন প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে; যাতে অনগ্রসর জনগোষ্ঠী, নারী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন এমন ব্যক্তিদের তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যম সমাজের মূলস্রোতে নিয়ে আসা।

ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার কাজে বেশ কিছু অর্জন ও অগ্রগতি হয়েছে। করোনাকালে বিভিন্ন সেবা যেমন তথ্য সংগ্রহ, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, ই-কমার্স, মোবাইল ফাইন্যান্সিং ইত্যাদি ক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার অনেক বেড়েছে। তবে ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মাণের ক্ষেত্রে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতাও সামনে এসেছে। করোনাকালে সব জনগোষ্ঠী তথ্যপ্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণ করতে পারেনি। মূলত দরিদ্র ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠী, যারা গ্রামাঞ্চলে বসবাস করে, যাদের প্রয়োজনীয় ডিজিটাল ডিভাইস বা সংযোগ নেই বা সেবা গ্রহণ করার জন্য যাদের প্রয়োজনীয় তথ্য ও দক্ষতা নেই তারা এই সেবা গ্রহণ থেকে বঞ্চিত হয়েছে কিংবা এখনও পিছিয়ে পড়েছে। বর্তমানে দেশের ৫৫ শতাংশ গ্রামীণ পরিবারে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুবিধা নেই। পাশাপাশি গ্রামীণ পরিবারগুলোর ৫৯ শতাংশের স্মার্টফোন নেই এবং ৪৯ শতাংশের কম্পিউটার ব্যবহারের সুযোগ নেই। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সেবা গ্রহণে যেমন স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, ইন্টারনেট সংযোগ গুরুত্বপূর্ণ একই সঙ্গে সেবাগুলোর সহজীকরণ ও তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষতাও প্রয়োজনীয়। এ দুই ক্ষেত্রেই দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর ঘাটতি রয়েছে।

প্রযুক্তি ক্ষেত্রে অসমতা দেশের জনগণের মধ্যকার বর্তমান অসমতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। এমনিতেই আমাদের শ্রেণিবিভক্ত সমাজে সরকারি-বেসরকারি সেবায় সবার সমান সুযোগ না পাওয়া এক বাস্তবতা। সরকার প্রণীত তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি নীতিমালায় 'সামাজিক সমতা ও সর্বজনীন প্রবেশাধিকার' অংশে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে। এখন এই নীতিমালা বাস্তবায়ন করা জরুরি এবং এ জন্য সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। সবার আগে তথ্যপ্রযুক্তিকে সব জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় নিয়ে যেতে হবে। এ জন্য সরকারি উদ্যোগে তথ্যপ্রযুক্তিতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করতে হবে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে উদ্যোগী করে তুলতে হবে। পাশাপাশি কম খরচে বিশেষত দরিদ্র জনগোষ্ঠী ও নারীরা যাতে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে এই উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

বিষয় : ডিজিটাল বৈষম্য

মন্তব্য করুন