সম্প্রতি সেনাবাহিনী কর্তৃক মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের পর থেকে সেখানে গণআন্দোলন চলছে। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে দানা বেঁধে ওঠা এ আন্দোলনের অংশ হিসেবে সড়ক অবরোধ, গণজমায়েত, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অফিস ত্যাগসহ বিভিন্ন প্রতিবাদ কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে। এসব কর্মসূচি দেখে বোঝা যায়, দেশটির বৃহত্তর নাগরিক সমাজ অং সান সু চির সঙ্গে আছে এবং তারা সামরিক শাসন জারিকে অবৈধ মনে করে। মিয়ানমারের এই গণআন্দোলন সে দেশের জাতীয় জীবনে একটা নতুন মোড় এনে দিয়েছে।

এ কথা সত্য যে, রোহিঙ্গা নির্যাতনের কারণে গণতান্ত্রিক বিশ্ব অনেক আগেই মিয়ানমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ের গণআন্দোলন পুনরায় দেশটির দিকে বিশ্ববাসীর নজর ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। কারণ, শক্তিশালী এবং নীতিহীন সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলন কার্যক্রম পরিচালনা এবং কর্মসূচিতে যোগ দেওয়া সহজ ব্যাপার নয়। তাই মিয়ানমারের জনগণকে বিশ্ববাসী বাহবা দিচ্ছে। কিন্তু এসব দেখে বাংলাদেশের মানুষের ভুলে যাওয়ার সুযোগ নেই যে, কিছুদিন আগে মিয়ানমারের এই জনগণই রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নেওয়া ইতিহাসের জঘন্যতম মানবতাবিরোধী অভিযানের বিপক্ষে একটা টুঁ-শব্দও করেনি। যার ফলাফল হিসেবে বাংলাদেশকে ১০ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী নিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

এখন মিয়ানমারের জনগণ যেভাবে সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে লড়াই করছে, তা দেখে তাদের রাজনীতিকে আর সেনাবাহিনীর হাতের পুতুল ভাবা যায় না। তারা যথেষ্ট পরিপক্ব একটি জনগোষ্ঠী বলে মনে হয়। এই আন্দোলন অং সান সু চির জন্য একটা বিরাট ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে। বিশ্ববাসী যদি এটা বুঝতে পারে, অং সান সু চি মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও সেনাবাহিনীর ব্যাপক ক্ষমতার কারণে আগে তাকে সেনাবাহিনী এবং জনগণ এই দুই পক্ষকেই সামলাতে হয়েছে এবং দুই পক্ষের কেউই তখন রোহিঙ্গাদের সুনজরে দেখেনি, তাহলেই কেবল সেনাবাহিনীর দোসর হিসেবে অতিবাহিত সময়ে তার পদস্খলনের দায়ভার হালকা করার একটা সুযোগ থাকে। বিশ্ববাসী এটা বলতে পারে যে, মিয়ানমারের বৃহত্তর জনগণ যদি রোহিঙ্গা উচ্ছেদকে খারাপ দৃষ্টিতে দেখত তাহলে তারা রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বন্ধে সক্রিয় হতো, যেমনটা এখন প্রতিবাদ-বিক্ষোভে রাস্তায় নেমেছে। তাই বলা যায়, রোহিঙ্গা ইস্যুতে এই বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ভেতরে শাসকগোষ্ঠীর সমান্তরাল একটা অনৈতিক চিন্তা যদি থেকে থাকে, তাহলে সু চির রোহিঙ্গাবিরোধী কর্মকাণ্ডের মধ্যে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর চাওয়া এবং সেনাবাহিনীর চাপের কারণের মতো একটা অনুষঙ্গ উঠে আসে।

অং সান সু চি প্রথম প্রথম বলতেন, রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের খবর মিথ্যা। তারপর বিশ্ব সম্প্রদায়ের সামনে গণহত্যার প্রমাণ চলে এলে তিনি সেটাকে গোপন করার চেষ্টা করেন। কিন্তু সত্য এটা যে, শুধু সেনাবাহিনী নয়, অং সান সু চির দল এনএলডির বহু নেতা রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচারের ঘটনায় জড়িত ছিল। সর্বশেষ তিনি ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে হেগের আদালতে গিয়ে নির্যাতনের কথা অস্বীকার করে এসেছেন। এখন তার দায় এড়ানোর একটা মাত্র পথ খোলা আছে; তিনি বলতে পারেন, বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মন জোগাতে তিনি এসব করেছেন। তবে যে-যাই বলুক না কেন, মিয়ানমারের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী এবং অং সান সু চির রাজনৈতিক দল রোহিঙ্গাদের ভিটেছাড়া করে বাংলাদেশে পাঠানোর কাজে সেনাবাহিনীর সহযোগী ছিল, তা অস্বীকার করা যায় না।

মিয়ানমারের মানুষ রোহিঙ্গা ইস্যুতে যে ভুল করেছিল, এবার তাদের সেটা বোঝার সময় হয়েছে। সেনাবাহিনী যদি সামনের দিনগুলোতে আরও কঠোর অবস্থানে গিয়ে আন্দোলন দমাতে চায়, তখন এই জনগণ বুঝতে পারবে, আগে নিশ্চুপ থাকা বা অত্যাচারে ইন্ধন জোগানো তাদের জন্য কত বড় ভুল ছিল। তাদের নীরবতা নির্যাতনের হাতকে তখন শক্ত করেছিল, আর সেই হাত আজ তাদের দিকেই ধেয়ে আসছে। এই বাস্তবতা উপলব্ধি করে সেনাশাসন হটাতে আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রাপ্তির লক্ষ্যে মিয়ানমারবাসী গণতন্ত্রকামী মানুষকে এখন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে দেশে ফেরানোর আন্তর্জাতিক উদ্যোগকে সমর্থন জানানো উচিত। আশার কথা- ইতোমধ্যে জানা গেছে, গণতন্ত্রকামী মানুষের আন্দোলনে কিছু রোহিঙ্গা যোগ দিয়েছে এবং মিয়ানমারের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী ভেঙে-যাওয়া সম্পর্কটা জোড়া লাগাতে আগ্রহী এবং চলমান আন্দোলনে তারা রোহিঙ্গাদেরও পাশে চায়। সেনাশাসন হটানোর আন্দোলনে যোগ দিতে পারলে রোহিঙ্গাদেরও একটা ভরসা থাকবে, আন্দোলন সফল হলে এবং সেনাবাহিনী বিদায় নিলে তারা তাদের স্বভূমিতে ফিরে যেতে পারবে।

শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো উন্নয়ন- সব বিষয়ে রোহিঙ্গাদের পেছনে রেখে একটা বিভক্ত সমাজ বানানো হয়েছিল, তা স্পষ্ট হয়েছে তাদের গোষ্ঠীর শরীরী ভাষায়। যদি রোহিঙ্গারা কখনও দেশে ফিরে যেতে পারে, তাদের উচিত হবে নিজেদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক উন্নয়নের কথা ভাবা এবং তাদের জনগোষ্ঠীকে সুশিক্ষিত করে তোলা। নিজেদের শিক্ষা-সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার দিক দিয়ে কাছাকাছি নিয়ে আসতে না পারলে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে ন্যায্য পাওনা আদায় করা যায় না।

আমরা চাই, গণন্ত্রকামী আন্দোলনরত বৃহত্তর মিয়ানমার জনগোষ্ঠীর সঙ্গে রোহিঙ্গাদের একটা সমঝোতা গড়ে উঠুক। তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় যদি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে রোহিঙ্গারা দেশে ফিরে গেলে পারস্পরিক সহমর্মিতার পথ উন্মুক্ত হবে। মিয়ানমারের আন্দোলনকারীদেরও বুঝতে হবে, আজ তারা যে গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন করছে তার মধ্যে মানবতা এবং সংখ্যালঘুর সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার অন্তর্ভুক্ত। নিজ ভূখণ্ডে নাগরিক সুবিধা নিয়ে বেঁচে থাকা রোহিঙ্গাদের গণতান্ত্রিক অধিকার। তাদেরকে সেই অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া বড় গণতান্ত্রিক চেতনা।

বিষয় : গণআন্দোলন মিয়ানমার

মন্তব্য করুন