ট্রান্সকন্টিনেন্টাল রাষ্ট্র রাশিয়া যার দাপ্তরিক নাম রাশিয়ান ফেডারেশন। পূর্ব ইউরোপ থেকে উত্তর এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত রাশিয়ান ফেডারেশন বিশ্বের বৃহত্তম রাষ্ট্র। পৃথিবীর মোট স্থলভাগের এক-অষ্টমাংশজুড়ে বিস্তৃত রাশিয়ায় স্লোভেনিক ভাষা প্রচলিত; যা ইউরোপের মধ্যে সর্বাধিক ব্যবহৃত একক ভাষা।

পারমাণবিক শক্তিধর এই দেশটি মানব উন্নয়ন সূচকে বেশ এগিয়ে। এ ছাড়া রাশিয়ার স্বাস্থ্যব্যবস্থা বেশ উন্নত। রাশিয়ায় রয়েছে বিনামূল্যে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ সংবলিত একটি উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা। শিক্ষা ক্ষেত্রে রাশিয়ার অভূতপূর্ব সাফল্য রয়েছে। শিক্ষা ও গবেষণায় দেশটি অত্যন্ত গুরুত্ব প্রদান করে থাকে। রাশিয়া শিক্ষা ও গবেষণায় গুরুত্ব আরোপ করে মহাকাশ তথা চন্দ্র-মঙ্গল গ্রহ বিজয়ের গর্ব অর্জন করেছে।

লেনিন, স্ট্যালিন, কালিনিনদের দেশ রাশিয়া ১৯২২ সালে ইউএসএসআর গঠন করে; যা সোভিয়েত ইউনিয়ন নামে পরিচিত ছিল। ১৯৯১ সালের ২৫ ডিসেম্বর সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙনের পূর্ব পর্যন্ত এটি ছিল বিশ্বের অন্যতম প্রধান সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র।

২০১৩ সালের তথ্য মতে রাশিয়া শিক্ষা খাতে জিডিপির ৩.৮ শতাংশ ব্যয় করে থাকে। 'মিনিস্ট্রি অব এডুকেশন অ্যান্ড সায়েন্স' রাশিয়ার শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। রাশিয়ার মোট জনসংখ্যার ৯৯.৭% মানুষ সাক্ষরতা অর্জন করেছে। ২০১৬ সালের এক হিসাবে রাশিয়ার ২৫-৬৪ বছর বয়সী ৫৪% মানুষ মাধ্যমিক শিক্ষা লাভ করে। অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের ৩৫টি দেশের মধ্যে মাধ্যমিক শিক্ষা অর্জনে রাশিয়া দ্বিতীয় সফলতম রাষ্ট্র।

প্রত্যেক শিক্ষার্থীর ওপর নজর নিশ্চিত করতে রাশিয়ার স্কুল-কলেজগুলোর ক্লাস ছোট আকারের হয়ে থাকে। রাশিয়ান শিক্ষা ব্যবস্থা ইউরোপের মধ্যে অষ্টম সেরা এবং বিশ্বের মধ্যে ১৪তম সেরা। বিজ্ঞান ও গণিতে রাশিয়া ভীষণ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। মাধ্যমিক পাস করা শিক্ষার্থীদের কলেজে ভর্তির হিসেবে এবং মোট কলেজ গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে স্নাতকদের তালিকা বিবেচনায় রাশিয়া বিশ্বের মধ্যে তৃতীয় স্থান লাভ করেছে।

রাশিয়ার শিক্ষাব্যবস্থা দুটি পর্যায়ে বিভক্ত। প্রথমত, প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা এবং মাধ্যমিক শিক্ষা নিয়ে জেনারেল এডুকেশন। ট্রেনিং, ভোকেশনাল ও উচ্চশিক্ষা মিলিয়ে প্রোফেশনাল এডুকেশন। রাশিয়া শিক্ষার্থীদের প্রাথমিকভাবে একটা নূ্যনতম পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষা নিশ্চিত করে। এরপর যোগ্যতা ও দক্ষতা অনুযায়ী তাদের জন্য কর্মমুখী শিক্ষার ব্যবস্থা করে। ফলে নিজ নিজ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা দক্ষ হয়ে ওঠে ও যোগ্য বিশ্ব নাগরিক হয়ে উঠতে পারে।

রাশিয়ায় ১ থেকে ৩ বছর বয়সী শিশুরা প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে থাকে। এই পর্যায়ে শিশুদের আচরণ, আদবকেতা ও বর্ণ পরিচয় করানো হয়ে থাকে। মূলত মানব চরিত্র গঠনের শিক্ষা দেওয়া হয়ে থাকে এই পর্যায়ে। রাশিয়ার জেনারেল এডুকেশন ৩টি ভাগে বিভক্ত। যার মধ্যে প্রথম থেকে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক, পঞ্চম থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত মাধ্যমিক ও দশম থেকে একাদশ শ্রেণি পর্যন্ত উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা। রাশিয়ার ৪ থেকে ৭ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুরা প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করে থাকে। এই পর্যায়ে শিশুরা কিন্ডারগার্টেনে শিক্ষা লাভ করে।

রাশিয়ার স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থী-শিক্ষকের অনুপাত ১১:১ জন। প্রথম থেকে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত ১ জন শিক্ষকই শিক্ষার্থীদের সব বিষয়ে শিক্ষা দিয়ে থাকেন। তবে শারীরিক শিক্ষা ও বিদেশি ভাষা শিক্ষার জন্য স্কুল পর্যায়ে আলাদা শিক্ষক থাকেন। প্রাথমিক স্কুল পর্যায়ে ভাষা, গণিত, বিজ্ঞান, ধর্মীয় শিক্ষা ও নৈতিকতার পাশাপাশি শারীরিক শিক্ষা এবং বিদেশি ভাষা শিক্ষা দেওয়া হয়ে থাকে। প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা খরচের ৮০% স্থানীয় প্রশাসন বহন করে থাকে, বাকি অর্থ অভিভাবকরা স্কুলকে প্রদান করে থাকেন। ১৯৯৮ সালের রাশিয়ান অর্থনৈতিক মন্দার পরবর্তীতে দেশটি তার শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যাপক সংস্কার করে; যা রাশিয়ার শিক্ষা ব্যবস্থাকে বদলে দিয়েছে।

রাশিয়ার ঐতিহ্যবাহী দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলো জিমনেশিয়াম ও লাইসিয়াম। রাশিয়ায় ১৭ শতকে প্রথম জিমনেশিয়াম চালু হয় এবং এই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার ভাষা ছিল রাশিয়ান। ১৯১৭ সালের রাশিয়ান বিপ্লব পর্যন্ত এই দেশে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান চালু ছিল। এ ছাড়া রাশিয়ায় মাধ্যমিক স্তরের অন্যান্য যেসব প্রতিষ্ঠান ছিল তা সরাসরি মস্কো ও কাজান বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হতো। উনিশ শতকের শুরুতে প্রতিষ্ঠিত লাইসিয়ামগুলো প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংমিশ্রণ ছিল। ১৮৬৪ সালে একটি সংস্কারের মাধ্যমে রাশিয়ান শিক্ষা ব্যবস্থায় দুটি ভিন্ন ধারা প্রবর্তিত হয়। একটি ছিল ক্ল্যাসিক আর অন্যটি নরমাল। ক্ল্যাসিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রাচীন ইতিহাস ও ভাষার প্রতি জোর দেওয়া হতো। অন্যদিকে নরমাল স্কুলগুলোতে বিজ্ঞানের প্রতি জোর দেওয়া হয়।

১৮৭১ সালের চার্টার অনুযায়ী ক্ল্যাসিক স্কুলগুলো রাশিয়ান মূলধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ১৯১৭ সালে প্রথম নরমাল স্কুলের শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য যোগ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এ সময় স্কুলগুলোতে কমিউনিস্ট মতাদর্শ চর্চার ওপর জোর দেওয়া শুরু হয়। ১৯৩৪ সালের বিধিবিধান অনুযায়ী রাশিয়ায় দুই ধরনের মাধ্যমিক শিক্ষার প্রচলন ঘটে। ৭ বছরের অসম্পূর্ণ মাধ্যমিক শিক্ষা ও ১০ বছরের সম্পূর্ণ মাধ্যমিক শিক্ষা। ১৯৫৯ সালের আইনে মাধ্যমিক শিক্ষাকে ১১ বছর মেয়াদি ঘোষণা করা হয়। ১৯৮০ সালের দিকের আর্থসামাজিক সংকট রাশিয়ার শিক্ষা ব্যবস্থাকে বিপন্ন করে তোলে। এ জন্য ১৯৮৪ সালে শিক্ষার সংস্কারে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয় কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। এ সময় শিক্ষার্থীদের শ্রেণি কক্ষের আয়তন নির্ধারণ করা হয়, পাঠদানের সূচি পরিবর্তিত হয়। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের প্রতি নজর রাখার নিমিত্তে অভিভাবকদের একাডেমিক ডিরেক্টর নিয়োগ করা হয়। এ ছাড়া নিয়মিত অভিভাবক সভা আয়োজনের প্রক্রিয়া চালু হয়।

২০০৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে রাশিয়ায় মাধ্যমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ৬ থেকে ১৫ বছর বয়সী সব শিক্ষার্থীর জন্য বিদ্যালয়ে গিয়ে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করা এখানে বাধ্যতামূলক। এর মধ্যে ৬-৯ বছর বয়স পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা এবং ১০-১৫ বছর বয়স পর্যন্ত মাধ্যমিক শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত। এর আগ পর্যন্ত ৯ বছর মেয়াদি মাধ্যমিক শিক্ষা প্রচলিত ছিল যার মধ্যে দশম থেকে একাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা গ্রহণ ঐচ্ছিক ছিল। রাশিয়ায় মাধ্যমিক শিক্ষা দুটি ধারায় বিভক্ত। সাধারণ শিক্ষা ও বিশেষায়িত শিক্ষা। জেনারেল এডুকেশন সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য প্রযোজ্য, অন্যদিকে ফিজিক্যালি চ্যালেঞ্জড শিক্ষার্থী ও অন্যান্য বিশেষ শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষায়িত শিক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। জেনারেল এডুকেশনে শিক্ষার্থীদের মাধ্যমিক পর্যায়ে ভাষা, গণিত, বিজ্ঞান, ধর্ম ও সংস্কৃতি, অর্থনীতি, ভূগোল, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, শারীরিক শিক্ষা, চিত্রকলা, কারুশিল্প প্রভৃতি বিষয় পড়ানো হয়। অন্যদিকে বিশেষায়িত বিদ্যালয়গুলোতে বিশেষ মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা-প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়। এ স্কুলগুলো মূলত লাইসিয়াম নামে পরিচিত।

৯ বছরের শিক্ষা লাভের পর শিক্ষার্থীদের ২ বছরের উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অথবা ২ বছরের কর্মমুখী শিক্ষার মাঝে যে কোনো একটিকে বেছে নিয়ে হয়। কর্মমুখী শিক্ষার জন্য রাশিয়ায় বিশেষায়িত স্কুল রয়েছে। উচ্চ মেধাবী শিক্ষার্থী উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণের পথ বেছে নেয় এবং পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা গ্রহণ করে। বাদ-বাকি শিক্ষার্থীরা কর্মমুখী ভোকেশনাল ট্রেনিংয়ের পথে যায়। ২ বছরের ভোকেশনাল স্কুলিং শেষে তারা কাজে যোগদান করতে পারে। রাশিয়ায় বাধ্যতামূলক মাধ্যমিক শিক্ষার শেষ দুই বছর স্কিপ করে অনেকেই মিলিটারিতে যোগদান করে এবং সেখানে পর্যাপ্ত ট্রেনিং শেষে আলাদাভাবে মাধ্যমিক শিক্ষা লাভ করে। পরে তাদের অনেকেই উচ্চ শিক্ষাকেন্দ্রে ভর্তি হয়।

রাশিয়ায় স্কুল-কলেজে সকাল ৮টা থেকে ক্লাস শুরু হয় এবং তা দুপুর ১-২টা পর্যন্ত চলে। ক্লাসের দৈর্ঘ্য হয় ৪০-৪৫ মিনিট এবং দুটি ক্লাসের মাঝে ৫-১০ মিনিটের সংক্ষিপ্ত একটি বিরতি থাকে। এখানে সপ্তাহে ৫ দিন ক্লাস হয়। শনি ও রোববার সাপ্তাহিক ছুটি থাকে। তবে কিছু কিছু শিক্ষার্থীর উন্নতির জন্য শনিবারেও স্কুলগুলো বিশেষ ক্লাস নিয়ে থাকে। শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নের জন্য রাশিয়ায় রয়েছে বিশেষায়িত গ্রেডিং সিস্টেম। শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় ২-৫ এর মধ্যে গ্রেডিং করা হয়। ৫ হলো সর্বোচ্চ গ্রেড। এখানকার সব শিক্ষার্থীকে একটি ডায়েরি মেইনটেইন করতে হয়। এই ডায়েরিতে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নের ফলাফল লিখে রাখেন। ফলে অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা কোনো শিক্ষার্থীর অগ্রগতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পান।

রাশিয়ান শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষাবর্ষ শুরু হয় সেপ্টেম্বর মাস থেকে এবং তা পরবর্তী ক্যালেন্ডার ইয়ারের জুন মাসে শেষ হয়। জুলাই ও আগস্ট মাস দুটিতে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ ছুটি লাভ করে। এ সময় তারা শিক্ষাভ্রমণ ও কাজ করে বিভিন্ন অভিজ্ঞতা অর্জন করে থাকে। রাশিয়ায় জেনারেল এডুকেশনে সবার জন্য একই কারিকুলামে শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়, তবে বিশেষায়িত কিছু পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানে আলাদা সিলেবাস রয়েছে।

মস্কো ও তার আশপাশের অঞ্চলে বিশেষত ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল দেখা যায়। এ স্কুলগুলোর মধ্যে অ্যাংলো-আমেরিকান স্কুল অন্যতম। এ ধরনের স্কুলগুলো স্টেট নিয়ন্ত্রিত স্কুলের মতো বিনা বেতনের নয়। বরং এগুলোতে উচ্চহারে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বেতন নেওয়া হয়।