আমার বয়স এখন ৭৩। মনে পড়ে সেসব দিনের কথা- বঙ্গবন্ধুকে আমি কাছ থেকে দেখেছি। আমি বঙ্গবন্ধুর পারিবারিক চিকিৎসক ছিলাম। বঙ্গবন্ধুর পিতার চিকিৎসার দায়িত্বে ছিলাম।

ডাক্তারি পাস করেছিলাম ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে। ১৯৬৫ থেকে '৬৯ সাল পর্যন্ত আমি ঢাকা মেডিকেলের ছাত্র ছিলাম। এর মধ্যেই যুদ্ধ এসে গেল। তাই রেজাল্ট বেরোলো না, তখন আমি ঢাকা মেডিকেলে ছাত্রলীগের কর্মী।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রমনার মাঠে আমরা সবাই দল বেঁধে গিয়েছিলাম বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক ভাষণ শুনতে। মঞ্চের একদম সামনে থেকে বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণ শোনার অভিজ্ঞতা আমার হয়েছিল। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম- ওই ভাষণের মধ্য দিয়ে সেদিন সমগ্র জাতির মতো আমিও দিকনির্দেশনা পেয়েছিলাম। এখনও মনে পড়ে বঙ্গবন্ধুর সেই ১৯ মিনিটের বজ্রনির্ঘোষ।

এর ঠিক ক'দিন পরেই ২৫ মার্চ রাত দুটোর সময় পাকিস্তানি বাহিনী নেমে পড়ল ঢাকার রাজপথে। অবরুদ্ধ হলো ঢাকা। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করে পাকিস্তানি হানাদাররা নৃশংসভাবে হত্যা করল জাতির বিবেকদের। সেই রাতের কথা আমার আজও মনে আছে। যখন দিনটির কথা স্মরণ করি, ভয়ে শিউরে উঠি। সেই রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজের হোস্টেল থেকে পালিয়ে গিয়েছিলাম আমি বন্ধুদের সঙ্গে। যদি হোস্টেলে থাকতাম তাহলে হয়তো পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে জগন্নাথ হলের ছাত্র-শিক্ষকদের যে পরিণতি হয়েছিল তা আমার ভাগ্যেও ঘটত।

ছাত্ররাজনীতি করার জন্য আমরা তখন ঘন ঘন বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডির বাড়িতে যেতাম। সেখানে বিভিন্ন আলোচনায় এটা বুঝতে পারতাম, এবার কিছু হতে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর বডিল্যাঙ্গুয়েজ একটা কথাই বলত, এই দেশ আমাদের। আমরা কোনোভাবেই পাকিস্তানিদের বরদাশত করব না। ২৫ মার্চের সেই ভয়াবহ রাতের পর ঢাকার বিভিন্ন অঞ্চলে লুকিয়ে ছিলাম। এ সময় নির্দেশ এলো, নিরাপদ জায়গায় সরে যাও। সময় হলে আবার সংগঠিত হতে হবে। আমি অনেক কষ্ট করে গোপালগঞ্জে চলে এলাম। গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধুর বাড়ি টুঙ্গিপাড়ার কাছে মুকসুদপুর থানা এলাকার টেংরা গ্রামে আমার গ্রামের বাড়ি ছিল। যদিও বেশির ভাগ সময় আমি গোপালগঞ্জ টাউনে থাকতাম। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী গোপালগঞ্জে চলে এলে আমি পালিয়ে ভারতে চলে আসি। প্রথমে আসি কলকাতায়। সেখানে এসে দেখা হয়ে যায় আমাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রদের সঙ্গে। আমরা তখনও ডাক্তারি ফাইনাল রেজাল্ট পাইনি। কিন্তু প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে বারাসাত স্টেশনের সামনে আমবাগানে একটি অস্থায়ী হাসপাতাল গড়ে তোলা হয়। সেখানে আমি চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলাম। বাড়ি থেকে বের হয়েছিলাম মুক্তিযুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করব বলে; কিন্তু চিকিৎসা শাস্ত্রের ছাত্র হওয়ার কারণে আমাকে ফ্রন্টে পাঠানো হয়নি। দায়িত্ব দেওয়া হলো যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এবং শরণার্থীদের সেবা করার। সেই কাজ আমি নিরলসভাবে করার চেষ্টা করেছিলাম। আমি জানতাম আমাদের দেশ একদিন স্বাধীন হবে। সেই স্বাধীনতা আমাদের এলো ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার রমনার মাঠে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণ করল যৌথ বাহিনীর হাতে। সেদিন আমাদের কী আনন্দ! স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র আর আকাশবাণী থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা শুনে উচ্ছ্বাস ধরে রাখতে পারছিলাম না। এরপর ফিরে গেলাম দেশে।

ঢাকায় যাওয়ার পর আমাদের রেজাল্ট বেরোলো। ডাক্তারি পাস করলাম; কিন্তু তখন গ্রামেগঞ্জে হাসপাতালগুলো বিধ্বস্ত। ডাক্তার নেই। আমাদের মতো বেঁচে থাকা কয়েকজন ডাক্তারকে পাঠিয়ে দেওয়া হলো মফস্বল এলাকায়। আমার বাড়ি গোপালগঞ্জ বলে আমাকে পাঠানো হলো দেশের বাড়িতে। গোপালগঞ্জ টিবি হাসপাতালে। কিন্তু সেখানে পরিকাঠামো না থাকায় আমাকে পাঠানো হলো টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর বাড়ির সামনে রেডক্রসের হাসপাতালে। এই হাসপাতালের চেয়ারম্যান ছিলেন বঙ্গবন্ধুর শ্বশুরমশাই মোশারফ হোসেন। আমার থাকার ব্যবস্থা হলো আমার স্বপ্নের নায়ক বাঙালির স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্নদ্র্রষ্টা বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে। সারাদিন হাসপাতালে কাজ করার পর বিকেলে বাড়িতে ফিরে আসতাম। বঙ্গবন্ধুর বাবা শেখ লুৎফর রহমান সাহেবের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে আর ওনার চিকিৎসা করে সময় ভালোই কাটছিল।

এই আড্ডায় বঙ্গবন্ধুর প্রসঙ্গ এলেই দেখতাম লুৎফর সাহেবের চোখে জল। তিনি বলতেন, খোকা (বঙ্গবন্ধুর ডাক নাম) আমার ছেলে শুধু নয়, ও দেশের ছেলে। ও কখনোই বেশিদিন বাড়ি থাকত না রাজনীতি করার জন্য। আর ঠিক এ কারণেই লুৎফর সাহেবের মনে একটা চাপা দুঃখ ছিল। বঙ্গবন্ধু দেশের দায়িত্ব নেওয়ার পর ঘন ঘন টুঙ্গিপাড়ার বাড়িতে আসতে পারতেন না। কিন্তু তিনি যখন আসতেন, জনতার ঢল নামত। ১০ মাইল দূর থেকে গোপালগঞ্জের মানুষ তাদের আদরের খোকাকে দেখতে ছুটে আসত।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সেই ভয়াল দিনটির কথা আমি আজও ভুলতে পারি না। যেদিন জাতির পিতাকে হত্যা করা হয়েছিল সপরিবারে, আমি সেদিন আর বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে ফিরে না গিয়ে ভারতের উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলাম। আর ফিরতে পারিনি আমার প্রিয় বাংলাদেশে। মীর জাফররা আঘাত হানল স্বাধীনতার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের ওপর।

এপারে চলে আসার পরে শুরু করলাম চিকিৎসক জীবন। সরকারি চিকিৎসক হিসেবে অবসর নিয়েছি অনেক দিন। সমসাময়িক রাজনৈতিক ও চিকিৎসা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ের ওপর আমার লেখা প্রকাশিত হয়েছে অনেক। সেই কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ভারত সরকার আমাকে নাগরিক হিসেবে সর্বোচ্চ সম্মান পদ্মশ্রী দিয়েছে এবার। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের একজন সৈনিক হিসেবে আমি এজন্য গর্বিত। দেশ থেকে দূরে থাকলেও আমি চাই আমার মাতৃভূমি বাংলাদেশ যেন ভালো থাকে। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে আমি কাছ থেকে দেখেছি। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার স্বপ্নকে তিনি যেন বাস্তবায়ন করতে পারেন- শেষ জীবনে এটাই আমার কামনা।

অনুলিখন: রক্তিম দাশ