প্রধানমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের চেয়ারম্যান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে আমার মিথস্কর্ম সম্পর্কে তার জন্মশতবর্ষে উৎসর্গিত বিভিন্ন প্রকাশনায় আমি লিখেছি। তিনিই আমাকে বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য নিয়োগ করেছিলেন।
এই প্রবন্ধটিতে আমি বঙ্গবন্ধুর আরও কিছু বৈশিষ্ট্য তুলে ধরতে চাই, যা আমার অন্য লেখায় স্থান পায়নি। ১৯৫৭ থেকে শুরু করে ১৯৭৫-এর আগস্টে তার শেষ দিনগুলো পর্যন্ত তার সাথে আমার বিস্তারিত সম্পর্কে আমি সেগুলো লক্ষ্য করেছিলাম। প্রথম অংশে রয়েছে সেই জননেতা বঙ্গবন্ধু, যিনি বাংলাদেশের জনগণকে ১৯৭০-এর ডিসেম্বরের নির্বাচনে তাদের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করতে সমাবিষ্ট করেছিলেন। দ্বিতীয় অংশে রয়েছে ১৯৭১-এর মার্চ মাসে গণতান্ত্রিক রায়প্রাপ্ত অবিসংবাদিত নেতা এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বঙ্গবন্ধুর আবির্ভাব। তৃতীয় অংশ বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত উপলব্ধি নিয়ে, অনেকগুলো বছর তার সাথে আমার অনেক ব্যক্তিগত দেখা-সাক্ষাতে তাকে কেমন দেখেছি, বুঝতে পেরেছি। বঙ্গবন্ধুর ক্ষেত্রে এই বিচিত্র পরিপ্রেক্ষিত নেওয়া হয়েছে আমার প্রকাশিত স্মৃতিকথা 'উতল রোমন্থন :পূর্ণতার সেই বছরগুলো' (Untranquil Recollections : The Years of Fulfilment) এবং আমার প্রকাশিতব্য আত্মস্মৃতির দ্বিতীয় খণ্ড থেকে।
বঙ্গবন্ধু :জননেতা
ইয়াহিয়া যখনই ১৯৭০-এর ১ জানুয়ারি থেকে উন্মুক্ত রাজনীতির অনুমতি দিয়েছিলেন, পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক দৃশ্য বিপুলভাবে পাল্টে যায়। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার পরেই বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক মাপ একটি উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। এবারে পাকিস্তানের ২২ বছরের ইতিহাসে প্রথম সাধারণ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা সামনে আসায় বঙ্গবন্ধু তার স্বরূপে চলে আসেন। আওয়ামী লীগ কোনো বিপ্লবী দল ছিল না; কিন্তু জনগণের মধ্যে তার গভীর শেকড় ছিল, নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য যা ছিল একটি সম্পদ। বঙ্গবন্ধুর প্রয়োজন ছিল মানুষের সাথে পুনর্যুক্ত হওয়ার এবং তাদের সমর্থনকে সচল করে তোলার সুযোগ।
পরবর্তী ১১ মাসে বঙ্গবন্ধু প্রদেশব্যাপী জোয়ারের প্লাবন তুলে চললেন, তার সামনের সবকিছুকে ভাসিয়ে নিয়ে। নির্বাচনের দিনের বেশ আগেই বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের কাছে এটা স্পষ্ট ছিল যে, আওয়ামী লীগ নির্বাচনে ধস নামিয়ে জিতবে। নভেম্বরে গাড়িযোগে মনপুরার বিধ্বস্ত এলাকায় যাওয়ার পথে আমি যখন তাজউদ্দীনের কাছে জানতে চাইলাম, তিনি এক হাতের আঙুলেই গুনে ফেললেন সম্ভাব্য কতগুলো আসনে আওয়ামী লীগ হারতে পারে। যা পরে ঘটল তাতে দুটো আসনে তারা হেরেছিল, ময়মনসিংহে কাউন্সিল মুসলিম লীগের প্রার্থী সাবেক মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিন এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমাপ্রধান রাজা ত্রিদিব রায়ের কাছে।
১৯৭০-এর মাসগুলোতে বঙ্গবন্ধু এক প্রতীকী উচ্চতায় উন্নীত হয়েছিলেন এবং সমগ্র নির্বাচনী অভিযানে তিনি প্রোজ্জ্বলভাবে প্রতিভাত হয়েছিলেন। ফোরাম-এর একটি লেখায় আমরা হিসাব করেছিলাম যে, বঙ্গবন্ধু যেসব নির্বাচনী এলাকা সফর করেন, সেখানে তা আওয়ামী লীগের প্রার্থীর ভোটের সংখ্যায় ১০ শতাংশ যোগ করেছিল। ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলামের সাথে একটি কথোপকথন আমার মনে পড়ছে, যেখানে তার নির্বাচনী এলাকায় এক অতিবৃদ্ধ কৃষককে যখন তিনি প্রশ্ন করেন। তিনি তাকে ভোট দেবেন কিনা? কৃষক উত্তর দিয়েছিলেন, "দুঃখিত, আপনাকে আমি ভোট দিতে পারব না, আমি মুজিব উদ্দিনকে ভোট দিচ্ছি।"
বঙ্গবন্ধুর সাথে নির্বাচনী প্রচারাভিযানে
আমি বঙ্গবন্ধুর সাথে ঢাকা থেকে কালীগঞ্জ গিয়েছিলাম, যেখানে তাজউদ্দীনের নির্বাচনী এলাকায় একটি নির্বাচনী সমাবেশে তিনি বক্তৃতা দেবেন কথা ছিল। পথে গোটা শিল্প এলাকার সমগ্র শ্রমিক-জনতা আদমজীনগরে জমায়েত হয়েছিল বঙ্গবন্ধুকে শুভেচ্ছা জানাতে এবং সমর্থন জানাতে। নারায়ণগঞ্জ লঞ্চঘাট থেকে কালীগঞ্জ- নদীতীরগুলোর প্রতি ইঞ্চি জনতায় ঠাসা। কিছুসংখ্যক বাম পার্টি-সমর্থকদের তখন বিশ্বাস ছিল যে, বঙ্গবন্ধু বাঙালি বুর্জোয়াদের প্রার্থী, তার সাথে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের যে সমর্থন তিনি পাচ্ছিলেন, তার কোনো মিল ছিল না। সাধারণ মানুষের মনে তিনি রাজনৈতিক নেতা থেকে রূপান্তরিত হয়েছিলেন তাদের আশা আর স্বপ্নের মানুষে। যে কোনো ব্যক্তির পক্ষে এ এক ভারী বোঝা এবং বঙ্গবন্ধু এ-রকম একটি রায়ের তাৎপর্যের উদ্বেগ সম্পর্কে আমাদের সাথে আলাপ করেছিলেন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটের এই পরিবর্তনকে একপক্ষ যারা স্বীকার করতে চাননি, তারা ছিলেন মনে হচ্ছে পাকিস্তানের নির্বোধ গোয়েন্দা সংস্থাসমূহ। জাতীয় নিরাপত্তার প্রধান এবং ইয়াহিয়ার রাজনৈতিক কৌশলপ্রণেতা লেফটেন্যান্ট জেনারেল উমরকে বিভ্রান্ত করেছিল সবুর খান, ওয়াহিদুজ্জামান এবং ফজলুল কাদের চৌধুরী। কাইয়ুম মুসলিম লীগের এই নেতারা তাকে বুঝিয়েছিল- 'ভাসানী ন্যাপের সাথে একযোগে তাদের পার্টির নেতারা পূর্ব পাকিস্তান থেকে জাতীয় পরিষদের এতটা যথেষ্ট আসন পাবে যে, মুজিব কোনো বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না এবং ৬ দফায় ছাড় দিতে বাধ্য হবে, যদি সে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে চায়। এই লক্ষ্যে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কোষাগার থেকে উমর কর্তৃক বিপুল অর্থ কাইয়ুম মুসলিম লীগের জন্য বিনিয়োগ করা হয়েছিল।'
বঙ্গবন্ধু :এক স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা পিতা
একটি জাতির জন্ম
জেনারেল ইয়াকুব যখন দেখলেন যে, সামরিক সমাধান সম্ভব নয়, ১৯৭১-এর ৪ মার্চ নাগাদ তিনি তার সেনাদের ক্যান্টনমেন্টগুলোতে ফিরিয়ে নিলেন। সেই পর্যায়েই তিনি বাংলাদেশের ওপরে পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব প্রত্যাহার করে নিলেন, তারই মধ্য দিয়ে ২৪ বছরের সাম্রাজ্যিক শাসনের ওপর তিনি পর্দা ফেলে দিলেন। একটি রাজনৈতিক সমাধান অর্জনের লক্ষ্যে পরিস্থিতি সামাল দিতে ঢাকা সফরে যেতে যখন তিনি ইয়াহিয়া খানকে রাজি করাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন, তখন তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের কমান্ডার হিসেবে পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন। ৫ মার্চ ইয়াহিয়াকে পাঠানো পদত্যাগপত্রে তিনি জানান যে, 'প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে শেখ মুজিবের কাছে, যিনি এখন কার্যত সরকারপ্রধান এবং গোটা জনজীবনকে নিয়ন্ত্রণ করছেন। ... বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো সামরিক সমাধান যে নেই সে-সম্পর্কে আমি নিশ্চিত। ফলত কোনো মিশন বাস্তবায়নের দায়িত্ব গ্রহণে আমি অক্ষম, অর্থাৎ সামরিক সমাধানের দায়িত্ব গ্রহণে, যার অর্থ হবে নিরস্ত্র বেসামরিক মানুষের ব্যাপক হত্যাকাণ্ড এবং কোনো সুস্থ লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থতা। এতে বিপর্যয়কর পরিণতি ঘটবে।' (সূত্র :খাদিম হোসেন রাজার স্মৃতিকথা, A Stranger in his Own Country)
ইয়াকুবের পদত্যাগপত্র ইয়াহিয়া গ্রহণ করলেন এবং বেলুচিস্তানের কসাই (ইঁঃপযবৎ) হিসেবে পরিচিত টিক্কা খানকে গভর্নর এবং প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের জন্য ঢাকায় পাঠালেন। ষাটের দশকে বেলুচিস্তানের একটি বিদ্রোহ দমনের জন্য ঐ পরিচয় দাঁড়িয়েছিল টিক্কা খানের। ৭ মার্চ ঢাকায় টিক্কার আগমন নির্দেশ করেছিল যে স্বশাসন অর্জন করার জন্য বাঙালিদের অনেক অনেক রক্ত ঝরাতে হবে।
৫ মার্চ নাগাদ সৈন্যদের ক্যান্টনমেন্টে ফিরিয়ে নেওয়াটি ঐতিহাসিক বিস্তারের একটি অসহযোগ আন্দোলনের ক্ষেত্র তৈরি করেছিল, যার সদৃশ কিছু অতীতে কখনও ঘটেনি। গোটা বেসামরিক আমলাতন্ত্র, পুলিশ বাহিনী, প্রাদেশিক আর কেন্দ্রীয় সরকারের সকল অংশ পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠিত সরকারকে সেবা প্রদান বন্ধ করে দেয়। অসহযোগ আন্দোলনের শীর্ষবিন্দু এসে গেল যখন পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি বদরুদ্দিন সিদ্দিকী পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে টিক্কা খানকে শপথ পড়াতে অস্বীকার করলেন। অসহযোগ আন্দোলন গুণগত এক নতুন স্তরে উত্তীর্ণ হলো, যখন সরকার ব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায় ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে তাদের প্রতিনিধি পাঠাল, বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাদের আনুগত্য জ্ঞাপন করতে। আমলাদের দ্রুত অনুসরণ করল ব্যবসায়ী সম্প্রদায়, যাদের ওপর প্রাধান্য ছিল অবাঙালিদের, তারাও তাদের সমর্থন জানাল। পৃথিবী এমন অনেক আন্দোলন প্রত্যক্ষ করেছে; কিন্তু আমার সর্বোত্তম জ্ঞানানুযায়ী, কোথাও এমন মাত্রায় তা ঘটেনি যেখানে পুলিশ বাহিনী, আইন-আদালত শুধু বিদ্যমান সরকারের আদেশ মান্য করতে অস্বীকার করেনি, তারা একজন রাজনৈতিক নেতার প্রতি আনুগত্য জানাতে গিয়েছে, যার কোনো আনুষ্ঠানিক সরকারি (Public) দপ্তর কিংবা দায়িত্ব ছিল না।
৭ মার্চ ইতিহাস সৃষ্টি হলো
রেসকোর্সে অনেক প্রত্যাশার ৭ মার্চের সভায় বঙ্গবন্ধু তার ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়েছিলেন, 'এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।' অনেকেই আশা করেছিলেন সেখানে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করবেন। একই সঙ্গে এটাও বিশ্বাস ছিল যে, তিনি তা করলে কুর্মিটোলার বিমানবাহিনী জনসভায় বোমা হামলা চালাবে, শুরু হয়ে যাবে একটি পূর্ণাঙ্গ গণহত্যা। এই শঙ্কার সত্যতা মেলে খাদিম হোসেন রাজার স্মৃতিচারণ থেকে। তিনি লিখেছেন যে, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বকে তিনি সাবধান বার্তা পাঠিয়েছিলেন যে, স্বাধীনতা ঘোষণার কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী পূর্ণাঙ্গ আক্রমণে চলে যাবে।
কামাল হোসেনের কাছ থেকে আমি জেনেছিলাম যে, আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের একটি জরুরি সভা ৭ মার্চের প্রাক্কালে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে অনুষ্ঠিত হয় এবং প্রায় রাতভর চলে। পরদিনের জনসভায় বঙ্গবন্ধুর কোন্‌ অবস্থান নেওয়া উচিত হবে- সেটাই ছিল আলোচনা। বঙ্গবন্ধু এবং তাজউদ্দীনের নেতৃত্বে অধিকতর জ্যেষ্ঠ নেতারা যুক্তি দেন যে, স্বাধীনতার ঘোষণার পর্যায় আসেনি, জনচেতনাকে অগ্রসর করার জন্য আরও সময়ের প্রয়োজন। স্বাধীনতা ঘোষণা মানুষকে যে সংগ্রামে নিয়ে যাবে, তার জন্য যে রক্তমূল্য দিতে হবে, তার জন্য আরও সময় চাই। সেই সময়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের মানুষের সশস্ত্র সংগ্রামে যাওয়ার সক্ষমতা সম্পর্কে কমই ধারণা ছিল এবং বাংলাদেশের ক্যান্টনমেন্টগুলোতে সেনাবাহিনীতে কর্মরত বাঙালিদের সম্ভাব্য ভূমিকা সম্পর্কে তারা নিশ্চিত ছিলেন না। আওয়ামী লীগের গরিষ্ঠ নেতাদের সংশয়ের বিপরীতে কাপালিক সিরাজ নামে পরিচিত সিরাজুল আলম খানের মতো তরুণ নেতাগণ দ্রুত স্বাধীনতা ঘোষণার পক্ষে বলেন, যেন একটি পূর্ণাঙ্গ মুক্তিযুদ্ধের উদ্যম তৈরি হয়। ৭ মার্চের জনসভায় যোগদানের আগে আমি এবং নূরুল ইসলাম তরুণ প্রজন্মের মেজাজ পরখ করার জন্য গাড়ি চালিয়ে ইকবাল হলে যাই। আমরা কাপালিকের দেখা পেয়ে যাই, তাকে বিষণ্ণ দেখাচ্ছিল এবং সে ইঙ্গিত করল যে, স্বাধীনতার কোনো নাটকীয় ঘোষণা আশা করা যাচ্ছে না। যেমনটা দাঁড়াল, বঙ্গবন্ধু তার রাজনৈতিক জীবনের সর্বাধিক কর্তৃত্বব্যঞ্জক বক্তৃতা করলেন, যাতে সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা না করেই তিনি বুঝিয়ে দিলেন যে বাঙালিদের স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগ দেওয়ার প্রস্তুতি নিতে হবে।
১ মার্চের পূর্বেকার উত্তেজনাপূর্ণ সময়ে উপরোল্লিখিত উদ্বেগের কিয়দংশ আমি আমার ফোরাম-এর লেখাগুলোতে প্রকাশ করেছিলাম। তাতে আমি ৬ দফা বাস্তবায়নের অর্থ এবং পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য বিবদমান বিষয়গুলোকে আরও পরিস্কার ভাষায় উপস্থিত করার চেষ্টা করি। ফোরাম-এর কলামে আমার লেখাগুলোর সাধারণ বিষয় ছিল এটাই যে, ৬ দফা ছিল পাকিস্তান সংকটের রাজনৈতিক সমাধানের সর্বশেষ সুযোগ। এর ওপরে ছিল গণআন্দোলন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার পথ। 'পাকিস্তান' প্রত্যয়ের সাথে খুব কম বাঙালিরই তখন কোনো আবেগী সংযোগ ছিল। একমাত্র প্রশ্ন ছিল পথের বিভাজন আসবে শাসনতান্ত্রিক বিবর্তন, না সশস্ত্র বিরোধের পথে।
স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়
ইয়াহিয়া খান কর্তৃক ১৯৭১-এর ১ মার্চ গণপরিষদের সভা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করার সিদ্ধান্তই আমার মতে, সেই সন্ধিক্ষণ যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে নির্মাণ করেছিল। সেদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে বাংলাদেশব্যাপী অসহযোগ আন্দোলনের সূচনা ছিল বাংলাদেশ সীমানার মধ্যে পাকিস্তান সরকারের রাজনৈতিক কর্তৃত্বের অস্বীকৃতি। এই রাজনৈতিক কর্তৃত্ব আর কখনোই ফিরে আসেনি। ১৯৭১-এর ২৬ মার্চের পরে পাকিস্তানের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার যাবতীয় প্রচেষ্টাকে বাংলাদেশের আমজনতা একটি বিদেশি দখলদার সামরিক শক্তি কর্তৃক বলপূর্বক জবরদখলের কর্মকাণ্ড হিসেবেই দেখেছে।
বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ আন্দোলনের ডাকের অর্জিত সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গেই বাংলাদেশে অত্যাবশ্যকীয় সামাজিক ও অর্থনৈতিক সেবা-ব্যবস্থা রক্ষায় একটি সংকট সৃষ্টি করে। যে-মুহূর্তে গোটা শ্রমজনশক্তি, প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা কর্তৃপক্ষসমূহ অসহযোগের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়েছিল, সেই মুহূর্তেই বাংলাদেশের ক্যান্টনমেন্টগুলোর বাইরে পাকিস্তান সরকারের পরোয়ানার কার্যকারিতা শেষ হয়ে যায়। দেশে সমাজ-জীবন ভেঙে পড়া ঠেকাতে এই শূন্যতা পূরণের প্রয়োজন ছিল। যখনই ইয়াহিয়া তার স্থানীয় বাহিনী কমান্ডার জেনারেল ইয়াকুবের দেওয়া ১৯৭১-এর ৫ মার্চ থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে ক্যান্টনমেন্টগুলোতে প্রত্যাহার করে নেওয়ার পরামর্শ গ্রহণ করেন, তখন থেকেই বঙ্গবন্ধুকে রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক- এই দুই কর্তৃত্বই গ্রহণ করতে হয়। ১৭৫৭-এর পলাশী যুদ্ধের পর বাংলাদেশ সেদিন প্রথমবার স্বশাসন অর্জন করে।
একাত্তরের ৫ মার্চ ক্যান্টনমেন্টের বাইরে বাংলাদেশের সীমারেখার মধ্যে সেনাবাহিনী শাসিত পাকিস্তানের একটি সামরিক সরকারের তরফ থেকে বঙ্গবন্ধুর কাছে কর্তৃত্বের এই অনন্য স্থানান্তর স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কে আমাদের সমসাময়িক সব আলোচনাকে নির্বুদ্ধিতা এবং অর্থহীন করে তোলে। বঙ্গবন্ধু কিংবা অন্য কারও দ্বারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণার তারিখ যা-ই হোক, বাংলাদেশের কার্যকর স্বাধীনতা ১৯৭১-এর ৫ মার্চ থেকেই গণনা করা যায়, যেদিন বাংলাদেশের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব বঙ্গবন্ধুর ওপর বর্তায়। ঐ তারিখের পরে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে যে কোনো পদক্ষেপকে সকল বাংলাদেশি একটি সার্বভৌম দেশের বিরুদ্ধে সামরিক আগ্রাসন মনে করত।

বঙ্গবন্ধু : মানুষটি
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের প্রতি বঙ্গবন্ধুর উদারতা
বঙ্গবন্ধুর সাথে আমার সম্পর্ক আর স্মৃতি ১৯৫৭ সাল থেকে, যখন তিনি আতাউর রহমানের নেতৃত্বাধীন প্রাদেশিক আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী। তার রাজনৈতিক চেতনার উদারতাকে আমি তারিফ করেছিলাম যখন তিনি এবং আতাউর রহমান আমার নানা খাজা নাজিমুদ্দীনের পাঠানো একটি ডিনার দাওয়াত দ্রুত গ্রহণ করেছিলেন, তখন খাজা নাজিমুদ্দীন পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১০ বছর করাচিতে কাটিয়ে তার জন্মস্থান ঢাকায় ফিরেছিলেন। এই গোটা সময়কালে আমার নানার দল মুসলিম লীগ ছিল আওয়ামী লীগের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, শাস্তিদাতা এবং তারা বঙ্গবন্ধুকে বহুবার জেলে পাঠিয়েছিল।
কিন্তু বঙ্গবন্ধু একজন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের দাওয়াত গ্রহণে কোনো দ্বিধা দেখাননি, বয়োজ্যেষ্ঠ (মুরুব্বি) হিসেবে সম্মান দেখিয়ে শেরওয়ানি পরে তিনি তার দেওয়া ডিনারে এসেছেন, যেন কোনো সরকারি অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন। যদিও খাজা নাজিমুদ্দীন তখন আর কোনো সক্রিয় রাজনীতিবিদ নন, তবু ডিনারে বঙ্গবন্ধু এবং আতাউর রহমান তাকে ঢাকায় তার পৈর্তৃক বাড়িতে স্বাগত জানিয়েছিলেন এবং ঢাকায় তার বিষয়-আশয় সমাধানে সর্বপ্রকার সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
আমি ঐ ডিনারে উপস্থিত ছিলাম। কিছুদিন আগে আমি কেমব্রিজ থেকে ফিরেছিলাম; কিন্তু ঐদিন বঙ্গবন্ধু আমাকে খুব বেশি লক্ষ্য করেননি। আমাকে তিনি অধিকতর মনোযোগ দিয়েছিলেন সম্ভবত মাস খানেক পরে, যখন শাহবাগ হোটেলে মিয়া ইফতেখার উদ্দিনের কক্ষে আমাকে দেখেছিলেন। পাঞ্জাবের বড় জমিদার মিয়া সাহেব ছিলেন কেমব্রিজে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং কমরেড আরিফ ইফতেখারের পিতা এবং পাকিস্তানের অন্যতম প্রধান ইংরেজি দৈনিক পাকিস্তান টাইমসের মালিক। তিনি প্রবলভাবে সব প্রগতিশীল মত পোষণ করতেন এবং মওলানা ভাসানী প্রতিষ্ঠিত ন্যাপের প্রতিষ্ঠা সভায় যোগ দিতে ঢাকায় এসেছিলেন। নতুন দলটির প্রতিষ্ঠা সভায় যোগ দিতে যাওয়ার পথে তার ওপর পরিচালিত ছাত্রগুন্ডাদের এক হামলায় তিনি আহত হয়েছিলেন এবং হোটেল কক্ষে সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন। বঙ্গবন্ধু তার সাথে দেখা করে মিয়া সাহেবের শারীরিক অবস্থার এবং তার ওপরে পরিচালিত হামলার জোর নিন্দা জানানোর তাগিদ বোধ করেন, যদিও তিনি ছিলেন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। প্রথমে মুসলিম লীগের একদল দক্ষিণপন্থি নেতার এবং পরে এক বামপন্থি রাজনীতিবিদের সাথে আমাকে দেখে বঙ্গবন্ধু আমার প্রতি বেশি মনোযোগ দেন।
বঙ্গবন্ধু এবং তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মধ্যে এই দুটো সাক্ষাতের ঘটনা থেকে আমি তার চিত্তের প্রসার এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি শ্রদ্ধার প্রদর্শন সম্পর্কে কিছু লিখেছিলাম। যেখানে সম্ভব, সেখানে তিনি সর্বদাই বিরোধ নিরসনের এবং শেষ পর্যন্ত তার বিরোধীকে জয় করার চেষ্টা করতেন, তার ব্যক্তিত্বের উষ্ণতা এবং সহমতে আনার কৌশল দিয়ে। একাধিক ঘটনায় আমি দেখেছি পেছনে যারা তার সমালোচনা করেছেন তারা তার সান্নিধ্যে ১৫ মিনিট কাটানোর পরে আদরের পোষা বিড়ালে পরিণত।
প্রকাশ্য যুক্তিবিস্তারের পাঠ
সামরিক শাসনামলে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ঢাকা সফরের সময় যখন আমাদের দেখা হতো, বঙ্গবন্ধুকে তখন আমি আরও ভালোভাবে জেনেছি। ততদিনে দুই অর্থনীতি এবং আঞ্চলিক বৈষম্য বিষয়ে আমার লেখালেখির সাথে তিনি পরিচিত হয়েছেন এবং ১৯৬৪ সালে শেষ পর্যন্ত আমাকে তিনি আমন্ত্রণ জানান '৬৪-এর আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ম্যানিফেস্টোতে অবদান রাখার জন্য।
বঙ্গবন্ধুর সাথে আমার পরবর্তী দেখা-সাক্ষাতে আমি দেখেছি কীভাবে কী রকম সম্মান তিনি মানুষকে দিতেন, এমনকি তাদেরও সম্মান দিতেন যাদের সাথে তার ভিন্নমত, যারা তাকে নির্যাতন করেছে। আমি তার অনেক কনিষ্ঠ, একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক মাত্র; কিন্তু তিনি মর্যাদা দিয়ে আমার ধারণাগুলো শুনতেন এবং যা তিনি সম্পূর্ণ জানতেন না, সেগুলো সম্পর্কে জানতে চাইতেন। এমনকি যখন তার কোনো সিদ্ধান্তের সাথে অমিল হতো, তিনি যুক্তি দিতে চাইতেন, তার মত আমার ওপর চাপিয়ে দিতেন না। তার এই গুণাবলি আমার কাছে বিশেষ স্পষ্টতায় ধরা পড়ে ২৫ মার্চ পর্যন্ত সময়কালে, ১৯৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার তৈরির কাজে যখন আমি কামাল হোসেন এবং নূরুল ইসলামের সাথে জড়িত ছিলাম এবং পরবর্তীতে আমাদের প্ল্যানিং কমিশন দিনগুলোতে।
জনযুক্তি বিস্তারে (Public Reasoning) তার সক্ষমতা ছোট-বড়, যুবক-বৃদ্ধ এবং রাজনৈতিক শত্রু-মিত্র সকলের সাথে ভদ্র আচরণ ইত্যাদির মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু আমার চোখে নেতার একদম রোলমডেলে পরিণত হন। তার বিরোধীদের নিন্দামন্দ বলা থেকে তিনি বিরত থাকতেন, গালাগালির ভাষা ব্যবহার থেকেও এমনকি তখনও যখন যারা তাকে নিন্দামন্দ করেছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাকে পাকিস্তানের তেমন এক শাসক-শ্রেণির সাথে দেনদরবার করতে হয়েছে, যারা বিশ্বাস করতেন শক্তির যুক্তিতে, যুক্তির শক্তিতে নয়। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পরও এই প্রবণতা বিদায় নেয়নি। জাতি এবং প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের পরবর্তী রাজনৈতিক ঐতিহ্য এক অপরিমেয় মূল্য দিয়েছে তার অসময়ের এবং বলপ্রয়োগভিত্তিক বিদায়ের মধ্য দিয়ে, যা অসংশোধনীয়ভাবে দূষিত করে গেছে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে।
বঙ্গবন্ধুর উত্তরাধিকার
বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিশক্তি আর জনমানুষের সম্পর্কে তার ধারণার কোনো সমকক্ষ ছিল না। লাখ লাখ লোককে চালনা করেছেন যে মহান নেতা, তার অনন্য যোগ্যতা ছিল যে, তিনি মানুষকে বুঝতেন, তাদের সাথে জনতার মতো নয়, ব্যক্তির মতো আচরণ করতেন, আর তাদের সবলতা-দুর্বলতাকে মূল্যায়ন করতে পারতেন। একবার দেখা হলে তিনি আর তাকে ভুলতেন না। তেমন সাক্ষাতে মানুষটিকে তিনি স্বতন্ত্র মনোযোগ দিতেন, জীবনে তাদের অবস্থান যা-ই হোক এবং একজন মানুষ হিসেবে যুক্ত হতেন।
মানুষের সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্ক স্থাপনের এই গুণ ছিল তার সর্ববৃহৎ সম্পদ; কিন্তু এ ছিল নাজুকতার এক উৎসও। কারও অন্তরের ভেতরে যদি আপনি তাকান, আপনি মূল্যায়ন করেন যে ভালো-মন্দ দুই-ই সেখানে রয়েছে। এমন বুঝ নিয়ে বঙ্গবন্ধু অনেক অন্যায়কারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চাইতেন। কিন্তু কতক্ষণ পরেই সেই লোকটির স্ত্রী আর তিন সন্তান এসে তার পায়ে পড়ত, ঘরজোড়া বিলাপ শুরু করত এবং তাদের বিপথগামী পরিবার সদস্যদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করত। স্মৃতি খুঁড়ে বঙ্গবন্ধু তখন বের করতেন একদা এই লোকটি ভালো কি করেছিল এবং সমবেদনা দ্বারা চালিত হয়ে শিথিল হতেন এবং অন্যায়কারীকে ছেড়ে দিতেন। এই মানবিক গুণের সুযোগ মানুষ নিত এবং শেষ পর্যন্ত তা-ই নিয়ে গিয়েছিল তাদের কিছু লোকের বিশ্বাসঘাতকতায়, বিপরীত প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তিনি যাদের বিশ্বাস করেছিলেন। এতে তার নিজের প্রাণ যায় এবং তার খুবই প্রিয় সব ব্যক্তির প্রাণ।
বঙ্গবন্ধুর সাথে দূর থেকে আমার শেষ সাক্ষাৎ ঘটে ১৯৭৫-এর ১ জুলাই গণভবনে, যখন আমি আর মোশারফ হোসেন তার ছোট ছেলে জামালের বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলাম। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পরে কথিত হাজার মিথ্যে এবং অর্ধসত্যের ক্ষেত্রে যেমনটা, সেদিনও হাজার হাজার দাওয়াতির জন্য ভূরিভোজের আয়োজন করা হয়নি, উপহার হিসেবে সোনা আর হিরে উপচে পড়েনি। অনুষ্ঠানস্থল বিশেষ জাঁকজমকের সাথে সাজানো হয়নি, সেখানে গিয়ে আমরা দেখলাম কোনো খাবারই পরিবেশন করা হয়নি, কোল্ড ড্রিংকস এবং পান ছাড়া, তা-ও সহজে পাওয়া যাচ্ছিল না। আমার স্মরণে আছে, দাওয়াতপত্রে অতিথিদের উপহার আনতে বারণ করা হয়েছিল।
পরবর্তী ২৪ বছরে জিয়া, এরশাদ এবং তাদের উত্তরসূরিদের ধারাবাহিক সরকারগুলোর নানা ধরনের গোয়েন্দা সংস্থার নিবিড় তদন্তও বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে বিন্দুমাত্র দুর্নীতির চিহ্নও খুঁজে বের করতে পারেনি। আমার অভিজ্ঞতা মোতাবেক এবং জানামতে বঙ্গবন্ধু ছিলেন ব্যতিক্রমী সততার এক নেতা এবং ব্যক্তিগত লাভের জন্য সরকারি অফিসে অপব্যবহার না করার গুরুত্ব সম্পর্কে বিশেষভাবে সচেতন। অন্যরা গল্প করেছেন কীভাবে ১৯৭৪-এর শেষ দিকে যখন বঙ্গবন্ধুর সরকার মুদ্রাস্ম্ফীতিবিরোধী ব্যবস্থা হিসেবে টাকা বাতিল (Demonitise) করার সিদ্ধান্ত নেন, বঙ্গবন্ধু এ ব্যাপারে তার স্ত্রীকেও জানাননি। ফলে, গার্হস্থ্য প্রয়োজনে যে কিছু উচ্চমানের নোট তার স্ত্রী আলমারিতে রেখেছিলেন, সেগুলোও অবৈধ (Dead) হয়ে যায়।
প্ল্যানিং কমিশনে আমাদের দিনগুলোতে আমরা বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য কোটি কোটি ডলারের সাহায্য বণ্টন করেছি। বঙ্গবন্ধু কখনও কোনো পছন্দের ব্যক্তিকে স্থান করে দেওয়ার জন্য একটি প্রকল্প অনুমোদনের অনুরোধ করেননি, কোনো আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীর পক্ষের মধ্যস্বত্বভোগী হননি। যাদের সাথে না-কি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য যোগাযোগ করা হবে।
মানুষ এবং সরকারি কর্মকর্তা বঙ্গবন্ধুর পক্ষে আরও সাক্ষ্য আমি ব্যক্তিগতভাবে পেয়েছিলাম। ১৯৭৪-এর সেপ্টেম্বরে পরিকল্পনা কমিশনে আমার পদ থেকে আমি চলে আসি। সরকারি নিয়ম মান্য করে সরকারি অতিথিদের (Visitor) কাছ থেকে কিংবা সরকারি সফরে বিদেশে গিয়ে প্রাপ্ত সকল উপহারসামগ্রী আমি তোষাখানায় পাঠিয়ে দিই। আমার মনে আছে, শুধু ১০০ টাকার কম দামের উপহার আমাদের রেখে দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। তোষাখানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আমার আচরণে বিস্মিত হয়েছিলেন। তিনি আমার সচিবকে জানান যে, সরকারের আর মাত্র দুজন সদস্য গত ক-বছরে তাদের সরকারি উপহার জমা দিয়েছেন। একজন আমার সহকর্মী অধ্যাপক মোশারফ হোসেন, অপর ব্যক্তি হচ্ছেন- বঙ্গবন্ধু, যিনি সরকারি সফরকালে আমির এবং রাষ্ট্রপতিদের দেওয়া অনেক বেশি সংখ্যক এবং অনেক বেশি উচ্চমূল্যের সব উপহার তোষাখানায় জমা দেন।
বঙ্গবন্ধুর পরিবারের অবশিষ্ট দুই সদস্যের কাছে রেখে যাওয়া তার উত্তরাধিকারই বঙ্গবন্ধুর ন্যায়পরায়ণতার পরম প্রমাণ। নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশে সাড়ে তিন বছর সর্বময় ক্ষমতা পরিচালনার পরে তিনি রেখে যান ধানমন্ডি ৩২নং রোডে একটি বুলেটে বিধ্বস্ত দোতলা বাড়ি। ঐ বাড়ি ১৯৬০-এর দশকে নির্মিত, তার পরিবারের বাসস্থান। একটি গাড়ি নয়, কোনো বীমা পলিসি নয়, নয় কোনো ব্যাংক হিসাব।
ক'জন নেতা কিংবা বড় জনব্যক্তিত্বের নাম আমরা করতে পারব তখন কিংবা এখন যারা পরিবারের জন্য এত সামান্য উত্তরাধিকার রেখে গিয়েছেন? উত্তরাধিকার হিসেবে তিনি রেখে গিয়েছেন ত্যাগের, অবিরাম জনসেবার এবং সরকারি দায়িত্বে থাকাকালীন আর্থিক সততার এক ঐতিহ্য। যা তার সব অনুসারীর পথ প্রদর্শন। এই উত্তরাধিকার সর্বদা স্মরণ রাখলেই হবে তার স্মৃতির প্রতি সত্যিকার মর্যাদা প্রদর্শন।
ভাষান্তর ::কাজল বন্দ্যোপাধ্যায়
লেখক: অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, বঙ্গবন্ধুর পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য