'সহজ মানুষ ভজে দেখনারে মন দিব্যজ্ঞানে
পাবিরে তুই অমূল্যনিধি বর্তমানে...।'
-লালন শাহ।
মনের মানুষ

সে আমাদের মনের মানুষ। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। তাকে আমি অন্তরে লালন করি। এই ঘোর অন্ধকারে তিনি ধ্রুবতারা হয়ে আমাকে- আমাদের অনেককে চালনা করছেন মানুষের মুক্তি সাধনায় সুকঠিন পথে। আমি ও আমরা অনেকেই যে এখনও অর্থবিত্ত, ক্ষমতার মোহে দিগ্‌ভ্রষ্ট ও আদর্শচ্যুত হইনি, তার পেছনে রয়েছে আমার মনের মানুষের জীবনের শিক্ষা, প্রেরণা ও ভালোবাসা। আমি তাকে ভালোবাসি- তিনি বঙ্গবন্ধু, জাতির পিতা, মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক এবং বাংলাদেশের স্থপতি বলেই নয়; তিনি এই বাংলার ভূমিপুত্র ও এক অনন্যসাধারণ 'সহজ মানুষ' বলে। বাংলার মাটিতে অনেক মনীষী, অনেক মহামানবের আবির্ভাব হয়েছে। তারা তাদের চিন্তা, কাজ এবং আদর্শ দিয়ে বাঙালির ভিত্তিভূমি ও জাতিসত্তার ভিত্তি রচনা করে গিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাদের মধ্যে কেবল অগ্রগণ্যই নন, ব্যতিক্রমও বটে। তিনি আধুনিক বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর প্রথম জাতিরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবেই কেবল ব্যতিক্রম ছিলেন, তা নয়; তিনি ছিলেন রাজনীতির এক অনন্য জাদুকর। বৌদ্ধ ও বাউল দর্শনে সহজ মানুষ হওয়া সবচেয়ে কঠিন। জীবনভর তপস্যার কাজ। সহজ মানুষ তিনি, যার চিন্তা ও কাজের কেন্দ্রে রয়েছে একমাত্র মানুষ। সে মানুষ মনের মানুষ। 'জীবে দয়া করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর' বৌদ্ধ দর্শনের এই উপলব্ধিরই অভিব্যক্তি মধ্যযুগের বাঙালি কবি চণ্ডীদাসের 'সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।' সহজ মানুষদের জীবনদর্শন হচ্ছে 'মানুষ ভজনা'- মানববন্দনা। মানুষের কল্যাণ, তাদের জাগতিক ও পারলৌকিক মুক্তি সাধনই সহজিয়া দর্শনের মূল কথা। এর সঙ্গে ব্যক্তিমানুষের ধর্মবিশ্বাসের কোনো মৌলিক বিরোধ নেই। 'আখলাকুল মাখলুকাত' বা সৃষ্টির সেরা জীব বলে ইসলাম ধর্মও মানুষকে সর্বোচ্চ মর্যাদার আসনে বসিয়েছে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার সমগ্র জীবন এই মানুষের কল্যাণের জন্যই উৎসর্গ করেছিলেন। মানুষকে তিনি ধর্মের দৃষ্টিতে বা জাতপাতের দৃষ্টিতে বিচার করেননি। তার এই দৃষ্টিভঙ্গি অভিব্যক্ত হয়েছে আমাদের সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগের ১১ অনুচ্ছেদে, যেখানে লেখা হয়েছে, 'প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র, যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকিবে, মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হইবে...।' ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রকে বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি করেছিলেন, তার মূলেও রয়েছে বঙ্গবন্ধুর সর্বজনীন মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। বলা বাহুল্য, মানুষের মধ্যে কেবল হিন্দু-মুসলমান, বৌদ্ধ-খ্রিষ্টানের ভেদাভেদই নয়, আশরাফ-আতরাফ আর ধনী-গরিবের ভেদাভেদকেও বঙ্গবন্ধু মানেননি। মানেননি বলেই মুষ্টিমেয় শোষককে তিনি মানুষের মূল ধারা থেকে পৃথক করেছেন। বলেছেন, শোষক-শোষিতে বিভক্ত এই পৃথিবীতে আমি শোষিতের পক্ষে। অসাধারণ রাজনৈতিক-দার্শনিক বীক্ষা থেকে তিনি এদেশের হতদরিদ্র-শোষিত-বঞ্চিত মানুষদের চিহ্নিত করেছেন 'দুখী মানুষ' হিসেবে। এই দুখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই ছিল তার জীবনের একমাত্র ব্রত। স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্রপিতা মহাত্মা গান্ধী ধর্ম, বর্ণ, জাত-পাতে বিভক্ত ভারতের দরিদ্র মানুষকে 'দরিদ্র-নারায়ণ' এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের অচ্ছুৎ শুভ্রদের 'হরিজন' আখ্যা দিয়েছিলেন। এই দুটি ধর্মাশ্রিত বিশেষণ দিয়ে তিনি তাদের দেবতাতুল্য বা ভগবানের বন্ধু হিসেবে মর্যাদা দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু গান্ধীজি 'দরিদ্র' ও 'হরিজন'কে সমাজের প্রান্তসীমা থেকে ওপরে তুলে আনতে চাইলেও ভারতের হাজার বছরের পুরোনো বর্ণাশ্রম প্রথা নির্মূল করতে চাননি। অধ্যাত্ম চেতনাই ছিল তার রাজনৈতিক দর্শনের মূল প্রেরণা।
পক্ষান্তরে বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি ও রাষ্ট্রচিন্তা কোনো ধর্মচিন্তা বা অধ্যাত্ম চেতনার দ্বারা আচ্ছন্ন ছিল না। ধর্মনিরপেক্ষতাকে যেমন তিনি ধর্মহীনতার নামান্তর বা ধর্মবিশ্বাসের বিপরীত মনে করতেন না, তেমনি ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারেরও তিনি ছিলেন ঘোরতর বিরোধী। বস্তুত শেখ মুজিব ছিলেন বাঙালির হাজার বছরের সংস্টৃ্কতির সংশ্নেষণের ধারার আধুনিক রূপকার।
'দুখী মানুষ', হিন্দু না মুসলমান, ব্রাহ্মণ না অস্পৃশ্য, আশরাফ না আতরাফ, খ্রিষ্টান না বৌদ্ধ, বাঙালি না অন্যান্য জাতিসত্তার মানুষ, তা তিনি বিচার করেননি।
আমি তাকে যুগপৎভাবে আমাদের মনের মানুষ এবং জাতির পিতা বলে মানি, কারণ তিনি জাতিসত্তার মর্যাদাকে যেমন সমুন্নত করতে জীবনভর সংগ্রাম করেছেন, তেমনি জাতিসত্তার ওপরে তিনি স্থান দিয়েছেন মানবসত্তার মর্যাদা।
তার সান্নিধ্য তার স্মৃতি
কিশোর বয়স থেকেই শেখ মুজিব আমার পরিচিত। আমার বাবা রাজনৈতিক কারণে অন্তত দু'বার ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে শেখ মুজিবের সহবন্দি ছিলেন। বাবা ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য। কমিউনিস্ট পার্টি কার্যত নিষিদ্ধ থাকায় ১৯৪৯ সাল থেকে বাবা আওয়ামী লীগ করতেন, মুন্সীগঞ্জ জেলার তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। পরবর্তী সময়ে আমৃত্যু ন্যাপ করেছেন। বাবা পাকিস্তানি আমলে বেশ কয়েকবার কারাবরণ করেছেন, জেল খেটেছেন। তিনি ১৯৪৮ সালে প্রথমবার কারাবরণ করেন এবং রাজবন্দিদের মর্যাদার দাবিতে দীর্ঘদিন অনশন পালন করেন। তরুণ শেখ মুজিবের সঙ্গে তখনই ঢাকা জেলে বাবার পরিচয়। বাবা দ্বিতীয়বার ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের সময় এবং তৃতীয়বার ১৯৫৪ সালে গ্রেপ্তার হন। ১৯৫৪ সালে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা বাতিল করে ৯২-ক ধারা জারি করে। সে সময় শেখ মুজিবসহ শত শত রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। 'আবদুর রহমান মাস্টার' নামে খ্যাত আমার বাবা ও কৃষক নেতা জিতেন ঘোষ একই সঙ্গে গ্রেপ্তার হন। এই তৃতীয়বারের বন্দিজীবনের গল্পই আমরা বেশি শুনেছি।
শেখ মুজিব তখন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং উদীয়মান জাতীয় নেতা। যে কোনো মানুষের ঘনিষ্ঠ পরিচয়, তার চরিত্রের উদারতা, মহত্ত্ব, সংকীর্ণতা, চারিত্রিক দৃঢ়তা, দুর্বলতা, সাহস, ভীরুতা, জ্ঞান ও বিশ্বাসের গভীরতা অথবা অন্তঃসারশূন্যতা সহবন্দিদের প্রতি সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ এবং রসবোধ ইত্যাকার বিষয়গুলো জেলজীবনে যতটা অকৃত্রিমভাবে জানা যায়, বাইরে তা জানা সম্ভব হয় না। বাবার কাছ থেকে সহবন্দি অনেকের জীবনের রোমাঞ্চকর কথা যেমন শুনেছি, তেমনি বন্দিজীবনের প্রাত্যহিকতার ছোট ছোট নানা ঘটনা, বন্দিদের মধ্যকার খুনসুটি, আলাপচারিতা ও স্বপ্নের কথা বাবা আমাদের শুনিয়েছেন। দেখেছি, তখন থেকেই শেখ মুজিবের প্রতি বাবার প্রগাঢ় শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। সেই ষাটের দশকের গোড়াতেই, আইয়ুব খানের মার্শাল ল'-এর সময় শেখ মুজিব এবং আমাদের রাজনৈতিক কুলগুরু জিতেন ঘোষ যখন গ্রেপ্তার হলেন, বাবা গ্রেপ্তার এড়াতে কিছুদিন আত্মগোপনে চলে গেলেন। পরে যখন বুঝতে পারলেন তার গ্রেপ্তার হওয়ার সম্ভাবনা নেই, তখন আবার স্বাভাবিক শিক্ষকতার জীবনে ফিরে এলেন। আমাদের তখন কৈশোরের উত্তেজনা। বাবা বলতেন, শেখ মুজিব '৫৪ সালেই জেলখানায় বলতেন, পাঞ্জাবিদের সঙ্গে থাকা যাবে না। বাংলার স্বাধীনতার স্পৃহা তিনি গোপন করেননি। কৃষক নেতা জিতেন ঘোষের কাছেও একই কথা শুনেছি। জিতেন ঘোষ ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের বিপ্লবী। বাবাও। শেখ মুজিব এসব বিপ্লবী ও বয়োজ্যেষ্ঠ বন্দিদের খুব শ্রদ্ধা ও সমীহ করতেন। যে কোনো বিপদে-আপদে তাদের পাশে এসে দাঁড়াতেন।
বাবার কাছ থেকেই শেখ মুজিবের উদার ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং মানুষকে আপন করে নেওয়ার অদ্ভুত জাদুকরী ব্যক্তিত্বের কথা শুনেছি। সত্য বলতে কী, তখন থেকেই ওই মানুষটির প্রতি আকর্ষণবোধ করেছি। বিপ্লবের নেশায় মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে আদর্শজ্ঞান এবং কমিউনিস্ট পার্টির লক্ষ্যকে অভ্রান্ত মনে করলেও, শেখ মুজিবের প্রতি যে একটা অজানা টান অনুভব করতাম, তাতে কখনোই টোল পড়েনি।

তবে সরাসরি বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্যে পৌঁছার জন্য আমাকে '৭২ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু পরিবারের সঙ্গে পরিচয় ১৯৬৭ সাল থেকে। ১৯৬৭ সালে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অনার্স ক্লাসে ভর্তি হই। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা সে বছর একই বিভাগে ভর্তি হন। বিভাগীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পরস্পর প্রতিপক্ষ দুই ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী হিসেবে আমাদের মধ্যে একটা ঘনিষ্ঠ পরিচয় গড়ে ওঠে। শেখ হাসিনা নিজে প্রার্থী না হলেও ছাত্রলীগ প্যানেলকে সাংগঠনিকভাবে নেতৃত্ব দেন। অন্যদিকে, আমিও প্রার্থী হইনি, তবে ছাত্র ইউনিয়নের প্যানেলে জয়লাভের জন্য কাজ করি।
চমৎকার সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে বিভাগীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বিভাগীয় নির্বাচনের বেশ কিছুদিন পর আমরা জানতে পারি, বেগম মুজিব গুরুতর অসুস্থ হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। সাধারণ বা ভিআইপি ক্যাবিনে না থেকে তিনি ছিলেন ডাক্তারদের জন্য সংরক্ষিত ক্যাবিনে। একদিন দুপুরে ক্লাস বাদ দিয়ে আমরা কয়েকজন সতীর্থ হাসপাতালে 'খালাম্মা'কে (আমরা তখন শেখ মুজিবকে বলতাম মুজিব ভাই, আর আমাদের সহপাঠীর মা বলে বেগম মুজিবকে সম্বোধন করতাম খালাম্মা বলে) দেখতে যাই। বেগম মুজিবের পাশে শেখ হাসিনা। আটপৌরে শাড়ি পরা বেগম মুজিব গভীর মাতৃস্নেহে আমাদের আপন করে নিলেন। আমরা তার জন্য কিছু নিয়ে যাইনি। উল্টো তিনি আমাদের ফল কেটে খাওয়ালেন।
সেবারে হাসপাতালে আমি আরও দু'দিন গিয়েছি। ওখানেই পরিচয় হয়েছে শেখ কামালের সঙ্গে।
পরে শুনেছি, বেগম মুজিব অসুস্থ ছিলেন বটে। কিন্তু ডাক্তার ক্যাবিনে থেকেছেন গোয়েন্দা নজরদারি এড়াতে এবং ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি শেখ মুজিবের (তখনও তিনি বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠেননি) সঙ্গে যোগাযোগের সুবিধার জন্য। ঢাকা মেডিকেলে তখন প্রায়শ রাজবন্দিরা হয় চিকিৎসাধীন থাকতেন অথবা চেকআপের জন্য আসতেন।
ডাক্তারদের মাধ্যমে চিকিৎসা গ্রহণেচ্ছু রাজবন্দিদের কারও কারও সঙ্গে যোগাযোগ হতো এবং চেকআপ শেষে জেলে ফিরে যাওয়ার সময় তার মাধ্যমে বেগম মুজিব খবরাখবর পেতেন এবং শেখ মুজিবকে প্রয়োজনীয় খবরাখবর পাঠাতেন। ১৯৬৮ সালে শেখ হাসিনার বিয়ে হয়ে যাওয়ায় বঙ্গবন্ধু পরিবারের সঙ্গে আমার স্বাভাবিক সামাজিক সম্পর্কের ছেদ ঘটে। ১৯৭২ সালে প্রকৃতপক্ষে প্রথম বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করা ও কথা বলার সুযোগ পাই। ১৯৭২ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের ত্রয়োদশ জাতীয় সম্মেলন এবং ১৯৭৩ সালের নভেম্বরে চতুর্দশ জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত এ দুটি সম্মেলনেই প্রধান অতিথি ছিলেন বঙ্গবন্ধু। ত্রয়োদশ সম্মেলনের পর অনুষ্ঠিত হয় ডাকসু নির্বাচন। ছাত্র ইউনিয়ন তখন ছাত্রলীগের সমান্তরাল জনপ্রিয় ছাত্র সংগঠন। ছাত্রলীগের বিভক্তির (মূল ছাত্রলীগ থেকে বেরিয়ে 'বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র' প্রতিষ্ঠার ধুয়া তুলে আ স ম রবরা ছাত্রলীগ বিভক্ত করে ও জাসদ গঠন করে) সুবাদে ডাকসু নির্বাচনে ছাত্র ইউনিয়নের বিজয় সহজ হয়।
ছাত্র ইউনিয়ন বামধারার বৃহত্তম ছাত্র সংগঠন হলেও বঙ্গবন্ধু এবং তার সরকারের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানায়। এজন্য বঙ্গবন্ধু ছাত্র ইউনিয়নকে বিশ্বাস করতেন এবং ছাত্র ইউনিয়ন নেতাদের বিশেষ স্নেহের দৃষ্টিতে দেখতেন। ছাত্র ইউনিয়নের সম্মেলন দুটিতে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ, ছাত্র ইউনিয়ন সংগঠনের প্রতি তার আস্থা এবং ছাত্র ইউনিয়ন নেতাদের প্রতি স্নেহের দৃষ্টি বামধারার ছাত্রছাত্রীদের ওপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর ছাত্র ইউনিয়ন কর্মী এবং বামধারার ছাত্রদের কাছে বঙ্গবন্ধু 'আইকন' হয়ে ওঠেন।
'৭২ থেকে '৭৫ পর্যন্ত বহুবার আমরা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। দীর্ঘ সময় নিয়ে তার কথা শুনেছি। কখনও ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাড়িতে আবার কখনও পুরোনো (বর্তমান রাষ্ট্রীয় অতিথিশালা 'সুগন্ধা') ও নতুন গণভবনে তার সঙ্গে মিলিত হওয়ার সুযোগ হয়েছে আমাদের।
বাংলাদেশের স্থপতি ও নতুন প্রজাতন্ত্রের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নামের আড়ালে যে মানুষটি, তিনি কেমন ছিলেন? বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে দু-একটি টুকরো ব্যক্তিগত স্মৃতির কথা এখানে উল্লেখ করছি, যা থেকে কিছুটা ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
সত্য বটে, যারা বঙ্গবন্ধুকে অতি কাছ থেকে দেখেছেন এবং তার সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন, তাদের পক্ষে ব্যক্তিমানুষ হিসেবে বঙ্গবন্ধু কেমন ছিলেন তা বলা সহজ। আমার জানার সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও 'আপাত গুরুত্বহীন' তথ্যগুলো বলার লোভ সংবরণ করতে পারলাম না।
অনুস্মৃতি : পিতৃস্নেহ
এবার নিজেদের কথা বলি। ১৯৭৩ সালের ১ জানুয়ারি ছাত্র ইউনিয়ন আহূত ভিয়েতনাম দিবসের সমাবেশে পুলিশ গুলিবর্ষণ করলে মতিউল ও কাদের নামের দু'জন ছাত্র ইউনিয়ন কর্মী নিহত হয়। প্রেস ক্লাবের উল্টো দিকে ইউসিস (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাঠাগার) ভবনের (বর্তমানে পাট মন্ত্রণালয়ের অফিস) সামনে ছাত্র ইউনিয়ন বিক্ষোভ সমাবেশ করে। এই সমাবেশের ওপরে পুলিশের গুলিবর্ষণে দু'জন ছাত্র ইউনিয়ন কর্মীর মৃত্যু সারাদেশে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। এ ঘটনার প্রতিবাদে আমরা ছাত্র ধর্মঘট ও হরতাল আহ্বান করেই ক্ষান্ত থাকিনি, আমরা যারা তখন ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃত্বে ছিলাম, উগ্র হঠকারী নীতি গ্রহণ করি। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ বঙ্গবন্ধুকে নূরুল আমিনের সঙ্গে তুলনা করে। এমনকি পল্টনের জনসভায় তৎকালীন ডাকসুর নেতারা বঙ্গবন্ধুর আজীবন ডাকসু সদস্যপত্রটি ছিঁড়ে ফেলেন। এই সিদ্ধান্ত কীভাবে ডাকসুর সহ-সভাপতি নিলেন আজও আমার কাছে অজ্ঞাত। স্বভাবত ছাত্র ইউনিয়নের এই বাড়াবাড়ি যুবলীগ ও ছাত্রলীগকে বিক্ষুব্ধ করে। তারা ছাত্র ইউনিয়ন ও ন্যাপ অফিসে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। সারাদেশেই ছাত্র ইউনিয়ন আক্রমণের শিকার হয়।
বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও আওয়ামী লীগের সহযোগী বামপন্থি ছাত্র ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং স্বয়ং বঙ্গবন্ধুসহ আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ এ ঘটনায় গভীরভাবে উদ্বিগ্ন হন। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের হস্তক্ষেপের ফলে এই উত্তেজনা এক পর্যায়ে প্রশমিত হয়।
যুবলীগ ছাত্রলীগের হামলার মুখে ৩ জানুয়ারি থেকে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, ছাত্র ইউনিয়ন সাধারণ সম্পাদক কাইয়ুম মুকুল, ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক মাহবুব জামান এবং সহ-সভাপতি নুহ-উল-আলম লেনিন কয়েকদিন আত্মগোপন করে থাকতে বাধ্য হয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এলে জানুয়ারির মাঝামাঝি একদিন আমরা চারজন ও ১ জানুয়ারির গুলিতে আহত বঙ্গবন্ধুর আত্মীয় সম্পর্কের বোন, রোকেয়া হলের ভিপি রীনা খান গুলিতে আহত বঙ্গবন্ধুর আত্মীয় ইউকসুর সহ-সভাপতি, বুয়েটের ছাত্র আবুল কাশেমসহ কয়েকজন ছাত্র ইউনিয়ন কর্মী গণভবনে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে যাই।
গম্ভীর মুখে বঙ্গবন্ধু এলেন। আমরা কিছু বলার আগেই তিনি বললেন, 'আমি জানি তোরা এই কাজ করতে পারিস না। তোদের মধ্যে এজেন্ট প্রোভোকেটর ঢুকে পড়েছিল, তারাই পুলিশকে লক্ষ করে বোমা মেরেছে। পুলিশ আমাকে কিছুই জানায়নি। আত্মরক্ষার নামে গুলি করেছে, আমার দুটি ছেলেকে হত্যা করেছে। আহ্‌ কী যে ক্ষতি হয়ে গেল! আমার দুটি ছেলে ...।'
বঙ্গবন্ধুর আবেগতাড়িত এই মন্তব্য শুনে আমরা সবাই স্তম্ভিত! লজ্জায়, অপরাধবোধে, দুঃখে, যন্ত্রণায় আমাদের তখন মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করেছে।
কারণ আমরা তো জানতাম, ইউসিসের লাগোয়া ন্যাপ অফিসের (পরবর্তীকালে এনএসআইর অফিস ছিল) দোতলার ছাদে বসে ছাত্র ইউনিয়নের কিছু অতি উৎসাহী কর্মী মলোটভ ককটেল বানিয়েছিল এবং তারাই ইউসিস ভবনে তা নিক্ষেপ করেছিল। এটা ছিল এক চরম হঠকারিতা। আমার ও কাইয়ুম মুকুলের পরীক্ষা থাকায় সেদিন আমরা মিছিলে ছিলাম না। ছাত্র ইউনিয়ন নেতৃত্বের দু-একজন ছাড়া বোমা বানানোর ঘটনার কথা কেউই জানতেন না। যারা জানতেন তারাও এ ধরনের হঠকারী কর্মকাণ্ডে বাধা দেননি।
ছাত্র ইউনিয়ন কর্মীদের বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত স্নেহ করতেন। বিশ্বাস করতেন। প্রয়াত কাজী আকরাম হোসেনের (মুক্তিযোদ্ধা ও আমার পরে ১৯৭৬ সালে ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি হন) কাছ থেকে ১ জানুয়ারি বিকেলেই আমি মলোটভ ককটেল বানানোর ঘটনাটি প্রথম জানতে পারি। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সামনে সাহস করে সেদিন আমাদের সেই অপরাধের কথা আমি বলতে পারিনি। আমরা ভুল স্বীকার করেছি, বঙ্গবন্ধুর ডাকসু সদস্যপদ ছিঁড়ে ফেলার জন্য আমরা যে অনুতপ্ত, সে কথাও জানিয়েছি। বলিনি যে দুটি প্রাণ ঝরে গেল, যাদের বঙ্গবন্ধু 'আমার ছেলে' বলে সম্বোধন করে স্নেহকাতর পিতৃহৃদয়ের সবটুকু শোক প্রকাশ করলেন, তাদের নিহত হওয়ার পেছনে আমাদের দায়-দায়িত্ব ও হঠকারিতার কথা।
বঙ্গবন্ধু তার অসীম ক্ষমায় সেদিন আবারও আমাদের পিতৃস্নেহে তার বুকে টেনে নিয়েছিলেন। আমরা অভিভূত হয়ে ফিরে এসেছিলাম। আর সেদিন থেকেই বঙ্গবন্ধুর আসনটি আমার হৃদয়ে (আমাদের প্রায় সবার) পবিত্র বিগ্রহের মতো চিরস্থায়ী হয়ে গেল। বঙ্গবন্ধু সেদিন আরও বলেছিলেন, 'ভিয়েতনামের জন্য আমি কী করিনি। আমরা ছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আর কোনো দেশ দক্ষিণ ভিয়েতনামকে স্বীকৃতি দেয়নি। আমি বিনা ভাড়ায় ঢাকায় তাদের মিশন (দূতাবাস) খুলতে দিয়েছি। আমেরিকা ক্ষিপ্ত হয়েছে। তারপরও আমি তাদের সাহায্য করেছি। কারণ ওরা মুক্তিযুদ্ধ করছে। আমি কাউকে ভয় পাই না...।' অপরিপকস্ফ তারুণ্যের উন্মাদনায় বঙ্গবন্ধুর এ কাজটির ঝুঁকি ও গুরুত্ব তাৎক্ষণিকভাবে আমরা বুঝিনি। বুঝিনি ১৯৭২ সালে প্যালেস্টাইন মুক্তি সংস্থা (পিএলও) এবং মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত দক্ষিণ ভিয়েতনামের জাতীয় মুক্তি ফ্রন্টকে (এনএলএফ) কূটনৈতিক মর্যাদা দিয়ে ঢাকায় তাদের দূতাবাস স্থাপন এবং বিনা ভাড়ায় এ জন্য দুটি সরকারি মালিকানার (পরিত্যক্ত সম্পত্তি) ভবন বরাদ্দ কতটা ও সাহসিকতাপূর্ণ কাজ ছিল। বুঝেছি ১৯৭৫-এর তার ট্র্যাজিক হত্যাকাণ্ডের পর।
[সংক্ষেপিত]

লেখক: রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব