শেখ মুজিবুর রহমান দশজনের একজন ছিলেন না, ছিলেন দশজনের উপরে একজন। জনসম্পৃক্ত ছিলেন তিনি। চতুষ্পার্শ্বে সকলের উপর প্রাধান্য বিস্তার করার অসাধারণ ক্ষমতা তার ছিল। আমার মনে হয়েছে, কৈশোরকাল থেকেই তিনি এ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন। সুন্দর চেহারা, বাকপটুতা, কৌতুকবোধ, অন্তহীন ক্ষমতানুরাগ, সাহস, শ্রমশীলতা, স্মৃতিশক্তির প্রখরতা, দৃঢ় ব্যক্তিত্ব, সংগ্রামশীলতা, বিপদের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করার মনোবল, প্রবল আত্মসম্মান বোধ ও স্বাজাত্যবোধ, তীব্র আবেগপ্রবণতা, আর যে কোনো আসরে মধ্যমণি হয়ে থাকার ও লোকজনকে আপন করে নেওয়ার শক্তি তার ছিল। স্বকীয় গুণের বলেই রাজনৈতিক জীবনে তিনি 'মুজিব ভাই' থেকে 'বঙ্গবন্ধু' হয়েছিলেন এবং দেশবাসীর ভালোবাসা লাভ করেছিলেন। বুঝতে হবে যে, এই গুণগুলো তাকে অর্জন করতে হয়েছিল কঠোর অনুশীলনের মধ্য দিয়ে। তিনি বঙ্গবন্ধু হয়ে জন্মগ্রহণ করেননি, বঙ্গবন্ধু তিনি হয়েছিলেন আপন কর্মবলে, বিপদ-আপদ অতিক্রম করে, জেল-জুলুম সহ্য করে। এদেশে তার কালের অন্য যে কোনো নেতার চেয়ে এসব গুণ তিনি অনেক বেশি অর্জন করেছিলেন। মওলানা ভাসানী তাকে ডাকতেন 'মুজিবুর' বলে, বয়োজ্যেষ্ঠ নেতারা ডাকতেন 'মুজিব' বলে, বয়ঃকনিষ্ঠরা ডাকতেন 'মুজিব ভাই' বলে। আওয়ামী লীগের তরুণ কর্মীরা এবং ছাত্রলীগের নেতারা যারা তার সান্নিধ্যে যেতেন, তারাও তাকে ডাকতেন 'মুজিব ভাই' বলে। নিজের সৃষ্ট ছয় দফা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ করে, লক্ষ্য অর্জনের জন্য সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করে তিনি দেশবাসীর তো বটেই, সমগ্র বিশ্ববাসীরও মনোযোগ লাভ করেছিলেন।
উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্ত হওয়ার পরে, সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ রমনা রেসকোর্স ময়দানে লাখো লোকের সংবর্ধনা সভা করে তাকে 'বঙ্গবন্ধু' উপাধি প্রদান করে। বঙ্গবন্ধু কথাটা ধীরে ধীরে চালু হয় এবং ব্যাপকতা লাভ করতে থাকে ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর থেকে। সেইসঙ্গে চালু হয় 'জাতির পিতা', 'হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি' কথা।
যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি যখন তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হন, তখন বিশ্ববাসীর বৃহত্তর অংশ তাকে গ্রহণ করেছিলেন নির্যাতিত, নিপীড়িত, মুক্তিকামী, সংগ্রামী জনগণের নেতা হিসেবে। পরে তার শাসনকালের ঘটনাবলি দেখে ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলেন না তার নেতৃত্বের প্রকৃতি। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে যখন তিনি দ্বিতীয় বিপ্লবের ঘোষণা দিয়ে বাংলাদেশে অধুনালুপ্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো একদলীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রবর্তনের পথে পা বাড়ালেন, তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ভারত এবং তাদের মিত্ররা এই ভেবে উল্লসিত হয়েছিলেন যে, বাংলাদেশে সত্য সত্যই সমাজতন্ত্র কায়েম হচ্ছে। শেখ মুজিবকে তারা তখন মস্কোপন্থি সমাজতন্ত্রী মনে করেছিলেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার ঘনিষ্ঠ মিত্ররা তাতে ভীষণ ক্ষিপ্ত হয়। ভূ-রাজনৈতিক কারণে বৃহৎ শক্তিবর্গের কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব অপরিসীম। ঘটনা পরম্পরায় বঙ্গবন্ধু যখন নিহত হন, তখন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রতি দেশের জনগণের মনোভাব ছিল ভীষণ বিরূপ। তবে ঐতিহাসিক ব্যক্তি হিসেবে শেখ মুজিবের অসাধারণ গুরুত্ব সর্বস্বীকৃত।
শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের ছয় দফা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে, রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে, অগণিত প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশে। স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে। যুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে প্রবাসে গঠিত প্রথম বাংলাদেশ সরকারের দ্বারা। তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত প্রথম বাংলাদেশ সরকার যুদ্ধ পরিচালনা করেছে ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সহায়তা নিয়ে। স্বায়ত্তশাসন, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ছিল তখন সময়ের দাবি। মুজিবের নেতৃত্বে ছয় দফা আন্দোলনকালে আওয়ামী লীগ অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা লাভ করলেও দলটি ভেতর থেকে অল্পই সংগঠিত হয়েছিল। আত্মগঠন, আত্মসমালোচনা ও আত্মোৎকর্ষের অনুশীলন ছিল না। আদর্শ ও শৃঙ্খলার চর্চাও ছিল না। সমকালীন অন্য কোনো দলেও এসব ছিল না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ও স্বাধীনতা যুদ্ধের এটা ছিল মৌলিক দুর্বলতা। সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী বুদ্ধিজীবীরাও নবপ্রতিষ্ঠিত একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞানগত বা বৌদ্ধিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেননি। এটাও আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের আর এক মৌলিক দুর্বলতা। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানের বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে শেখ মুজিব লন্ডন ও দিল্লি হয়ে ঢাকায় ফিরে আসেন এবং ১২ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে বাংলাদেশের নতুন সরকার গঠন করেন। শুরু হয় নবযাত্রা।

 

নয় মাসের যুদ্ধের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের দলীয় চরিত্রের অনেক পরিবর্তন ঘটে যায়। নতুন ভবিষ্যৎ সৃষ্টির জন্য অতীত সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাসমূহের পুনর্গঠন দরকার হয়। এজন্য প্রত্যেক জেনারেশনকেই তার ইতিহাস নতুন করে লিখতে হয়। অতীতের প্রতি সুবিচার না করে উন্নত ভবিষ্যৎ কখনও সৃষ্টি করা যায় না। শেখ মুজিবের ঐতিহাসিক ভূমিকা চিরস্মরণীয়। 'বঙ্গবন্ধু বলে যুগ-যুগান্তর ধরে কীর্তিত হবে তার নাম। এরই মধ্যে কাল বয়ে যাবে এবং এক সময়ের নতুন ভবিষ্যৎ সৃষ্টির তাগিদ দেখা দেবে। সহিষুষ্ণতা ও গ্রহিষুষ্ণতার প্রয়োজনে আমাদের বুঝতে হবে যে, ইতিহাস বিচারে পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্রেই সকলে কখনও একমত হন না। মতপার্থক্য থাকেই। সমকালীন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার ইতিহাস নিয়ে প্রত্যেক জাতির মধ্যেই উত্তেজনাকর বিতর্কও দেখা দেয়। তারপর এক সময়ে সকলেই উপলব্ধি করেন যে, মতপার্থক্যকে স্বীকার করে নেওয়াই সামনে চলার জন্য কল্যাণকর/ইতিহাস নিয়ে আলোচনায় ঐতিহাসিক নিরাসক্তি ও তথ্যনিষ্ঠা একান্ত দরকার। মতভিন্নতা নিয়েও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের, তথ্য (facts) অবলম্বন করে সত্য (truth) নির্ণয়ের এবং ঐতিহাসিক পরম্পরা অবলম্বন করে কারণ কার্য সূত্র ধরে প্রতিটি ঘটনাকে বুঝবার মনোভাব সকলের মধ্যে দেখা দিক, এই কামনা করি। কাল নিরবধি, পৃথ্বী বিপুলা। বাংলাদেশ ও বাঙালির জয় হোক। শুভবুদ্ধির জয় হোক।
লেখক: প্রাবন্ধিক, শিক্ষাবিদ