১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে পুরুষের পাশাপাশি নারী অসামান্য আবদান রাখে। দুই লক্ষাধিক মা-বোন যুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কাছে সল্ফ্ভ্রম হারান। স্বাধীনতার পর এই নারীদের বঙ্গবন্ধু 'বীরাঙ্গনা' খেতাবে ভূষিত করেছিলেন। বীরাঙ্গনা অর্থ বীর নারী। একজন বীরাঙ্গনা নারীর কথায়, 'প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন, যেসব রমণী মাতৃভূমির জন্য তাদের সতীত্ব, নারীত্ব হারিয়েছে, তিনি তাদের বীরাঙ্গনা আখ্যায় ভূষিত করেছেন। অন্তরের শ্রদ্ধা জানালাম সেই মহানায়কের উদ্দেশে' (আমি বীরাঙ্গনা বলছি, নীলিমা ইব্রাহিম; ২০১৮)। পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ও পরিবারের ঊর্ধ্বে গিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, 'তোরা আমার মা, জীবনের শ্রেষ্ঠ ধন স্বাধীনতার জন্য উৎসর্গ করেছিস। তোরা শ্রেষ্ঠ বীরাঙ্গনা। আমি আছি, তোদের চিন্তা কী?' (নীলিমা ইব্রাহিম, ২০১৮)। বঙ্গবন্ধুর পাশাপাশি তার স্ত্রী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছাও এই বীরাঙ্গনা নারীদের অভিভাবকে পরিণত হন। বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের প্রচেষ্টায় ১০ বীরাঙ্গনা নারীর বিয়ের ব্যবস্থা করা হয় এবং বীরাঙ্গনা নারীদের পুনর্বাসন ও আবাসনের জন্য বোর্ড গঠিত হয়।
পৃথিবীর কোনো দেশেই যুদ্ধে নির্যাতিত নারীদের এ ধরনের উপাধিতে ভূষিত করা হয়নি। বঙ্গবন্ধুই প্রথম যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে যুদ্ধে নারীর বহুমাত্রিক অবদানকে 'বীরাঙ্গনা' উপাধি দেওয়ার মাধ্যমে স্বীকৃতি দেন। উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগের নারী সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী বদরুন্নেসা আহমাদের মৃত্যুতে সংসদে গৃহীত শোক প্রস্তাবে তাকে বীরাঙ্গনা বলে অভিহিত করা হয়। এর মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী অন্য নারীদের ক্ষেত্রেও এ অভিধাটি ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের সময় ধর্ষণের শিকার হওয়া নারীদের বাইরে গিয়েও এই বীরাঙ্গনা অভিধা প্রয়োগের ক্ষেত্র তৈরি করা হয়। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ভাবনায় যুদ্ধে যেসব নারীর ওপর অমানবিক নির্যাতন করা হয়েছিল, যাদের ধর্ষণ করা হয়েছিল, তাদের প্রতি তার অনুভূতির তীব্রতা বেশি ছিল। তাই বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, 'ধর্ষিত মেয়ের বাবার নামের জায়গায় আমার নাম লিখে দাও আর ঠিকানা লেখো ধানমন্ডি ৩২। মুক্তিযুদ্ধে তোমরা যা দিয়েছ, তার ঋণ আমি কীভাবে শোধ করব?' (নীলিমা ইব্রাহিম, ২০১৮)
সমাজে ধর্ষণ যে নারীর বিরুদ্ধে একটি অপরাধ এবং যুদ্ধকালীন ধর্ষণ বস্তুত যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ- এ ধারণাগুলো পিতৃতান্ত্রিক সমাজে সে সময় প্রতিষ্ঠা পায়নি। বীরাঙ্গনাদের বয়ানে যার প্রতিফলন দেখা যায়। অসংখ্য বীরাঙ্গনা নিজ পরিবার, স্বামী ও ভাইবোনের সাহচর্য থেকে বঞ্চিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু সরকারই বীরাঙ্গনাদের 'সতীত্ব-মাতৃত্বের' দাম দিয়েছে, অথচ বীরাঙ্গনা মেয়েদের পরিবারই তাদের ঘরে তুলে নেয়নি। 'মনুষ্যত্বের এই অপমৃত্যু' বঙ্গবন্ধুকেও অনুধাবন করতে হয়েছে। তাই যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু বীরাঙ্গনাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করলেও শেষ দেখে যেতে পারেননি। সমাজে বীরাঙ্গনাদের পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার বিষয়কে সময়ের দাবি হিসেবে বিবেচনা করা যায়। বীরাঙ্গনাদের মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক লাঞ্ছনার হাত থেকে বাঁচানোটাই তখন মূল দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পরিবার-পরিজনও নির্যাতনের ঘটনার প্রকাশ চাননি। ফলে অনেক নির্যাতিত নারী পুনর্বাসন সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না, আবার অনেকে জেনেও নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ হয়ে যাওয়ার ভয়ে পুনর্বাসনে ব্যবস্থার সুযোগ গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নেন (আসক, ২০০১; হালিম, ২০২০)।
যুদ্ধাবস্থায় নারীর প্রতি সহিংসতার বিষয়টি দুই দশক ধরে নারীবাদী তাত্ত্বিক বিশ্নেষণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার প্রায় ৭৫ বছর পরও সে সময় নারীদের ওপর যে অত্যাচার চলেছে, তার ভিন্নতর বিশ্নেষণের মাধ্যমে যুদ্ধের এই বিশেষ কৌশলের দিকটি (যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে ধর্ষণের ব্যবহার) সবার দৃষ্টিতে আসে। একইভাবে বলা যায়, মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার প্রথম দশকে সংঘটিত ধর্ষণকে যুদ্ধাপরাধজনিত ধর্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি; বরং পিতৃতান্ত্রিক সমাজে সল্ফ্ভ্রমজনিত বিষয় হিসেবে দেখা হয়। মুক্তিযুদ্ধের চার দশক পর ২০১৪ সালের ১০ অক্টোবর জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল বীরাঙ্গনাদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২৯ জানুয়ারি ২০১৫ জাতীয় সংসদে ওই প্রস্তাব পাস হয়। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যার পর বীরাঙ্গনাদের ক্ষতিপূরণ প্রদান ও পুনর্বাসনের কাজ বন্ধ হয়ে গেলেও সামরিক সরকারের প্রত্যক্ষ মদদে যুদ্ধাপরাধীদের পুনর্বাসনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। বীরাঙ্গনা নারীরা প্রধানত ১৯৭১ সালের যুদ্ধকালীন শারীরিক ও মানসিক লাঞ্ছনাকে অভিশাপ হিসেবে নিয়ে বেঁচে আছে। তাই বীর নারী হনুফার কথায়, 'আমরা ভাতা চাই না, আমরা স্বীকৃতি চাই। প্রধানমন্ত্রী, আমাদের একটু দেখেন' (ডেইলি সান, ৪ আগস্ট ২০১৬)। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিক উদ্যোগে ৩২২ বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধাদের মতো অন্যান্য সরকারি সুযোগ-সুবিধা পেয়েছেন। যারা তালিকাভুক্ত হননি, তাদেরও পর্যায়ক্রমে তালিকাভুক্ত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
বঙ্গবন্ধু নারীমুক্তির যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা বাস্তবায়নের প্রথম ধাপ ১৯৭২-এর সংবিধান। ১৯৭২-এর সংবিধানের বিভিন্ন ধারা প্রশাসন ও রাষ্ট্রের সব ক্ষেত্রে নারীর সমঅধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সার্বিক সামাজিক-অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের উদ্দেশ্যে প্রণীত হয়। বঙ্গবন্ধুর সময়ে রাজনীতিতে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেন। তার মধ্যে বদরুন্নেসা আহমদ, আমেনা বেগম ও জোহরা তাজউদ্দীনের নাম উল্লেখযোগ্য।
বঙ্গবন্ধুর চিন্তাধারার ধারাবাহিকতা রক্ষা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নারীকে উন্নয়নের কেন্দ্রে নিয়ে আসেন। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৯৭ সালে প্রথম নারী উন্নয়ন নীতি প্রণয়ন করেন, যার লক্ষ্য ছিল নারী-পুরুষের মধ্যে বৈষম্য নিরসন, জাতীয় জীবনের সব ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ সমতা নিশ্চিত করা, নারীর মানবাধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং নারীকে শিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলা। কিন্তু ২০০৪ সালে তৎকালীন জামায়াত-বিএনপি জোট সরকার কঠোর গোপনীয়তার মাধ্যমে নারী নীতি সংশোধন করে এবং জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ১৯৯৭-এর পটভূমি থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম বাদ দিয়ে বিএনপি সরকারের কর্মকাণ্ড যুক্ত করা হয়। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় এসে নারীনীতি ১৯৯৭-এর আলোকে প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু নানা কারণে সম্পদের উত্তরাধিকার বণ্টনের সমঅধিকার বিষয়টি সংযোজন করা সম্ভব হয়নি। নারী-পুরুষের সমান সাংবিধানিক স্বীকৃতি থাকা সত্ত্বেও পুরুষেরা দেশের ৯৬ শতাংশ জমির মালিক, যেখানে নারীরা মাত্র ৪ শতাংশ জমির মালিক। ১৯৯৭-এর জাতীয় নারী নীতির উত্তরাধিকার, ভূমি এবং বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সম্পদের ক্ষেত্রে নারীরও সমান সুযোগ প্রদান করার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগেই কেবল নারীর উত্তরাধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব। সম্পত্তিতে সহজ অভিগম্যতা নারীকে ব্যক্তি হিসেবে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতায়িত করবে। যদিও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে সমান অধিকার দেওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন; কিন্তু বিদ্যমান কাঠামোগত ব্যবস্থা নারীসমাজকে বৃহৎ প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্মুখীন করেছে।
মুজিববর্ষে কভিড-১৯ সমগ্র বিশ্বসহ বাংলাদেশেও নারীদের জন্য সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জীবনে প্রতিঘাত সৃষ্টি করেছে। সংকটের সময় যখন কোনো প্রতিষ্ঠান সমস্যায় পড়ে, তখন প্রথমেই কিন্তু তারা নারীদের ছাঁটাই করে বা কাজ থেকে বের করে দেয়। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিরত যারা প্রশিক্ষিত ও যাদের প্রযুক্তিজ্ঞান আছে, তারাই প্রযুক্তিনির্ভর কাজগুলো পাবেন। এ মুহূর্তে নারীদের ওপর বিনিয়োগ করতে হলে নারীদের শিক্ষা ও দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর বিনিয়োগ করতে হবে। তা না হলে শ্রমবাজারে নারীর যে ৩৫ থেকে ৩৬ শতাংশ অংশগ্রহণ রয়েছে, তা হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা আছে।
বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ কম। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত জাতীয় বিষয়গুলোই আগামী দিনের কর্মসংস্থানের জায়গাগুলো নিয়ন্ত্রণ করবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নারীরা এখনও উল্লেখযোগ্য অবস্থানে নেই। কভিড-পরবর্তী সময়ে অনেক কাজই প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে যাচ্ছে, তাই এসব বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। কভিডের আরও একটি নেতিবাচক দিক হচ্ছে নারীর প্রতি ধর্ষণ-সহিংসতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কভিডের আগমনের পর প্রায় ৭০ শতাংশ সহিংসতা আগের বছর ২০১৯ থেকে বৃদ্ধি পায়। ২০১৯ সালেই কেবল ৯৭৫ নারী ধর্ষণের শিকার হন, ৪৩ জনকে হত্যা এবং ১২ জন আত্মহত্যা করেন।

ধর্ষণ কোনোভাবেই থামছে না। ধর্ষণ অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠার পেছনে কয়েকটি কারণ দেখছি :সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও আইনগত। ধর্ষণ আইনের সঙ্গে সংযোজিত হয়েছে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড। এই মৃত্যুদণ্ড কেবল রায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। রায় কার্যকর করার জন্য সরকারের জেন্ডারবান্ধব আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। নারী যখন অর্থনৈতিকভাবে সর্বত্র বিচরণ করছে, অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে অনেক জায়গায় নারী যখন প্রধানের চেয়ার অলংকৃত করে ভূমিকা রাখছে, তখন মানসিক নির্যাতন, সাইবার সহিংসতা ও মানহানিকর প্রচারণা তাদের সমৃদ্ধির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। নারীর প্রতি সামাজিক পিতৃতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজে লাগাতে হবে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষকদের মধ্যে মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন। যার ফল আমরা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে দেখব।
চ্যালেঞ্জ হলো নীতিগত হস্তক্ষেপ করা, যাতে করে নারীরা তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়। ক্রমান্বয়ে নারী নেতৃত্বের বিকাশ হয়, অধিক সংখ্যক নারী নেতৃত্ব কেবল পারবে নারীর প্রতি বিভিন্ন বৈষম্য নিরসন করে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন নারী-পুরুষের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা করতে। তাই শেষ কথা বলতে চাই, বঙ্গবন্ধু রাজনৈতিক দর্শনের দিক থেকে নারী-পুরুষের সমঅধিকারে বিশ্বাসী ছিলেন, তাই তিনি 'আমার দেখা নয়াচীন'-এ বলেছেন, 'নয়াচীনের উন্নতির প্রধান কারণ পুরুষ ও মহিলা আজ সমানভাবে এগিয়ে এসেছে দেশের কাজে। সমানভাবে সাড়া দিয়েছে জাতি গঠনমূলক কাজে। তাই জাতি এগিয়ে চলেছে উন্নতির দিকে' (২০২০ :১০১)। তাই মুজিববর্ষে বঙ্গবন্ধুর নারী ও পুরুষের বৈষম্য নিরসনে ন্যায্যতার বাস্তবায়নে অঙ্গীকার দাবি করছি।
লেখক: ডিন (ভারপ্রাপ্ত), সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সাবেক তথ্য কমিশনার