জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী স্মরণীয় করে রাখতে বছরজুড়েই নানা আয়োজন ও কর্মসূচি পালন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার। কিন্তু গত বছরের শুরুতেই মহামারি করোনাভাইরাস পুরো বিশ্বের সবকিছু বদলে দেয়। বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্র গত বছরের শুরু থেকেই 'লকডাউন' অর্থাৎ অতি জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে বের হওয়া সবার জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। লকডাউনে কম-বেশি ছয় মাস জনজীবন থমকে দাঁড়ায়। বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম নয়। 

গত বছরের ১৮ মার্চ থেকে বেশ কয়েক মাস মানুষ অতি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হয়নি। সভা-সমাবেশ, গণজমায়েত এখন পর্যন্ত স্বাভাবিক রূপে ফিরে আসেনি। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত সভা-সেমিনার অনলাইনে করার নতুন পথে আমরা প্রবেশ করেছি। এ পরিবর্তিত অবস্থায় বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী পালনেও পরিবর্তন আনতে হয়েছে। অফলাইন-অনলাইনের সমন্বয়ে আমরা এখন সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানমালার অনেক কর্মসূচি অনলাইনে পালন করতে হয়েছে। তবে এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানমালা যে মাধ্যমেই পালন করা হোক না কেন, বাঙালি জাতি বিনম্র শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করছে এবং ভবিষ্যতেও করবে। কারণ, তিনি ইতিহাসের অক্ষয় অধ্যায়।

যে কোনো ব্যক্তি মাত্রেরই জন্মশতবার্ষিকীর উৎসব একটি মাইলফলক। এ ক্ষেত্রে স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতির জন্মশতবার্ষিকীর উৎসব অতুলনীয়। স্বাধীনতার মহান স্থপতির জন্মশতবার্ষিকীর এই বিশেষ মাইলফলকে বহুমাত্রা যোগ হয়েছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারের সাফল্যে। বিশেষত জাতিসংঘ কর্তৃক বাংলাদেশ চূড়ান্তভাবে স্বল্পোন্নত দেশ বা এলডিসি থেকে উত্তরণ অর্থাৎ উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে এ নতুন মাইলফলক অর্জন আমাদের জন্য অনেক সম্মান ও গৌরবের। আমরা আশাবাদী, আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে। পিছিয়ে পড়া রাষ্ট্রগুলোর কাছে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে বাংলাদেশ এখন আলোচিত।

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে তার সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্নের কথা মনে পড়ে। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান 'সোনার বাংলা' গড়ার যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, যে প্রত্যয় নিয়ে যুদ্ধ-বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার অগ্রযাত্রার শুভ সূচনা করেছিলেন, আমাদের খুব দুর্ভাগ্য অল্প ক'দিনের মাথায় দেশি-বিদেশি চক্রান্তে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে ঘাতকদের হাতে নির্মমভাবে হত্যাকাণ্ডের শিকার হলে সে স্বপ্নযাত্রা থমকে দাঁড়ায়। কিন্তু জাতির পিতার দূরদর্শী কন্যার নেতৃত্বে সেই সোনার বাংলার স্বপ্ন এখন বাস্তবের পথে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর ২০২১ সাল অর্থাৎ স্বাধীনতার ৫০ বছরকে সামনে রেখে যে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করে, তার বাস্তব রূপায়ণ এখন দৃশ্যমান। এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ২০৪১ সালে উন্নত দেশে উন্নীত হওয়ার কর্ম-কৌশল গ্রহণ করেছে। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় অনুযায়ী উদ্যোগ নেওয়া হয়, যার মাধ্যমে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সাফল্য অর্জন করে।

বঙ্গবন্ধুর জন্ম, শৈশব, পড়াশোনা, নেতৃত্বের হাতেখড়ি সম্পর্কে আমরা সবাই কম-বেশি জানি। বাবা শেখ লুৎফর রহমান ও মা সায়েরা খাতুনের সন্তান শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি ছোট বেলাতেই শতবর্ষ আগে পরাধীনতার নিকষ অন্ধকারে নিমজ্জিত বাঙালি জাতির মুক্তির স্বপ্ন দেখেছিলেন। তিনি ছিলেন আপাদমস্তক রাজনীতিবিদ। স্টু্কলজীবনেই শেখ মুজিবুর রহমান জড়িয়ে পড়েন রাজনীতিতে। ১৯৪০ সালে সর্বভারতীয় মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনে যোগ দেন। ম্যাট্রিক পাসের পর কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে অধ্যয়নকালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকসহ তৎকালীন প্রথম সারির রাজনৈতিক নেতাদের সান্নিধ্যে আসেন। ১৯৪৪ সালে কুষ্টিয়ায় নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগের সম্মেলন আয়োজনে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৪৬ সালে তিনি কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভের পরপরই বঙ্গবন্ধু ঢাকায় ফিরে নতুন রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনা নিয়ে অগ্রসর হন। ১৯৪৮ সালে তিনি ছাত্রলীগ গঠন করেন। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন তৎকালীন ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের প্রথম বিরোধী দল আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হলে তরুণ নেতা শেখ মুজিব দলটির যুগ্ম সম্পাদক হন। সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন ১৯৫৩ সালে। ১৯৫৬ সালে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে 'মুসলিম' শব্দটি বাদ দিয়ে দলের নামকরণ করা হয় আওয়ামী লীগ। বঙ্গবন্ধু বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, আটান্নর আইয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন ও বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলনসহ পাকিস্তানি সামরিক শাসনবিরোধী সব আন্দোলন-সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

ব্রিটিশ শাসন ও শোষণ থেকে মুক্ত হয়ে বাঙালি অনেক স্বপ্ন ও আশা নিয়ে পাকিস্তানের অংশ হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু লক্ষ্য করেছেন, বাঙালির সে আশা ভঙ্গ হতে বেশি সময় লাগেনি। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নিপীড়ন, নির্যাতন ও বৈষম্যের কারণে বাঙালি বুঝতে পারে এক ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র হতে স্বাধীনতা অর্জন করলেও বাঙালি নতুন করে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর কবলে পড়েছে। পশ্চিম পাকিস্তানিদের দ্বারা বাঙালির দিন ফিরবে না। সহসাই বাঙালি লক্ষ্য করে যে, পূর্ব পাকিস্তানের আয়-উন্নতি ও ধন-সম্পদ পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। দৃশ্যত পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানকে লুটপাটের একটি রাজ্যে পরিণত করেছে। বাঙালি আরও বুঝতে পারে পাকিস্তানের অংশ হওয়ার সিদ্ধান্তটি মারাত্মক ভুল ছিল। এ ভুল থেকে সঠিক পথে ফিরে আসতে বঙ্গবন্ধু কাণ্ডারির ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে 'এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম' স্বাধীনতার ডাক দেন। বাঙালি ঝাঁপিয়ে পড়ে মুক্তিযুদ্ধে। বাঙালির মনোবল ভেঙে দেওয়া এবং দমন-পীড়নের জন্য পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে নিয়ে যায়। কিন্তু বাঙালি এতে দমে না গিয়ে আরও সংগঠিত হয় এবং যুদ্ধ চালিয়ে যায়।

দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে বাঙালি পশ্চিম পাকিস্তানিদের পরাজিত করে বিজয় লাভ করে। ইতিহাসের বরপুত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগার থেকে ১০ জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। বঙ্গবন্ধু নিজে তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে 'অন্ধকার হতে আলোর পথে যাত্রা' হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। বাঙালি তাদের ইতিহাসের বরপুত্রকে স্বাগত জানায় আনন্দ-অশ্রুতে বুকে আলিঙ্গন করে। বঙ্গবন্ধু সদ্য স্বাধীন দেশের পুনর্গঠন ও পুনর্বাসন কাজে আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৭৫ সালে জাতির অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে জাতীয় কর্মসূচি ঘোষণা করেন তিনি। কিন্তু এরই মধ্যে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাতে নিজ বাসভবনে ক্ষমতালোভী ঘাতকদের হাতে সপরিবারে নিহত হন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে পাঁচজনের ফাঁসির রায় ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে কার্যকর করা হয়। এর মধ্য দিয়ে জাতির ইতিহাসের অন্ধকার যুগের অবসান ঘটে।

বাঙালিকে নিয়ে জাতির পিতা যে স্বপ্ন দেখতেন, তার মধ্যে একটি ছিল এই ভূখণ্ডকে স্বাধীন করা এবং ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা গড়ে তোলা। প্রথম স্বপ্নটি বঙ্গবন্ধু বাস্তবায়িত করেছিলেন। বাঙালির সবচেয়ে বড় অর্জন বাংলাদেশের স্বাধীনতা, যা তিনি এনে দিয়েছেন। অন্য স্বপ্নটি নিয়ে যখন বাস্তবায়নের পথে অগ্রসর হচ্ছিলেন, তখনই বুলেটের আঘাতে সপরিবারে তাকে হত্যা করা হয়। জাতির পিতাকে হারানোর দুঃখের মধ্যে '৮১-এর ফেব্রুয়ারি মাসে প্রবাস জীবন কাটিয়ে বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। বর্তমানে তার বিচক্ষণ নেতৃত্বে জাতির পিতার দ্বিতীয় স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে বাংলাদেশ দ্রুত অগ্রসরমান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিষ্ঠা, সততা ও দক্ষতায় উন্নয়নসূচকে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের অনেক দেশকে টপকে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের 'সোনার বাংলা' এখন অধরা নয়, দৃশ্যমান।