নিউইয়র্ক টাইমসের তরুণ বৈদেশিক সংবাদদাতা সিডনি শনবার্গ ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ঢাকায় ছিলেন। ওই কালরাত থেকে ২৬ মার্চ সন্ধ্যায় বহিস্কৃত হওয়ার আগে তিনি যেটুকু হত্যাযজ্ঞ দেখতে পেয়েছিলেন সেটাই ২৭ মার্চ ডেটলাইনে বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দেন। পরবর্তী সময়ে তিনি একাধিকবার সীমান্ত এলাকা ও অবরুদ্ধ বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন ও প্রতিবেদন লিখেছেন। একাত্তরের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত শনবার্গের প্রতিবেদনগুলো সংকলন, সম্পাদনা ও অনুবাদ করে প্রতিবেদকের ভূমিকাসহ মফিদুল হক ১৯৯৫ সালে প্রকাশ করেন 'ডেটলাইন বাংলাদেশ : নাইনটিন সেভেন্টিওয়ান' শীর্ষক গ্রন্থ। মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রহরে ঢাকা পরিস্থিতি নিয়ে সিডনি শনবার্গের প্রথম  প্রতিবেদন ওই গ্রন্থ থেকে পুনর্মুদ্রিত হলো-


ডেটলাইন : ঢাকা, মার্চ ২৭, ১৯৭১

পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক আক্রমণ অভিযান, জোর লড়াইয়ের খবর, সৈন্যরা কামান দাগিয়েছে, নাগরিকদের ওপর গুলিবর্ষণ, বিভিন্ন এলাকায় অগ্নিসংযোগ

[শনিবার সকালে পূর্ব পাকিস্তান থেকে বহিস্কৃত ৩৫ জন বিদেশি সংবাদদাতার মধ্যে মি. শনবার্গও ছিলেন। তিনি এই বার্তা পাঠিয়েছেন ভারতের বোম্বে থেকে।]

৭৫ মিলিয়ন মানুষের পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশের স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন ধ্বংস করার জন্য নিরস্ত্র সাধারণ নাগরিকদের বিরুদ্ধে পাকবাহিনী কামান ও ভারী মেশিনগান ব্যবহার করছে।

কোনো সতর্কীকরণ ছাড়াই বৃহস্পতিবার রাতে আক্রমণ শুরু হয়। পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্যরা, সেনাবাহিনীতে রয়েছে যাদের সংখ্যাধিক্য, প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকার রাস্তায় নেমে আসে বিশ্ববিদ্যালয়সহ স্বাধীনতা আন্দোলনের বিভিন্ন শক্ত ঘাঁটি অবরোধের উদ্দেশ্যে।

কত নাগরিক আহত বা নিহত হয়েছে সেটা জানার কোনো উপায় নেই। প্রদেশের বাদবাকি অঞ্চলে কী ঘটছে, সে সম্পর্কেও কোনো সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে না। তবে ঢাকা আক্রমণের আগে দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন জায়গায় পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্য ও নাগরিকদের মধ্যে সংঘর্ষের খবর পাওয়া যাচ্ছিল।

প্রথমদিকে গোলাগুলি চলছিল বিক্ষিপ্ত, তবে রাত একটার দিকে তা জোরদার ও বিরামহীন হয়ে ওঠে এবং প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে এমনি চলে। প্রাণের ভয়ে ইন্টারকন্টিনেটাল হোটেলে আটকে থাকা বিদেশি সংবাদদাতারা কামানের গোলাবর্ষণের আগুন দেখতে পেয়েছেন, শুনেছেন এর শব্দ।

উত্তর ঢাকায় অবস্থিত আমাদের হোটেল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, বাঙালিদের সংখ্যাধিক্যসম্পন্ন আধা-সামরিক বাহিনী ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের ব্যারাকসহ শহরের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশাল দহনযজ্ঞ দেখা যাচ্ছিল।

আজ খুব সকালে যখন ৩৫ জন সাংবাদিককে ঢাকা থেকে বহিস্কার করা হয়, তখনও গোলাগুলির শব্দ শোনা যাচ্ছিল এবং ইতস্তত আগুন জ্বলছিল।

'হায় আল্লা, হায় আল্লা', হোটেলের জানালা থেকে এসব দেখে চোখের জল চাপতে চাপতে একজন পাকিস্তানি ছাত্র বলছিল, 'ওদেরকে মেরে ফেলছে। ওদেরকে জবাই করছে।'

ঘরে ঘরে অগ্নিসংযোগ

সামরিক ট্রাকের বহরে কঠোর পাহারায় বিমানবন্দরের দিকে যেতে যেতে সাংবাদিকরা দেখেছিলেন সৈন্যরা গরিব বাঙালিদের আবাস রাস্তার ধারের বস্তিগুলোতে আগুন জ্বালাচ্ছিল। স্বশাসন আন্দোলনের দৃঢ় সমর্থকদের মধ্যে রয়েছে এসব বস্তিবাসী বাঙালি।

বৃহস্পতিবার রাতে সামরিক অভিযানের শুরু থেকে সৈন্যরা ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় 'জিন্দাবাদ' ধ্বনি দিয়ে স্বয়ংক্রিয় রাইফেল, মেশিনগান ও রিকয়েললেস রাইফেলে প্রথমে দালানকোঠায় গোলাগুলি ছোড়ে ও পরে গোটা অঞ্চলে আগুন লাগিয়ে দেয়।

বিদেশি সাংবাদিকরা সকলেই অবস্থান করছিলেন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে। কী ঘটছে বোঝার জন্য বাইরে যেতে চাইলে ব্যাপকভাবে মোতায়েন সেনাপ্রহরীরা তাদের জোর করে ভেতরে ঠেলে দেয় এবং বলে, ভবনের বাইরে পা বাড়াবার চেষ্টা নিলে তাদের গুলি করা হবে।

হোটেলের আশপাশে গোলাগুলি বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং রাত একটার দিকে গোটা শহরেই গুলিবর্ষণের তীব্রতা বৃদ্ধি পায়।

১-২৫ মিনিটে বাইরের মিলিটারি গার্ডদের হুকুমে হোটেলের টেলিফোন লাইন কেটে দেওয়া হয়। একই সময়ে টেলিগ্রাফ টাওয়ারের বাতি নিভে যায়। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ও অন্যান্য অঞ্চল থেকে ভারী স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গুলির আওয়াজ ভেসে আসতে থাকে।

বাজার আক্রমণ

রাত ২-১৫ মিনিটে মেশিনগান বসানো একটি জিপগাড়ি হোটেলের সামনে দিয়ে ময়মনসিংহ রোডে ওঠে এবং একটি শপিং সেন্টারের সামনে থেকে দোতলার জানালার দিকে নিশানা করে। এক ডজন সৈন্য পায়ে হেঁটে জিপের পিছু পিছু অবস্থান নেয়। তাদের কারও কারও কাঁধে রকেট জাতীয় অস্ত্র।

দোতলা থেকে হঠাৎ চিৎকার ভেসে আসে, 'বীর বাঙালি এক হও' এবং সৈন্যরা ঝাঁকে ঝাঁকে মেশিনগানের এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণে ভবন ক্ষত-বিক্ষত করে দেয়। এরপর সৈন্যরা গুলি ছুড়তে ছুড়তে শপিং সেন্টারের পাশের গলিতে ঢোকে এবং পথ আটকে রাখা গাড়িগুলো উল্টে ফেলে দেয়। সৈন্যদের হাতের টর্চের আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছিল এসব দৃশ্য এবং হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের একাদশ-তলা থেকে দর্শনরত সাংবাদিকদের কাছে এসব ছিল এক অবিশ্বাস্য নাটক।

সৈনিকরা যখন গলির ভেতরে গুলি ছুড়ছিল, তখন প্রায় ২০০ গজ দূর থেকে ১৫-২০ জন বাঙালি তরুণের একটি দল তাদের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। তারা সৈন্যদের বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছিল, তবে মনে হচ্ছিল তারা নিরস্ত্র, তাদের কারও হাতে কিছু নেই।

জিপের ওপরের মেশিনগানের নিশানা ঘুরে গেল তাদের দিকে এবং শুরু হলো একটানা গুলিবর্ষণ। স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রসজ্জিত সৈন্যরাও যোগ দিল সঙ্গে। দু'পাশের ছায়াময় অন্ধকারে সটকে পড়ল বাঙালি তরুণরা। কেউ আহত-নিহত হলো কিনা এখান থেকে ঠাহর করা অসম্ভব।

এরপর সৈন্যরা আবার গলির দিকে দৃষ্টি ফেরাল। একটি গ্যারেজে আগুন লাগিয়ে এগিয়ে গেল। দৃশ্যত তাদের মূল লক্ষ্য, সৈন্যবাহিনীকে কটাক্ষকারী শেখ মুজিবের কড়া সমর্থক ইংরেজি দৈনিক দি পিপল-এর দপ্তর ও ছাপাখানা।

পশ্চিম পাকিস্তানিদের ভাষা উর্দুতে চিৎকার করে তারা ভেতরের লোকদের আত্মসমর্পণ নচেৎ মৃত্যুবরণ করার হুঁশিয়ারি জানাল। কোনো জবাব মিলল না, ভেতরে থেকে কেউ বেরিয়েও এলো না। এরপর সৈন্যরা ভবনের দিকে তাক করে রকেট ছুড়ে মারল এবং মেশিনগান ও হালকা অস্ত্রের গুলিবর্ষণ শুরু করল। তারপর তারা প্রেস ও যন্ত্রপাতি ভাঙচুর করে ভবনে আগুন লাগিয়ে দিল।

আরও ভেতরে এগিয়ে গলিতে যেসব দোকান ও ঝুপড়ি ছিল, তাতে তারা অগ্নিসংযোগ করল এবং অগ্নিশিখা দ্রুত দোতলা ভবনের মাথা ছাপিয়ে উঠল।

রাত চারটার অব্যবহিত পর আর্তচিৎকার কিছুটা থিতিয়ে এলো, তবে কামান ও মেশিনগানের গোলাগুলি বর্ষণের বিক্ষিপ্ত আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছিল। অনেক দূর থেকে ছোড়া ট্রেসার বুলেট হোটেলের পাশ দিয়ে ছুটে যাচ্ছিল।

৪-৪৫ মিনিটে ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের হেডকোয়ার্টারের দিকে আরেকটি বড় অগ্নিকাণ্ড দেখা গেল।

৫-৪৫-এর দিকে সকালের ধূসর আলোয় ছয়টি চৈনিক টি-৫১ ট্যাঙ্কে সওয়ারি সৈন্যরা ঘর্ঘর করে শহরের দিকে এগিয়ে গেল এবং রাস্তায় টহল শুরু করল।

গতকাল সারাদিন এবং আজ সকালে সাংবাদিকদের বহিস্কারের পূর্ব পর্যন্ত থেকে থেকে দহন ও গোলাবর্ষণ চলছিল।

গতকাল সকালে মাথার ওপর হেলিকপ্টার চক্কর দিয়েছে, নিশ্চিতই তদারকির কাজে। গত নভেম্বরের ঘূর্ণিঝড়ের পর ত্রাণ কাজের জন্য সৌদি আরব যে চারটি হেলিকপ্টার পাকিস্তানকে দিয়েছিল, এই সামরিক অভিযানে সেগুলো ব্যবহূত হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

ইয়াহিয়া পশ্চিম পাকিস্তানে

সেনাবাহিনীর দখলকৃত ঢাকা বেতারে সকাল সাতটায় ঘোষণা করা হয় প্রেসিডেন্ট আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান পশ্চিম পাকিস্তানে ফিরে এসেছেন এবং রাত আটটায় জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন।

সকাল আটটার অল্পকাল পরে আগুপিছু জিপ ও ট্রাকে মোতায়েন সশস্ত্র প্রহরায় একটি ১৯৬১ মডেলের শেভ্রলেট গাড়ি হোটেলের সামনে এসে থামে। এই গাড়িবহর জুলফিকার আলী ভুট্টো ও তার সঙ্গীদের এয়ারপোর্টে নিয়ে যাবে।

পশ্চিম পাকিস্তানের প্রধান নেতা জনাব ভুট্টো পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন অর্জনে শেখ মুজিবের দাবির বিরোধিতা করেছিলেন। সাধারণভাবে এটা মনে করা হয় যে, সেনাবাহিনী ও পশ্চিম পাকিস্তানি ব্যবসায়ী মহল সমর্থিত বা সৃষ্ট এই বিরোধিতাই সাম্প্রতিক সংকটের জন্ম দিয়েছে। বাঙালিরা যে তাদের বর্তমান দুর্গতির জন্য তাকেই মূলত দোষারোপ করে, এ সম্পর্কে সচেতন ভুট্টো হোটেলের লবিতে এলেন স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রধারী সামরিক ও সাদা পোশাকের প্রহরীবেষ্টিত হয়ে। তাকে ভীতসন্ত্রস্ত দেখাচ্ছিল এবং সাংবাদিকদের সব প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে গেলেন এই বলে, 'আমার মন্তব্য করার কিছু নেই।'

দশটার সময় বেতারে নতুন সামরিক আইন জারির কথা ঘোষিত হলো। হোটেলে সাংবাদিকরা যতবারই খবরাখবর জানতে চেয়েছেন, তাদের নিরাশ করা হয়েছে। কূটনীতিক মিশনগুলোতে যোগাযোগ স্থাপনের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।

একবার তর্ক-বিতর্ককালে তার সঙ্গে কথা বলার জন্য সদর দরজা দিয়ে বের হয়ে আসা সাংবাদিকদের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল ক্যাপ্টেন। তাদেরকে ভেতরে ফিরে যাওয়ার আদেশ দিয়ে প্রত্যাবর্তনরত সাংবাদিকদের উদ্দেশে পেছন থেকে চিৎকার করে বলল, 'তোমাদের কীভাবে সামাল দিতে হয় জানা আছে আমার। আমি যদি নিজের লোকজনকে খুন করতে পারি তবে তোমাদেরও পারব।'

সংকট নিয়ন্ত্রণে আনার ঘোষণা

কিছুক্ষণ পর সামরিক কর্তৃপক্ষ হোটেলে খবর পাঠাল, সন্ধ্যা ৬-১৫ মিনিটের মধ্যে হোটেল ছাড়ার জন্য বিদেশি সাংবাদিকদের তৈরি থাকতে হবে। সাংবাদিকরা জিনিসপত্র গুছিয়ে হোটেলের বিল চুকিয়ে সামনে-পিছে পাঁচ ট্রাক বোঝাই সৈন্যের প্রহরায় যখন হোটেল থেকে এয়ারপোর্টের উদ্দেশে বের হলেন, তখন রাত ৮-২০ মিনিট। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার ভাষণ সবে শেষ হয়েছে।

হোটেল ত্যাগের ঠিক আগে একজন সাংবাদিক দায়িত্বপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেলকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, বিদেশি সাংবাদিকদের বিদায় দেওয়া হচ্ছে কেন। তিনি জবাব দিয়েছিলেন, 'আমরা চাই আপনারা চলে যান। কেননা এটা আপনাদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠবে। সবকিছু হয়ে উঠবে অতিশয় রক্তাক্ত।' হোটেলের কর্মচারী ও অন্যান্য বিদেশি অতিথি যারা হোটেলে রয়েছেন তারা সবাই মনে করেন, সাংবাদিকদের বিদায় ঘটলে সূচনা হবে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের।

হোটেলের একজন কর্মী বললেন, 'এটা হোটেল থাকছে না, এটা হয়ে উঠবে রক্তাক্ত হাসপাতাল।' দূরে অব্যাহত গোলাগুলির পটভূমিকায় বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের ব্যাগপত্র কঠোরভাবে তল্লাশি করা হলো এবং কিছু টেলিভিশন ফিল্ম, বিশেষভাবে বিবিসির তোলা, বাজেয়াপ্ত করা হয়।