বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ ছিল বাঙালির ম্যাগনা কার্টা। বাঙালির স্বাধীনতার দলিল। বাঙালির স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তিপ্রস্তর বা কর্নার স্টোন অব লিবার্টি স্থাপিত হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণে। প্রকৃতপক্ষে ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ডাক দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। সেই দিন রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত দশ লক্ষাধিক মানুষ এবং সাত কোটি বাঙালি উৎকীর্ণ হয়ে অপেক্ষায় ছিল, বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে পরাধীনতার শিকল ভাঙার গান শোনার জন্য। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে কথা বলেছিল মহাকাল।

হাজার বছরের বঞ্চনা, হতাশা, নির্যাতনের ইতিহাস শেষে বঙ্গবন্ধুর তর্জনী ধ্রুবতারা হয়ে বাঙালিকে মুক্তিযুদ্ধে উৎসাহ ও উদ্দীপনা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে পথ দেখিয়েছিল। কাজী নজরুল ইসলাম ১৯৩৭ সালে 'বাঙালির বাংলা' প্রবন্ধে বলেছিলেন- 'যে দিন বাঙালি সব বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হতে পারবে, সে দিন বাঙালি অসাধ্য সাধন করবে, সে দিন বাঙালির পরাধীনতার শেকল যাবে ঘুচে।' বিদ্রোহী কবির এই আশাবাদ ব্যর্থ হয়নি। বাংলার হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, কৃষক, শ্রমিক সবাই বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধভাবে ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে মিলিত হয়েছিল। সেই ঐক্যবদ্ধ জনতাকে শক্তি, সাহস ও অদম্য প্রেরণা জুগিয়েছিল বঙ্গবন্ধুর বজ্রধ্বনি- 'এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।'

বঙ্গবন্ধুর কালজয়ী ভাষণ কেবল বাঙালি নয়, বিশ্বের সব নিপীড়িত, নির্যাতিত জাতির মুক্তি সংগ্রামে চিরন্তন প্রেরণার উৎস ৭ মার্চের ভাষণ। গণতান্ত্রিক অধিকার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে সমুজ্জ্বল করেছে বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণ। ভাষণের শুরুতেই বঙ্গবন্ধু বলেছেন, 'আমাদের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি বসবে, আমরা সেখানে শাসনতন্ত্র তৈরি করব এবং এ দেশকে আমরা গড়ে তুলব।'

জনগণের দ্বারা নির্বাচিত জাতীয় সংসদে বসে সংবিধান তৈরি করে দেশ গড়ার যে প্রত্যয় বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে শুনতে পাই- এটাই গণতন্ত্রের মৌলিক সৌন্দর্য। গণতন্ত্রের আরেক ভিত্তি আলাপ-আলোচনা। তিনি ৭ মার্চের ভাষণে আরও আহ্বান করেন, 'আপনারা আসুন, বসুন, আমরা আলাপ করে শাসনতন্ত্র তৈয়ার করি।' অর্থাৎ ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু গণতন্ত্রের প্রতিটি স্তম্ভ সাজিয়ে তুলেছিলেন তার ঔদার্যপূর্ণ মনোভাব নিয়ে। গণতন্ত্র যে রূপ প্রতিবাদ, সংগ্রামকে স্বীকৃতি দেয়, তেমনি সংখ্যাগরিষ্ঠের দেশ পরিচালনার অধিকারকে সুনিশ্চিত করে। কিন্তু বাঙালির দুর্ভাগ্য, বাঙালি সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েও ক্ষমতায় যেতে পারেনি। তাই প্রতিবাদে বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে আক্ষেপ ঝরে- 'আমরা পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ, আমরা বাঙালিরা যখনই ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টা করেছি তখনই তারা আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে।' যখন বঙ্গবন্ধু জনগণকে অনুপ্রাণিত করে শান্তিপূর্ণভাবে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার জন্য স্থির প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলেন, ঠিক তখনই বাংলার মানুষের বুকের ওপর গুলি করা হলো। বঙ্গবন্ধুর ভাষায় 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে। ... আমরা পয়সা দিয়ে যে অস্ত্র কিনেছি বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য, আজ সেই অস্ত্র ব্যবহার হচ্ছে আমার দেশের গরিব দুঃখী আর্ত মানুষের বিরুদ্ধে। তার বুকের ওপর হচ্ছে গুলি।' 

সংখ্যাগরিষ্ঠের নেতা হিসেবে বাংলার মানুষকে বাঁচাতে, বাঙালিকে মুক্তি দিতে, বাংলার মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে বঙ্গবন্ধু দৃঢ়চিত্তে উচ্চারণ করলেন- 'আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না। আমরা এ দেশের মানুষের অধিকার চাই।' কোন অধিকারের কথা তিনি বললেন। তিনি চাইলেন বাঙালির অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি তথা স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা। সংখ্যাগরিষ্ঠের নেতা হিসেবে হুঁশিয়ারি দিয়ে বললেন- 'আর যদি একটি গুলি চলে, আর যদি আমার লোকদের হত্যা করা হয়, তোমাদের ওপর আমার অনুরোধ রইল: প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল।' গণতন্ত্রের আরেক সৌন্দর্য সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা ও সংখ্যালঘিষ্ঠের অধিকার রক্ষা করা। সেই দিক বিবেচনায় নিলে গণতন্ত্রের জয়গান শোনা যায় বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে, যখন বলে উঠলেন, 'শোনেন-মনে রাখবেন শত্রুবাহিনী ঢুকেছে, নিজেদের মধ্যে আত্মকলহ সৃষ্টি করবে, লুটতরাজ করবে। এই বাংলায় হিন্দু-মুসলমান, বাঙালি, নন-বেঙলি যারা আছে তারা আমাদের ভাই। তাদের রক্ষার দায়িত্ব আমাদের ওপরে।' 

এই যে সংখ্যালঘিষ্ঠের অধিকারের নিশ্চয়তা দান, তাদের রক্ষায় দায় গ্রহণ- এটাই বঙ্গবন্ধুকে গণতন্ত্রের আকাশে সূর্যের আলোয় আলোকিত করেছে। গণতন্ত্রের আরেক মাধুর্য পরমত সহিষ্ণুতা। বিজয়ীই সব কৃতিত্বের দাবিদার- এই মতের অনুসরণে সংখ্যাগরিষ্ঠের চাওয়াই গণতন্ত্রের শেষ কথা। সংখ্যাগরিষ্ঠের কণ্ঠভোটের চাপে পড়ে পদদলিত হয়েছে কত ন্যায্য দাবি। ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব মুসলিম লীগের সংখ্যাগরিষ্ঠের কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যাওয়া তার অন্যতম উদাহরণ। বঙ্গবন্ধু তার ৭ মার্চের ভাষণে ঘোষণা করেন- 'আমি বললাম, 'অ্যাসেম্বলির মধ্যে আলোচনা করব, এমনকি আমি এও পর্যন্ত বললাম, যদি কেউ ন্যায্য কথা বলে, আমরা সংখ্যায় বেশি হলেও, একজন যদিও সে হয় তার ন্যায্য কথা আমরা মেনে নেব।' কাজেই বলা যায় বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ গণতন্ত্রের সৌন্দর্যে ঝলমলে আলোকিত জোছনাধারা। বঙ্গবন্ধুর গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, তার ৭ মার্চের ভাষণে প্রতিধ্বনিত হয়ে গণতন্ত্রের মাধুর্যকে বিকশিত করেছে।

গণতন্ত্রের ভিত্তিমূলই হলো জনমত। তাই গণতন্ত্রে জনমতকেই সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী বলে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। জনমতের মধ্যেই সার্বভৌম ক্ষমতা নিহিত থাকে এবং জনমতের মাধ্যমেই তা মূর্ত হয়ে ওঠে। মেজরিটি পার্টির নেতা হিসেবে জনমত বঙ্গবন্ধুর পক্ষে থাকায় ৭ মার্চের ভাষণে বাঙালি জাতির স্বাধীন সার্বভৌম আকাঙ্ক্ষার কথা উঠে এসেছে। বাঙালির হাজার বছরের স্বপ্ন, পরাধীনতার শেকল ভেঙে স্বাধীন জাতিসত্তার আকাঙ্ক্ষা সম্পূর্ণরূপে উপলব্ধি করেই বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, 'আজ, বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ তার অধিকার চায়।' স্যার আইভর জেনিংস যেমন বলেছিলেন, 'দ্য ভয়েজ অব দ্য পিপল ইজ সুপ্রিম'। তেমনি বঙ্গবন্ধু বিশ্বাস করতেন, 'বন্দুকের নল নয়, জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস'। বঙ্গবন্ধুর কাছে জনতাই শেষ কথা। 

বঙ্গবন্ধু বিশ্বাস করতেন 'জনগণকে ভালোবাসা তার যোগ্যতা আর জনগণকে বেশি ভালোবাসাই তার অযোগ্যতা'। প্রেসিডেন্ট লিংকন বলেন, 'জনসাধারণের সম্মতি ছাড়া তাদের শাসন করার অধিকার কারও নেই।' তাই জনগণের ওপর আস্থা রেখেই বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, 'আমি বললাম, আপনারা কলকারখানা সবকিছু বন্ধ করে দেবেন। জনগণ সাড়া দিল। আপন ইচ্ছায় জনগণ রাস্তায় বেরিয়ে পড়ল। তারা শান্তিপূর্ণভাবে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার জন্য স্থির প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো।' বাঙালির চূড়ান্ত সম্মতি অর্জন করতে পেরেছিলেন বলেই বঙ্গবন্ধু আদেশ করেছিলেন, 'সরকারি কর্মচারীদের বলি; আমি যা বলি তা মানতে হবে। যে পর্যন্ত আমার এই দেশের মুক্তি না হয়, খাজনা, ট্যাপ বন্ধ করে দেওয়া হবে। কেউ দেবে না।'

অন্যদিকে শোষিতের গণতন্ত্রে বিশ্বাসী বঙ্গবন্ধু খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষের জীবিকার স্বার্থ সংরক্ষণে ঘোষণা করলেন, 'আমি পরিস্কার অক্ষরে বলে দেবার চাই যে, আজ থেকে বাংলাদেশে কোর্ট, কাচারী, আদালত, ফৌজদারি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে। গরিবের যাতে কষ্ট না হয়, যাতে আমার মানুষ কষ্ট না করে, সে জন্য সমস্ত অন্যান্য যে জিনিস আছে, সেগুলোর হরতাল কাল থেকে চলবে না। রিকশা-ঘোড়ার গাড়ি চলবে, রেল চলবে, লঞ্চ চলবে। শুধু সেক্রেটারিয়েট, সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট, জজকোর্ট, সেমি-গভর্নমেন্ট দপ্তরগুলো- ওয়াপদা, কোনো কিছু চলবে না। ২৮ তারিখে কর্মচারীরা যেয়ে বেতন নিয়ে আসবেন'। কাজেই দেখা যায় গণতান্ত্রিক আন্দোলন পরিচালনাকালেও বঙ্গবন্ধু শোষিত মানুষের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। বাংলাদেশের সংবিধান জাতীয় সংসদে গৃহীত হওয়ার প্রাক্কালে প্রদত্ত ভাষণে বঙ্গবন্ধু তার শাসনতন্ত্রের মূল চার স্তম্ভের অন্যতম গণতন্ত্রের ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছিলেন, 'যে গণতন্ত্র পুঁজিপতিদের প্রটেকশনে কাজ করে, শোষকদের রক্ষা করে যে গণতন্ত্র, সেই গণতন্ত্রে আমরা বিশ্বাস করি না। আমরা চাই শোষিতের গণতন্ত্র এবং এর অর্থ হলো এদেশের দুঃখী মানুষকে রক্ষা করা।'

আজন্ম গণতন্ত্রপ্রেমী বঙ্গবন্ধু চারটি দাবি উত্থাপন করে বলেন, 'অ্যাসেম্বলি কল করেছে, আমার দাবি মানতে হবে প্রথম। সামরিক আইন মার্শার ল' উইথড্র করতে হবে। সমস্ত সামরিক বাহিনীর লোকদের ব্যারাকে ফেরত নিতে হবে। যেভাবে হত্যা করা হয়েছে তার তদন্ত করতে হবে। আর জনগণের প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।' শর্তের বেড়াজালে সামরিক জান্তাকে বেঁধে ফেলে জনগণের শক্তির ওপর নির্ভর করে বঙ্গবন্ধু হুঁশিয়ারি দিয়ে বজ্রকন্ঠে উচ্চারণ করেছেন, 'কিন্তু আর আমার বুকের উপর গুলি চালাবার চেষ্টা করো না। সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না।' সমস্ত ভাষণেই বঙ্গবন্ধু তার তেইশ বছরের সংগ্রামের যৌক্তিকতা ও চূড়ান্ত অভিলক্ষ্য স্বাধীনতা অর্জন- এ বিষয়ে বাংলার জনগণকে অবহিত করেছেন। বাঙালিকে একতাবদ্ধ করে, যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করে বিজয় ছিনিয়ে আনতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ করে, স্বাধীনতার চূড়ান্ত ডাক বঙ্গবন্ধু সাত মার্চের ভাষণেই দিয়েছিলেন।

মন্তব্য করুন