১৮৬২ সালের ১৫ নভেম্বর বাংলাদেশে প্রথম রেলওয়ের কার্যক্রম শুরু হয়। স্থাপিত হয় প্রথম ব্রডগেজ লাইন। রেলযুগে প্রবেশের পরবর্তী দেড়শ বছরে, দেশজুড়ে রেললাইন বিস্তৃত এবং বহুগুণে প্রসারিত হয়েছে। কিন্তু প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং সেবার আধুনিকীকরণের ক্ষেত্রে উন্নতি হয়েছে যৎসামান্যই। যাতায়াতের অন্যান্য মাধ্যম যেমন- এপপ্রেস বাস ও বিমানের পাশাপাশি রাস্তার যাবতীয় অবস্থা, এয়ারফিল্ড এবং সাধারণ মানুষের আর্থিক মানদণ্ডের সর্বোপরি উন্নয়ন একই সময়ে ঘটেছিল, যা বাংলাদেশের রেলওয়ে ব্যবস্থার ভাগ্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ২০১৮ সালে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, স্বাধীনতার পর থেকে রেললাইনের দৈর্ঘ্য প্রায় ১০০ কিলোমিটার (২,৮৫৮.২৩ থেকে ২,৯৫৫.৫৩ কিলোমিটার) বাড়লেও, বিগত ৫০ বছরে রেলগাড়ির স্টেশন, ইঞ্জিন, কোচ এবং ওয়াগনের পরিমাণ কেবল কমেছে।

জনবলে পরিপূর্ণ এবং বর্ধনশীল অর্থনীতির একটি দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন সেবার এতো বিশাল সময় ধরে এমন সামান্য উন্নয়নের পেছনে আসলে কারণ কী থাকতে পারে? পারিপার্শ্বিক পরিবর্তনের দৃশ্যপটে পিছিয়ে থাকার মূল কারণ সম্ভবত ভারসাম্য ধরে নিশ্চিতে স্থায়িত্ব বজায় রাখার ক্ষেত্রে সক্ষমতার ঘাটতি। সনাতন পদ্ধতির রেলওয়ে ব্যবস্থা, কম সক্ষমতার রেলের ইঞ্জিন ও মালগাড়ি পরিচালনা (যাত্রীদের সুবিধা এবং পরিবেশগত ভারসাম্য উভয় ক্ষেত্রে) এবং ম্যানুয়াল পদ্ধতির ব্যবহার ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশের রেলওয়ে ব্যবস্থাকে পিছিয়ে রাখছে। তবে, এসব সমস্যার সমাধান খুঁজে পাওয়া এমন কঠিন কিছু না। বিশ্বের অন্যান্য দেশের দিকে তাকালে এমন অসংখ্য উদাহরণ পাওয়া যায়, যেখানে গণপরিবহন ডিজিটাইজ করার ফলে সারাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতিসাধিত হয়েছে ও জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিগত শতাব্দীতে চীন, রাশিয়া, জাপান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতের মতো অনেক দেশ বৈদ্যুতিক ট্রেন চালু করেছে। এই ট্রেন এসব দেশের উন্নয়নে যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছে। বৈদ্যুতিক ট্রেনের শুরুটা হয়েছিল ১৮৩৬ সালে স্কটল্যান্ডে প্রথমবারের মতো বৈদ্যুতিক রেলকার পরীক্ষার মধ্য দিয়ে। ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে, ১৮৯৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাল্টিমোর অ্যান্ড ওহাইও আরআর প্রথম বৈদ্যুতিক রেলওয়ে চালু করে। পর্যায়ক্রমে বৈদ্যুতিক ট্রেন পরিচালনায় দক্ষতা বৃদ্ধি পায় এবং এটি যাত্রীদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বেশ কিছু কারণে বৈদ্যুতিক ট্রেন গণপরিবহনের ভবিষ্যৎ হিসেবে বিবেচিত হয়, যার মধ্যে রয়েছে- ১. সীমিত শক্তি ব্যয়, ২. প্রাকৃতিক শক্তিসম্পদ সংরক্ষণ, ৩. স্বল্প শব্দ, পরিবেশবান্ধব কার্যপ্রণালি, ৪. কম যান্ত্রিক অবক্ষয়, ৫. সমমানের ওজনের জন্য অধিক শক্তি, ৬. অধিক গতি এবং ৭. রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কম এবং আরও অনেক সুবিধা।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর দিকে এগিয়ে অগ্রসরমান বাংলাদেশের যাতায়াত ব্যবস্থার এমন সুফল ভোগ করা এখনও বাকি। ব্রিটিশ-ইন্ডিয়ান রেলওয়ে থেকে বাংলাদেশ যে রেলওয়ে নেটওয়ার্ক পেয়েছে তার মধ্যে ছিল পৃথক দুটি গেজ, যথা- মিটারগেজ ও ব্রডগেজ এবং তিন পকেটের নেটওয়ার্ক। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য বৈদ্যুতিক ট্রেন হতে পারে উন্নয়নের অন্যতম হাতিয়ার।

বাংলাদেশ পাওয়ার সিস্টেমের (বিপিএস) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিপিএসের উৎপাদন ক্ষমতা বাংলাদেশে বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন সিস্টেম প্রবর্তনের জন্য যথেষ্ট। বৈদ্যুতিক ট্রেন ব্যবস্থা দেশের যাতায়াতের সময় কমিয়ে আনবে। শিল্পের কেন্দ্রীকরণের ফলে ঢাকায় জনচাপ ক্রমেই বাড়ছে। বিপুল জনগণের ঢাকায় স্থায়ী হওয়ার প্রবণতা কমিয়ে আনতে পারে বৈদ্যুতিক ট্রেন। কারণ ঢাকার আশপাশে যারা বাস করেন তাদের ঢাকায় যাতায়াতে তেমন ঝামেলা পোহাতে হবে না। আন্তঃনগর যাতায়াত জনসাধারণের জন্য আরও বেশি সময় সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য হয়ে উঠবে। উন্নত এই রেলওয়ে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় হ্রাস করবে, যা সরকারের জন্য আরও লাভজনক হবে। স্বল্প সময়ে অধিকসংখ্যক যাত্রী পরিবহনের ফলে অন্যান্য যাতায়াত ব্যবস্থার ওপর চাপ কমবে, ট্রাফিক জ্যাম হ্রাস পাবে এবং সকল পরিবহন ব্যবস্থায় যাত্রীর চাপও কমবে।

আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত প্রায় এক শতাব্দী আগে ১৯২৫ সালে ছত্রপতি শিবাজি টার্মিনাস এবং কুরলার মধ্যে তাদের প্রথম বৈদ্যুতিক ট্রেন চালু করেছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৯ সালের মে মাসে উচ্চগতিসম্পন্ন বৈদ্যুতিক ট্রেন চালু প্রসঙ্গে সরকারের পরিকল্পনা ঘোষণার পর এর সূচনায় আশার আলো জ্বলেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ রূপকল্প বাস্তবায়ন এবং এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল শক্তি ও বিদ্যুৎ খাতকে সঙ্গে নিয়ে বৈদ্যুতিক ট্রেন চালু হলে এটি পরোক্ষভাবে উভয় খাতের জন্য সুফল বয়ে আনবে, যা কিনা সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের উন্নয়নের ধারাকে ত্বরান্বিত করবে।