সম্ভবত, জলবায়ু পরিবর্তনের মতো এতো বড় সমস্যা আমাদের সামনে আর একটিও নেই। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে প্রায়ই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব প্রাধান্য পাওয়া থেকে সহজেই অনুমেয়, আমাদের সামনের দিনগুলো কতটা ভয়াবহ হতে পারে। তবে, তাতে কেমন জানি একটা ভীতিজাগানিয়া ব্যাপার রয়েছে। উপস্থাপনায় কিছুটা পরিবর্তন আনা যুক্তিসংগত মনে হয়। উদাহরণস্বরূপ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিকূলতার সঙ্গে যুদ্ধ করে যারা স্থিতিস্থাপকতা অর্জন করতে পেরেছেন তাদের জীবনযাত্রা পাঠকদের কাছে তুলে ধরলে তা ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। প্রতিবেদনে স্থান পেতে পারে সেই প্রযুক্তি, যা জলবায়ু পরিবর্তনের মূল কারণকে মোকাবিলা করতে পারে এবং আর্থিকভাবে বিভিন্ন গোষ্ঠীর লোকজনের নাগালের মধ্যে রয়েছে। উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের পরিবেশ-বান্ধব উদ্যোগের পেছনের কথা এবং সাফল্য অন্য ব্যবসায়ীদের ব্যবসার ধরন পরিবর্তনে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। সংবাদ মাধ্যমের এমন প্রচার জলবায়ু সুরক্ষায় দীর্ঘমেয়াদে আরও অনেককেই সম্পৃক্ত হতে উৎসাহিত করবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের মতো একটি সমস্যাকে প্রতিরোধ করতে হলে প্রয়োজন আমাদের উদ্যোগগুলোর ইতিবাচক ফলাফল। আর হাতে নেওয়া নীতিমালাগুলো শুধু যে আকাঙ্ক্ষা-সম্পন্ন হতে হবে তা নয়, সঙ্গে বাস্তবায়নের সম্ভাবনা থাকতে হবে। বিগত বছরগুলোতে অনেক প্রকল্পই গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমাতে ভূমিকা রেখেছে, আবার অনেক দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে অভিযোজনে সহায়তা করেছে। সারা বিশ্বেই নবায়নযোগ্য জ্বালানি ভালো করছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার প্রাক্কলনে দেখা যায়, ২০২৪ সাল নাগাদ বৈশ্বিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানি কয়লাকে পেছনে ফেলবে। প্রয়োজন এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির আরও বিস্তার। সবকিছুই নির্ভর করবে আমাদের অর্জিত ফলাফলগুলো সময়মতো সঠিকভাবে অংশীজনের কাছে অর্থপূর্ণ উপস্থাপনের ওপর। সংবাদমাধ্যমের সুযোগ রয়েছে সঠিক তথ্য তুলে ধরে সব সংশয় দূর করে নবায়নযোগ্য জ্বালানির পথকে সুগম করার। এছাড়া, একটি দেশের জলবায়ু ও জ্বালানি-সংক্রান্ত নীতিমালা কার্যকর কিনা এর উপযুক্ত প্রমাণ এবং কী কারণে নীতিমালাতে পরিবর্তন আনা জরুরি এর ব্যাখ্যা উপস্থাপন সংবাদমাধ্যমই করতে পারে।

মানুষ অভ্যাসবশত তার দৈনন্দিন জীবনে ঘরে বা বাইরে প্রাকৃতিক সম্পদের অপচয় করে থাকে। পানি বা জ্বালানি এর বাইরে নয়। পানি এবং জ্বালানি সম্পদ অপচয়ের প্রভাব জলবায়ুতে কতটা এ সম্পর্কে কেউ কেউ ওয়াকিবহাল নন, আবার যারা জানেন তারা খুব বেশি গুরুত্ব দেন না। পানির কথা বিবেচনায় নিলেই দেখা যায়, পানি উত্তোলন, পরিশোধন এবং পরিবহন এ পুরো প্রক্রিয়া জ্বালানিনির্ভর। অহেতুক পানি অপচয়ের ফলে, পানির চাহিদা পূরণে, অতিরিক্ত পানি সরবরাহ করতে গিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত জ্বালানি ব্যবহারের ফলে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হয়, যা আমাদের জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমনে নেওয়া উদ্যোগে ব্যাঘাত ঘটায়। এ সমস্যা থেকে মুক্তির একটি উপায় হতে পারে, সচেতনতা বৃদ্ধি। সঙ্গে এও জানা জরুরি আমাদের চারপাশে শুধু পানি চোখে পড়লেও এর খুব কম অংশই পানের উপযুক্ত। কাজেই সংবাদমাধ্যমে মানুষের অভ্যাস পরিবর্তনের লক্ষ্যে ফিচার প্রচারিত হতে পারে। অন্যদিকে, জলবায়ু পরিবর্তন-সংক্রান্ত আন্তঃসরকারি প্যানেল (আই.পি.সি.সি.)-এর বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য-উপাত্তসমৃদ্ধ নিবন্ধ বিশ্বের সব মানুষ সংগত কারণেই পড়বে না। এ ধরনের বিশেষায়িত লেখায়, জটিল সমস্যার সমাধানে অনেক সময় বিভিন্ন গাণিতিক, অর্থনৈতিক বা অন্যান্য মডেল ব্যবহার করা হয় এবং এর নির্দিষ্ট পাঠক শ্রেণি রয়েছে। এগুলো সকলের বোধগম্য নয়। তবে এটা ঠিক, জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্তরা জানতে চায়, তারা কীভাবে দ্রুততার সঙ্গে অভিযোজন করতে পারবে আর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে মুক্তির পথই বা কি।

জাতিসংঘের জলবায়ু-সংক্রান্ত উইং ইউএনএফসিসিসি-এর আওতায় মাঝে করোনাভাইরাসের কারণে ২০২০ বাদ দিলে, ১৯৯৫ সাল থেকে প্রতি বছর আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলন হয়ে আসছে। উদ্দেশ্য হলো- আলাপ-আলোচনা করে জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমন ও অভিযোজনে গ্রহণযোগ্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ ও চুক্তি সম্পাদন। এ ধরনের বৈশ্বিক সম্মেলনে আলোচনার বিষয়-বস্তু এবং তার বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত জটিলতা সাধারণ মানুষের অনেকের কাছেই বেশ দুর্বোধ্য। তবে জলবায়ু পরিবর্তন যেহেতু সবার সমস্যা, এ ব্যাপারে বিভিন্ন দেশের নীতিনির্ধারকরা কোন পথে হাঁটার চেষ্টা করছেন এবং কেনই বা অন্য পথে নয় তা প্রত্যেকের জানার বা বোঝার অধিকার রয়েছে। সংবাদমাধ্যম তার অবস্থান থেকে মানুষের এ চাহিদা পূরণে এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরে জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক আলোচনাকে উৎসাহিত করতে পারে। জীবাশ্ম জ্বালানির ক্ষতিকর প্রভাব ক্রমাগত বেড়ে যাওয়ার পরও জীবাশ্ম জ্বালানির প্রচারক ও গুণগ্রাহীরা ভুল তথ্য দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কেউ কেউ আরেকটু এগিয়ে আছেন এবং বোঝাতে চাইছেন, জলবায়ু পরিবর্তন এক বিরাট ধাপ্পাবাজি। কোনো পক্ষপাত ছাড়া, সংবাদ মাধ্যমের উচিত সত্য তুলে ধরা এবং কয়লা পোড়ানোর ভয়াবহ ক্ষতির পরিবেশগত, আর্থিক ও সামাজিক বিষয়গুলো মানুষের সামনে নিয়ে আসা।

সংবাদমাধ্যমের জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে সময়োপযোগী এবং নিয়মিত বিরতিতে করা বাস্তব প্রতিবেদন প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারে মানুষকে যেমন সচেতন করবে, তেমনি জলবায়ু পরিবর্তন রোধে এগিয়ে আসতেও করবে উৎসাহিত। সাধারণ মানুষ পুরোপুরি বুঝতে পারবে, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের যোগসূত্র ও তার বৈশ্বিক ব্যাপ্তি আর কেনই বা জলবায়ু পরিবর্তন থেকে সুরক্ষা পেতে হলে আমাদের প্রত্যেকের কিছু না কিছু করণীয় রয়েছে।

বিষয় : শফিকুল আলম

মন্তব্য করুন