ফেব্রুয়ারি মাসের সঙ্গে বাঙালির আবেগ, ভালোবাসা জড়িয়ে আছে। একুশ আমাদের অহংকার। আজ ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে চলে অমর একুশে গ্রন্থমেলা। কলকাতায় অনুষ্ঠিত বইমেলা এবার স্থগিত করা হয়েছে পরিবর্তীত পরিস্থিতির কারণে। ১৮ মার্চ ২০২১ থেকে ১৪ এপ্রিল ২০২১ পর্যন্ত বইমেলা অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। একুশের বইমেলা শুধু বই-এর মেলা নয়, সাংস্কৃতিক মিলন মেলায় পরিণত হয়েছে।

বাংলা একাডেমি আয়োজিত বইমেলা সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়েছে। সত্তর দশকে মুক্তধারার কর্ণধার চিত্তরঞ্জন সাহা সাধারণভাবে বইমেলা শুরু করেছিলেন। তা যে এতো বিস্তৃত হবে কেউ কি তখন ভেবেছিলেন? ফেব্রুয়ারি মাস ক্যালেন্ডারের একটি নির্দিষ্ট মাস শুধু নয়, এ মাস বাঙালির আত্মমর্যাদা প্রকাশের অহংকার ও নিজেকে উন্মোচনের প্রতীক হয়ে উঠেছে। ফেব্রুয়ারিতে ভাষাশহীদদের স্মরণ করা হয়। ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে চলে বইমেলা। আমরা অপেক্ষা করি কখন আসবে ফেব্রুয়ারি, আর কখনোই বা শুরু হবে বইমেলা। লেখক, পাঠক, প্রকাশকের অধীর অপেক্ষা এই প্রহরের। বাঙালির আবেগ আর ভালোবাসার সংমিশ্রণের ফসল এই বইমেলা। অনেক বই প্রকাশিত হয়। নতুন বইয়ের মাতোয়ারা গন্ধ ও বই স্পর্শ করার আনন্দে কেটে যায় বাঙালির দিনরাত্রি।

ভাষা আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে বইমেলার আলোচনায় সূত্রপাত ১৯৬১তে বাংলা একাডেমিতে। ১৯৬৪ সালে একটি বইমেলার আয়োজন হয় টিচার্স ট্রেনিং কলেজে, অন্যটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারের নিচ তলায়। প্রথমটি বছরের শুরুতে ও পরেরটা ১৮ থেকে ২৪ অক্টোবর। ১৯৭০ সালে নারায়ণগঞ্জে একটি সফল বইমেলার আয়োজন করা হয়েছিল। সবচেয়ে সার্থক ও আশাসঞ্চারী বইমেলা ছিল ২০ ডিসেম্বর ১৯৭২ থেকে ২৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের উদ্যোগে আয়োজিত বইমেলা। উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। ১৯৭৩ ও ১৯৭৪ সালে শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে দুটি বইমেলা ছিল নজরকাড়া।

১৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪ থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪ পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সাহিত্য সম্মেলনের উদ্বোধন করেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭৬ ও ১৯৭৭ সালে আয়োজিত বইমেলা পাঠক-লেখকদের মিলন মেলায় পরিণত হয়। বাংলা একাডেমির প্রকাশনা, মুদ্রণ, বিক্রয় বিভাগ ১৯৭৮ সালের ১৫ থেকে ১৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বইমেলা আয়োজন করে। ১৯৭৯ সালে হয় আরেকটি বইমেলা। এসব মেলা প্রকৃত অর্থে প্রাচুর্যভরা ও সৌন্দর্যপূর্ণ ছিল। ১৯৮৪ সালে বাংলা একাডেমি আয়োজিত বইমেলার নামকরণ হয় 'অমর একুশে গ্রন্থমেলা'। ক্রমে ক্রমে বইমেলার পরিসর বৃদ্ধি পায়। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে আয়োজিত বইমেলায় স্থান সংকুলানের অভাব তৈরি হয়। মূল প্রাঙ্গণের বাইরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বইমেলাকে সম্প্রসারিত করা হয়েছে। খাবার দোকান, ক্যাসেটের দোকান, রকমারি গৃহস্থালি সামগ্রী বেচাকেনা মেলায় যে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছিল আশির দশকে, পরে বিযুক্ত হয়ে প্রকৃত বইকেন্দ্রিক মেলায় পরিণত হয়েছে। সুসজ্জিত বইমেলায় প্রকৃতি নানা সাজে রঞ্জিত। ঝরাপাতা, বিচিত্র ফুল, পাখির ডাক ও নানা বয়সি পাঠকের কলরবে মুখর বইমেলা শুধু মিলনমেলা নয়, স্মৃতিভারে গ্রথিত একটি অনন্য কেন্দ্র। ভালোবাসার টানে, নতুন বইয়ের গন্ধে আমরা বইমেলায় আসি, আবার ঘরে ফিরে যাই। সঙ্গে নিয়ে যাই প্রিয় মানুষের সান্নিধ্য স্মৃতি। বইয়ে পড়া কোনো চরিত্র অলক্ষ্যেই হয়ে যাই। আনন্দ-বেদনায় লীন হয়ে কখনও দুই চোখ ভিজে যায়। দীর্ঘশ্বাস বুক ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে। অতীতের পাওয়া না পাওয়া নিয়ে যে দোলাচলে আমরা বন্দি থাকি তার সামান্যটুকুই আমরা ধারণ করতে পারি।

দুর্যোগ-দুর্বিপাকে বাঙালি ঘুরে দাঁড়াতে জানে। কভিড-১৯-এর কারণে অনেক শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। স্থান নির্বাচন নিয়ে অনেকে কথা বলছেন। বাংলা একাডেমির মূল ভবনের আশপাশে জায়গা কম। সংগত কারণেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানই হবে মেলা আয়োজনের মূল কেন্দ্র। মুদ্রণশিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক মানুষের জীবন-জীবিকা। শুভ হোক বইমেলা। একুশের বইমেলা, প্রাণের মেলা। বইমেলা চিরজীবী হোক।

মন্তব্য করুন