স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অসাধারণ এক ইতিহাস নির্মাণ করেছেন। বাঙালি জাতিকে ইতিহাসের নতুন এক বাঁকে পৌঁছে দিয়েছেন। তার এই অসাধারণত্বই 'মৈত্রী' রাগ তৈরিতে আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে। সমকালের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় এ কথা জানিয়েছেন উপমহাদেশের কিংবদন্তি সংগীতজ্ঞ পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী। কথোপকথনে তিনি আরও বলেছেন, সংগীত আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে। এ কারণে শৈশব থেকেই সব শিশুকে সংগীত শেখানো উচিত। শিশুদের মানবিক ও চিন্তাশীল করার জন্যই সংগীত শিক্ষার প্রয়োজন।

অজয় চক্রবর্তী বাংলাদেশে এসেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরসঙ্গী হিসেবে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনে তিনি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে সৃজিত সংগীতের নতুন রাগ 'মৈত্রী' দিয়ে সংগীত পরিবেশন করেন। গতকাল রোববার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বসে তার সঙ্গে আলাপ শুরু হলো 'মৈত্রী' নিয়েই। তিনি জানালেন, কিছু দিন আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাকে অনুরোধ করেন বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে একটি নতুন রাগ তৈরির জন্য। এরপর তিনি এই নতুন রাগ নির্মাণের কাজ শুরু করেন।

অজয় চক্রবর্তী 'মৈত্রী' রাগ সৃষ্টি করেছেন শাস্ত্রীয় সংগীতের মহাগুরু ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর 'হেমন্ত রাগ' এবং তার নিজের প্রিয় আভোগী রাগের অনুরণনে। যেখানে তিনি বঙ্গবন্ধুর বিশালত্ব ও তার কীর্তির চিরন্তন আবেদন এবং বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আত্মিক বন্ধুত্বের সম্পর্ক ও আবহকে তুলে আনার চেষ্টা করেছেন। তিনি জানান, এই রাগে যে তিনটি গান বেঁধেছেন, তার মধ্যে সংস্কৃত গানটি রচনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের হনুলুলু হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বিশ্বব্যাপী খ্যাতনামা দার্শনিক ড. অরিন্দম চক্রবর্তী, হিন্দি গানটি যৌথভাবে রচনা করেছেন শ্রীমতী সুস্মিতা বসু মজুমদার ও অধ্যাপক শ্রী রবি বর্মণ। আর বাংলা গানটি রচনা করেছেন তার শিষ্যদের একজন অনল চ্যাটার্জি।

জানতে চাইলাম এই 'রাগে'র মধ্য দিয়ে কীভাবে একটি আবহ এবং অবস্থার চিত্র উঠে এসেছে। তিনি তখন নিজেই মেঘমল্লার রাগে কণ্ঠ খুললেন। সঙ্গে সঙ্গে যেন কণ্ঠেই ছড়িয়ে পড়ল তানপুরার তান। কণ্ঠে সেই রাগের প্রতিধ্বনিতে বুকের ভেতরে কখনও মেঘে ঢাকা ভারি আকাশ ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায়, অনুভবে জেগে ওঠে ঝিরিঝিরি বৃষ্টির মায়াবতী স্পর্শ। এবার পি ত অজয় চক্রবর্তীর ব্যাখ্যা স্পষ্ট হলো। 'মৈত্রী' রাগের অনুরণনে বঙ্গবন্ধু বিস্তৃত হয়ে আমাদের হৃদয়কে অনেক বড় করে দেন। তার সেই কালজয়ী ভাষণ, চিরন্তন তর্জনী গভীর অনুভবে জীবন্ত হয়ে ওঠে।

অজয় চক্রবর্তী বললেন, যখন এই রাগ শুনবেন, চোখ বুঁজবেন, আপনার চোখের সামনে বিশাল আকাশটার দুয়ার খুলে যাবে। অনুভবে তখন সবুজের আবছায়ায় ঘেরা এই দেশের নীল আকাশ বিশাল থেকে বিশালতর হয়ে উঠবে।

আলাপে আলাপে জানতে চাইলাম সংগীতে রাগের প্রভাব নিয়ে। তিনি বললেন, আসলে রাগের জন্ম লোকসংগীত থেকে। বহু বছর ধরে গাঁয়ের পথে ভেসে বেড়ানো লোকসংগীত শুনুন, দেখবেন তার ভেতরে কী অদ্ভুত রাগলহরি! মূলত সেখান থেকেই রাগসংগীতের জন্ম। আবার সংগীতে দুটি ধারা আছে। একটা রাগপ্রধান ধারা। আরেকটি ভাবপ্রধান ধারা। আপনি যখন লতা মুঙ্গেশকর কিংবা মান্না দে শোনেন, তখন আপনি সেখানে ভাবের প্রাধান্য দেখবেন। আবার যখন গুলাম আলী শুনবেন, তখন সেখানে রাগের প্রাধান্য দেখতে পাবেন। আবার ভাবপ্রধান গানে রাগের দারুণ ব্যবহার হয়। সেটাও আছে। আসলে সংগীত অনেক অনুষঙ্গ নিয়ে তৈরি হয়। সেখানে প্রধান দুটি অনুষঙ্গ হচ্ছে রাগ আর ভাব। দেখুন বাংলা গানে রাগ আর ভাবের অসাধারণ সমন্বয় দেখা যায় পঞ্চকবির গানে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, অতুল প্রসাদ, রজনীকান্ত সেন আর দ্বিজেন্দ্রলাল রায়- এই পাঁচজন আসলে বাংলা গানের ধ্রুবতারা। কিন্তু দুর্ভাগ্য হচ্ছে, ভারতবর্ষে এখনও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামই গাওয়া হয়। বাকি তিনজনের নাম প্রায় মুছেই যাচ্ছে। আশার কথা, বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের পাশাপাশি বাকি তিন কবির গানও খুব গাওয়া হয়। পঞ্চকবি তাই সার্থকভাবে বাংলাদেশেই বেঁচে আছে। তিনি বলেন, এই প্রসঙ্গে বলে রাখি, বাংলাদেশে সংগীতের রত্নখনি আছে। তাদের তুলে ধরা দরকার, সংরক্ষণ করা দরকার।

এই সময়ে সংগীত চর্চার প্রসঙ্গ ধরেই আলাপ শুরু হলে জানতে চাইলাম সংগীতে অজয় চক্রবর্তীর নতুন প্রচেষ্টা 'শ্রুতি নন্দন' নিয়ে। তিনি জানালেন, আসলে সংগীত হচ্ছে শ্বাস দিয়ে প্রকৃতির ওপর ছবি আঁকা। একই সঙ্গে সংগীতের রাগ আর তান হচ্ছে বিজ্ঞানের নতুন উদ্ভাবনের জন্য মনকে তৈরি করার একটি প্রক্রিয়া। আপনি যখন কোনো সুর শোনেন, রাগ শোনেন, তার প্রতিটি তরঙ্গের ওঠানামা খেয়াল করুন। সেখান থেকে গভীরভাবে চিন্তা করুন। আপনার ভেতরে সৃষ্টির অসম্ভব একটি শক্তি নিজেই অনুভব করতে পারবেন। সেই কাজটি আমি করতে চাচ্ছি। সংগীতটাকে আরেকটু বড় আয়তনে সবার সামনে নিয়ে আসতে চাচ্ছি। সে জন্যই 'শ্রুতি নন্দন' প্রতিষ্ঠা করেছি।

অজয় চক্রবর্তী জানান, তিনি বাংলাদেশের সন্তান। এখানেই তার শৈশব-কৈশোর কেটেছে। এ জন্য তিনি বাংলার জন্য কিছু করতে চান। এখন করোনা মহামারি চলছে। এর মধ্যেও অনলাইনে অন্তত ১০ বাংলাদেশি শিক্ষার্থীকে তিনি সংগীত শেখাতে চান। বিষয়টি নিয়ে তিনি সাবেক সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের সঙ্গেও কথা বলেছেন বলে জানান। তিনি আরও বলেন, শিশুর হৃদয়ে মানবিকতার বোধ সৃষ্টি এবং চিন্তাশীল করার জন্যই সংগীতের প্রয়োজন। একটি রাগ, একটি সুর অদৃশ্য সুতোয় পুরো বিশ্বকে এক বন্ধনে বেঁধে ফেলতে পারে। আপনার ভেতরে রাগ এবং ভাব যত প্রকট হবে, আপনি বিনয়ী হবেন, নমনীয় হবেন, হিংসা ভুলে যাবেন এবং ভেতর থেকে বড় হবেন।

বাংলাদেশে শৈশব-কৈশোরের কথার প্রসঙ্গ তুলে আলাপ আরও একটু এগোল তার সঙ্গে। জানালেন, ময়মনসিংহে তার পৈতৃক বাড়ি ছিল। পিতা অজিত চক্রবর্তী ছিলেন স্কুল শিক্ষক। অভাবের সংসারে ষোলো বছর বয়স পর্যন্ত তার দু'বেলা খাবার জোটেনি। এরপর শিক্ষাজীবন শেষে যখন প্রথম চাকরি পেলেন, তখন সংগীতপ্রেমী বাবা তার প্রথম চাকরির নিয়োগপত্র ছিঁড়ে ফেলে বললেন, তুমি যদি চাকরি করে বাঁচতে চাও তাহলে বাবাকে মুখ দেখানোর দরকার নেই। বাবার চাওয়া, তার সন্তান রোজগার করতে হলে গান গেয়েই রোজগার করবে। বাবার সেই চাওয়া অজয় চক্রবর্তী পূরণ করেছেন। পুরোপুরি মন দিয়েছেন সংগীত চর্চায়। দিনে চৌদ্দ-পনেরো ঘণ্টা তিনি রেওয়াজ করেছেন। ভারতের বিখ্যাত সংগীতগুরুদের বাসায় গিয়ে সংগীত সম্পর্কে শিখেছেন। বত্রিশ বছরে এসে তিনি তার ফল পেয়েছেন। তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। কিছুটা থামলেন তিনি, বললেন, যদি নিজের লক্ষ্যের প্রতি নিবেদিত হন, যদি পরিশ্রম করেন, আপনি নিজেকে ছাড়িয়ে যাবেন, ছড়িয়েও দেবেন। মানুষ আপনার নাম করবেই।

৬৮ বছর বয়সে এসেও সেই কণ্ঠ কীভাবে ধরে রেখেছেন, জানতে চাইলাম। কিংবদন্তির এই সংগীতজ্ঞ জানালেন, আসলে যে কণ্ঠ তানপুরার সঙ্গে রেওয়াজ করে তৈরি হয়, সেটা কখনও বুড়ো হয় না, সব সময় তরুণই থাকে। তিনি এখনও সময় নিয়ে রেওয়াজ করেন, তানপুরার তানে নিজেকে বুঁদ হয়ে সূর্যোদয়ের রাগে প্রতিদিনই নতুন করে জাগিয়ে তোলেন নিজেকে।

আলাপের শেষ পর্যায়ে এসে কথা উঠল বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে। তিনি বললেন, এই সুরে, এই গীতিতে বাঁধা বাংলাদেশ-ভারতের হৃদয়। এ সম্পর্কে যত অভিমানই থাকুক, ভালোবাসার কখনও ঘাটতি হবে না। স্মরণ করলেন ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁকে, যাকে তিনি সংগীত বাবা বলে ডাকেন। যিনি শিখিয়েছেন, কী করে একটি সন্দেশ ভাগ করে খেতে হয়, কী করে একটি সুরের তানে কোটি হৃদয়ের মেলবন্ধনের সৃষ্টি হয়। ভালোবাসার রাগে, সুরে, কথায়, ঐতিহ্যে বাংলাদেশ-ভারত সব সময়ই থাকবে একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে।

মন্তব্য করুন