১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে আবেগঘন কণ্ঠে বলেছেন- 'বিশ্বকবি, তুমি বলেছিলে, সাত কোটি সন্তানেরে, হে মুগ্ধ জননী,/ রেখেছ বাঙালি করে, মানুষ কর নি।' বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ, তুমি দেখে যাও, তোমার আক্ষেপকে আমরা মোচন করেছি। তোমার কথা মিথ্যা প্রমাণিত করে আজ সাত কোটি বাঙালি যুদ্ধ করে রক্ত দিয়ে এই দেশ স্বাধীন করেছে। হে বিশ্বকবি, তুমি আজ জীবিত থাকলে বাঙালির বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে নতুন কবিতা সৃষ্টি করতে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু একজন নেতাই নন; একটি চেতনা, একটি অধ্যায় এবং সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি। তিনি আমাদের জাতির পিতা। ১৭ মার্চ ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। এই বছরে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন উদযাপন উপলক্ষে জাতীয় শিশু দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল 'বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন, শিশুর হৃদয় হোক রঙিন'। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী ১৭ মার্চ ২০২০ থেকে ১৬ ডিসেম্বর ২০২১ পর্যন্ত সময়কে মুজিববর্ষ হিসেবে ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ সরকার।

বিদেশি মিশনগুলোতে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে। এ ছাড়াও জনতার মুজিবকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করার জন্য প্রবাসী বাঙালিরা ইউরোপের ৫০টি দেশ; এশিয়া, আমেরিকাসহ অস্ট্রেলিয়াতে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান যেমন- গান, কবিতা, সিনেমা ও আলোচনার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকে নতুনভাবে আবিস্কার করছে। 'জেগে আছে তর্জনী, হৃদয়ে তাঁর কথা/ তাঁর স্বপ্ন চোখে চোখে আরও স্বপ্নময়/ হাজার বছরে একবারই আসে এক মুজিব/ জনতায় আছে নির্জনতায় আছে শেখ মুজিব।'

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২-এর জানুয়ারি থেকে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট পর্যন্ত রাষ্ট্র পরিচালনায় সময় পেয়েছিলেন মাত্র সাড়ে ৩ বছর। এই সময়ে একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত জাতিকে গড়ে তোলার দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছিলেন তিনি। এ সময়ে ১২৬টি দেশ কর্তৃক বাংলাদেশের স্বীকৃতি প্রদান এবং জাতিসংঘ, ওআইসিসহ ২৭টি আন্তর্জাতিক বড় বড় সংস্থার সদস্যপদ অর্জন বঙ্গবন্ধু সরকারের অন্যতম সফলতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু ছিলেন একজন শক্তিশালী ও বিচক্ষণ নেতৃত্বের পুরোধা ব্যক্তিত্ব।

তাঁর দেওয়া পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শনই ছিল- সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়; বন্ধুত্বপূর্ণ সহাবস্থান এবং জোটনিরপেক্ষ সহাবস্থান। তাই স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর চলমান কর্মসূচি ও অনুষ্ঠানমালায় স্বতঃস্টম্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও শুভেচ্ছা বার্তা দিয়ে একজন বিশ্বনেতাকে স্মরণ করছেন বিভিন্ন রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ। গত ২৫ নভেম্বর ২০১৯ প্যারিসে ইউনেস্কোর ৪০তম সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথভাবে মুজিববর্ষ উদযাপনের সিদ্ধান্ত নেয় ইউনেস্কো।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ বলেছেন, 'বাঙালির বঙ্গবন্ধু ছিলেন রাশিয়ারও সত্যিকারের বন্ধু।'

বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্বের প্রশংসা করে সের্গেই লাভরভ বলেন, 'অসাধারণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব শেখ মুজিবুর রহমানকে স্মরণ করছে রাশিয়া। লড়াকু নেতা হিসেবে জনগণের স্বাধীনতা ও সুখের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। তিনি রাশিয়ার সর্তিকারের বন্ধু ছিলেন।' ১৯৭২ সালের মার্চে বঙ্গবন্ধুর রাশিয়া সফরের কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেওয়ার দুই মাসেরও কম সময়ের মধ্যে রাশিয়া সফর করেন বাংলাদেশের তখনকার সরকার প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিব। সের্গেই লাভরভ বলেন, 'সেই সময়ই সমতা, পারস্পরিক সম্মান ও স্বার্থ বিবেচনার নীতির ওপর আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভিত্তি নির্মিত হয়েছিল।'

চীনা রাষ্ট্রপতি শি জিংপিং বলেন, ৫০ বছর আগে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি বলেন, 'যে ব্যক্তি তার পুরো জীবন নিজের দেশ এবং জনগণের জন্য উৎসর্গ করেছেন, তাঁকে আজ অবধি বাংলাদেশের মানুষ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে।' তিনি আরও বলেন, 'বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা এখনও ১৬ কোটি মানুষকে জাতীয় চেতনায় উজ্জীবিত করে।'

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে বিশেষ শুভেচ্ছা বার্তা দিয়েছেন ব্রিটেনের রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ। রাষ্ট্রপতির উদ্দেশে তাঁর শুভেচ্ছা বার্তায় তিনি বলেন, 'বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছরপূর্তিতে আমি অত্যন্ত আনন্দিত এবং এই বিশেষ মুহূর্তে আপনাকে আমার আন্তরিক অভিনন্দন জানাচ্ছি ও একই সঙ্গে বাংলাদেশের জনগণকে জানাচ্ছি শুভকামনা।'

বাংলাদেশ সফরের ঠিক আগের দিন ২৫ মার্চ এক সংবাদ সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, 'বঙ্গবন্ধু গত শতাব্দীর অন্যতম শীর্ষ নেতা ছিলেন; যার জীবন এবং আদর্শ লাখ লাখ মানুষকে অনুপ্রাণিত করে। বঙ্গবন্ধুর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে টুঙ্গিপাড়ায় তাঁর সমাধিতে যাওয়ার অপেক্ষা করছি।' এর আগে বঙ্গবন্ধুর জন্মবার্ষিকী ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী দিনে এক ভিডিও বার্তায় শুভেচ্ছা জানান কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো। তিনি বলেন, 'আমরা আজ বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করতে পারছি; কারণ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিলেন। নেতা বা নাগরিক হিসেবে যে কোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের এমনই হওয়া উচিত।'

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আজ বাংলাদেশ আলোচিত ও প্রশংসিত একটি নাম। বৈশ্বিক করোনা মহামারির মধ্যে বিশ্বের ধনী দেশগুলোর অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়লেও বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এগিয়ে যাওয়ার স্বীকৃতি মিলেছে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) থেকে। সংস্থাটি স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশকে বের হয়ে যাওয়ার সুপারিশ করেছে।

প্রভাবশালী মার্কিন গণমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল বলছে, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন ও ভিয়েতনামের উন্নয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের মিল রয়েছে। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক ও মানবসম্পদ উন্নয়নের দীর্ঘ যাত্রায় ২০০৯ থেকে বর্তমান পর্যন্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ-পরিক্রমা। আর এটি সম্ভব হয়েছে বঙ্গবন্ধুতনয়া এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞার এক অনবদ্য রসায়নে। 'তলাবিহীন ঝুড়ি' থেকে 'উন্নয়নের রোল মডেল' হিসেবে বাংলাদেশের এই অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রা সন্দেহাতীতভাবে জাতির পিতার লালিত স্বপ্নের বাস্তবায়নেরই বহিঃপ্রকাশ। 'সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না। আমরা যখন মরতে শিখেছি, তখন কেউ আমাদের দমাতে পারবে না'- বঙ্গবন্ধুর এই দৃপ্ত ঘোষণা আজ যেন সত্যিই প্রমাণিত ও কোটি বাঙালির হৃদয়ে অনুরণিত। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের মধ্য দিয়ে বিশ্বের বুকে বাংলাদেশের সফলতার স্টম্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে যাবে- সে প্রত্যাশা করা যেতেই পারে।