বাংলাদেশের মুক্তির সংগ্রামের ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন অগণিত গণযোদ্ধা এবং তাদের মা জননীদের গৌরবগাথা। ইতিহাসের আখ্যান হয়ে রয়েছে অসংখ্য মায়ের সন্তান হারানোর হাহাকার। '৭১ শুধু সংখ্যাই নয়, স্বজন হারানোর দীর্ঘশ্বাস; হাজার হাজার মানুষের রক্তাক্ত স্মৃতি। যারা আপনজন হারিয়েছেন, সন্তানকে বিসর্জন দিয়েছেন, দেশের স্বাধীনতার জন্য তাদের দুঃখ-কষ্ট-শূন্যতা-হাহাকার-বেদনার কথা জড়িয়ে রয়েছে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের পরতে পরতে। স্বজনের রক্তের দাম দিতে হয়েছে কান্নার স্রোতে। হাসি ম্লান হয়ে যায়; ভেসে যায় চোখের জলে। তাদের ধূসর শূন্যতা যেন মিশে যায় বাংলাদেশের পতাকার সবুজ জমিনে রক্ত রঙের সূর্যের মাঝে সোনালি হরফে।

একাত্তরে প্রতিটি মায়ের রয়েছে সন্তানকে ঘিরে একেকটি গল্পগাথা। খুব সাধারণ একেকজন মায়ের অসাধারণ আখ্যান হয়ে ওঠার কাহিনি। একটি মায়ের গর্ভধারণের সন্তান সৃজনের সময়কাল 'নয় মাস'। ১৯৭১ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বর, এই নয় মাসে একটি দেশ- 'বাংলাদেশে'-এর জন্ম হয়। একজন মা প্রকৃতির আলো-বাতাসের মতোই। জন্মের পর থেকে নিজের সঞ্জীবনী সুধায় বড় করে তোলেন মা সন্তানকে। রক্তঝরা একাত্তরের সে দিনগুলোতে নিজের জীবনের চেয়ে প্রিয় সন্তানকে উৎসর্গ করেছেন দেশের জন্য। উজ্জীবিত করেছেন গ্রীষ্ফ্মের বৈশাখী ঝড়ের মতো। তাদের অমৃতসন্তানরা যেন দ্রোহের শিক্ষায় উজ্জীবিত হয়ে প্রতিবাদে ফেটে পড়তে পারেন। যেন রক্তের অক্ষরে বুকে নাম লিখতে পারে বাংলা আর বাংলাদেশের মানচিত্রের।

'মা' এবং 'মাতৃভূমি' সমার্থক। পৃথিবীর সব যুদ্ধের মতো আমাদের এই ৫৬ হাজার বর্গমাইলের ভূখণ্ডে জননীরূপী শৃঙ্খলিত পরাধীন জন্মভূমিকে মুক্ত করার লক্ষ্যে জীবন বাজি রেখে একাত্তরে মহান মুক্তির সংগ্রাম- জনযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন অগণিত গণযোদ্ধা। সাধারণ-অতিসাধারণ 'মা জননী' একাত্তরের সেই আগুনঝরা দিনে 'জননী সাহসিকা' হয়ে সন্তানকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের আদেশ দিয়েছেন, অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। শুধু সন্তানের জেদ আর প্রতিজ্ঞার কারণেই মা সন্তানকে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন তা নয়; কখনও উৎসাহ দিয়েছেন, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছেন।

শুধু সম্মুখ সমর নয়, প্রতিটি ঘরে মুক্তিযুদ্ধে মায়েরা কোনো না কোনোভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। সময়ের সন্তান- মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানতুল্য মনে করে নিজ ঘরে আশ্রয় দিয়েছেন। পরম মমতায় নিজ হাতে রান্না করা খাবার খাইয়েছেন। অসুস্থ আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা-সেবা-শুশ্রুষা দিয়েছেন, শীতে নিজেরা কষ্ট সহ্য করে মুক্তিযোদ্ধাদের লেপকাঁথা দিয়েছেন, নিজে অভুক্ত থেকে খাবার তুলে দিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধাদের পাতে। চাল-ডাল-অর্থ দিয়েছেন মুক্তিবাহিনীদের ক্যাম্পে। গোপনে অস্ত্র-গোলা-বারুদ জমা রেখেছেন খোরাকি চাল অথবা তুষের ভেতরে। কখনও-বা যুদ্ধ করেছেন হানাদার-রাজাকারদের সঙ্গে নিজেদের চেনা-জানা আঙিনায়। মা ও মাতৃভূমি সমার্থক হয়ে যাওয়ায় মুক্তিযোদ্ধা সন্তান মায়ের সম্মান উদ্ধার করতে, মায়ের অসম্মানের প্রতিশোধ নিতে মরণপণ যুদ্ধ করে জীবন দিতেও দ্বিধা করেননি।

একাত্তরে প্রতিটি ঘরেই সাধারণ-অসাধারণ মায়েরা যেন উজ্জীবিত হয়েছিলেন আত্মত্যাগের মন্ত্রে। সময়ের সাহসী সন্তানদের নিয়ে খুব সাধারণ মায়েরা যেন অসাধারণ হয়ে উঠেছিলেন কোনো এক অমৃতলোকের ইশারায়।

'শহীদ জননী' জাহানারা ইমাম সব মুক্তিযোদ্ধার মা হয়ে আছেন। তার সন্তান রুমী আমেরিকায় উচ্চশিক্ষার জন্য না গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত যখন চূড়ান্ত করেন, তখন মা জাহানারা ইমাম হয়ে ওঠেন ছেলের প্রধান সহযোগী। বিপদের আশঙ্কা নিয়েও জাহানারা ইমাম নিজ গাড়িতে অস্ত্র বহন করতেন, পৌঁছে দিতেন সেই অস্ত্র যথাস্থানে, ছেলের বন্ধু মুক্তিযোদ্ধাদের নিজ বাসায় আশ্রয় দিতেন। অনিশ্চিত সময়ে লেখা তার 'একাত্তরের দিনগুলি' শুধু ইতিহাসই নয়, গভীর মমতায় যুদ্ধদিনের কথা যেন অনুভবের কলমের আঁচড়ে উঠে এসেছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য ঘটনা যেমন ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর রেসকোর্স ময়দানের ভাষণ, ২৫ মার্চের কালরাতের পাকিস্তান সামরিক জান্তার নির্মমতার বর্ণনা, রাজারবাগ পুলিশ লাইনের হত্যাকাণ্ড, গেরিলাদের অতর্কিতে দুঃসাহসী অপারেশনের গল্প, সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালের হত্যাকাণ্ডের বীভৎসতা, ২৯ আগস্ট অসতর্কতার কারণে হানাদারদের হাতে রুমীর ধরা পড়া, বিজয়ের পূর্ব মুহূর্তে স্বামী শরিফ ইমামের মৃত্যু- ধারাবাহিকভাবে এসব তিনি লিখেছেন।

বাংলাদেশে এরকম আরও অসংখ্য মা ছিলেন কিংবা রয়েছেন যাদের ত্যাগ, পরামর্শ, নির্দেশ মুক্তিযুদ্ধ সফল করতে সহায়তা করেছে। সাফিয়া খাতুন এরকম আরেকজন সাধারণ মায়ের নাম। যিনি বেঁচেছিলেন 'মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ আজাদের মা'-এর পরিচয়ে। শহীদ আজাদ ছিলেন মা ও বিত্তশালী প্রকৌশলী বাবার একমাত্র সন্তান। আজাদের বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করলে প্রতিবাদে মা সাফিয়া খাতুন, ইস্কাটনের রাজপ্রাসাদপ্রতিম বাড়ি থেকে বের হয়ে যান আজাদের হাত ধরে। আশ্রয় নেন ফরাশগঞ্জের একটি বাড়িতে; অতঃপর মালিবাগের একটি বস্তিতে। মা ছাড়া আজাদের আর কেউ ছিল না, মায়েরও আজাদ ছাড়া। একাত্তরে বন্ধুদের সঙ্গে যুদ্ধে রওনা হওয়ার আগে আজাদ মায়ের অনুমতি নেন। মাকে জিজ্ঞেস করেন, 'মা, আমি কি যুদ্ধে যাব? ওরা সবাই আমাকে ডাকছে।' মা বললেন, 'নিশ্চয়ই, আমি তো আমার প্রয়োজনে লাগবে বলে তোমাকে মানুষ করিনি, তুমি লাগবে দেশের প্রয়োজনে, দশের প্রয়োজনে, যাও।' আজাদ গেরিলা অপারেশনে তার বন্ধুদের সহযাত্রী হন। ৩০ আগস্ট আজাদদের বাড়ি পাকিস্তানি সৈন্যরা ঘিরে ফেলে। গোলাগুলি হয়। আজাদসহ মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে নিয়ে যায় পাকিস্তানি মিলিটারিরা। এমপি হোস্টেলের ইন্টারোগেশন সেন্টারে চলে অকথ্য নির্যাতন। আজাদকে বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হয়। বিদ্যুতের তার খুলে বাঁধা হয় চেয়ারের সঙ্গে আর আজাদের পা। নির্মম অত্যাচার চলে আজাদের ওপর কিন্তু আজাদ নির্বিকার। তিনি শুধু মনে করেন তার মায়ের মুখ। মা বলেছেন, 'বাবা শক্ত থেকো... কারও নাম বলো না।'

আগেরদিন ভাত খেতে চেয়েছিলেন আজাদ মায়ের কাছে। মা ভাত নিয়ে হাজির হন পরের দিন বন্দিশিবিরে। কিন্তু ছেলের দেখা মেলে না। আর কোনোদিনও ছেলে তার ফিরে আসেনি আর এই মা আর কোনোদিনও জীবনে ভাত খাননি। যশোর জেলার কালিগঞ্জ গ্রামে এ রকমই একটি অসাধারণ ঘটনা বিবৃত হয়েছে উপন্যাস 'হাঙর নদী গ্রেনেড'-এ। একজন সাধারণ মা দু'জন মুক্তিযোদ্ধাকে বাঁচানোর জন্য নিজের প্রতিবন্ধী সন্তানকে উৎসর্গ করেছেন শ্যামল-সবুজ এ দেশের স্বাধীনতার সংগ্রামের বেদিতে; একমাত্র সন্তান রইসকে তুলে দিয়েছিলেন পাকিস্তানি মিলিটারির হাতে। পাবনা মহিলা পরিষদের আহ্বায়ক কমিটির সভানেত্রী রাকিবা বেগম ছেলেদের বলতেন, 'তোমাদের কি মানুষ করেছি ঘরে থেকে অসহায়ভাবে মরার জন্য? মরতে হলে যুদ্ধ করতে করতে মরো। আরও বলতেন, আরেকটি কথা মনে রেখো, পিঠে কখনও গুলি খেয়ো না।'    

আশরাফুন্নিসা নয় মুক্তিযোদ্ধার আরেক এক গরবিনী মা। তার সাত ছেলে এবং দুই মেয়ে মুক্তিযোদ্ধা। চার সন্তান মুক্তিযুদ্ধে অসীম সাহসিকতার জন্য বীরত্বসূচক পদকের অধিকারী। কর্নেল তাহের বীরউত্তম, এক সন্তান ইউসুফ বীরবিক্রম, দুই সন্তান বীরপ্রতীক। মর্টারের সেলের আঘাতে একটি পা হারিয়েও রক্তাক্ত কমান্ডার তাহের সহযোদ্ধাদের বলেন, 'যুদ্ধ চালিয়ে যাও, তোমরা ফ্রন্টে ফিরে যাও, যুদ্ধ চালিয়ে যাও... মনে রেখো কামালপুরকে মুক্ত করতে হবে। আমি মরব না, খুব দ্রুত চলে আসছি তোমাদের কাছে। পাকিস্তানিদের তোমাদের হারাতেই হবে।' হাসপাতালের বিছানায় শায়িত ছেলের মুখপানে চেয়ে মা বলেছিলেন, 'নান্টু (কর্নেল আবু তাহের বীরউত্তম), দেশের স্বাধীনতার জন্য পা হারিয়েছ, আমাদের দুঃখ নেই, তোমার জন্য আমরা গর্বিত।'

পরিতাপের বিষয়, আমাদের মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিবাহিনী, বাঙালি বিভিন্ন পেশাদার সেনাবাহিনী, কৃষক-শ্রমিক-ছাত্রছাত্রী-শিক্ষক-মুটে মজুর ইত্যাদি নানা গোত্রগোষ্ঠী বর্ণের মানুষের কৃতিত্ব ও অবদানের কথা উল্লেখ করা হলেও সমাজ-সংসারের একটা উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণির কথা প্রায় অনুচ্চারিত থেকে যায়। সেই শ্রেণিটি হচ্ছেন মা। মা জননী। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য- আমাদের প্রধানত মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণির মায়েরাই যুদ্ধে সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ করেছেন, দেশের মুক্তির জন্য আপন গর্ভজাত সন্তানকে যুদ্ধে যেতে ক্ষেত্রবিশেষে বাধ্য করেছেন, না গেলে ধিক্কারও দিয়েছেন। এভাবে চিরায়ত শাশ্বত বাঙালি মা স্নেহের আঁচল আড়াল করে কখনও-বা 'যোদ্ধা' হয়ে ওঠেন। মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের অধিকারিণী নারীদের কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি জোটেনি; শুধু 'বীরাঙ্গনা' ছাড়া। যদিও স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু 'বীরাঙ্গনা' উপাধিটি প্রবর্তন করেছিলেন 'বীর নারী' অর্থে কিন্তু তথাকথিত পুরুষতান্ত্রিক সমাজে ক্রমেই 'বীরাঙ্গনা' শব্দটি পরিণত হয়েছে সহানুভূতিসহ এক ধরনের সান্ত্বনায়। বীর নারী আর জননী সাহসিকাদের আত্মত্যাগ যেন ইতিহাসের একটি প্রচ্ছন্ন প্রচ্ছদ। 'বীরাঙ্গনা' যেন একটি প্রতীক। সভ্যতার সঙ্গে অসভ্যতার সংঘাত। একাত্তরের অজস্র কালরাতে উর্দিধারী রাক্ষসদের ক্যাম্প থেকে গভীর রাতে ভেঙে আসা, নারী চিৎকার আর্তনাদ। অস্বীকার করা যায় না- এ শব্দটিতে 'অসম্মানের' বিষয়টিই বেশি প্রতিভাত হয়।

১৯৭১-এ মাতৃভূমি, মা এবং তাদের সূর্যসন্তান-মুক্তিযোদ্ধাদের ইতিহাস নানা আঙ্গিকে লেখা প্রয়োজন ইতিহাসেরই প্রয়োজনে। অনুসন্ধান প্রয়োজন, সারাদেশের এরকম মায়েদের আর মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধদিনের সংগ্রাম, স্মৃতিকথা, আত্মত্যাগের ইতিহাস। প্রত্যাশা থাকবে, বর্তমান প্রজন্মের গবেষকরা সারাদেশের মুক্তিযোদ্ধার মা এবং তাদের বীর সন্তানদের অপ্রকাশিত কীর্তি প্রকাশ করবেন। মুক্তিযোদ্ধার মায়ের বিচ্ছিন্ন স্মৃতিকথা, দেশের জন্য আত্মত্যাগ, মাতৃত্বের অনুভব, মুক্তিযোদ্ধাদের অহংকারের ইতিহাস, গৌরবগাথা লেখা হবে যা বহন করব আমরা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে, চেতনার শিখা অনির্বাণে। মুক্তিযুদ্ধের মতো একটি সুমহৎ ও সুবিশাল ঘটনা আপন শক্তিতেই পুনরুজ্জীবিত হবে। মুক্তিযুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনায় নিশ্চিতভাবে একাত্তরের মায়েদের আত্মত্যাগের অনুসন্ধান করবে- অনাগত প্রজন্ম, যারা আশা আর বিশ্বাসের মৃত্যুঞ্জয়ী অভিযাত্রী। যাদের হাতে সমর্পিত হবে মুক্তিযুদ্ধের জয়ের নিশান। অশেষ শ্রদ্ধা মুক্তিযোদ্ধার মা আর সূর্য সন্তানদের, যাদের আত্মত্যাগ আর বুকের রক্তে পাওয়া স্বপ্টেম্নর সবুজ স্বদেশ। আমরা তাদের অক্ষয় আত্মদান ভুলব না।




মন্তব্য করুন