ভারতের বহুল বিতর্কিত কৃষি আইন বাতিলের দাবিতে সে দেশের কৃষকদের আন্দোলন কিছুটা স্তিমিত হয়ে আসছে বলে মনে হলেও এখন আবার তা ক্রমশই চাঙ্গা হয়ে উঠছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। গত ১০ মার্চ লোকসভার স্পিকারের চলতি বাজেট অধিবেশন দিন পাঁচেকের জন্য স্থগিত করে দিতে বাধ্য হন। আন্দোলনের গতিবিধি দেখে মনে হয় না যে, কৃষকরাও এ থেকে সহসা সরে আসবেন। তাহলে এর শেষ কোথায় বা এর পরিণতিই-বা কী হতে পারে, এ নিয়ে শুধু ভারতে নয় ভারতের বাইরেও মানুষের মধ্যে যথেষ্ট ঔৎসুক্য রয়েছে। আর এই সূত্রে এ আলোচনাও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে যে, ঐতিহ্যিক ধারায় ক্রমাগত বঞ্চিত হয়ে আসা বাংলাদেশের সাধারণ কৃষকের চারপাশে ধূর্ত কারবারি এবং সামাজিক দড়িবাজ শক্তির যে দৌরাত্ম্য, তার হাত থেকে ওই শোষিত কৃষকের মুক্তি কবে ও কীভাবে ঘটবে?

এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গেলে বিষয়গুলো একটু পেছন থেকে ও গভীরভাবে দেখা প্রয়োজন। নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি ২০১৯ সালে দ্বিতীয় দফায় সরকার গঠনের পর পরই দেশটির নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন জারি করলে তা নিয়ে দেশে-বিদেশে ব্যাপক বিতর্ক ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়। এমনকি এক পর্যায়ে তা দেশব্যাপী সর্বাত্মক বিক্ষোভ-আন্দোলনেরও রূপ পরিগ্রহ করে। আর সরকারের পক্ষ থেকে আন্দোলন-বিক্ষোভ দমন করতে গেলে নিরাপত্তারক্ষী বাহিনীর হাতে অন্তত ৬৫ জন নিহত হয়। এমনি পরিস্থিতিতে ভারতসহ পৃথিবীব্যাপী করোনার ব্যাপক প্রাদুর্ভাব ঘটলে স্বভাবতই সে আন্দোলন-বিক্ষোভে কিছুটা ভাটা পড়ে।

করোনাকালীন পরিস্থিতি চলতে থাকা অবস্থাতেই মোদি নতুন করে জারি করলেন বিতর্কিত কৃষি আইন, ভারতীয় কৃষক ও সংশ্নিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে যা বস্তুত দেশি-বিদেশি করপোরেটদের স্বার্থ রক্ষারই উদ্যোগ। ক্ষমতায় যাওয়া বা সেখানে টিকে থাকার জন্য ২০১০-পরবর্তী রাজনীতিতে বিজেপি নিজেদের গায়ে যতই গণতান্ত্রিক লেবাস পরার চেষ্টা করুক না কেন, হিন্দু মহাসভা (১৯৪৮-৫১) থেকে জনসংঘ (১৯৫১-৭৭) হয়ে প্রথমে জনতা পার্টি (১৯৭৭-৮০) ও পরে ১৯৮০ সালে বিজেপিতে রূপান্তরিত এ দলটির ইতিহাস বস্তুত বুর্জোয়া সাম্প্রদায়িকতারই ইতিহাস। ফলে এ দলের পক্ষে সাম্প্রদায়িক চেতনার বোধ দ্বারা তাড়িত হয়ে নাগরিক সংশোধনী আইন প্রণয়ন বা কট্টর মুনাফালোভী বুর্জোয়া পুঁজির পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করতে গিয়ে নতুন কৃষি আইন প্রণয়ন করাটা ছিল খুবই স্বাভাবিক। আর এটা তো স্বীকৃত বাস্তবতা যে, কিছু বিরল ব্যতিক্রম বাদে বিশ্ব এবং ভারত উভয়ের রাজনীতি ও অর্থনীতির প্রায় পুরোটাই এখন করপোরেট পুঁজির হাতে বন্দি। কিন্তু তার পরও ভারতের কৃষকরা ওই জনবিরোধী কৃষি আইনকে রুখে দাঁড়াতে গত ২৯ নভেম্বর থেকে পথে নেমেছেন, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় এবং তাদের প্রতিবাদী চেতনা ও অসম সাহসিকতারই বহিঃপ্রকাশ। আর তাদের এ ধরনের প্রতিবাদী আচরণের পরিপ্রেক্ষিতেই ভারতীয় হাইকোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আইনটি স্থগিত করতে উদ্যোগী হয়েছেন। তবে সে দেশের কৃষকদের দাবি পুরো আইনটিই বাতিল করা।

সম্পদবৈষম্য বৃদ্ধির হারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের এ জাতীয় শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর অন্যতম। ফলে এখানকার করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো এখনও ভারতের মতো অত বিশালাকৃতির পুঁজি গড়ে তুলতে বা বহুজাতিক চরিত্রের আদল ধারণ করতে না পারলেও স্বার্থ ও মুনাফার চর্চায় বহুক্ষেত্রে এরা ভারতকেও ছাড়িয়ে গেছে। আর এ ধারার স্বার্থের চর্চায় বাংলাদেশের ক্ষুদ্র বা মাঝারি পুঁজির বহু নন-করপোরেট ফাটকা প্রতিষ্ঠানও ক্রমান্বয়ে বড় পুঁজির চরিত্র ধারণ করতে শুরু করেছে, যেমন বাংলাদেশের চালকল মালিকরা। আপাতদৃষ্টিতে এরা মফস্বল বা জেলা শহরের নামগোত্রহীন চাতাল মালিক হলেও প্রভাব ও ধূর্ততায় এরা সংসদ সদস্য কাজী শহিদ ইসলাম পাপুল কিংবা করোনার ভুয়া পরীক্ষাখ্যাত মোহাম্মদ শাহেদের চেয়ে কোনো অংশে পিছিয়ে নেই। পাপুল বা শাহেদরা যেমন কৌশল ও বুদ্ধি খাটিয়ে বিপুল অর্থ কামিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে, অসাধু চাতাল মালিকেরাও তেমনি নানা কৌশলে সংশ্নিষ্ট প্রভাবশালীদের প্রশ্রয় ও সমর্থন নিয়ে ধান-চালের মূল্য বিক্রির সময় বাড়িয়ে আর কেনার সময় কমিয়ে একচেটিয়া ও অনৈতিক মুনাফা অর্জন করে চলেছে। এদের অনৈতিক কর্মকাণ্ডে কৃষকই শুধু অমানবিক ক্ষতির শিকার হচ্ছে না, দেশের প্রতিটি সাধারণ মানুষও তাদের প্রতিদিনের একটি অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের জন্য এই হীন রুচির চাতালিদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ছে।

অন্যদিকে, এই অসাধু চাতালিদের মতোই কৃষককে চারদিক থেকে ঘিরে আছে নানা ধূর্ত-ধুরন্ধর সামাজিক অপশক্তিও, যাদের মধ্যে রাজনৈতিক দলের টাউট, রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে গড়ে ওঠা চাঁদাবাজ, প্রতারক দালাল, ঘুষখোর সরকারি কর্মচারী প্রভৃতি রয়েছে। অবশ্য এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কৃষকের যুগ যুগের সারল্য ও দুর্ভাগ্যজনক নিরক্ষরতাও, যা তাকে শুধু দৈনন্দিন ন্যায়-ন্যায্যতা থেকেই বঞ্চিত করছে না, নিজেদের অধিকার ও করণীয় সম্পর্কেও অন্ধকারাচ্ছন্ন করে রেখেছে। আর এ অন্ধকারাচ্ছন্নতার দায় আপাতদৃষ্টে তার ব্যক্তিগত উদ্যমহীনতার ওপর বর্তায় বলে মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে এ আসলে রাষ্ট্রের দুর্বল নীতিকাঠামোরই ফল। রাষ্ট্রই বস্তুত তাকে দুষ্ট সামাজিক চক্রের হাতে বন্দি ও তাদের দ্বারা অধিকারবঞ্চিত করে রেখেছে। তবে এ বঞ্চনা ও অধিকারহীনতা থেকে বেরিয়ে আসার ব্যাপারে তাদের নিজ শ্রেণির মধ্যেও যে উদ্যমের ঘাটতি রয়েছে, সেটিও একটি কষ্টদায়ক বাস্তবতা বৈকি! বঙ্গবন্ধু ও তাজউদ্দীন আহমদ কৃষককে দীর্ঘ দিনের বঞ্চনাগ্রস্ত অবস্থান থেকে বের করে আনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ের সরকারগুলো স্বাধীনতার মৌলচেতনা ও স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে গৃহীত সেসব গণমুখী উদ্যোগ আর কখনোই বাস্তবায়নের পথ খুঁজে পায়নি।

পুঁজি ও করপোরেট শোষণের চাপে পিষ্ট ভারতের ছোট-বড় প্রায় সব কৃষকের জীবনই এখন অতিষ্ঠ হতে হতে সহনীয়তার শেষ পর্যায়ে নেমে এসেছে এবং বস্তুত সে কারণেই এটি বাতিলের দাবিতে তারা রাজপথে নেমে এসেছে বলে ধারণা করা হয়। অবশ্য এরূপ অভিমতও রয়েছে যে, তাদের এ আন্দোলনের পেছনে রাজনৈতিক মদদও যথেষ্টই রয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে দৃঢ়তার সঙ্গে মন্তব্য করতে চাই যে, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এরূপ গণমুখী আন্দোলনের পেছনে রাজনৈতিক সংশ্নিষ্টতা থাকাটা শুধু স্বাভাবিকই নয়, জরুরিও। ফলে ওই কৃষক আন্দোলনের পেছনে সে দেশের কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থন বা সংশ্নিষ্টতা থাকাটা ভারতীয় কৃষকের আন্দোলনের যুক্তি ও গুরুত্বকে কোনোভাবেই খাটো করে না। বরং তাদের সমর্থনদানকারী রাজনৈতিক দলগুলো শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাদের পূর্ণ শক্তি নিয়ে এই কৃষকদের পাশে থাকবে কিনা সেটিই অধিক দুশ্চিন্তার বিষয়। কারণ সমর্থনদানকারী এই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও বিকাশমান করপোরেট পুঁজির যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে।

অতএব, ভারতের চলমান কৃষক আন্দোলন কতটা সফল হবে, তার অনেকটাই নির্ভর করছে তাদের নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি অটুট থাকার পাশাপাশি তাদের সমর্থনদানকারী রাজনৈতিক দলগুলো কতটুকু শক্তি ও নিষ্ঠা নিয়ে কতক্ষণ তাদের পাশে থাকবে, তার ওপর। অবশ্য এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট পদের সাল্ফপ্রতিক পরিবর্তন-উত্তর আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং কূটনীতিও কিছুটা হলেও প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা চলে। বাংলাদেশের কৃষক পরিস্থিতি নিয়ে যা বলা হলো তা আলোচনার খুবই সামান্য অংশ মাত্র। ভূমি থেকে প্রকৃত কৃষকের ব্যাপক হারে উচ্ছেদ হয়ে যাওয়া এবং কৃষিজমি ক্রমশ দুর্নীতিপরায়ণ ও উঠতি পুঁজিপতিদের হাতে চলে যাওয়া সংক্রান্ত ঘটনার বৃত্তান্ত অসাধু চাতালিদের চালাকির চেয়েও অনেক বেশি করুণ।

ভারতের করপোরেট স্বার্থের কৃষিনীতি নিয়ে সে দেশে ব্যাপক প্রতিবাদ হচ্ছে এবং এতদসংক্রান্ত আলোচনা-সমালোচনার পরিসর এখন দেশের সীমানা ছাড়িয়ে অন্য দেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। এতে ভারতের মর্যাদা, অবস্থান ও ভাবমূর্তির ক্ষয়ক্ষতি যাই হোক না কেন, তা অন্য অনেক দেশের জন্যই এ থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের পক্ষে সচেতন হবার সুযোগ তৈরি দিল। বাংলাদেশে কৃষক ঠকানোর সঙ্গে যুক্ত সব পক্ষ এ ব্যাপারে দূরদৃষ্টি, বিচক্ষণতা ও অগ্রসর চিন্তাভাবনা নিয়ে ইতিবাচক পরিবর্তনের দিকে এগিয়ে গেলে তা শুধু কৃষকের স্বার্থকেই রক্ষা করবে না- দীর্ঘমেয়াদে পরিবর্তন সাধনকারী পক্ষগুলোর জন্যও সুফল বয়ে আনবে। করপোরেট সংস্কৃতিতে শুধু যে শোষণ ও মুনাফাই আছে তা নয়- মান, শৃঙ্খলা, দক্ষতা এবং উন্নত কর্মসম্পর্কও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সে ক্ষেত্রে ভারতের কৃষক আন্দোলন সংশ্নিষ্ট সবার জন্য এ শিক্ষাই নিয়ে এসেছে যে, এ দেশের কৃষি খাত থেকে মধ্যস্বত্বভোগী শক্তির অপনোদনের পাশাপাশি এখানকার উদীয়মান করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকেও একচেটিয়া মুনাফা অর্জনের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।


মন্তব্য করুন